- দে । শ বৈষয়িক
- মে ১৮, ২০২৬
কাঁচা পাটের তীব্র সঙ্কট, লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধিতে ধুঁকছে বাংলার পাটশিল্প ! সরকারের হস্তক্ষেপের দাবি শিল্পমহলের
হুগলির শিল্পাঞ্চলে আবারও নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার ছায়া। টিটাগড় থেকে জগদ্দল, হাজিনগর থেকে ভদ্রেশ্বর— কাঁচা পাটের অভাবে উৎপাদনের চাকা ঘোরাতে না পেরে গঙ্গার ধারে সারি সারি পুরনো পাটকল হয় আংশিক বন্ধ, নয়তো কার্যত ধুঁকছে। শ্রমিকেরা কাজ পাচ্ছেন অনিয়মিত, মালিকেরা ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে শিল্পমহলের শেষ ভরসা নতুন সরকার। সদ্য গঠিত বিজেপি সরকারের কাছে তাই সরাসরি আর্জি জানিয়েছে মিল মালিকরা, তাঁদের দাবি, সরকার দ্রুত হস্তক্ষেপ না করলে অচিরেই শেষ হয়ে যাবে বাংলার অন্যতম প্রাচীন শিল্প।
ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (আইজেএমএ)-এর সূত্রে জানা যাচ্ছে, হুগলি শিল্পাঞ্চলের অন্তত ১৪টি পাটকল ইতিমধ্যেই উৎপাদন বন্ধ রেখেছে অথবা মারাত্মক উৎপাদন সঙ্কটের মুখে পড়েছে। কাঁচা পাটের অভাব ও লাগামছাড়া দামের কারণে বহু কলেই নিয়মিত উৎপাদন অসম্ভব হয়ে উঠেছে। কোথাও শিফট কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও শ্রমিকদের বসিয়ে রাখা হচ্ছে, কোথাও আবার সপ্তাহের নির্দিষ্ট কয়েক দিন মাত্র উৎপাদন চলছে। শিল্পমহলের আশঙ্কা, দ্রুত পরিস্থিতি না বদলালে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। আইজেএমএ-র এক প্রাক্তন চেয়ারম্যান পিটিআই-কে দেওয়া বক্তব্যে পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘জুট ব্যালার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (জেবিএ)-এর শেষ নির্ধারিত দর ছিল প্রতি কুইন্টাল ১৭,১০০ টাকা। সে দরের পর থেকেই কার্যত বাজারে স্বাভাবিক বাণিজ্য থমকে যায়। নতুন ফসল বাজারে আসতে এখনো প্রায় দশ সপ্তাহ সময় বাকি। এই দীর্ঘ ব্যবধানের মধ্যে কাঁচা পাটের জোগান না থাকায় মিলগুলোকে কার্যত কাঁচামাল ছাড়াই উৎপাদন চালিয়ে যেতে বলা হচ্ছে, যা বাস্তবের নিরিখে অসম্ভব।
মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কাও শিল্পকে আরও বিপর্যস্ত করেছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি যেখানে কাঁচা পাটের দাম ছিল প্রতি কুইন্টাল ১১,৬০০ টাকা, তা মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বেড়ে ৬ মে নাগাদ পৌঁছে যায় ১৭,১০০ টাকায়। এই অস্বাভাবিক লাফ ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) ৫,৬৫০ টাকার প্রায় তিন গুণেরও বেশি। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বহু মিলের পক্ষেই ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া আর লাভজনক থাকছে না। এরই মধ্যে জুট কমিশনারের দফতর থেকে ব্যবসায়ী ও বেলারদের ‘জিরো স্টক’ বজায় রাখার নির্দেশ কার্যকর হয় ৫ মে থেকে। উদ্দেশ্য ছিল বাজারে মজুত কাঁচা পাট ফিরিয়ে এনে সরবরাহ স্বাভাবিক করা। কিন্তু শিল্পমহলের একাংশের দাবি, এ পদক্ষেপ বাস্তবে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ এর ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল আরও ভেঙে পড়ে এবং বাজারে কাঁচা পাটের প্রাপ্যতা আরও কমে যায়।
পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে ৭ মে থেকে ‘জেবিএ’ বাজার দর প্রকাশ বন্ধ করে দেয়। ফলে বাজারে কোনো সরকারি বা বাণিজ্যিক ‘রেফারেন্স প্রাইস’ আর থাকছে না। শিল্পমহলের অভিযোগ, মূল্য নির্ধারণের কোনো স্বচ্ছ সূচক না থাকায় ক্রয়-বিক্রয় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। কাঁচা পাটের প্রকৃত দাম বোঝা যাচ্ছে না, ভবিষ্যৎ ক্রয় পরিকল্পনাও ভেঙে পড়ছে। জুট কমিশনারের নির্দেশ এবং বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় বস্ত্রসচিবের কাছে পাঠানো এক প্রতিনিধিত্বপত্রে ‘জেবিএ’ জানিয়েছে, বাজারে এখন ‘চরম অনিশ্চয়তা’ তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, সরকারি বেঞ্চমার্ক বা নির্ধারিত মূল্য না থাকায় মিলগুলো কাঁচামালের খরচ নির্ধারণ করতে পারছে না, পাশাপাশি পর্যাপ্ত জোগানও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
শিল্প সংগঠনগুলির অভিযোগ, এ সংকট শুধুমাত্র মৌসুমি ঘাটতির ফল নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা জল্পনাভিত্তিক মজুতদারি, বিকৃত বাজারব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার ফলেই পরিস্থিতি আজকের এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাজারে অবশিষ্ট কাঁচা পাটের পরিমাণও অত্যন্ত সীমিত— আনুমানিক মাত্র ২ থেকে ৩ লক্ষ বেল। ফলে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বিশাল ফারাক তৈরি হয়েছে। আর এ সংকটের সবচেয়ে বড়ো আঘাত নেমেছে শ্রমিকদের উপর। শিল্পমহলের হিসাব অনুযায়ী, উত্তর ২৪ পরগনা, হুগলি এবং সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে ইতিমধ্যেই প্রায় ৭৫ হাজার শ্রমিক ‘অনিচ্ছাকৃত বেকারত্ব’-এর মুখে পড়েছেন। সামগ্রিকভাবে প্রায় দুই লক্ষ শ্রমিক এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। কিন্তু উৎপাদন কমে যাওয়ায় তাঁদের রোজগার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাটকল মালিকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে ক্ষোভ ও অসহায়তা— বছরের পর বছর মজুতদারি এবং অস্বাভাবিক দামের কারণে আজ কাঁচামাল কেনাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শিল্পমহল দ্রুত স্বস্তি প্রত্যাশা করলেও, রাজ্যসরকারের তরফে এ পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা যায় নি। বাজারে ‘জিরো স্টক’ নির্দেশকে ঘিরেও তৈরি হয়েছে দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়া। একাংশ মনে করছে, এটি মজুতদারি ভাঙার উদ্যোগ হলেও বাস্তবে সরবরাহ ব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সরবরাহকারীরা বাড়তি খরচ, বকেয়া এবং কঠোর স্টক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আটকে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা যাচ্ছে, উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি নিয়ন্ত্রিত বি-টুয়েল বস্তার দাম কাঠামো। কাঁচা পাটের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সেই দাম তাল মেলাতে না পারায় উৎপাদন ক্রমশ অলাভজনক হয়ে উঠছে। ফলে বহু মিল শিফট কমাতে বাধ্য হয়েছে, কোথাও কোথাও আংশিক বন্ধের সিদ্ধান্তও নেওয়া হচ্ছে। সময়ের দিক থেকেও সংকট অত্যন্ত জটিল। জুট কমিশনারের বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ ৩০ জুন পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। নতুন পাটবর্ষ শুরু হবে ১ জুলাই থেকে। কিন্তু নতুন ফসল বাজারে আসতে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। অর্থাৎ মাঝের এই এক মাসের সরবরাহ ঘাটতি বহু মিলের টিকে থাকার ক্ষমতাকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
এ পরিস্থিতিতে শিল্পমহল সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছে নতুন বিজেপি সরকারের কাছে। তাঁদের আর্জি, অবশিষ্ট কাঁচা পাট অবিলম্বে বাজারে ছাড়া, বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞায় শিথিলতা আনা এবং প্রয়োজনে বাংলাদেশ থেকে জরুরি ভিত্তিতে কাঁচা পাট আমদানির অনুমতি দেওয়া হোক। পাশাপাশি একটি স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ মূল্যনীতি প্রণয়নের দাবি জোরালো হয়েছে। আইজেএমএ-র প্রাক্তন চেয়ারম্যান সঞ্জয় কাজারিয়ার বক্তব্যে উঠে এসেছে শিল্পের প্রত্যাশা— নীতিগত স্থিতিশীলতা, নিয়মিত সংলাপ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। তাঁর মতে, বিজেপির ‘সঙ্কল্প পত্র’-এ যেহেতু শিল্প পুনরুজ্জীবনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তাই এখন তার বাস্তব রূপায়ণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
❤ Support Us





