- দে । শ
- মার্চ ৩০, ২০২৬
বাম জোট অতীত, ২৮৪ আসনে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ কংগ্রেসের। বহরমপুরে অধীর, মালতীপুরে মৌসম
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে দীর্ঘ জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। রবিবার একযোগে রাজ্যের ২৮৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও এখনও ১০টি আসনে প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত হয়নি, তবু দেরিতে হলেও এই তালিকা প্রকাশ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা নিঃসন্দেহে বহরমপুর কেন্দ্রকে ঘিরে। সেখানে প্রার্থী করা হয়েছে প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী-কে। দীর্ঘদিনের সাংসদ অধীরের বিধানসভা ভোটে নামা রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে, মালদহ জেলার মালতীপুর কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছেন প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ মৌসম বেনজির নূর। উত্তর দিনাজপুরের চাকুলিয়া কেন্দ্রে আবারও আস্থা রাখা হয়েছে আলি ইমরান রামজ (ভিক্টর)-এর উপর, যিনি পূর্বেও ওই কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
কলকাতার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রেও চেনা-অচেনা মুখের সমাবেশ ঘটেছে। বালিগঞ্জ কেন্দ্রে প্রার্থী করা হয়েছে প্রয়াত কংগ্রেস নেতা সোমেন মিত্র-এর পুত্র রোহন মিত্র-কে। ভবানীপুরে কংগ্রেসের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দক্ষিণ কলকাতা জেলা সভাপতি প্রদীপ প্রসাদ। রাসবিহারী কেন্দ্রে আবারও প্রার্থী হয়েছেন আশুতোষ চট্টোপাধ্যায়। নন্দীগ্রাম, যা বরাবরই রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু, সেখানে দল ভরসা রেখেছে যুব নেতা শেখ জারিয়াতুল হোসেনের উপর।
২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিধায়ক ছিলেন এমন একাধিক নেতাকে এ বারও টিকিট দেওয়া হয়েছে। রায়গঞ্জে মোহিত সেনগুপ্ত, চাঁচলে আসিফ মেহবুব এবং হরিশ্চন্দ্রপুরে মোস্তাক আলম—এই নামগুলি সেই তালিকায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে দলবদলের রাজনীতির প্রতিফলনও দেখা গিয়েছে প্রার্থী তালিকায়। তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি ঘুরে কংগ্রেসে যোগ দেওয়া অমল আচার্যকে ইটাহার কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করা হয়েছে।
উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ—প্রায় প্রতিটি জেলাতেই প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হয়েছে। কোচবিহারের ৯টি আসনের প্রতিটিতেই প্রার্থী ঘোষণা হয়েছে। আলিপুরদুয়ারে একটি আসন বাদে বাকি কেন্দ্রে নাম চূড়ান্ত। জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, কালিম্পং-সহ পাহাড় ও ডুয়ার্স অঞ্চলেও প্রায় সব আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। উত্তর দিনাজপুরে ইসলামপুর কেন্দ্র এখনও ঘোষণা বাকি থাকলেও, অন্যান্য কেন্দ্রে প্রার্থী নির্ধারণ করা হয়েছে। দক্ষিণ দিনাজপুরে ছ’টি আসনের সবকটিতেই প্রার্থী ঘোষণা হয়েছে।
মালদহ জেলার ১২টি আসনের মধ্যে প্রায় সবকটিতেই প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে মালতীপুরে মৌসম নূরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুর্শিদাবাদের ২২টি আসনের তালিকাতেও একাধিক পরিচিত নাম রয়েছে—বহরমপুরে অধীর চৌধুরী ছাড়াও জঙ্গিপুরে মহম্মদ ইমরান আলি, রানিনগরে জুলফিকার আলি, কান্দিতে শামিম রানা, ভরতপুরে আজহারউদ্দিন সিজার, ডোমকলে শেহনাজ বেগম এবং জলঙ্গিতে আব্দুল রেজ্জাক মোল্লার নাম রয়েছে। তবে এখানেও কয়েকটি আসনে প্রার্থী ঘোষণা বাকি।
নদিয়ার ১৭টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। করিমপুরে পূজা রায়চৌধুরী, তেহট্টে জ্যোর্তিময় সরকার, কালীগঞ্জে কাবিল উদ্দিন শেখ এবং কল্যাণীতে অসীমানন্দ মজুমদারের নাম রয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার ৩৩টি আসনের মধ্যে কয়েকটিতে এখনও প্রার্থী ঘোষণা হয়নি, তবে বাগদা, নৈহাটি, বারাকপুর, দমদম এবং বিধাননগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে প্রার্থীদের নাম সামনে এসেছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ৩১টি আসনের অধিকাংশেই প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে—কাকদ্বীপ, সাগর, ডায়মন্ড হারবার, যাদবপুর এবং বেহালা পূর্বে প্রার্থীরা ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত।
কলকাতার ১১টি আসনের তালিকাও প্রকাশিত হয়েছে—ভবানীপুর, বালিগঞ্জ, চৌরঙ্গি, শ্যামপুকুর এবং মানিকতলার মতো কেন্দ্রে প্রার্থী ঘোষণা হয়েছে। হাওড়া, হুগলি-সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলাতেও বেশিরভাগ আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে এখনও ঘোষণা বাকি রয়েছে। পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বর্ধমান ও বীরভূম জেলাতেও প্রায় সব আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। নন্দীগ্রামে শেখ জারিয়াতুল হোসেন, খড়গপুরে ডঃ পাপিয়া চক্রবর্তী, পুরুলিয়ায় দিব্যজ্যোতি প্রসাদ সিং দেও, বাঁকুড়ায় অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়, বর্ধমান দক্ষিণে গৌরব সমাদ্দার, আসানসোলে শৌভিক মুখোপাধ্যায়, বোলপুরে রথীন সেন এবং রামপুরহাটে বিবেকানন্দ সাউ—এই নামগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তবে প্রার্থী তালিকার পাশাপাশি রাজনৈতিক সমীকরণের দিক থেকেও এ বার কংগ্রেসের অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ। অতীতের মতো বামফ্রন্ট-এর সঙ্গে জোট না করে এ বার একক লড়াইয়ের পথে হেঁটেছে দল। ২৯৪টি আসনেই প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা আগেই করা হয়েছিল, যদিও আপাতত ২৮৪টি আসনে নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রার্থী তালিকায় আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের নাম না থাকা। ২০২১ সালে তিনি শ্রীরামপুর কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ঘটনাচক্রে, যে ১০টি আসনে এখনও প্রার্থী ঘোষণা হয়নি, তার মধ্যে শ্রীরামপুরও রয়েছে। ফলে তিনি কি আবার সেই কেন্দ্র থেকেই লড়বেন, তা নিয়ে জল্পনা ক্রমশ বাড়ছে।
নির্বাচন কমিশনের নির্ঘণ্ট অনুযায়ী, প্রথম দফায় আগামী ২৩ এপ্রিল ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে। সেই দফার মনোনয়ন জমা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার ২৪ ঘণ্টা আগে এই প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে কংগ্রেস। এত দিন প্রার্থী তালিকা প্রকাশ না হওয়ায় দলের তৃণমূল স্তরে যে অসন্তোষের কথা শোনা যাচ্ছিল, এই ঘোষণার পর তা কিছুটা প্রশমিত হতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এখন দেখার, একক লড়াইয়ে নামা কংগ্রেস এই বিস্তৃত প্রার্থী তালিকাকে হাতিয়ার করে কতটা সংগঠনকে চাঙা করতে পারে এবং ভোটের ময়দানে তার প্রতিফলন কতটা পড়ে।
❤ Support Us





