- এই মুহূর্তে দে । শ
- মে ১৮, ২০২৬
দশ বছর পর কেরালায় ইউডিএফের প্রত্যাবর্তন, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ সতীশনের। পাশে থাকার বার্তা প্রধানমন্ত্রীর
দশ বছরের বাম জমানার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে কেরালায় ক্ষমতায় ফিরেছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ)। আর সেই প্রত্যাবর্তনের রাজনৈতিক আবেগ, দীর্ঘ টানাপড়েন, দলীয় দরকষাকষি এবং ক্ষমতার সমীকরণের আবহের মধ্যেই সোমবার কেরালার ১৩তম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ভি ডি সতীশন। সোমাবার, তিরুবনন্তপুরমের সেন্ট্রাল স্টেডিয়ামে আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আর্লেকর তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান। তাঁর সঙ্গে শপথ নেন ২০ জন মন্ত্রীও।
শুধু কেরালা নয়, এ দিনের অনুষ্ঠান ঘিরে নজর ছিল জাতীয় রাজনীতিরও। সামনের সারিতে বসেছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। উপস্থিত ছিলেন কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া, তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী এ. রেভান্থ রেড্ডি, হিমাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সুখবিন্দর সিং সুখু এবং কর্নাটকের উপমুখ্যমন্ত্রী ডি. কে. শিবকুমার। অন্য দিকে, সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন–সহ বাম নেতৃত্ব এবং বিজেপি প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
এদিন, রাজধানী তিরুবনন্তপুরমে সকাল থেকেই ছিল উৎসবের আবহ। কেরলার বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার কংগ্রেস কর্মী ও সমর্থক এসে জড়ো হন শহরে। সাদা খদ্দরের পোশাক, ইউডিএফের পতাকা, ঢাক-ঢোল আর স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে সেন্ট্রাল স্টেডিয়াম চত্বর। সতীশন যখন শপথ নিতে ওঠেন, তখন উল্লাসে ফেটে পড়ে জনতা। কংগ্রেস কর্মীদের একাংশের মতে, টানা দু–বার পরাজয়ের পর এ জয় শুধুমাত্র সরকার পরিবর্তন নয়, দলের জন্য এক রাজনৈতিক পুনর্জন্ম। তবে সতীশনের শপথ গ্রহণের পিছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর প্রায় ১০ দিন ধরে চলেছে জল্পনা, আলোচনা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং নেতৃত্ব নিয়ে চাপানউতোর। মুখ্যমন্ত্রী পদে একাধিক নাম ঘোরাফেরা করছিল। প্রবীণ নেতা রমেশ চেনিথাল্লা-র নামও উঠে এসেছিল জোরালো ভাবে। শেষ পর্যন্ত ১৪ মে কংগ্রেস হাইকমান্ড আনুষ্ঠানিক ভাবে সতীশনের নাম ঘোষণা করে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সংগঠনের নিচুতলার কর্মীদের বড়ো অংশ সতীশনকেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে চাইছিলেন। বিরোধী দলনেতা হিসেবে গত কয়েক বছরে তাঁর ধারাবাহিক আক্রমণাত্মক ভূমিকা, বিধানসভায় তথ্যনির্ভর বক্তব্য এবং তরুণ ভোটারদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতাই শেষ পর্যন্ত তাঁর পক্ষে গিয়েছে।
সতীশনের শপথ গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শুভেচ্ছা জানান কেরালার নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘কেরালায়মের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করায় শ্রী ভিডি সতীশনজিকে অভিনন্দন। তাঁর কার্যকালের জন্য শুভেচ্ছা রইল। জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে নবগঠিত রাজ্য সরকারকে কেন্দ্র সব রকম সহায়তা করবে।’ রাজনৈতিক মহলের মতে, দক্ষিণের এই গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে নতুন সরকারের প্রতি কেন্দ্রের এই বার্তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৪০ আসনের কেরল বিধানসভায় এ বার ইউডিএফ পেয়েছে ১০২টি আসন। এলডিএফ থেমে গিয়েছে ৩৫-এ। বিজেপি পেয়েছে ৩টি আসন। ৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণের পর ৪ মে ফল প্রকাশ হয়। ফল ঘোষণার পর থেকেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, দশ বছরের বাম শাসনের বিরুদ্ধে প্রবল জনরায় তৈরি হয়েছে। বেকারত্ব, প্রশাসনিক দুর্নীতি, আর্থিক সঙ্কট এবং সরকার-বিরোধী ক্ষোভকে সামনে রেখেই নির্বাচনী লড়াই চালিয়েছিল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট।
তবে সরকার গঠনের আগেই ইউডিএফের অন্দরে শুরু হয়ে যায় নতুন বিতর্ক। জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ বা আইইউএমএলের প্রভাব নিয়ে কংগ্রেসের অন্দরেই চাপা অসন্তোষ তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, মন্ত্রিসভা গঠন থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত— বহু ক্ষেত্রেই নাকি মুসলিম লিগের মতামতই শেষ কথা হয়ে উঠছে। কংগ্রেসের একাংশের নেতাদের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, জোট রাজনীতির চাপে কি অতিরিক্ত ছাড় দিচ্ছে হাত শিবির? এ আবহে নতুন মন্ত্রিসভায় মুসলিম লিগের পাঁচ নেতাকে জায়গা দেওয়া হয়েছে। পি. কে. কুনহালিকুট্টির নেতৃত্বে আইইউএমএল যে এই সরকারের অন্যতম শক্তিশালী অংশীদার, তা স্পষ্ট।
এদিন ২০ জন মন্ত্রী শপথ নিলেও, কোন মন্ত্রী কোন দপ্তর পাবেন, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা তখনো প্রকাশ হয়নি। প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী সতীশনের হাতেই থাকতে পারে অর্থ ও বন্দর দপ্তর। অন্য দিকে স্বরাষ্ট্র দপ্তর পেতে পারেন রমেশ চেনিথাল্লা। নতুন মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ এবং নবীন— দুই প্রজন্মের মিশ্রণ রাখার চেষ্টা করেছে কংগ্রেস। ২১ সদস্যের মন্ত্রিসভার মধ্যে ১৪ জনই প্রথম বার মন্ত্রী হয়েছেন। একদিকে যেমন রয়েছেন কে মুরলীধরন, সানি জোসেফ, এ. পি. অনিল কুমার–এর মতো প্রবীণ মুখ। আবার তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন পি. সি. বিষ্ণুনাধ, রোজি এম. জন, টি. সিদ্দিক, এম. লিজু এবং সবচেয়ে কমবয়সি মন্ত্রী ও. জে. জনীশ। বিন্দু কৃষ্ণা এবং কে. এ. তুলসীর মতো মহিলা মুখও রয়েছে মন্ত্রিসভায়।
শপথের দিনে প্রশাসনিক বার্তা দিতেও ভোলেননি মুখ্যমন্ত্রী সতীশন। সচিবালয়ে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই মহিলাদের জন্য কেএসআরটিসি বাসে বিনামূল্যে যাত্রা এবং আশা কর্মীদের সম্মানী ৩ হাজার টাকা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বর্তমানে আশা কর্মীরা মাসে ৯ হাজার টাকা পান। তা বেড়ে হচ্ছে ১২ হাজার। আগামী ১৫ জুন থেকে মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে বাস পরিষেবা চালুর কথাও ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের প্রতিশ্রুতি দ্রুত কার্যকর করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছে নতুন সরকার।
কেরালার রাজনীতিতে সতীশনের উত্থানকে অনেকেই ‘প্রজন্ম পরিবর্তনের মুহূর্ত’ বলছেন। দীর্ঘ দিন ধরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জর্জরিত কেরল কংগ্রেসকে একত্রিত করা, এলডিএফের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আক্রমণ শানানো এবং তরুণ ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য মুখ হয়ে ওঠা— এই তিনের সমন্বয়েই শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে পৌঁছেছেন তিনি। এখন দেখার, বিপুল প্রত্যাশা, জোটের অভ্যন্তরীণ চাপ এবং বিরোধীদের আক্রমণের মধ্যে দাঁড়িয়ে কতটা দক্ষতার সঙ্গে সরকার চালাতে পারেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী।
❤ Support Us







