- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৫
কেন্দ্রীয় স্কুলগুলিতে স্কুলে বাধ্যতামূলক প্রধানমন্ত্রীর শৈশবভিত্তিক চলচিত্র প্রদর্শন! দেশজুড়ে সারম্বরে চলছে জন্মদিন উদ্যাপন
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। তাঁর শৈশব জীবনের উপর নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ‘চলো জিতে হ্যায়’ ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে ২ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ১৭ দিন দেশের সমস্ত কেন্দ্রীয় স্কুলে দেখানো হবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রক। নির্দেশ পাঠানো হয়েছে সিবিএসই, কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় সংগঠন, এবং নবোদয় বিদ্যালয় সমিতিকে। শিক্ষামন্ত্রকের দাবি, এই চলচ্চিত্র তরুণ শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠন, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং নৈতিক চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ করবে। মন্ত্রকের চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘চলচ্চিত্রটি নৈতিক বিচারবোধ, আত্ম-অনুভব, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং সহানুভূতির শিক্ষা দিতে সক্ষম। শিক্ষার এক অঙ্গ হিসেবে এই ধরনের দৃশ্যমান উপাদান ছাত্রছাত্রীদের মনে আরও গভীর ছাপ ফেলতে পারে।’
কেন্দ্রীয় শিক্ষাদফতর মারফৎ জানা যাচ্ছে, এ চলচ্চিত্র ‘প্রেরণা’ নামক একটি নতুন প্রয়োগভিত্তিক শিক্ষানীতির অংশ। ‘প্রেরণা’ কর্মসূচি চালু হয়েছে গুজরাটের ভাদনগরের ঐতিহাসিক ‘ভর্ণাকুলার স্কুল’-এ, যেখানে একসময় পড়াশোনা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। সেখানে কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে গল্প বলা, দেশীয় খেলা, মূল্যবোধভিত্তিক আলোচনা, ভিডিওচিত্র প্রদর্শন ও বিভিন্ন সৃষ্টিশীল কার্যকলাপ। এ কর্মসূচির মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের শেখানো হচ্ছে ৯টি মানবিক মূল্যবোধ—যার মধ্যে রয়েছে আত্মমর্যাদা, সাহস, পরিশ্রম, সত্যনিষ্ঠা, করুণা, উদ্ভাবন, ঐক্য, বিশ্বাস এবং কর্তব্যবোধ। এই মূল্যবোধগুলিকে দৃশ্যমান করে তুলতেই চলচ্চিত্রটি একটি কাহিনিচিত্র হিসেবে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। মন্ত্রক বলেছে, শিক্ষার্থীদের মনে ইতিমধ্যেই ছবিটি গভীর প্রভাব ফেলেছে, এবং তাদের মনোভাব ও আচরণে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
২০১৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিটি নির্মিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী মোদির শৈশবের একটি সত্য ঘটনার ভিত্তিতে। নির্মাতারা বলছেন, এই ছবির কেন্দ্রীয় অনুপ্রেরণা হল স্বামী বিবেকানন্দের সেই বিখ্যাত বাণী—‘নিজের জন্য নয়, পরের জন্য বেঁচে থাকার নামই জীবন।’ ছবিতে দেখা যায় ছোট্ট নরেন্দ্র ওরফে নারু কীভাবে বিবেকানন্দের দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজসেবার দিকে ঝুঁকে পড়ে। ৬৬তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এই ছবিটি শ্রেষ্ঠ পারিবারিক মূল্যবোধভিত্তিক স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। একদিকে যেমন শিক্ষা মন্ত্রকের এই উদ্যোগ, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনকে ঘিরে বিজেপি রাজনৈতিক মঞ্চেও শুরু করেছে এক বিশাল জনসংযোগ কর্মসূচি। বিহারে ২৪৩টি বিধানসভা কেন্দ্রে এক একটি ‘সেবা রথ’ চালু হয়েছে। এই গাড়িগুলির মধ্যে বড়ো পর্দায় দেখানো হচ্ছে ‘চলো জিয়েতে হ্যায়’ চলচ্চিত্রটি। বিজেপির দাবি, এই প্রচার অভিযান সমাজের সর্বস্তরে ‘রাজনীতির আসল অর্থ—সেবা ও ত্যাগ’ পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে। গাড়িগুলি গ্রামেগঞ্জে ঘুরে ঘুরে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে, এবং পাশাপাশি চলেছে স্বাস্থ্য শিবির, বৃক্ষরোপণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান।
এছাড়াও, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষে কলকাতায় শুরু হয়েছে এক ব্যতিক্রমী প্রদর্শনী। ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে তুলে ধরা হয়েছে মোদির ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক জীবনপথের নানা অধ্যায়। মহালয়া পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনী। রাজ্যের বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। প্রদর্শনীটি এতটাই বিশাল যে, মিউজিয়ামের দুটি তলা এবং মধ্যবর্তী চত্বর (কোর্টইয়ার্ড) জুড়ে তার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধে ৬টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা প্রদর্শনী উপভোগ করতে পারবেন। পাশাপাশি প্রতিদিনই থাকছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রদর্শনীতে থাকছে প্রধানমন্ত্রীর জীবনের বিরল আলোকচিত্র, তথ্যচিত্র, ডকুমেন্টারি এবং তাঁর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জীবনের নানা অধ্যায়ের দালিলিক উপস্থাপনা। আয়োজকদের দাবি, দেশের ২৩টি শহরে মোদীর জীবন ও কর্মযাত্রা নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলেও কলকাতার এই আয়োজন সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং ব্যতিক্রমী। শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘মোদীজির গোটা জীবনই সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের প্রতি সমর্পিত। সঙ্ঘে হোক, বিজেপিতে হোক বা সরকারে, যেখানে-যেখানে তিনি কাজ করেছেন, ভারতের সমৃদ্ধির দিকেই লক্ষ্য রেখে করেছেন।’
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদির জীবনের শুরু আরএসএস-এর হাত ধরে। মাত্র ৮ বছর বয়সে সঙ্ঘের সদস্য হন তিনি। ২৭ বছর পরে তাঁকে বিজেপিতে পাঠায় আরএসএস। সেখানেও দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। ২০০১ সালে তিনি গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হন। এরপর ২০১৪ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রী। টানা ২৪ বছর ধরে তিনি প্রশাসনিক নেতৃত্বের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। অরাজনৈতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল এবং সরকার— ৩ ক্ষেত্রেই একটানা এত দীর্ঘ সময় কাজ করার অভিজ্ঞতা ভারতে খুব কম রাজনৈতিক নেতারই আছে। তাই গেরুয়া শিবিরের মতে, এ উদযাপন শুধু একটি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট আদর্শ ও দর্শনকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা। তাঁদের আশা, মোদির জীবন ও কাজের এই প্রতিবিম্ব সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রেরণা জোগাবে।
তবে স্কুলে বাধ্যতামূলকভাবে প্রধানমন্ত্রীর জীবনকেন্দ্রিক চলচিত্র প্রদর্শনী ঘিরে সমালোচনাও উঠছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিরোধিরা। শিক্ষা মন্ত্রক যদিও বলছে, এটি ‘মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার প্রচেষ্টা’, তবে বিরোধীদের একাংশের প্রশ্ন — শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি তবে এখন রাজনৈতিক প্রচারের মঞ্চ হয়ে উঠছে? একাধিক শিক্ষা বিশ্লেষক এবং বিরোধী নেতারা বলছেন, ‘ছাত্রছাত্রীদের উপর এইভাবে কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জীবন তুলে ধরা ও বাধ্যতামূলকভাবে দেখানো শিক্ষার নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।’ তবে কেন্দ্রীয় শিক্ষা দফতর ও বিজেপি তাদের অবস্থানে অনড়। তা দের বক্তব্য, ‘চলচ্চিত্রটি কোনও রাজনৈতিক বার্তা দেয় না, বরং একজন সাধারণ শিশুর সেবামূলক মানসিকতা ও আত্মবিকাশের যাত্রা তুলে ধরে, যা সকলের জন্যই শিক্ষণীয়।’ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে ইউটিউব লিংকও দেওয়া হয়েছে, যাতে বিদ্যালয়গুলি প্রয়োজনে সরাসরি অনলাইনেও ছবিটি দেখাতে পারে।
❤ Support Us







