Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • মে ২৫, ২০২৬

বিশ্ববাজারে কমেছে অপরিশোধিত তেলের দাম, তবু ভারতে কেন অগ্নিমূল্য পেট্রল-ডিজেল ?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বিশ্ববাজারে কমেছে অপরিশোধিত তেলের দাম, তবু ভারতে কেন অগ্নিমূল্য পেট্রল-ডিজেল ?

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ঘিরে দীর্ঘ দিন ধরে চলা টানাপড়েনের আবহে অবশেষে খানিকটা স্বস্তি ফিরেছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনার জল্পনায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপিছু ১০০ ডলারের নীচে নেমে এসেছে। কিন্তু সে স্বস্তির কোনো ছাপ পড়েনি ভারতের জ্বালানি বাজারে। বরং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের আগুন কিছুটা নিভতেই দেশের সাধারণ মানুষের পকেটে নতুন করে চাপ বাড়িয়ে আরও মহার্ঘ্য হয়েছে পেট্রল ও ডিজেল।  

সোমবার, মাত্র ১০ দিনের মধ্যে চতুর্থ বার বাড়ানো হয়েছে জ্বালানির দাম। কলকাতায় প্রতি লিটার পেট্রলের দাম এক ধাক্কায় বেড়েছে ২ টাকা ৮৭ পয়সা। ডিজেলের দাম বেড়েছে লিটারপিছু ২ টাকা ৮০ পয়সা। নতুন দরে কলকাতায় এক লিটার পেট্রলের দাম দাঁড়িয়েছে ১১৩ টাকা ৫১ পয়সা। ডিজেলের দাম পৌঁছেছে ৯৯ টাকা ৮২ পয়সায়। দেশের অন্য শহরগুলিতেও একই ছবি। সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে— আন্তর্জাতিক বাজারে যখন অপরিশোধিত তেলের দাম কমছেতখন দেশে কেন লাগাতার বাড়ছে পেট্রল-ডিজেলের দাম?

অর্থনীতিবিদ এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতেএর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে একাধিক জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণের মধ্যে। শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নয়বরং টাকার অবমূল্যায়নকেন্দ্র ও রাজ্যের করনীতিপশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির পুরনো লোকসানের বোঝা— সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি।  সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুডের দাম প্রায় ৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপিছু ৯০.৮০ ডলারে নেমে আসে। অন্যদিকে, ব্রেন্ট ক্রুডের দামও ৫.৬৪ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৯৭.৭০ ডলারে। কয়েক সপ্তাহ আগেও পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। ইরান সংঘাতহরমুজ প্রণালীতে সম্ভাব্য জোগান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপিছু প্রায় ১২০ ডলার ছুঁয়ে ফেলেছিল।

সে সময় দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলি— ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড— আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির পুরো চাপ এক ধাক্কায় সাধারণ মানুষের উপর চাপায়নি। বরং বহু ক্ষেত্রেই লোকসান মেনে খুচরো জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছিল।  এখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কিছুটা কমলেও পুরনো আন্ডার-রিকভারি’ বা লোকসান পুষিয়ে নিতে ব্যস্ত তেল সংস্থাগুলি। বিশেষজ্ঞদের মতেদেশের বাজারে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম বড়ো কারণ সেটাই। অর্থাৎবিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও তার সুফল এখনই গ্রাহকের হাতে পৌঁছচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেনব্যারেলপিছু ১০০ ডলারের নীচে তেলের দাম নামলেও ভারতের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য তা এখনো অত্যন্ত চড়া। ভারত তার মোট অপরিশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য ওঠানামাও দেশের আমদানি বিল এবং জ্বালানির বাজারে বড়ো প্রভাব ফেলে। তার উপর রয়েছে ভারতীয় টাকার অবমূল্যায়ন। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল কেনাবেচা হয় মার্কিন ডলারে। ফলে ডলারের তুলনায় টাকার মান কমলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও আমদানির খরচ বেড়ে যায়। সম্প্রতি ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার দর প্রায় রেকর্ড তলানিতে পৌঁছে গিয়েছিল। এক সময় তা ৯৭ টাকার কাছাকাছি নেমে আসে। ফলে ভারতীয় রিফাইনারিগুলির উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

ইনফোমেরিক্স রেটিংসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মনোরঞ্জন শর্মার বলেছেন, ‘ভারত কাঠামোগত ভাবেই তার মোট তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানি করে। ফলে ডলারের তুলনায় টাকার অবমূল্যায়ন সরাসরি আমদানির খরচ বাড়িয়ে দেয়।’ তাঁর মতেশুধু অপরিশোধিত তেলের দাম নয়মুদ্রাবাজারের পরিস্থিতিও জ্বালানির খুচরো মূল্য নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেয়।তবে শুধু আন্তর্জাতিক বাজার কিংবা টাকার দুর্বলতা নয়দেশের কর কাঠামোও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সাধারণ ভাবে অনেকেই মনে করেন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলে পেট্রল-ডিজেলের দামও সঙ্গে সঙ্গে কমবে। বাস্তবে সে সমীকরণ এতটা সরল নয়।

ভারতে পেট্রল ও ডিজেলের খুচরো মূল্যের বড়ো অংশ জুড়ে থাকে কেন্দ্রীয় আবগারি শুল্করাজ্যের ভ্যাটডিলার কমিশনপরিবহণ ব্যয় এবং রিফাইনিং খরচ। অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যঅনেক ক্ষেত্রে খুচরো মূল্যের একটি বড়ো অংশই চলে যায় কর বাবদ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও তার সরাসরি প্রভাব ভোক্তাদের উপর পড়ে না। ড. শর্মার ব্যাখ্যা, ‘কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির চাপানো আবগারি শুল্ক এবং ভ্যাটের কারণেই খুচরো জ্বালানির দামের বৃহৎ অংশ কর নির্ভর হয়ে উঠেছে।’

এ দিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে বাজারে। ভারতের প্রায় ৭০ শতাংশ পণ্য পরিবহণ হয় সড়কপথে এবং তার সিংহভাগই ডিজেলচালিত যানবাহনের মাধ্যমে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লেই বাড়ে পরিবহণ ব্যয়। তার সরাসরি অভিঘাত পড়ে সবজিদুধমুদি সামগ্রীনির্মাণসামগ্রী থেকে শুরু করে প্রায় সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কাপরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতিও এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে আলোচনা নিয়ে আশার আলো দেখা গেলেওহরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। নতুন করে সংঘাত ছড়ালে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ফের উর্ধ্বমুখী হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্র সরকারও সতর্ক। পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী সম্প্রতি জানিয়েছেনআন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করেই ভবিষ্যতের মূল্যনীতি নির্ধারিত হবে। অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার কমানো, গণপরিবহণ ব্যবহার সহ একাধিক পরামর্শ দিয়েছেন। তাই বিশেষজ্ঞদের মতেআপাতত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমলেও ভারতীয় গ্রাহকদের দ্রুত স্বস্তি মেলার সম্ভাবনা কম। কারণ জ্বালানির দাম নির্ধারণে এখন শুধু ক্রুড অয়েলের বাজার নয়সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতিমুদ্রাবাজার এবং সরকারের করনীতি।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!