- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ২, ২০২৬
‘পাহাড় চূড়ায় আতঙ্ক !’ এভারেস্টে ‘বিষমিশ্রিত’ আতিথ্য, শেরপা-ট্রেকিং-উড়ান সংস্থার কোটি ডলারের বিমা জালিয়াতি ফাঁস
হিমালয়ের ভয়াল-সুন্দর সৌন্দর্যের আড়ালে, মানুষের আরও ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র। জীবনরক্ষাকারী উদ্ধার ব্যবস্থাকেই হাতিয়ার করে ভয়াবহ জালিয়াতি। অভিযোগ, পর্যটকদের খাবারে ইচ্ছাকৃতভাবে মিশিয়ে দেওয়া হত বেকিং সোডা—উদ্দেশ্য একটাই, তাঁদের শরীরে এমন উপসর্গ তৈরি করা যা উচ্চতাজনিত অসুস্থতা কিংবা খাদ্যে বিষক্রিয়ার সঙ্গে মিলে যায়। অসুস্থ পর্যটককে ঘিরে তৈরি হতো আতঙ্কের আবহ, আর সেই সুযোগেই চলত কোটি টাকার বিমা জালিয়াতির খেলা। নেপাল পুলিশের সাম্প্রতিক তদন্তে ফাঁস হয়েছে প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলারের এই চক্র, যার সঙ্গে জড়িত শেরপা, ট্রেকিং সংস্থা, হেলিকপ্টার অপারেটর থেকে শুরু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত।
মাউন্ট এভারেস্ট-এর ট্রেকিং রুট ঘিরে গড়ে ওঠা এই চক্রে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে শেরপা, ট্রেকিং সংস্থা, হেলিকপ্টার অপারেটর এবং হাসপাতালগুলির বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ‘দেশভক্ত জেন জি’ নামে একটি নাগরিক সংগঠনের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়। চলতি বছরের ১২ মার্চ ৩২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই ৯ জন গ্রেফতার হয়েছেন, বাকিরা পলাতক। তাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধ ও প্রতারণার অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছে। সূত্রের খবর, অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন নামী ট্রেকিং এজেন্সির মালিক, বেসরকারি উদ্ধার পরিষেবার কর্তা এবং চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরাও। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে, এই চক্র, এ পর্যন্ত অন্তত ১৯.৬৯ মিলিয়ন ডলারের বিমার টাকা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়েছে।
তদন্তকারীদের দাবি, গোটা চক্রটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। পর্যটকদের খাবারে বেকিং সোডা মিশিয়ে দেওয়া হত, যার ফলে পেটের মারাত্মক গোলযোগ, বমি, দুর্বলতা— এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিত। লক্ষণগুলি এমনভাবে তৈরি করা হতো, যাতে তা উচ্চতাজনিত অসুস্থতা বা খাদ্যে বিষক্রিয়ার সঙ্গে মিলে যায়। এরপর আতঙ্কিত পর্যটকদের বোঝানো হত, পরিস্থিতি গুরুতর, তৎক্ষণাৎ ‘এয়ারলিফট’ না করলে প্রাণসংশয় হতে পারে। এই সুযোগেই শুরু হত আসল খেলা। একটি হেলিকপ্টারে একাধিক যাত্রী থাকলেও প্রত্যেকের বিমা সংস্থার কাছে আলাদা আলাদা পূর্ণ ভাড়ার বিল পাঠানো হতো। একটি ৪,০০০ ডলারের ফ্লাইটের জন্য দাবি করা হত ১২,০০০ ডলার। সঙ্গে জোড়া লাগানো হতো ভুয়ো ফ্লাইট ম্যানিফেস্ট, জাল মেডিক্যাল রিপোর্ট, এমনকি এমন চিকিৎসার নথিও, যা আদৌ দেওয়া হয়নি।
হাসপাতালেও চলত একই খেলা। চিকিৎসার নামে তৈরি হত ভুয়ো ভর্তি নথি, জাল ডিসচার্জ সামারি। এমনকি, তদন্তে উঠে এসেছে—সিনিয়র চিকিৎসকদের ডিজিটাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে তাঁদের অজান্তেই তৈরি করা হয়েছে নথি। কোনও কোনও ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, যাঁদের ‘গুরুতর অসুস্থ’ বলে দেখানো হয়েছে, তাঁরা সেই সময় হাসপাতালের ক্যাফেতে বসে বিয়ার পান করছিলেন। এক ঘটনায় তো এক হাসপাতালের কর্মী নিজের এক বছর আগের এক্স-রে রিপোর্ট অন্য রোগীর নামে ব্যবহার করার কথা স্বীকারও করেছেন।
এই বিপুল অঙ্কের টাকা ভাগাভাগি হত চক্রের বিভিন্ন স্তরে। শেরপা, ট্রেকিং সংস্থা, হেলিকপ্টার পরিষেবা এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল—সবাই পেত নির্দিষ্ট ‘কমিশন’। কোথাও কোথাও বিমার টাকার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দেওয়া হত বলে অভিযোগ। তদন্তের সূত্রপাত চলতি বছরের জানুয়ারিতে। ৩টি বড়ো উদ্ধার সংস্থার ৬ কর্তার গ্রেফতারি থেকেই খুলতে শুরু করে জাল। পুলিশের দাবি, অন্তত ১৯.৬৯ মিলিয়ন ডলার এইভাবে হাতানো হয়েছে। একটি সংস্থা তাদের দাবি করা ১,২৪৮টি উদ্ধার অভিযানের মধ্যে ১৭১টি ভুয়ো দেখিয়ে ১০ মিলিয়নেরও বেশি ডলার তুলেছে। অন্য একটি সংস্থা ৪৭১টির মধ্যে ৭৫টি ‘মিথ্যা রেসকিউ’ দেখিয়ে ৮ মিলিয়ন ডলার আদায় করেছে। তৃতীয় সংস্থার বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ। এ ঘটনায় মোট ১১.৩ মিলিয়ন ডলার জরিমানার দাবি তুলেছেন সরকারি আইনজীবীরা। নেপালের উচ্চ আদালত সূত্রে খবর, উচ্চপ্রোফাইল এই মামলাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেখা হচ্ছে।
নেপালের অর্থনীতিতে পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের জীবিকা এর উপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে একাধিক জালিয়াতির ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে এই শিল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে। ইতিমধ্যেই কয়েকটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক বিমা সংস্থা নেপালে ট্রেকিং সংক্রান্ত কভারেজ বন্ধ করে দিয়েছে। ২০১৮ সালে প্রথমবার এই ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ সামনে আসার পর তৎকালীন ওলি সরকার একাধিক সংস্কারের কথা ঘোষণা করেছিল। তদন্ত কমিটি গঠন করে ৭০০ পাতার রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছিল। সুপারিশ করা হয়েছিল, সমস্ত উদ্ধার ও চিকিৎসার তথ্য পর্যটন দপ্তরে জমা দিতে হবে, মধ্যস্থতাকারী তুলে দিতে হবে এবং ট্যুর অপারেটরদের দায়বদ্ধতা বাড়াতে হবে। কিন্তু বাস্তবে সে ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। নেপাল পুলিশের সংগঠিত অপরাধ দমন শাখার প্রধান মনোজ কুমার কেসি স্পষ্টই জানিয়েছেন, ‘অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এই জালিয়াতি ক্রমশ বেড়েছে।’
তবে, তদন্তকারীদের মতে, এই প্রতারণার শিকড় আরও গভীরে। অনেক ক্ষেত্রে ক্লান্ত পর্যটকদের নিজেরাই অংশগ্রহণ করেছেন জালিয়াতিতে। কখনো হাঁটা এড়িয়ে সরাসরি হেলিকপ্টারে ফেরার প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। কখনো আবার উচ্চতাজনিত স্বাভাবিক শারীরিক সমস্যাকে ভয়াবহ রূপে তুলে ধরে আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছে। এমনকি বিশেষ ওষুধ এবং অতিরিক্ত জল খাওয়ানোর মাধ্যমেও উপসর্গ বাড়িয়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। এক জার্মান পর্যটক দ্বিগুণ বিলের অভিযোগ তুলে সরাসরি প্রতিবাদ জানান। আবার দুই কানাডীয় পর্যটক নিজেরাই পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন, যেখানে ভুয়ো অক্সিজেন লেভেল, অপ্রয়োজনীয় সিটি স্ক্যান ও আইসিইউ ভর্তির কথা উল্লেখ রয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, কেন এতদিন ধরে এই জালিয়াতি ধরা পড়েনি? বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয়ের দুর্গম এলাকায় যোগাযোগের অভাব, বিমা সংস্থার পক্ষে তাৎক্ষণিক যাচাইয়ের অসুবিধা এবং স্থানীয় ‘সহযোগী’ সংস্থাগুলির উপর নির্ভরশীলতা, এ সবই প্রতারণাকে বাহবা দিয়েছে। বিমা সংস্থাগুলি সাধারণত স্থানীয় এজেন্সির মাধ্যমে নথি যাচাই করে, আর সে ব্যবস্থার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জালিয়াতির সুযোগ। সব মিলিয়ে, নেপালের পর্যটন ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দেওয়া এই কেলেঙ্কারি এখন আন্তর্জাতিক নজরে। প্রশ্ন একটাই, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বলেন শাহ-র সরকার কি পারবে কড়া শাস্তির মাধ্যমে এই ‘ভুয়ো উদ্ধার’-এর ব্যবসা রুখতে, না কি হিমালয়ের অদৃশ্য অন্ধকারে দীর্ঘদিন ধরে চলতেই থাকবে প্রতারণার সাম্রাজ্য?
❤ Support Us





