Advertisement
  • বি। দে । শ
  • আগস্ট ২৪, ২০২৬

ইরানে আবার ‘‌হিজাব যুদ্ধ’‌, আয়াতুল্লাহর ফরমান মানতে অস্বীকার নারীদের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ইরানে আবার ‘‌হিজাব যুদ্ধ’‌, আয়াতুল্লাহর ফরমান মানতে অস্বীকার নারীদের

২০২২ সালের বিক্ষোভের পর ইরানে হিজাব ছাড়া থাকা অনেক নারীর কাছে দৈনন্দিন জীবনের একটা অংশ এবং প্রতিবাদের রূপ হয়ে উঠেছে। হিজাব পরা নিয়ে ইরানে আবার সংঘাত তীব্র হয়ে উঠেছে। নারীরা আয়াতুল্লাহ খামেনির ফরমান মানতে অস্বীকার করছেন। এখন অনেক ইরানি নারীকে জনসমক্ষে হিজাব ছাড়া দেখা যাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে কট্টরপন্থী নেতারা হিজাব সংক্রান্ত আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করার জন্য সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছেন।

কট্টরপন্থীদের চাপে ইরান সরকার হিজাব সংক্রান্ত আইনকে আরও কঠোর করতে চাইছে। আর নারীরা হিজাব ছাড়া জনসমক্ষে এসে আইনটিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে শুরু করেছেন। ১৯৭৯ সালে আরোপিত বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল, তা এখন গণআন্দোলনের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমাজের একটা অংশের জন্য দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ এবং প্রতিবাদের একটা রূপ হয়ে উঠেছে।

ইরানে বাধ্যতামূলক হিজাব শুধু একটা ধর্মীয় ঐতিহ্যই নয়, বরং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ব্যবস্থার একটা অংশ। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর নারীদের পোশাকের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায় এবং ১৯৮৩ সালে জনসমক্ষে হিজাব বাধ্যতামূলক করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, নারীদের চুল ঢেকে রাখতে এবং ঢিলেঢালা পোশাক পরতে হয়। এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এই উদ্দেশ্যে, ‘ঘাশত–এ–এরশাদ’ নামে পরিচিত নীতিপুলিশ বাহিনী গঠন করা হয়। এই নীতিপুলিশ জনসমক্ষে নারীদের পোশাকের ওপর নজরদারি করে আসছে।

২০২২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর, ২২ বছর বয়সী মাসা জিনা আমিনি পুলিশি হেফাজতে মারা যান। ভুলভাবে হিজাব পরার অভিযোগে তাঁকে ১৩ সেপ্টেম্বর তেহরান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। মাসা আমিনির মৃত্যু ইরানজুড়ে প্রতিবাদের জন্ম দেয় এবং ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন বিশ্বব্যাপী আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

নারীরা রাস্তায় নেমে আসেন, হিজাব খুলে ফেলেন, চুল কেটে ফেলেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। এই প্রতিবাদ বন্ধ করার জন্য সরকার ব্যাপক দমনপীড়ন শুরু করে। ২২০০০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে যে, শত শত মানুষ নিহত হয়। এ কারণেই হিজাব ছাড়া জনসমক্ষে আসা এখন আর শুধু পোশাক পছন্দের বিষয় নয়। অনেক নারীর কাছে এটা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রতীক হয়ে উঠেছে।

২০২২ সালের পর ইরান শুধু রাস্তায় পুলিশ মোতায়েনের বাইরেও প্রযুক্তি ও নজরদারির ব্যবহার প্রসারিত করে। ২০২৩ সালে হিজাববিহীন নারীদের শনাক্ত করতে জনসমাগমস্থলে ক্যামেরা এবং মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছিল। উপরন্তু, নারীরা জরিমানা, গ্রেপ্তার এবং অন্যান্য নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে ছিলেন। সরকার হিজাবের নিয়মকানুন কার্যকর করার উপায় হিসেবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ব্যবহার করত। ২০২৪ সালে সংসদ কর্তৃক পাসকৃত ‘হিজাব ও সতীত্ব আইন’ আরও কঠোর বিধিনিষেধ ও শাস্তির বিধান চালু করে।

এখন ইরানি মহিলারা হিজাব ছাড়া বাইরে বের হতে শুরু করেছেন। কারণ ২০২২ সাল থেকে প্রতিবাদের পদ্ধতি বদলে গেছে। আগে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামত, কিন্তু এখন অনেক নারী হিজাব ছাড়া স্বাভাবিক জীবনযাপন করে প্রতিবাদ করছেন। ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে যে, বড় আকারের সংগঠন ও নেতৃত্বের ওপর দমনপীড়নের পর নারীদের প্রতিরোধ ছোট, আরও বিক্ষিপ্ত এবং নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছে, কিন্তু জনসমক্ষে হিজাব ছাড়া দেখা দেওয়াটা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই রয়ে গেছে। এই কারণেই সরকারের সমস্যা শুধু কয়েকজন বিক্ষোভকারী নয়। হাজার হাজার নারী তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে নিয়মকানুন অমান্য করতে শুরু করায়, পুলিশের পক্ষে সবাইকে থামানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এবছর থেকে আবার হিজাবের ওপর কড়াকড়ি শুরু করেছে ইরান সরকার। বর্তমানে ইরান যুদ্ধ, নিরাপত্তা সংকট এবং অর্থনৈতিক চাপের সম্মুখীন। যুদ্ধের সময় হিজাব আইন বলবৎকরণের বিষয় চাপা পড়ে গিয়েছিল। তবে, যুদ্ধ পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসতেই কট্টরপন্থীরা এটিকে ক্ষমতা ও ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয় হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। কট্টরপন্থীরা এখন ‘‌হিজাব ও সতীত্ব’‌ আইন পুনর্বহালের জন্য চাপ বাড়াচ্ছে, যা আগে বাস্তবায়নে বাধা দেওয়া হয়েছিল। হিজাববিহীন নারীদের ক্যাফে ও অন্যান্য ব্যবসার ওপর দমনপীড়নের খবরও পাওয়া গেছে। এর অর্থ হল, ইরানের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যেও এই বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কট্টরপন্থীরা এটিকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করে, অন্যদিকে সরকার আশঙ্কা করে যে অতিরিক্ত কঠোরতা আরেকটি বড় সামাজিক বিক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।

আইনগতভাবে না হলেও, সামাজিকভাবে চিত্রটি নিশ্চিতভাবেই বদলে গেছে। ইরানে বাধ্যতামূলক হিজাব এখনও বিলুপ্ত করা হয়নি। সরকারের কাছে আইন প্রণয়ন, পুলিশ, নজরদারি এবং বিচার ব্যবস্থার সাহয্য নেওয়ার উপায় রয়েছে। তবে ২০২২ সালের পর নারীদের আচরণে যে পরিবর্তন এসেছে, তা শুধু পুলিশি পদক্ষেপের মাধ্যমে পাল্টে দেওয়া কঠিন বলে মনে হচ্ছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!