- বি। দে । শ
- আগস্ট ৩১, ২০২৬
নেতানিয়াহু জমানার অবসান ! ইজরায়েলে ভোট সমীক্ষায় এগিয়ে প্রাক্তন সেনাপ্রধান
ইজরায়েলের রাজনীতিতে সেনা প্রধানদের উত্থান নতুন ঘটনা নয়। বরং ইতিহাস বলছে, সামরিক পোশাকে অর্জিত জনপ্রিয়তাকে ব্যালট বাক্সের ভোটে বদলে ফেলার পথটি মোটেই সহজ নয়। একের পর এক প্রাক্তন সেনাকর্তা রাজনীতিতে এসে প্রথমে জনমত সমীক্ষায় ঝড় তুলেছেন, পরে জোটের অঙ্ক, দলীয় কোন্দল এবং ক্ষমতার কঠিন বাস্তবতায় সেই জনপ্রিয়তা ফিকে হয়েছে। এহুদ বারাক, বেনি গান্টজ— তালিকা দীর্ঘ। এ বার সেই পরীক্ষায় প্রাক্তন জেনারেল গাদি আইজেনকোট। ইজরায়েলের প্রাক্তন সেনাপ্রধান, বর্তমানে বিরোধী দল ইয়াশারের নেতা আইজেনকোটকে ঘিরে সাম্প্রতিক সমীক্ষা সে দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২৫ আগস্ট প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় প্রধানমন্ত্রী পদে কে বেশি উপযুক্ত ? এই সরাসরি প্রশ্নে আইজেনকোটকে বেছে নিয়েছেন ৪৪ শতাংশ ভোটার। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর পক্ষে মত দিয়েছেন ৩৪ শতাংশ। শুধু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় নয়, দলীয় হিসাবেও এগিয়ে ইয়াশার— সমীক্ষায় তাদের সম্ভাব্য আসন ২৪, নেতানিয়াহুর লিকুদের ২২। অর্থাৎ, প্রায় দুই দশক ধরে ইজরায়েলি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নেতানিয়াহুর সামনে এ বার এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বী, যাঁকে কেবল ‘দুর্বল’, ‘বামপন্থী’ কিংবা ‘নিরাপত্তার প্রশ্নে নরম’ বলে সরিয়ে দেওয়া সহজ হচ্ছে না।
তবে নির্বাচনে সবচেয়ে বড়ো দল হওয়া আর সরকার গড়া, দুটো এক জিনিস নয়। ১২০ আসনের ‘ক্নেসেট’-এ সরকার গড়তে প্রয়োজন ৬১টি আসন। সাম্প্রতিক সমীক্ষাগুলিতে আইজেনকোটের সম্ভাব্য বিরোধী জোট ৫৮-৫৯ আসনের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। ফলে নেতানিয়াহুকে হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হলেও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ এখনো কাঁটায় ভরা। যদিও, বিশ্লেষকদের মতে, আইজেনকোটের রাজনৈতিক শক্তি তাঁর কোনো নির্দিষ্ট নীতিতে নয়, তাঁর ব্যক্তিত্বে। নেতানিয়াহু যেখানে দীর্ঘ বক্তৃতা, তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক আক্রমণ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে সাবলীল উপস্থিতির জন্য পরিচিত, সেখানে আইজেনকোট অনেকটাই বিপরীত। সংযত, মেপে কথা বলা, প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব বেশি কথা না বলা— এই ভাবমূর্তিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। ইজরায়েলি রাজনীতিতে তিনি তাই এই মুহুর্তে ‘অ্যান্টি-নেতানিয়াহু’ মুখ।
১৯৬০ সালে মরক্কো থেকে আসা ইহুদি অভিবাসী পরিবারে জন্ম আইজেনকোটের। ছোটবেলা কেটেছে ইলাতে। জেরুজালেমের ক্ষমতার অলিন্দ থেকে বহু দূরের সেই শহরেই তাঁর শৈশব-কৈশোর। প্রযুক্তিগত উচ্চবিদ্যালয়ে নৌ-প্রকৌশল ও যান্ত্রিক বিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা। ১৯৭৮ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ‘গোলানি ব্রিগেড’-এর ৫১তম ব্যাটালিয়নে। কোনো অভিজাত কমান্ডো ইউনিট নয়, সাধারণ পদাতিক বাহিনী দিয়েই শুরু। ১৯৮২ সালের লেবানন যুদ্ধে কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে অংশ নেন। বৈরুত বিমানবন্দরের ভয়াবহ লড়াই দেখেছেন। হারিয়েছেন ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের। তিন বার আহত হয়েছেন। তবু সেনাবাহিনী ছাড়েননি পরবর্তী কয়েক দশকে গোলানি ব্রিগেডের বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে ‘রিজার্ভ পদাতিক ব্রিগেড’, ‘এফ্রাইম রিজিওনাল ব্রিগেড’ এবং শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী এহুদ বারাকের সামরিক সচিবের দায়িত্বে পৌঁছন। ১৯৯৯ সালে সে পদে থেকেই সিরিয়ার সঙ্গে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলির সাক্ষী ছিলেন। এর পর ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাঁর ঝুলিতে। দ্বিতীয় ‘ইন্তিফাদা’-র রক্তক্ষয়ী সময়ে ‘জুডিয়া অ্যান্ড সামারিয়া ডিভিশন’-এর কমান্ডার। ২০০৬ সালের দ্বিতীয় লেবানন যুদ্ধের সময় ‘অপারেশনস ডিরেক্টরেট’-এর প্রধান। যুদ্ধের ব্যর্থতার পর ‘নর্দার্ন কমান্ড’-এর দায়িত্ব। সেখানে কাটে ছ–বছর— উদ্দেশ্য ছিল হিজবুল্লাহ্-র বিরুদ্ধে ইজরায়েলের প্রতিরোধক্ষমতা পুনর্গঠন। ২০১৫ থেকে ২০১৯, ছিলে ‘চিফ অব স্টাফ’
এদিকে, নেতানিয়াহু বেড়ে উঠেছেন জেরুজালেমের অভিজাত রেহাভিয়া এলাকায়। তাঁর বাবা ছিলেন পরিচিত ডানপন্থী বুদ্ধিজীবী। নেতানিয়াহু নিজে ‘সায়েরেত মাতকাল’-এর মতো সেনার অভিজাত কমান্ডো ইউনিটে কাজ করেছেন। আইজেনকোটের রাজনৈতিক প্রচারে তাঁর এই ‘সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা’ পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ। মিজরাহি বা উত্তর আফ্রিকা-উৎপত্তির ইহুদি ভোটব্যাঙ্ক দীর্ঘ দিন ধরে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি। সেই ভোটারদের মধ্যেই এখন আইজেনকোটের প্রভাব বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। দু–দশকেরও বেশি সময় ধরে ইজরায়েলের রাজনীতিতে ক্ষমতার সঙ্গে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নামটি প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে। নির্বাচনী উত্থান-পতন হয়েছে, বিরোধী জোট তৈরি হয়েছে, ভেঙেছে, নতুন দল এসেছে, পুরনো দল হারিয়ে গিয়েছে— কিন্তু নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রভাব অটুট থেকেছে।
তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে ইজরায়েলের নাম বার বার জড়িয়েছে যুদ্ধ, সংঘাত আর আন্তর্জাতিক বিতর্কে। ১৯৯৬-৯৯ এবং বিশেষ করে ২০০৯-এর পর থেকে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী থাকা নেতানিয়াহুর শাসনকালে ফিলিস্তিন প্রশ্নে পুরনো সংঘাত আরও জটিল হয়েছে। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনা, পশ্চিম তীরে ইজরায়েলি বসতি, গাজায় সামরিক অভিযান এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে তাঁর সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রপুঞ্জ, ইউরোপীয় দেশ এবং কখনো কখনো আমেরিকারও মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। ১৯৯৬ সালে প্রথম বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময়ই নেতানিয়াহুর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার টানাপড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ‘অসলো চুক্তি’-র মাধ্যমে ইজরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে যে সমঝোতার পথ তৈরি হয়েছিল, নেতানিয়াহু তার প্রতি আগের সরকারের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক ছিলেন। নিরাপত্তা, জেরুজালেম ও ইজরায়েলি বসতির প্রশ্নে তাঁর কঠোর অবস্থান শান্তি প্রক্রিয়াকে বার বার ধাক্কা দিয়েছিল। যদিও প্রথম দফার সরকার মাত্র তিন বছর স্থায়ী হয়েছিল, ১৯৯৯ সালে এহুদ বারাকের কাছে পরাজয়ের পরও ইজরায়েলি রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব কমেনি।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইজরায়েলি বসতি নির্মাণ আন্তর্জাতিক মহলের অন্যতম প্রধান উদ্বেগে পরিণত হয়। ফিলিস্তিনিদের দাবি ছিল, এই বসতি সম্প্রসারণ ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের ভূখণ্ডকে খণ্ডিত করছে; ইজরায়েলের যুক্তি, বসতি ও ভূখণ্ডের প্রশ্নকে চূড়ান্ত শান্তি-আলোচনার অংশ হিসাবেই দেখা উচিত। এ প্রশ্নে নেতানিয়াহু সরকারের সঙ্গে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের সম্পর্কেও টানাপড়েন তৈরি হয়। ২০১০ সালে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইজরায়েল সফরে থাকা অবস্থায় পূর্ব জেরুসালেমে নতুন বসতি নির্মাণের ঘোষণা সে অস্বস্তিকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত করে।
এর পর গাজা হয়ে ওঠে নেতানিয়াহু সরকারের আন্তর্জাতিক সমালোচনার অন্যতম ক্ষেত্র। ২০১৪ সালে ইজরায়েল ও হামাসের মধ্যে দীর্ঘ যুদ্ধের পর গাজায় বিপুল প্রাণহানি ও ধ্বংসের ছবি আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ইজরায়েলের বক্তব্য ছিল, হামাসের রকেট হামলা ও সামরিক পরিকাঠামো ধ্বংস করা তার আত্মরক্ষার অধিকার এবং নিরাপত্তার প্রয়োজন। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি পক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলের অভিযোগ ছিল, সামরিক অভিযানে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। তবে ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ছবিটা বদলে যায়। জেরুসালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি, মার্কিন দূতাবাস তেল আভিভ থেকে জেরুসালেমে সরিয়ে নেওয়া ও গোলান মালভূমির উপর ইজরায়েলের নিয়ন্ত্রণকে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেতানিয়াহু সরকারের জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসাবে দেখা হয়। একই সময়ে ওয়াশিংটনের ‘সেটলমেন্ট পলিসি’-র ভাষাতেও বদল আসে। ফলে এক দিকে রাষ্ট্রপুঞ্জ ও ইউরোপের বহু দেশের সমালোচনা চলতে থাকে, অন্যদিকে আমেরিকার সঙ্গে ইজরায়েলের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়।
২০২২ সালের নির্বাচনের পরে নেতানিয়াহু যে জোট সরকার গড়েন, তার চরিত্রও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ায়। সরকারের শরিকদের মধ্যে পশ্চিম তীরে ইজরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করা কট্টর দক্ষিণপন্থী নেতাদের প্রভাব বাড়ে। ফলে নেতানিয়াহু সরকারের নীতি নিয়ে শুধু আরব দেশগুলিই নয়, ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যেও উদ্বেগ বাড়তে থাকে। রাষ্ট্রপুঞ্জও বার বার বলে এসেছে, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক ধারাবাহিকতাকে দুর্বল করছে এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা নষ্ট করছে। পরবর্তী বছরগুলিতে ২০২১-এর গাজা সংঘাত সে বিতর্ককে আরও গভীর করে। এরপর আসে ৭ অক্টোবর ২০২৩। ইজরায়েলে হামাসের হামলা, অনেক মানুষ নিহত হওয়া এবং বহু মানুষ পণবন্দি হওয়ার পর নেতানিয়াহু সরকার গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। ইজরায়েলের বক্তব্য, হামাসকে সামরিক ভাবে নিষ্ক্রিয় করা আর পণবন্দিদের ফিরিয়ে আনা ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, ততই আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্র হয়েছে গাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, খাদ্য ও ওষুধের ঘাটতি, বাস্তুচ্যুতি, হাসপাতাল ও পরিকাঠামোর ধ্বংস এবং মানবিক সাহায্য পৌঁছনোর প্রশ্ন। ২০২৬ সালেও গাজা নিয়ে এ বিতর্ক থামেনি।
গাজার যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের দরজাতেও পৌঁছয়। দক্ষিণ আফ্রিকা ইজরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যা সনদের আওতায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা ‘আইসিজে’-তে মামলা করে। মামলার শুনানি চলাকালীন আদালত একাধিক অন্তর্বর্তী নির্দেশে ইজরায়েলকে গণহত্যা প্রতিরোধ, মানবিক সাহায্যের সুযোগ আর বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। ফলে নেতানিয়াহু সরকারের সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর পরীক্ষার মুখে পড়ে। আরও বড়ো ধাক্কা আসে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা ‘আইসিসি’-র সিদ্ধান্তে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে সে আদালত নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। তাঁদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী কার্যকলাপ-এর অভিযোগে আদালত পদক্ষেপ করে। অবশ্য ওই গ্রেফতারি পরোয়ানা দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় নয়; এটি আদালতের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ। তবু কোনো বর্তমান ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হয়ে ওঠে।
বিরোধিতা শুধু রাষ্ট্রপুঞ্জ বা আন্তর্জাতিক আদালতের মধ্যে সীমাবদ্ধও নেই। ইউরোপের একাধিক দেশ পশ্চিম তীরে নতুন বসতি নির্মাণের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস-সহ একাধিক ইউরোপীয় দেশ পশ্চিম তীরের ‘ই-‘১ এলাকায় বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়ে আপত্তি জানায়। তাদের বক্তব্য, ওই এলাকায় নির্মাণ ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ভূখণ্ডকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে, দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে কার্যত অসম্ভব করে তুলতে পারে। আমেরিকার সঙ্গেও ইজরায়েলের সম্পর্ক পুরোপুরি মসৃণ নয়। ২০২৬ সালের আগস্টেই মার্কিন সেনেটের ৪৫ জন ডেমোক্র্যাট সদস্য নেতানিয়াহুকে চিঠি দিয়ে পশ্চিম তীরে ইজরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হিংসা নিয়ন্ত্রণ এবং ফিলিস্তিনিদের গণগ্রেফতার বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। বসতি সম্প্রসারণ ও হিংসার ঘটনায় যথাযথ তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা। অর্থাৎ আমেরিকা-ইজরায়েল কৌশলগত সম্পর্ক বজায় থাকলেও নেতানিয়াহু সরকারের নির্দিষ্ট নীতি নিয়ে মার্কিন রাজনীতির ভিতরেও মতভেদ ক্রমশ প্রকাশ্য হচ্ছে। নেতানিয়াহু-যুগে ইরানও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইজরায়েলের অস্তিত্বের জন্য প্রত্যক্ষ হুমকি বলে তুলে ধরেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এ প্রশ্নেই আমেরিকার সহযোগী হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করেন ইজরায়েল।
তবে, আইজেনকোটকেও কোনো ভাবেই ‘শান্তিবাদী’ বা ‘নরমপন্থী নেতা’ বলা যায় না। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ‘দাহিয়েহ ডকট্রিন’। ২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধের সময় বৈরুতের দক্ষিণের দাহিয়েহ অঞ্চলে ইজরায়েলি সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি এই মতবাদে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে বিপুল শক্তি প্রয়োগ ও বেসামরিক পরিকাঠামোর উপর আঘাতের কথা বলা হয়। ফলে আইজেনকোটের রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি দিক যথেষ্ট কঠোর। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও তিনি বিরোধী। সাম্প্রতিক প্রচারে তাঁর অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে— ৭ অক্টোবরের হামলার পরে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাকে তিনি অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে করেছেন। সম্প্রতি তিনি জানিয়েছেন, তাঁর সরকার ক্ষমতায় এলে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠিত হবে না। পশ্চিম তীরে ইজরায়েলি বসতি নিয়েও তাঁর অবস্থান নেতানিয়াহু-বিরোধী কোনো শান্তি-আন্দোলনের সঙ্গে মেলে না। বরং আইজেনকোটের রাজনৈতিক অবস্থান নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক, জাতীয়তাবাদী, শক্তিশালী ইজরায়েল রাষ্ট্রের ধারণার উপর দাঁড়ানো।
তবে পার্থক্য অন্য জায়গায়। আইজেনকোট মনে করেন, সামরিক শক্তি ব্যবহারেরও একটি সীমা রয়েছে। হিজবুল্লাহ্-কে কেবল বোমা মেরে স্থায়ী ভাবে নির্মূল করা সম্ভব নয়। সামরিক চাপের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন। ইরানের ক্ষেত্রেও তাঁর অবস্থান একই। তাঁর মতে, সামরিক শক্তি দিয়ে পরমাণু কর্মসূচিতে আঘাত করা যায়, কিন্তু আকাশ থেকে বোমা ফেলে কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা বদলে দেওয়া যায় না। অর্থাৎ, শক্তি প্রয়োগে তিনি কট্টর; শক্তির সীমা সম্পর্কে তুলনায় রক্ষণশীল। অক্টোবর হামলার পর নেতানিয়াহু সরকার যখন যুদ্ধের পথে হাঁটছে, তখন আইজেনকোট যোগ দেন যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায়। সেখানে তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল—হামাসের হাতে বন্দি জিম্মিদের ফিরিয়ে আনার যে কোনো সুযোগ কাজে লাগানো। এ সময়েই গাজায় জাবালিয়ায় অভিযানের সময় নিহত হন তাঁর ২৫ বছরের ছেলে গাল আইজেনকোট। ৫৫১তম রিজার্ভ ব্রিগেডের মেডিক এবং পদাতিক যোদ্ধা ছিলেন তিনি। ছেলের শেষকৃত্যের কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি আবার যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় ফিরে আসেন। মাসে নিজের শোকের কথা প্রকাশ্যে লিখেছিলেন তিনি। এই ব্যক্তিগত শোকই আইজেনকোটের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর অবস্থানকে ‘নরম’ বলা কঠিন। ‘দেশপ্রেম’ নিয়ে প্রশ্ন তোলাও তাঁর ক্ষেত্রে সহজ নয়।
অন্যদিকে, দু–দশকের বেশি সময় ধরে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি ছিল তাঁর নিরাপত্তা-ভাবমূর্তি। ‘মিস্টার সিকিউরিটি’— দেশকে নিরাপদ রাখার জন্য সবচেয়ে যোগ্য নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন তিনি। কিন্তু ৭ অক্টোবর সে দাবির ভিতেই ফাটল ধরিয়েছে। হামাসের নজিরবিহীন হামলা ইজরায়েলের বিখ্যাত গোয়েন্দা ব্যবস্থা, সামরিক প্রস্তুতি ও প্রতিরোধক্ষমতার গভীর ব্যর্থতা প্রকাশ করেছে। আইজেনকোট এখন সে ব্যর্থতাকেই নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে চলেছেন। নেতানিয়াহু’ও অবশ্য পাল্টা বয়ান তৈরি করতে চাইছেন। তাঁর যুক্তি, হামাস দুর্বল, হিজবুল্লাহ্ ক্ষতিগ্রস্ত, ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হয়েছে, ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ দুর্বল হয়েছে। নাসরাল্লাহ, খামেনি, সিনওয়ার—সকলেই মৃত।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি বেনি গান্টজের ‘ন্যাশনাল ইউনিটি জোট’ ছাড়েন আইজেনকোট। সেপ্টেম্বরে নিজের দল গড়েন। নাম—‘ইয়াশার!’ অর্থাৎ ‘সোজা’, ‘সৎ’। বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে স্বাগত জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, এই নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ ইজরায়েলের গতিপথ বদলানোর সুযোগ তৈরি করেছে। প্রথমে লাপিদ এবং নাফতালি বেনেট— দুই বিরোধী নেতাই আইজেনকোটকে নিজেদের শিবিরে টানতে চেয়েছিলেন। আবার তাঁর জনপ্রিয়তা নিয়েও সতর্ক ছিলেন সকলেই।শেষ পর্যন্ত লাপিদ ও বেনেট নিজেদের মধ্যে সমঝোতার পথে হাঁটেন। আইজেনকোট নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রেখে নিজের শর্তে রাজনীতির ময়দানে জায়গা করে নেন। এবার তাঁর রাজনৈতিক পরিণতির পরীক্ষা। ক্ষমতা দখলের পথে খোলা রয়েছের দুই রাস্তা প্রথম রাস্তা — ‘জায়নিস্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা’। ‘ইয়াশার’, ‘টুগেদার’, ‘ইজরায়েল বেইতেনু’, ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’ এবং ছোটো ডানপন্থী দলের সমন্বয়ে ৬১ বা তার বেশি আসন। এই পথই আইজেনকোটের পছন্দের। কারণ, এতে আরব দলগুলির বাইরের সমর্থনের উপর নির্ভর করতে হবে না।
দ্বিতীয় রাস্তা কঠিন— সংখ্যালঘু সরকার। বিরোধী ‘জায়নিস্ট’ দলগুলি যদি ৫৭ থেকে ৬০টি আসনে আটকে যায়, তা হলে আরব দলগুলি বাইরে থেকে সমর্থন দিয়ে নেতানিয়াহুকে সরকার গঠন থেকে আটকাতে পারে। ২০২২ সালে আরব ইসলামপন্থী দল রা’আমের লাপিদ-বেনেট সরকারে যোগ দেওয়ার নজির রয়েছে।কিন্তু এই পথের মূল্যও আছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাজেট, সাংবিধানিক সংস্কার কিংবা নিরাপত্তা-নীতি নিয়ে নতুন করে দর-কষাকষি করতে হবে। আর নেতানিয়াহুর হাতে উঠে আসবে সহজ একটি রাজনৈতিক অস্ত্র—‘আরব দলের সমর্থনে ক্ষমতায় আসা সরকার’। বিশেষত, ফিলিস্তিন প্রশ্নে এ নির্ভরতা আইজেনকোটের জন্য রাজনৈতিক বিপদ হয়ে উঠতে পারে। ফলে, আইজেনকোটকে সম্ভাব্য শরিকদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, তাঁর মিত্রদের কেউ যেন ৩.২৫ শতাংশের ভোট পাওয়ার নীচে না চলে যায়।
❤ Support Us







