- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- আগস্ট ৩১, ২০২৬
ফের উত্তপ্ত পশ্চিম এশিয়া! ইরানের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদি
কিরঘিস্তানের রাজধানী বিশকেকে বসেছে ২৬তম ‘সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন’ বা এসসিও শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পৃথকভাবে কথা বলবেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও। হরমুজ ঘিরে নতুন করে অশান্তির আঁচ ছড়াচ্ছে পশ্চিম এশিয়ায়। আমেরিকা-ইরানের আঘাত-পাল্টা আঘাতে উত্তপ্ত গোটা অঞ্চল। প্রায় এক মাসের বিরতির পর রবিবার ইরানের লারাক দ্বীপে আমেরিকান বাহিনীর হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালীর দিকে সমুদ্র-মাইন বহনকারী রকেট ছোড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি)। সে কারণেই লারাক দ্বীপে ‘আইআরজিসি’-র ২ টি অবস্থানে হামলা চালানো হয়। আমেরিকার এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ইরানি বাহিনীকে হরমুজের দিকে সমুদ্র-মাইন নিয়ে রকেট নিক্ষেপের প্রস্তুতি নিতে দেখা গিয়েছিল।
এর পরেই পাল্টা জবাব দেয় তেহরান। হরমুজের কাছে থাকা মার্কিন জাহাজ ও জর্ডানে মোতায়েন আমেরিকান বাহিনীকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। যদিও অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিহত করা হয়েছে বলে দাবি ট্রাম্প প্রশাসনের। বড়ো ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবরও পাওয়া যায়নি। যদিও ইরানের ‘রেভলিউশনারি গার্ডস’ দাবি করেছে, আমেরিকার প্রাথমিক হামলায় কয়েক জন সেনা ও সাধারণ নাগরিক নিহত বা আহত হয়েছেন। হামলার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ‘জবাব ও শাস্তি’-র হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ‘আইআরজিসি’। নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ভারতও এর প্রত্যক্ষ প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। এ আবহেই, সোমবার বিশকেকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে মুখোমুখি বসেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। ফেব্রুয়ারিতে ইরান-মার্কিন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম মুখোমুখি হলেন তাঁরা।
জানা যাচ্ছে, পশ্চিম এশিয়ার চলমান পরিস্থিতি, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও বাড়ানো এবং যৌথ ভাবে কাজের পরিধি সম্প্রসারণের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচি-সহ শীর্ষ আধিকারিকেরা। ভারত ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ দিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের তালিকায় ইরান রয়েছে। কিন্তু তেহরানের উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা ও হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে অস্থিরতার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দু–দেশের অর্থনৈতিক যোগাযোগও ধাক্কা খেয়েছে। এর আগেও বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। হরমুজ প্রণালী দিয়ে অবাধ ও নিরাপদ নৌ-চলাচলের প্রয়োজনীয়তার, ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে তেহরানকে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে দিল্লি। সংঘাতের অবসানে যে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তাকেও স্বাগত জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
জানা যাচ্ছে, সোমবারের বৈঠকে বৈঠকে আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রভাবের কথা তুলে ধরেছেন ইরানের রাষ্ট্রপতি। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিম এশিয়ায় অশান্তি কোনো দেশের জন্যই ভাল নয়। অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত লক্ষ্য পূরণে দেশগুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। ইরানের প্রেসিডেন্ট আরও বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘এসসিও’-র মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তাঁর কথায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীন মত ও কণ্ঠস্বরের উপস্থিতিই এ ধরনের মঞ্চকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। তবে, ‘এসসিও শীর্ষ সম্মেলন’ ঘিরে কূটনৈতিক নজর শুধু ভারত-ইরান বৈঠকেই আটকে নেই। রাশিয়া, চিন ও ভারত— তিন শক্তিশালী দেশের রাষ্ট্রনেতারা একই মঞ্চে রয়েছেন। ফলে গোটা সম্মেলনের দিকে নজর রয়েছে পশ্চিমী দুনিয়ারও। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কী ভাবে এগোয়, হরমুজ পরিস্থিতিতে দিল্লির অবস্থান কী হয়, এবং রাশিয়া ও চিনের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে যায়— এসব প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
‘এসসিও’-র ফাঁকে কিরঘিস্তানের প্রেসিডেন্ট সদির জাপারভ এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও মোদির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ানের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন মোদি। প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, ওষুধ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং শিক্ষা— বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ফলে বিশকেকের এই সফরে একের পর এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে পশ্চিম এশিয়া থেকে ইউরেশিয়া— বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সমীকরণ সামলাতে হচ্ছে দিল্লিকে। কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ওয়াশিংটনের চাপের আবহে তেহরান ও মস্কোর সঙ্গে নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন কৌশলগত সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমেরিকাকে সামনে রেখে কার্যত একটি ‘তৃতীয় অক্ষ’ গড়ে তোলার বার্তাই কি দিচ্ছে দিল্লি—এমন প্রশ্নও উঠছে।
উল্লেখ্য, ৩১ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কিরঘিস্তানের রাজধানী বিশকেকে ২৬তম ‘এসসিও শীর্ষ সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ বার সংগঠনটির ২৫ বছর পূর্তি। ২০০১ সালে চিন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরঘিস্তানে, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তানকে নিয়ে ‘এসসিও’-র পথচলা শুরু হয়েছিল। ২০১৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান পূর্ণ সদস্য হয়। পরে ২০২৩ সালে ইরান ও ২০২৪ সালে বেলারুশ সদস্য হয়। বিশকেকে ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আগে মধ্য এশিয়া সফরের প্রথম পর্বে উজবেকিস্তানের সঙ্গেও কৌশলগত সম্পর্ক আরও মজবুত করে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২৯-৩০ আগস্ট তাশখন্দ সফরে প্রেসিডেন্ট শভকত মিরজিয়য়েভের সঙ্গে বৈঠকে ভারত-উজবেকিস্তান সম্পর্ককে ‘সমগ্র কৌশলগত অংশীদারিত্ব’-এর স্তরে উন্নীত করার পাশাপাশি ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম সরবরাহের ব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যও স্থির হয়েছে।
পাশাপশি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, বাণিজ্য, ডিজিটাল পরিকাঠামো, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য-সহ একাধিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর রূপরেখা তৈরি হয়েছে। বিদেশমন্ত্রী পর্যায়ে একটি ‘কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল’ গঠন এবং বিদ্যমান যৌথ কমিশনকে মন্ত্রী পর্যায়ে উন্নীত করার সিদ্ধান্তও হয়েছে। উজবেকিস্তান সফরেই সে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘অলি দারাঝালি দুস্তলিক’-এ ভূষিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ফলে, তাশখন্দ পর্বের পর, এ বার বিশকেকের ‘এসসিও’ মঞ্চে ভারতের সক্রিয় কৌশলগত উপস্থিতি বৃহত্তর বার্তাই দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
❤ Support Us







