- দে । শ
- অক্টোবর ৯, ২০২৬
সঙ্কটে হিমালয়ের ‘জ্ঞানবৃক্ষ’-এর পুনর্জন্ম
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হিমালয়ের বুকে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের সাক্ষী থেকেছে ‘জ্ঞানবৃক্ষ’। সে গাছের ছালে লেখা হয়েছে ধর্মীয় শাস্ত্র, চিকিৎসা সংক্রান্ত পুঁথি। কাশ্মীরের শারদা লিপিতে রচিত বহু প্রাচীন পাণ্ডুলিপির সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে এ গাছের নাম। দীর্ঘ দিন ধরে জ্ঞান ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের অন্যতম মাধ্যম ছিল যে বৃক্ষ, সেই ভোজপত্রের ভবিষ্যৎ চরম সঙ্কটে।
উত্তরাখণ্ডের গাড়োয়াল হিমালয়ের বনভূমি নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ভোজপত্র-সহ একাধিক দেশীয় প্রজাতির গাছের স্বাভাবিক পুনর্জন্মের প্রক্রিয়া ধাক্কা খাচ্ছে। কোথাও পরিণত গাছ রয়েছে, অথচ তার নিচে জন্মাচ্ছে না নতুন চারা। গবেষকদের আশঙ্কা, এরকম পরিস্থিতি চলতে থাকলে নির্দিষ্ট কিছু এলাকা থেকে হারিয়ে যেতে পারে একাধিক প্রজাতি। উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশী ও টেহরি জেলার ২৪টি বনাঞ্চলে সমীক্ষা চালিয়ে এই উদ্বেগজনক ছবি পেয়েছেন গবেষকেরা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত বনভূমিগুলিকে এই গবেষণার আওতায় আনা হয়েছিল। সমীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত ৪১টি প্রজাতির মধ্যে ২২.৬০ শতাংশের ক্ষেত্রে পুনর্জন্মের কোনও লক্ষণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট এলাকায় পরিণত গাছ থাকলেও সেগুলির নীচে বীজ কিংবা নতুন চারাগাছের সন্ধান মেলেনি। বনভূমির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের অন্যতম কারণ এই প্রবণতা।
হেমবতী নন্দন বহুগুণা গাড়োয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চন্দ্রমোহন শর্মার নেতৃত্বে গবেষণাটি করা হয়েছে। দলে ছিলেন ডক্টর যশবন্ত সিং রানা এবং ডক্টর ওমপ্রকাশ তিওয়ারি। ‘নাতিশীতোষ্ণ গাড়োয়াল হিমালয়ে উচ্চতা ও পরিবেশগত বিঘ্নের তারতম্যের প্রেক্ষিতে বনভূমির গঠন এবং গাছের পুনর্জন্মের প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক গবেষণাপত্রটি সেপ্টেম্বর মাসে ‘স্প্রিঙ্গার নেচার’-এর ‘ডিসকভার ফরেস্ট’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় দেবদারু, ওক গাছের তিনটি প্রজাতি, রডোডেনড্রন, হিমালয়ান ফার, ব্লু পাইন, চিরপাইন, ইউ, ম্যাপল এবং ভোজপত্র-সহ একাধিক প্রজাতির গাছের অবস্থা খতিয়ে দেখা হয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে ৪১১ থেকে ৮৪০টি পরিণত গাছ, ৫৮৭ থেকে ৩,৬৫৫টি কিশলয় এবং ৯৪৪ থেকে ৬,৫৭২টি চারাগাছের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। তবে সব এলাকায় গাছের সংখ্যা কিংবা নতুন চারার বৃদ্ধির হার এক রকম নয়। বনভূমির অবস্থান, উচ্চতা এবং মানুষের কার্যকলাপের মাত্রার সঙ্গে তার উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষণায় সবচেয়ে উদ্বেগ দেশীয় বৃক্ষের পুনর্জন্মের হার ঘিরে। বনভূমিতে গাছের উপস্থিতি থাকলেই যে সে বনভূমির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত, তা নয়। কোনো প্রজাতির পরিণত গাছ বেঁচে থাকলেও যদি নতুন চারা জন্মাতে না পারে, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে প্রজাতির সংখ্যা কমতে থাকবে। গাড়োয়াল হিমালয়ের বনাঞ্চল নিয়ে গবেষণায় এ আশঙ্কাই স্পষ্ট হয়েছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, সমীক্ষা করা প্রজাতিগুলির মধ্যে ৩৪.২৫ শতাংশের পুনর্জন্মের হার তুলনামূলকভাবে ভালো। ১২.৩৩ শতাংশ প্রজাতির ক্ষেত্রে সে হার স্বাভাবিক। অন্যদিকে, ১৬.১০ শতাংশ প্রজাতির পুনর্জন্মের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগের। আরও ১৪.৭৩ শতাংশ প্রজাতি নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু ২২.৬০ শতাংশ প্রজাতির ক্ষেত্রে নতুন করে বংশবৃদ্ধির কোনো লক্ষণই দেখা যায়নি। গবেষক ওমপ্রকাশ তিওয়ারি জানিয়েছেন, যে সব জায়গায় বেশি চারাগাছ পাওয়া গিয়েছে, সেখানে সাধারণত কিশলয়ের সংখ্যাও বেশি। কিন্তু বেশ কয়েকটি বনাঞ্চলে চারাগাছ থেকে কিশলয় এবং কিশলয় থেকে পরিণত গাছে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া যথেষ্ট দুর্বল। অর্থাৎ, বীজ থেকে চারা জন্মালেও তার পরের ধাপগুলিতে গাছের বেড়ে ওঠা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের গাছকে পরিণত বয়সে পৌঁছতে না দেওয়ার এই প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে বনভূমির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতার বনাঞ্চলগুলিতে মানুষের হস্তক্ষেপ বেশি। বিশেষত, গ্রামের কাছাকাছি বনভূমিতে জ্বালানির কাঠ সংগ্রহ, গবাদি পশুর খাদ্যের জন্য পাতা ছেঁড়া, পশুচারণ এবং গাছের ডালপালা কেটে নেওয়ার মতো কাজ নিয়মিত চলে। এর ফলে শুধু পরিণত গাছের ক্ষতি হচ্ছে না, নতুন চারাগাছের বেড়ে ওঠার পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে। বনভূমিতে আগুন লাগার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। কোথাও কোথাও ইচ্ছাকৃত ভাবে আগুন লাগানো হয়। সে আগুনে মাটির কাছাকাছি বেড়ে ওঠা চারাগাছ এবং নতুন কিশলয় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফলে গাছের পুরনো প্রজন্ম টিকে থাকলেও নতুন প্রজন্মের বেড়ে ওঠার পথ বন্ধ হয়ে যায়। তবে মানুষের চাপ যে শুধু নিচু পাহাড়ের বনাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ, তা নয়। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অপেক্ষাকৃত বেশি উচ্চতার বনভূমিতে মানুষের কার্যকলাপ সাধারণত কম হলেও সেখানেও চাপ বাড়ছে। গ্রীষ্মকালে পশুচারণের জন্য মানুষ উঁচু পাহাড়ের তৃণভূমিতে যাতায়াত করেন। সেখানে তৈরি হয় অস্থায়ী আশ্রয়। সে আশ্রয় নির্মাণের জন্য কখনো কখনো হিমালয়ান ফার ও খারসু ওক গাছের কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে যে বনাঞ্চলগুলিকে তুলনামূলক ভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত বলে মনে করা হতো, সেখানেও মানুষের কার্যকলাপের প্রভাব বাড়ছে।
হিমালয়ের ভোজপত্র গাছের গুরুত্ব শুধু পরিবেশগত নয়, ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাচীন ভারতে লেখার উপকরণ হিসেবে এই গাছের ছাল ব্যবহার করা হতো। ধর্মীয় গ্রন্থ, চিকিৎসা সংক্রান্ত রচনা এবং নানা ধরনের পাণ্ডুলিপি লেখার কাজে ভোজপত্রের ছাল বিশেষ ভাবে সমাদৃত ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে লেখা সংরক্ষণ করতে পারার ক্ষমতার কারণেই এ গাছের ছালের কদর ছিল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,৫০০ মিটার উচ্চতায় ভোজপত্র জন্মায়। গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী, কেদারনাথ ও বদ্রীনাথের মতো তীর্থক্ষেত্রের আশপাশে এই গাছের দেখা মেলে। হেমকুণ্ড সাহিব, ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্স এবং তুঙ্গনাথ-চোপতা অঞ্চলও ভোজপত্রের উল্লেখযোগ্য আবাসস্থল। গঙ্গোত্রী থেকে গোমুখ যাওয়ার পথে অবস্থিত ভোজবাসা নামের জায়গাটির নামও এই গাছের সঙ্গে সম্পর্কিত। ওই এলাকায় ভোজপত্রের বন রয়েছে। গবেষকদের বক্তব্য, ভোজপত্রকে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা ‘আইইউসিএন’ বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এ গাছ কাটার উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। কিন্তু শুধু গাছ কাটা বন্ধ করলেই যে প্রজাতিটিকে রক্ষা করা যাবে, গবেষণার ফলাফল সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গিয়েছে, ভোজপত্রের পাশাপাশি ম্যাপল, আখরোট, ওক, কাইল ও পপলারের মতো প্রজাতির ক্ষেত্রেও পুনর্জন্মের সমস্যা রয়েছে। প্রায় প্রতি পাঁচটি প্রজাতির মধ্যে একটির ক্ষেত্রে কোনো বীজ বা চারাগাছ পাওয়া যায়নি। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সংশ্লিষ্ট বনাঞ্চলে ওই প্রজাতিগুলির উপস্থিতি ক্রমশ কমে যেতে পারে। বনের উপর মানুষের চাপ কতটা প্রভাব ফেলছে, তার ইঙ্গিত মিলেছে গাছের মাথার পাতার আচ্ছাদনের পরিমাণ থেকেও। অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিগ্রস্ত বনাঞ্চলে এই আচ্ছাদন ৭৫ শতাংশের বেশি। কিন্তু মানুষের কার্যকলাপে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বনাঞ্চলে তা ৪০ শতাংশের নীচে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, মানুষের হস্তক্ষেপের সঙ্গে বনভূমির গঠন এবং ঘনত্বের পরিবর্তনের যোগ রয়েছে। দেবদারু বনেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করেছেন গবেষকেরা। মাঝারি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত দেবদারু বনে প্রতি হেক্টরে ১,৮৩৩টি চারাগাছ এবং ১,০১৩টি কিশলয় পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু মানুষের চাপ আরও বাড়লে সে সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এতে স্পষ্ট, বনভূমির স্বাভাবিক পুনর্জন্মের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ বজায় রাখা কতটা জরুরি।
ভোজপত্রের মতো ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন গাছের ক্ষেত্রে এই সঙ্কট তাই কেবল একটি প্রজাতির অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হিমালয়ের বনভূমির বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং বহু শতাব্দী ধরে চলে আসা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। পরিণত গাছগুলিকে সংরক্ষণ করার পাশাপাশি বীজের অঙ্কুরোদ্গম, চারাগাছের বেড়ে ওঠা এবং কিশলয়ের পরিণত গাছে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত করতে হবে। নইলে আজ যে গাছগুলি হিমালয়ের বুকে দাঁড়িয়ে রয়েছে, আগামী প্রজন্মের কাছে সেগুলির অস্তিত্ব হয়তো শুধু ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে।
❤ Support Us





