- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- অক্টোবর ৭, ২০২৬
‘এসআইআর’-এ বাদ পড়েছে নাম, বাংলাদেশি সন্দেহে ছত্তিশগড়ের ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি মুর্শিদাবাদের চার শ্রমিক
‘এসআইআর’ পরবর্তী ভোটার তালিকায় নাম নেই। সেই ‘নেই’-এর সূত্র ধরেই কি কাউকে বাংলাদেশি বলে ধরে নেওয়া যায়? আর তাঁর নাম ভোটার তালিকায় ফেরানোর আবেদন যখন সংশ্লিষ্ট ট্রাইবুনালে বিচারাধীন, তখনই অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কী ভাবে তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে? মুর্শিদাবাদের চার বাসিন্দাকে ছত্তিশগড়ের ডিটেনশন সেন্টারে আটকে রাখার মামলায় সোমবার এমনই একাধিক প্রশ্ন তুলল কলকাতা হাই কোর্ট।
মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের বাসিন্দা চার পরিযায়ী শ্রমিক — সাবির শেখ (৪২), সফিকুল ইসলাম (৩৯), নাসিরুদ্দিন শেখ (৩৫) এবং লাল্টু শেখ (২৮)। অভিযোগ, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’-এর সময়ে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ পড়েছিল। তার পরেই কাজের সূত্রে ছত্তিশগড়ে থাকা ওই চার জনকে বাংলাদেশি নাগরিক সন্দেহে আটক করে পুলিশ। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তাঁদের রায়পুরের একটি ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছে। চার জনের পরিবারের সদস্যেরা ইতিমধ্যেই কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, ‘এসআইআর’-এ নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে চার জনই মুর্শিদাবাদের সংশ্লিষ্ট আপিল ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন। সে আবেদনের এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। তার আগেই তাঁদের ‘বিদেশি’ বলে সন্দেহ করে আটক করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী।
সোমবার মামলাটির শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণ রাও ছত্তিশগড়ের প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আদালতের প্রশ্ন , ‘আপনাদের কর্তৃপক্ষ যদি বলে দেন যে তিনি ভারতীয় নন, তা হলে আপিল কর্তৃপক্ষ কী করবে?’ অর্থাৎ, ভোটার তালিকায় নাম ফেরানোর আবেদন যখন ট্রাইবুনালের বিচারাধীন, তখন অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কী ভাবে একই ব্যক্তির নাগরিকত্ব সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারে — সে প্রশ্নই উঠে এসেছে শুনানিতে। আদালত বিষয়টিকে ‘পরস্পরবিরোধী’ বলেও মন্তব্য করেছে। ছত্তিশগড়ের ‘ফরেনার্স রেজিস্ট্রেশন অফিসার’ (এফআরও)-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আদালত। বিলাসপুরের পুলিশ সুপারই সেখানে ‘এফআরও’-র দায়িত্বে রয়েছেন। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, তাঁকে এ মামলায় পক্ষভুক্ত করতে হবে। আগামী ৮ অক্টোবরের মধ্যে তাঁকে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। ওই দিনই মামলাটির পরবর্তী শুনানি।
ঘটনার সূত্রপাত সেপ্টেম্বরের গোড়ায়। মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জ, সুতি, রঘুনাথগঞ্জ-সহ বিভিন্ন এলাকার অন্তত ২৩ জন পরিযায়ী শ্রমিক কাজের সন্ধানে ছত্তিশগড়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে কয়েক জন বিলাসপুর এলাকায় বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাপড়, অ্যালুমিনিয়ামের বাসন-সহ বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করতেন। চার জনেরও ঠিকানা ছিল বিলাসপুরের সিরগিটি থানা এলাকার চুঞ্চিয়াপাড়া-গণেশনগরের একটি কলোনিতে। ৪ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁদের ভাড়া ঘরে যায় সিরগিটি থানার পুলিশ। অভিযোগ, প্রথমে সমস্ত নথিপত্র নিয়ে থানায় আসতে বলা হয়। শ্রমিকেরা থানায় গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলেও তাঁদের সঙ্গে বিশেষ কথা বলা হয়নি। পরে তাঁদের চলে যেতে বলা হয়। ৩ সেপ্টেম্বর ফের পুলিশ গিয়ে নাম ও ফোন নম্বর লিখে নেয়। পরের দিন সন্ধ্যায় তাঁদের ফের আটক করা হয়।
এখনো আটক হয়ে থাকা সাবিরের দাদা মোস্তাকিম শেখ জানিয়েছেন, তাঁদের বলা হয়েছিল, নথিপত্র যাচাই এবং জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু ২৩ জনকেই বাসে করে রায়পুরের ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। মোস্তাকিম জানান, ‘আমরা থানায় গিয়ে সারা দিন অপেক্ষা করেছিলাম। কেউ আমাদের সঙ্গে কথা বলেনি। পরের দিন বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে রায়পুরের ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়।’ তাঁর আরও দাবি, ‘বাসে যাওয়ার সময় বলা হয়েছিল, জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু ডিটেনশন সেন্টারে থাকার সময়ে আমাদের সঙ্গে কেউ জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি ঠিকই, কিন্তু দিনের পর দিন বন্দি করে রাখাটাই তো শাস্তি।’ পরে ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মোস্তাকিমও। কিন্তু সাবির, সফিকুল, নাসিরুদ্দিন এবং লাল্টু এখনো বন্দি।
ঘটনার আরও একটি দিকই এখন আদালতের প্রশ্নের কেন্দ্রে। মোস্তাকিমের নাম ‘এসআইআর’-এর পরেও ভোটার তালিকায় রয়েছে। তাঁর ছোটো ভাই সাবিরের নাম বাদ পড়েছে। মোস্তাকিমের প্রশ্ন, একই পরিবারের এক জন ভারতীয় হলে অন্য জন কী ভাবে বাংলাদেশি হয়ে যান? আদালতে মোস্তাকিম বলেন, ‘আমরা ছয় ভাই-বোন। পাঁচ জনের নাম ভোটার তালিকায় রয়েছে। শুধু সাবিরের নাম নেই। আমি ভারতীয় আর আমার ভাই বাংলাদেশি, এ কী করে সম্ভব?’ সাবিরের বাবা রিয়াজুল শেখের বক্তব্যেও উঠে এসেছে তাঁদের পরিবারের দীর্ঘদিনের বসবাসের কথা। ৬৭ বছরের রিয়াজুলের দাবি, ছোটোবেলা থেকেই তিনি সামশেরগঞ্জে বাসিন্দা। তাঁদের পুরনো বাড়ি ছিল প্রায় একশো বছরের। গঙ্গার ভাঙনে সেই বাড়ি চলে যাওয়ার পরে ১৯৭৩ সালে নতুন বাড়ি তৈরি করেন তাঁরা। দু-টি বাড়িরই নথি তাঁদের কাছে রয়েছে।
তিনি আরো জানান, তাঁর এবং তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের নাম ‘এসআইআর’ পরবর্তী ভোটার তালিকায় রয়েছে। কিন্তু দুই ছেলে সফিকুল ও আসিকুলের নাম এসআইআর-এর পরে বাদ যায়। তাঁদের কাছে পাঠানো নোটিসে নির্বাচন কমিশন ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতির কথা জানিয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, আরও ছ-জন রিয়াজুলকে তাঁদের বাবা বলে দাবি করেছেন। এর পরেই নাম ফেরানোর দাবিতে ট্রাইবুনালে আবেদন করেন তাঁরা। কিন্তু সেই আবেদন এখনো বিচারাধীন। পরিবারের বক্তব্য, ট্রাইবুনালের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সাবির বা অন্য তিন জনকে ‘বিদেশি’ হিসেবে গণ্য করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। পরিবারের এ যুক্তিই আদালতে তুলে ধরেছেন মামলাকারীদের আইনজীবী। তাঁর বক্তব্য, চার জনের কাছেই ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ রয়েছে। তাঁদের বাবা-মায়ের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিল। এমনকি চার জন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটও দিয়েছেন।
আটক হওয়া শ্রমিকদের পরিবারের তরফে আদালতে আরও বলা হয়েছে, চার জনই কাজের জন্য সাময়িক ভাবে ছত্তিশগড়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা এবং পরিবারের শিকড় পশ্চিমবঙ্গে। ফলে শুধুমাত্র কর্মসূত্রে অন্য রাজ্যে থাকা আর ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়াকে ভিত্তি করে তাঁদের আটক করা যায় না। এ ঘটনায় পরিবারের উৎকণ্ঠার আর একটি ছবি রয়েছে সামশেরগঞ্জে। ধুসরিপাড়ায় গঙ্গার কাছে ছোট্ট বাড়িতে লাল্টুর স্ত্রী সাবেরা খাতুন এক বছরের সন্তানকে কোলে নিয়ে স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। সাবেরার জানান, ‘গত দু-মাস ধরে ওর গলার আওয়াজ শুনিনি। আমাদের এক প্রতিবেশী এখনো ছত্তিশগড়ে কাজ করছেন। কয়েক দিন আগে তিনি ডিটেনশন সেন্টারে গিয়ে ওদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। বলেছেন, ওরা শুধু কাঁদছিল আর আমাদের সন্তানের কথা জানতে চাইছিল।’ তাঁর অভিযোগ, ‘ওদের কারও সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। পরিবারের সঙ্গে ফোনেও কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না।’
এ ঘটনায় ‘এসআইআর’-এর পর ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার প্রভাব নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গে ‘এসআইআর’-পর্বে নাম বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে আবেদন শুনতে ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর সে ব্যবস্থার মাধ্যমে বাদ পড়া নামের পুনর্বিবেচনা চলছে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ট্রাইবুনালগুলি কাজ শুরু করার পর প্রায় পাঁচ মাসে ১,২৬,১৯৪টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। কিন্তু এখনো বহু আবেদন বিচারাধীন। মুর্শিদাবাদেই এসআইআর-এর খসড়া তালিকা প্রকাশের পরে ১১,২১,২০৫ জন ভোটারের নাম যাচাই বা ‘অ্যাডজুডিকেশন’-এর আওতায় এসেছিল। রাজ্যের জেলাগুলির মধ্যে সংখ্যাটি ছিল সর্বোচ্চ। ‘এসআইআর’-এর আগে মুর্শিদাবাদে মোট ভোটার ছিলেন ৫৭,৬৪,০৮৫ জন। তাঁদের মধ্যে ২,৯৩,৮২২ জনকে অনুপস্থিত, অন্যত্র চলে যাওয়া, মৃত বা একই ব্যক্তির একাধিক নামের তালিকায় রাখা হয়েছিল। এ ছাড়াও গত বছরের ডিসেম্বরে ৪,৫৫,১৩৭ জনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল।
‘এসআইআর’ ঘিরে বিতর্ক অবশ্য শুধু ভোটাধিকারেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার সঙ্গে পাসপোর্ট নবীকরণ বা অন্য প্রশাসনিক পরিষেবা আটকে যাওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। একটি মামলায় এসআইআর-এ নাম বাদ পড়ার কারণে আইআইটি-তে পিএইচডি-র আবেদন আটকে থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মুর্শিদাবাদের চার শ্রমিকের ক্ষেত্রে আপাতত সব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আগামী শুনানির দিকে। আদালত জানতে চেয়েছে, এক দিকে ভোটার তালিকায় নাম ফেরানোর আবেদন যখন ট্রাইবুনালে বিচারাধীন, অন্য দিকে সেই একই ব্যক্তিকে কী ভাবে বিদেশি বলে আটক রাখা হচ্ছে। ৮ অক্টোবর ছত্তিশগড়ের এফআরও কী রিপোর্ট দেয়, তার উপরেই আপাতত নজর পরিবারের।
❤ Support Us





