- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- মে ১৮, ২০২৬
দেশজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের সতর্কতা, দিল্লিতে পারদ ছুঁতে পারে ৪৫ ডিগ্রি। বর্ষা ঢুকবে কবে ?
প্রবল গরমে হাঁসফাঁস করছে গোটা দেশ। উত্তর-পশ্চিম থেকে মধ্য ভারত— সর্বত্রই তাপমাত্রার পারদ দ্রুত চড়ছে উপরের দিকে। রাজধানী দিল্লির অবস্থা ভয়াবহ। অসহনীয় দাবদাহে নাজেহাল সাধারণ মানুষ। এরই মধ্যে স্বস্তির বদলে আরও উদ্বেগ বাড়াল ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (আইএমডি)। মৌসম ভবনের পূর্বাভাস বলছে, আগামী এক সপ্তাহে উত্তর ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে তাপপ্রবাহ আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে। রাজধানী দিল্লিতে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়ে ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতীয় আবহাওয়া দফতর।
আইএমডি জানিয়েছে, ১৮ মে থেকে ২৩ মে পর্যন্ত দিল্লি ও সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি তৈরি হতে চলেছে। দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৩ থেকে ৪৫ ডিগ্রির মধ্যে ঘোরাফেরা করতে পারে। কোথাও কোথাও তা স্বাভাবিকের তুলনায় ৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি থাকতে পারে বলেও জানানো হয়েছে। যদিও এখনো পর্যন্ত কোনো বিশেষ ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়নি, তবে আবহাওয়া দফতর স্পষ্ট জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে দিল্লি ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে তীব্র ‘লু’ বইতে পারে। ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে গরম ও শুষ্ক হাওয়া বইবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের বক্তব্য, মধ্য পাকিস্তান এবং রাজস্থান থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকের গরম ও শুষ্ক বাতাস ক্রমাগত উত্তর ভারতের দিকে ঢুকছে। সে কারণেই দ্রুত বাড়ছে তাপমাত্রা। তার উপর আকাশে মেঘ নেই, বজ্রঝড়েরও বিশেষ সম্ভাবনা নেই। ফলে সূর্যের তাপ সরাসরি ভূমিকে উত্তপ্ত করছে। সোমবার দিল্লির একাধিক এলাকায় তাপমাত্রা কার্যত ৪৫ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছেছে। মহারাষ্ট্রের নাগপুরে পারদ উঠেছে ৪৬ ডিগ্রিতে। আবহবিদদের আশঙ্কা, মধ্য ভারতের কিছু অংশে তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রির কাছাকাছিও পৌঁছতে পারে।
শুধু দিল্লি নয়, পঞ্জাব, হরিয়ানা, চণ্ডীগড় এবং রাজস্থানেও ১৮ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি হয়েছে। রাজস্থানে গত কয়েক দিন ধরেই অতি তীব্র গরম চলছে। আইএমডি জানিয়েছে, অন্তত ২৩ মে পর্যন্ত সেখানে পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতির সম্ভাবনা নেই। উত্তরপ্রদেশের একাধিক এলাকায় ১৯ মে থেকে লু-এর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রদেশ, বিদর্ভ, ছত্তিশগড় এবং তেলেঙ্গানাতেও তীব্র গরম বজায় থাকবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর। বিদর্ভ অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
আইএমডির সংজ্ঞা অনুযায়ী, সমতল এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে উঠে স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি থাকলে তাকে তাপপ্রবাহ বলা হয়। আর যখন তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রির গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়, তখন তা ‘সিভিয়ার হিটওয়েভ’ বা অতি তীব্র তাপপ্রবাহের পর্যায়ে পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, এ ধরনের আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে হিটস্ট্রোক, জলশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট এবং শারীরিক ক্লান্তির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। শিশু, প্রবীণ এবং যাঁরা খোলা আকাশের নীচে কাজ করেন, তাঁদের সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এই চরম গরমের মধ্যেই অবশ্য বর্ষা নিয়ে বড় আপডেট দিয়েছে মৌসম ভবন। শনিবার আইএমডি জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ইতিমধ্যেই দক্ষিণ-পূর্ব আরব সাগর, দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর, আন্দামান সাগর, সমগ্র নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কিছু অংশে প্রবেশ করেছে। আবহাওয়া দফতরের বক্তব্য, আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে মৌসুমি বায়ু দক্ষিণ-পূর্ব আরব সাগরের আরও কিছু অংশ, বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং আন্দামান সাগরের বাকি অংশে পৌঁছে যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর, এ বছর নির্ধারিত সময়ের আগেই কেরালায় বর্ষা প্রবেশ করতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে আইএমডি। সাধারণত জুনের প্রথম সপ্তাহে বর্ষা ঢোকে কেরালায়। কিন্তু এ বার ২৬ মে-র আশপাশেই দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু সেখানে পৌঁছে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। যদিও আবহাওয়াবিদরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কেরালায় বর্ষা আগেভাগে এলেই বাংলায় দ্রুত বর্ষা ঢুকে পড়বে, এমন ভাববার কোনো কারণ নেই। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের বক্তব্য, বাংলায় বর্ষা প্রবেশ নির্ভর করে উত্তর-পূর্ব ভারতের আবহাওয়া, বায়ুপ্রবাহ এবং মৌসুমি অক্ষরেখার অবস্থানের উপর। সাধারণত উত্তরবঙ্গে বর্ষা ঢোকে ৫ জুনের আশপাশে এবং দক্ষিণবঙ্গে বর্ষার প্রথম বৃষ্টি পৌঁছয় প্রায় ১০ জুন নাগাদ। ফলে কলকাতা বা দক্ষিণবঙ্গের দাবদাহ এখনই কমার সম্ভাবনা কম।
আলিপুর আবহাওয়া দফতর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে উত্তর বিহার থেকে দক্ষিণ অসম পর্যন্ত একটি পূর্ব-পশ্চিম অক্ষরেখা বিস্তৃত রয়েছে, যা গাঙ্গেয় বঙ্গের উত্তরাংশের উপর দিয়ে গিয়েছে। তার প্রভাবে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প স্থলভাগে ঢুকছে। সে কারণেই উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গের কিছু এলাকায় ঝড়বৃষ্টির অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের অসম ও মেঘালয়ে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। অরুণাচলপ্রদেশের কিছু অংশে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসও দিয়েছে আবহাওয়া দফতর। পাশাপাশি, দক্ষিণের তামিলনাড়ু, কেরলা, উপকূল কর্নাটক এবং দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি এলাকাতেও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কর্নাটকের কিছু অংশে শিলাবৃষ্টিও হতে পারে বলে পূর্বাভাস। ২২ মে নাগাদ কেরলা, কর্নাটক ও বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন এলাকায় মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।
তবে বর্ষার আগমনের সুখবরের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বৃষ্টির সম্ভাব্য ঘাটতির পূর্বাভাস। আইএমডি আগেই জানিয়েছিল, এবছর জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হয়ে ওঠা ‘এল নিনো’ পরিস্থিতির কারণেই মৌসুমি বায়ু দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তার প্রভাব পড়তে পারে কৃষিকাজ, জলভাণ্ডার এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও। পরিবেশবিদদের একাংশের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের জেরেই ভারতে তাপপ্রবাহের চরিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। গরমের মেয়াদ দীর্ঘ হচ্ছে, তাপমাত্রার চূড়ান্ত সীমাও প্রতি বছর ছুঁয়ে ফেলছে নতুন রেকর্ড। তারই মধ্যে আগেভাগে বর্ষার প্রবেশ এবং একই সঙ্গে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ— এই দুই বিপরীত আবহাওয়াই এ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
❤ Support Us





