- এই মুহূর্তে দে । শ
- মে ২২, ২০২৬
তিন দিনের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন উমর খালিদের
২০২০ সালের উত্তর-পূর্ব দিল্লি দাঙ্গার তথাকথিত ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’ মামলায় অভিযুক্ত ছাত্রনেতা ও সমাজকর্মী উমর খালিদ-কে ৩ দিনের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিল দিল্লি হাই কোর্ট। শুক্রবার বিচারপতি প্রতিভা এম সিংহ এবং বিচারপতি মধু জৈনের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, মায়ের অস্ত্রোপচারের বিষয়টি বিবেচনা করেই ‘সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি’ গ্রহণ করেছে আদালত। সে কারণেই ১ জুন সকাল ৭টা থেকে ৩ জুন বিকেল ৫টা পর্যন্ত ১ লক্ষ টাকার ব্যক্তিগত বন্ডে উমরকে সাময়িক মুক্তির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে, জামিনের সঙ্গে একাধিক কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছে আদালত।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, জামিনের সময়ে উমর খালিদকে দিল্লি-এনসিআর-এর মধ্যেই থাকতে হবে। তিনি নিজের বাড়ি এবং হাসপাতাল ছাড়া অন্য কোথাও যেতে পারবেন না। কেবল একটি মোবাইল ফোন ব্যবহার করার অনুমতি থাকবে তাঁর, এবং সে নম্বর তদন্তকারী আধিকারিকের কাছে জানাতে হবে। তদন্তকারী আধিকারিকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার নির্দেশও দিয়েছে আদালত। বিস্তারিত শর্তাবলী পরে চূড়ান্ত নির্দেশে উল্লেখ করা হবে বলেও জানিয়েছে বেঞ্চ। এ মামলায় উমর খালিদ ১৫ দিনের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন চেয়ে আবেদন করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, সম্প্রতি কাকার মৃত্যু হয়েছে, সে উপলক্ষে ৪০ দিনের ধর্মীয় আচার ‘চেহলুম’-এ উপস্থিত থাকা তাঁর পক্ষে জরুরি। পাশাপাশি ২ জুন তাঁর মায়ের অস্ত্রোপচার নির্ধারিত রয়েছে। অস্ত্রোপচারের আগে এবং পরে পরিবারের পাশে থাকা প্রয়োজন বলেই তিনি আদালতের কাছে আবেদন জানান। ১৯ মে ট্রায়াল কোর্ট তাঁর আবেদন খারিজ করে দেওয়ার পরই দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন উমর।
উমরের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে আইনজীবী ত্রিদীপ পৈস আদালতে বলেন, অতীতেও পারিবারিক প্রয়োজনে তাঁর মক্কেল অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছেন। বোনের বিয়ের সময় তাঁকে স্বল্প সময়ের জন্য মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়েও আরও দু–বার অনুরূপ স্বস্তি মঞ্জুর করেছিল আদালত। প্রতিবারই উমর সমস্ত শর্ত মেনেছেন, কখনো কোনো নিয়ম ভঙ্গ করেননি বলেও দাবি করেন আইনজীবী। তাঁর যুক্তি, একজন ছেলের পক্ষে মায়ের অস্ত্রোপচারের সময় পাশে থাকা স্বাভাবিক এবং মানবিক বিষয়। অন্য দিকে, দিল্লি পুলিশের হয়ে আদালতে সওয়াল করেন অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এস ভি রাজু। তিনি আদালতকে জানান, উমরের মায়ের যে অস্ত্রোপচার হতে চলেছে, তা না কি ‘মাইনর সার্জারি’ বা ছোটোখাটো অস্ত্রোপচার মাত্র। তা জরুরি ভিত্তিতে করার মতো পরিস্থিতিও নয়। তাঁর দাবি, উমরের বোনেরা ও পরিবারের অন্য সদস্যরাই দেখাশোনা করতে সক্ষম। এমনকি প্রয়োজনে পুলিশি নিরাপত্তায় এক দিনের জন্য হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ফের জেলে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে বলে আদালতে যুক্তি দেন তিনি। দিল্লি পুলিশের বক্তব্য ছিল, অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেওয়ার মতো কোনো ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’ এখানে নেই।
দুই পক্ষের দীর্ঘ সওয়াল-জবাবের পর আদালত জানায়, মামলার গুরুত্ব এবং অভিযোগের প্রকৃতি মাথায় রেখেও মানবিক দিকটি উপেক্ষা করা যায় না। সে কারণেই ‘সহানুভূতির ভিত্তিতে’ সীমিত সময়ের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেওয়া হচ্ছে। যদিও একই সঙ্গে আদালতের পর্যবেক্ষণ, তদন্তকারী সংস্থার দাবি অনুযায়ী উমর খালিদ এ মামলার ‘মূল ষড়যন্ত্রকারীদের অন্যতম’। তবু মায়ের শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করেই তাঁকে সাময়িক স্বস্তি দেওয়া হলো। এর আগে ট্রায়াল কোর্ট উমরের আবেদন খারিজ করতে গিয়ে কড়া পর্যবেক্ষণ করেছিল। নিম্ন আদালতের বক্তব্য ছিল, অতীতে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছেন এবং কখনো শর্ত ভঙ্গ করেননি বলেই ভবিষ্যতে প্রত্যেক বার আবেদন করলেই তাঁকে জামিন দিতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আদালতের নেই। কাকার ‘চেহলুম’ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার বিষয়টিকে ট্রায়াল কোর্ট ‘অতটা জরুরি নয়’ বলেও মন্তব্য করেছিল। এমনকি আদালত এ-ও বলেছিল, সম্পর্ক যদি এতটাই ঘনিষ্ঠ হয়ে থাকে, তা হলে কাকার মৃত্যুর সময়ই জামিন চাওয়া উচিত ছিল, এত দিন পরে নয়। মায়ের অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রেও ট্রায়াল কোর্টের পর্যবেক্ষণ ছিল, উমরের বাবা ও বোনেরা তাঁর দেখভাল করতে পারবেন।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিএএ–এনআরসি-র বিরুদ্ধে আন্দোলনের আবহে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক দিনের সেই হিংসায় সরকারি হিসাব অনুযায়ী ৫৩ জনের মৃত্যু হয় এবং আহত হন ৭০০-রও বেশি মানুষ। ওই দাঙ্গার পিছনে ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’-এর অভিযোগ তুলে একাধিক ছাত্রনেতা, সমাজকর্মী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল। এফআইআর-এ উমর খালিদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ-র ১৩, ১৬, ১৭ এবং ১৮ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি অস্ত্র আইনের ২৫ ও ২৭ ধারা, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট প্রতিরোধ আইন, ১৯৮৪-এর ৩ ও ৪ ধারা এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারাতেও মামলা দায়ের হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, দাঙ্গার পিছনে পরিকল্পিত চক্রান্ত ছিল আর চক্রান্তের অন্যতম মুখ ছিলেন উমর। উমরের পাশাপাশি এ মামলায় চার্জশিটভুক্ত অন্যদের মধ্যে রয়েছেন প্রাক্তন আম আদমি পার্টি কাউন্সিলর তাহির হুসেন,সমাজকর্মী শরজিল ইমাম, , সাফুরা জারগর, মীরান হায়দার, শিফা-উর-রহমান, খালিদ সইফি, শাদাব আহমেদ, তসলিম আহমেদ, সলিম মালিক এবং আথার খান। পরে উমর খালিদ ও শরজিল ইমামের বিরুদ্ধে পৃথক পরিপূরক চার্জশিটও দাখিল করা হয়। গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর দিল্লি হাই কোর্টের বিচারপতি নবীন চাওলা এবং বিচারপতি শালিন্দর কৌরের বেঞ্চ উমর খালিদ, শরজিল ইমাম, মীরান হায়দার-সহ একাধিক অভিযুক্তের নিয়মিত জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সেই নির্দেশ বহাল রাখে শীর্ষ আদালত।
❤ Support Us







