- দে । শ
- মে ১৯, ২০২৬
দুই বর্ধমানে বাড়ছে পানীয় জলের সংকট
প্রবল গ্রীষ্মের মরশুমে দুই জেলাজুড়ে বাড়ছে পানীয় জলের সংকট। শিল্পাঞ্চলের ব্যস্ত জনপদ হোক বা গ্রামীণ প্রান্তের ছড়িয়ে থাকা বসতি; সবখানেই একই ছবি, পানীয় জলের অভাব, অনিয়মিত সরবরাহ। সরকার বদলের পর সমস্যা সমাধানে প্রশাসনিক আশ্বাস মিললেও, সময় যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে সমস্যার গভীরতা, স্থায়ী সমাধানের পথ এখনো অধরা।
পশ্চিম বর্ধমানের পাণ্ডবেশ্বর, অণ্ডাল, জামুড়িয়া থেকে বারাবনি; প্রায় প্রতিটি ব্লকেই পানীয় জলের তীব্র সংকট জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বহু জায়গায় বারবার রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চললেও কার্যকর সমাধান মেলেনি। হীরাপুর থানার কালাঝরিয়া এলাকায় জল প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ ভেঙে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, গত এক বছর ধরেই শিল্পাঞ্চলের একাধিক এলাকায় পানীয় জলের সমস্যা অব্যাহত। বিভিন্ন প্রকল্প ঘোষণা ও আশ্বাস থাকলেও বাস্তবে তার অগ্রগতি ছিল সীমিত। বিশেষ করে ‘জল জীবন মিশন’-এর অধীনে যে বৃহৎ পরিকাঠামো প্রকল্প শুরু হয়েছিল, তৃণমূল সরকারের আমলে তা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। বহু ক্ষেত্রে পাইপলাইন বসানো ও পরিশোধন কেন্দ্র নির্মাণের কাজে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলির মধ্যে ছিল মাইথন জলাধার থেকে জল সংগ্রহ করে তা পরিশোধন করে রানিগঞ্জ, অণ্ডাল, জামুড়িয়া ও পাণ্ডবেশ্বর ব্লকে সরবরাহের পরিকল্পনা। কিন্তু বাস্তবে সে প্রকল্প সম্পূর্ণ রূপ পায়নি। একইসঙ্গে বিভিন্ন পঞ্চায়েত এলাকায় পৃথক জল সরবরাহ ব্যবস্থার কাজও অর্থাভাব ও প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে গেছে বলে অভিযোগ। প্রশাসনিক মহলের একাংশের বক্তব্য, কেন্দ্র ও প্রাক্তন রাজ্য সরকারের টানাপড়েনের কারণে প্রায় ১৮০ কোটি টাকার প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তায় পড়ে রয়েছে। অভিযোগ, পরিকাঠামোগত দুর্বলতা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরির কারণে বহু জায়গায় পরিস্থিতি বারবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
শুধু পশ্চিমের শিল্পাঞ্চল নয়, জলকষ্টের ছবি দেখা যাচ্ছে পূর্ব বর্ধমানের বিভিন্ন প্রান্তেও। কালনা পুরসভার ৫ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডে গরম পড়তেই পানীয় জলের সংকট ভয়াবহ রূপ নেয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা সমস্যার প্রতিবাদে বাসিন্দারা পুরসভায় ডেপুটেশন জমা দেন। পুর প্রশাসনের তরফে জানানো হয়, ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমে যাওয়াই মূল কারণ। পরিস্থিতি সামাল দিতে পাম্পের গভীরতা বাড়ানো হয়েছে এবং নতুন পাম্প বসানোর জায়গা খোঁজা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়। পাশাপাশি জল অপচয় রোধে নাগরিকদের সচেতন হওয়ার আবেদনও জানানো হয়। জেলার বহু জায়গায় পানীয় জলের সংকট ক্রমশ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন ব্লকে ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমে যাওয়া, অগভীর নলকূপের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং অনিয়ন্ত্রিত জল উত্তোলনের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। কয়েকটি ব্লককে ‘হলুদ’ ও ‘লাল জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষিকাজ থেকে দৈনন্দিন ব্যবহার— সব ক্ষেত্রেই জলের চাপ বাড়ছে।
প্রশাসনিক স্তরে স্বীকার করা হচ্ছে, একসময় কেন্দ্রীয় সরকারের ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে ব্যক্তিগত জমিতে পুকুর খননের মাধ্যমে জলসংরক্ষণের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা ভূগর্ভস্থ জলের উপর চাপ কিছুটা কমিয়েছিল। দৈনন্দিন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সেই প্রকল্প কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছিল। কিন্তু অনুদান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই সে কাজ কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ে, ফলে আগের অবস্থাতেই ফিরে গিয়েছে জলনির্ভরতা। বর্তমানে চাষাবাদের প্রয়োজনে পরিস্থিতি সামাল দিতে বহু জায়গায় বড় নদী থেকে খাল কেটে জল নিয়ে আসার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। কোথাও আবার সাবমার্সিবল পাম্প বসানোই সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়েই কৃষকদের ভরসা রাখতে হচ্ছে অগভীর নলকূপ ও সেচ পাম্পের উপর। এর ফলেই দ্রুতগতিতে নামছে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর। জলসঙ্কটের ছায়া আরও গাঢ় হচ্ছে গ্রামীণ জনজীবনে।
জেলার জল অপচয়ের ছবিও উদ্বেগজনক। পূর্বস্থলী, মন্তেশ্বর, মঙ্গলকোট, ভাতার, রায়না এবং গলসি— বিস্তীর্ণ ব্লকগুলিতে ভূগর্ভস্থ জলকে ঘিরে উদ্বেগ ক্রমশই গভীর হচ্ছে। চাষের জন্য দেদার জল উত্তোলন, বিভিন্ন জায়গায় কল থেকে অবিরাম জল পড়ে যেতে দেখা যায়, যা নিয়ে প্রশাসন সচেতনতা প্রচার চালালেও কার্যত তেমন ফল মেলেনি। ভূগর্ভস্থ জলের উপর চাপ কমাতে আম্রুত জল প্রকল্পের মাধ্যমে দামোদর নদ থেকে জল এনে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে সম্পূর্ণ বাস্তবায়নে সময় লাগবে বলেই মত ওয়াকিবহাল মহলের। চাষীদের অভিযোগ, ক্যানেল ব্যবস্থা থাকলেও, প্রয়োজনের সময়ে জল পাওয়া যায়না, বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে ভূগর্ভস্থ জল কিনতে বাধ্য হন ‘ধানের গোলা’র কৃষকরা। তার জেরে একদিকে যেমন দ্রুত নামছে নদীর জলস্তর, অন্যদিকে বহু নদী কার্যত শুকিয়ে যাওয়ার মুখে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, লাগাতার এ প্রবণতা চলতে থাকলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
রাজনৈতিক পালাবদল, প্রশাসনিক বৈঠক, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের যথাযথ বাস্তবায়নের ঘোষণায়, আশায় বুক বাঁধছেন দুই জেলার বাসিন্দারা। জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন দফতরের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পানীয় জল সংকটকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা বিকল্প জলাধার, নতুন পাইপলাইন এবং রিজার্ভার তৈরির প্রস্তাব দিচ্ছেন। তবে সেগুলি বাস্তবায়নের পথে কতটা অগ্রসর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এরইমধ্যে আসানসোল জেলাশাসকের কার্যালয়ে নবনির্বাচিত বিধায়কদের নিয়ে রিভিউ বৈঠক করেছেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর এবং নারী, শিশু সুরক্ষা ও সমাজকল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। জেলার বিভিন্ন এলাকায় চলমান বৃহৎ সরকারি প্রকল্পগুলির অগ্রগতি এই বৈঠকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় পানীয় জলের সংকট।
বৈঠকে, বিধায়কেরা নিজ নিজ এলাকায় জলের সমস্যা সমাধানের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। জেলাশাসক পন্নমবলম এস অতিরিক্ত জেলাশাসক, মহকুমা শাসক, আসানসোল ও দুর্গাপুর পুরসভার কমিশনার-সহ জেলার শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকদের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। জেলাশাসক জানান, পানীয় জলের সমস্যা সমাধানকে কেন্দ্র করে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং একাধিক পরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। অগ্নিমিত্রা বলেন, রাজ্যে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের কাজ শুরু হয়েছে এবং এই বৈঠক অত্যন্ত ইতিবাচক। তাঁর দাবি, জেলার মানুষ এবার বাস্তব উন্নয়নের চেহারা দেখতে পাবেন। পানীয় জলের সংকট মোকাবিলায় একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই রাজ্যে ‘জল জীবন মিশন’ প্রকল্পের বাস্তবায়ন ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক দানা বেঁধেছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সাম্প্রতিক মেগা চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রকল্পের অগ্রগতি ও ব্যয় সংক্রান্ত নানা প্রশ্ন উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রী সিআর পাতিল পূর্বতন সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলেও তার যথাযথ ব্যবহার হয়নি, বহু ক্ষেত্রে কাজ কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও অভিযোগ করেছেন, গত কয়েক বছরে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাব ছিল। তিনি জানান, বহু গ্রামে ঘুরে বাস্তব পরিস্থিতি দেখে তিনি হতাশ হয়েছেন। ‘হর ঘর নল সে জল’ প্রকল্পের নাম বদলে আগের সরকার ‘জল স্বপ্ন’ করেছিল বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে রাজ্যে যেখানে মাত্র ১ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারে নলবাহিত জল পৌঁছেছিল, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৫৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে এখনো লক্ষ লক্ষ পরিবার এই পরিষেবার বাইরে। একই সঙ্গে স্কুল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতে জলের সংযোগের হারও জাতীয় গড়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অর্থব্যয়ের হিসেব তুলে ধরে কেন্দ্রের দাবি, রাজ্যকে বরাদ্দ করা বিপুল অর্থের একাংশ এখনো খরচ হয়নি। পাশাপাশি প্রকল্পের নথি ও বাস্তব কাজের মধ্যে অসঙ্গতি, ডুপ্লিকেট কাজ এবং বাতিল প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। গঙ্গা দূষণ রোধ এবং বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও আরও দ্রুত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
❤ Support Us





