- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ২৬, ২০২৬
দু-দশক পর জামিয়ায় ছাত্রভোটের আশ্বাস ! তবু আন্দোলনে অনড় পড়ুয়ারা, অনশন অব্যাহত
সংবিধান অনুমোদনের ১৫ দিনের মধ্যে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নির্দেশ দিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রত্যাহার করা হয়েছে শোকজ ও সাসপেনশন নোটিস, নিরাপত্তারক্ষীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠনেরও আশ্বাস। কিন্তু সংবিধান তৈরির নির্দিষ্ট সময়সীমা, বহিষ্কার প্রত্যাহার এবং মুখ্য নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে এখনো অনড় আন্দোলনকারীরা। প্রশাসনের বিরুদ্ধে মন্তব্যের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার শর্তও মানতে নারাজ তাঁরা।
প্রায় দু–দশক ধরে বন্ধ দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ ভোট। নির্বাচন ফেরানোর দাবিতে চলছে টানা আন্দোলন, অনশন, অবস্থান-বিক্ষোভ। রবিবার আন্দোলনকারীদের জোর করে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সে আবহেই সোমবার, ২৬ অক্টোবর, পড়ুয়াদের দাবির একাংশ মেনে নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ছাত্র সংসদের সংবিধান অনুমোদনের ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচন করানোর নির্দেশ জারি হয়েছে। আন্দোলনের সময়ে পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে জারি করা শোকজ ও সাসপেনশন নোটিস প্রত্যাহারের কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি, নিরাপত্তারক্ষীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু তাতেও কি কাটল অচলাবস্থা ? আপাতত তেমন কোনো ইঙ্গিত নেই। কারণ, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য ১৫ দিনের সময়সীমা ঘোষণা করা হলেও সংবিধান কবে অনুমোদিত হবে, তা স্পষ্ট করেনি বিশ্ববিদ্যালয়। আন্দোলনকারীদের আরও দাবি ছিল, উপাচার্য এবং মুখ্য প্রোক্টরকে পদত্যাগ করতে হবে। সে দাবির বিষয়ে কোনো আশ্বাস মেলেনি বলেই জানিয়েছেন পড়ুয়ারা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আন্দোলন তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিলেও, আন্দোলনকারীদের একাংশ অনড়। অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন দু–জন পড়ুয়া। সোমবার ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের দফতর থেকে জারি করা নির্দেশে বলা হয়েছে, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ছাত্র সংসদের সংবিধান অনুমোদিত হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্দেশটি নিয়ে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের সঙ্গে আলোচনা করতে ভোর সাড়ে ৪টা নাগাদ পৌঁছন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মহতাব আলম রিজভি। পড়ুয়াদের হাতে কর্তৃপক্ষের নির্দেশ তুলে দিয়ে তিনি আন্দোলন প্রত্যাহারের আবেদন জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, পড়ুয়াদের দাবিগুলি মেনে নেওয়া হয়েছে।
সোমবার ভোরে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের সঙ্গে দেখা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মহতাব আলম রিজভি। তাঁর হাতে ছিল কর্তৃপক্ষের জারি করা নির্দেশিকা। পড়ুয়াদের আন্দোলন প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়ে তিনি জানান, তাঁদের দাবির ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, তাঁদের মূল দাবির নিষ্পত্তি হয়নি। সংবিধান অনুমোদনের দিনক্ষণই যদি নির্দিষ্ট না হয়, তা হলে তার ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচন করানোর আশ্বাস কতটা কার্যকর হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তাঁদের আরও অভিযোগ, আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েক জন পড়ুয়ার বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা এবং বহিষ্কারের মতো পদক্ষেপ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশে শোকজ ও সাসপেনশন নোটিস প্রত্যাহারের কথা থাকলেও, ওই পড়ুয়াদের বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। তার উপর প্রশাসনের বিরুদ্ধে করা মন্তব্য ও সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্টের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার শর্তে আপত্তি জানিয়ে অনশন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ পুনরুদ্ধারের দাবিতে গত ১১ অক্টোবর থেকে আন্দোলনে নেমেছেন পড়ুয়াদের একাংশ। ২০০৬ সালে ছাত্র সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর থেকে ক্যাম্পাসে নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা আর চালু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সে ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন পড়ুয়াদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ছাত্রছাত্রীদের মতামত তুলে ধরা, পড়ুয়াদের সমস্যা কর্তৃপক্ষের নজরে আনা এবং ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে অধিকার ফিরিয়ে আনার দাবিতেই এ বার অনশন ও অবস্থান-বিক্ষোভ শুরু হয়। এ পরিস্থিতিতে সোমবার কর্তৃপক্ষের নির্দেশিকাকে আন্দোলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হলেও, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রশাসনের মতপার্থক্য রয়ে গিয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, প্রায় ২০ বছর পর ছাত্র সংসদ নির্বাচন ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি স্বাগত হলেও, সেই প্রতিশ্রুতিকে কার্যকর করার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ও বাকি দাবিগুলির বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বলা হয়েছে, ছাত্র সংসদের সংবিধান অনুমোদনের ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু সংবিধান তৈরির কাজ কখন শেষ হবে, কবে তা অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে, অনুমোদনের আগে পড়ুয়াদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে কি না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। এই অস্পষ্টতাই আন্দোলনকারীদের আপত্তির অন্যতম কারণ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশিকা পাওয়ার পর আন্দোলনকারীরা পাল্টা চিঠি দিয়ে সেটি সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, ছাত্র সংসদ পুনরুদ্ধারের জন্য যে দাবিগুলি জানানো হয়েছিল, তার সবগুলির নিষ্পত্তি হয়নি। তাই নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং স্পষ্ট আশ্বাস ছাড়া আন্দোলন প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়।
পড়ুয়াদের প্রথম দাবি, আগামী ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে ছাত্র সংসদের সংবিধানের খসড়া তৈরি করে অনুমোদন করতে হবে। তার পরে ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচনের দিনক্ষণ আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করতে হবে। তাঁদের মতে, সংবিধান অনুমোদনের সময়সীমা নির্দিষ্ট না থাকলে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলে থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে জারি হওয়া শোকজ ও সাসপেনশন নোটিসের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা এবং বহিষ্কারের নির্দেশও প্রত্যাহার করতে হবে। ভবিষ্যতে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে কোনো পড়ুয়ার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা যাবে না বলেও দাবি তাঁদের। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ্য নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। চতুর্থত, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের জন্য কোনো পড়ুয়াকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, এই দাবিগুলি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনশন এবং শান্তিপূর্ণ অবস্থান-বিক্ষোভ চলবে।
এ পরিস্থিতিতে প্রায় দুই দশক পর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় ছাত্র সংসদ নির্বাচন ফেরানোর সম্ভাবনা তৈরি হলেও, আন্দোলনের অবসান এখনো অধরা। এক দিকে নির্বাচনের আশ্বাস এবংশাস্তিমূলক পদক্ষেপ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে সংবিধান অনুমোদনের সময়সীমা, বহিষ্কার প্রত্যাহার, নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদত্যাগ এবং ক্ষমা চাওয়ার শর্ত নিয়ে বিরোধ — সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অচলাবস্থা বজায় রয়েছে। পড়ুয়াদের বক্তব্য, তাঁদের আন্দোলন ব্যক্তিগত দাবি আদায়ের লড়াই নয়; বরং ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক অধিকার ও নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিত্ব ফিরিয়ে আনার লড়াই। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট সময়সীমা আর লিখিত আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা পিছু হটবেন না। ফলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন ফেরানোর ঘোষণা সত্ত্বেও জামিয়ার আন্দোলন আপাতত থামছে না।
❤ Support Us






