- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ১, ২০২৬
চিন-নির্ভরতা কাটাতে কেন্দ্রীয় নীতিতে বদল, ১ জুন থেকে সৌরপ্রকল্পে দেশীয় সেলের ব্যবহার বাধ্যতামূলক। বাড়তে পারে খরচ ?
দেশের জ্বালানি ক্ষেত্রে অন্য দেশের অধিপত্য কমিয়ে, আত্মনির্ভরতার আরও জোর দিতে চায় কেন্দ্র কেন্দ্র। এ প্রেক্ষিতেই ১ জুন থেকে কার্যকর হলো সৌরশক্তি সংক্রান্ত নতুন নিয়ম। এর ফলে ‘নেট-মিটারিং’ ও ‘ওপেন অ্যাক্সেস’ ব্যবস্থার আওতায় থাকা সমস্ত নতুন সৌর প্রকল্পে শুধুমাত্র দেশীয়ভাবে উৎপাদিত সৌর সেল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সরকারের দাবি, এ সিদ্ধান্ত ভারতের সৌর উৎপাদন শিল্পকে শক্তিশালী করবে এবং চিন-সহ বিদেশি আমদানির উপর নির্ভরতা কমাবে। তবে শিল্পমহলের একাংশের আশঙ্কা, নয়া নীতির জেরে বাড়তে পারে সৌর প্যানেল বসানোর খরচ, তৈরি হতে পারে সরবরাহ-সংকট, চাপে পড়তে পারেন ছোটো ও মাঝারি নির্মাতারা।
কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত এমন সময়ে কার্যকর করা হলো, যখন দেশে ছাদভিত্তিক সৌরশক্তি প্রকল্প দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ‘পিএম সূর্য ঘর: মুফ্ত বিজলি যোজনা’-র মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ পরিবার সৌরশক্তির আওতায় আসছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন নিয়মের প্রভাব নিয়ে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। সাধারণত সৌর প্যানেল তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় পলিসিলিকন দিয়ে। সেখান থেকে তৈরি হয় ইনগট, তারপর ওয়েফার। ওই ওয়েফার থেকেই তৈরি হয় সৌর সেল, যা সূর্যের আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে। একাধিক সেল একত্রিত করে তৈরি হয় সৌর মডিউল বা প্যানেল। এত দিন পর্যন্ত ভারতে সৌর প্রকল্পে দেশীয়ভাবে তৈরি মডিউল ব্যবহার বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু মডিউলের ভিতরে থাকা সেল বিদেশ থেকে আমদানি করা যেত। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে সেলও সরকার অনুমোদিত ভারতীয় নির্মাতাদের কাছ থেকেই সংগ্রহ করতে হবে। ‘অ্যাপ্রুভড লিস্ট অব মডেলস অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স’ (এএলএমএম) তালিকার অন্তর্ভুক্ত সংস্থাগুলির উৎপাদিত দ্রব্যই ব্যবহার করা যাবে।
এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে ‘নেট-মিটারিং প্রকল্প’-এর ক্ষেত্রে, অর্থাৎ ছাদের সৌর প্যানেল প্রকল্পে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ও শিল্প সংস্থার ‘ওপেন-অ্যাক্সেস’ সৌর প্রকল্পগুলিও এর আওতায় পড়বে। যদিও শিল্পমহলের তরফে সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন জানানো হয়েছিল, কেন্দ্র স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে কোনো সামগ্রিক ছাড় দেওয়া হবে না। তবে যে সব প্রকল্পে ইতিমধ্যেই জমি অধিগ্রহণ, গ্রিড সংযোগ বা মডিউল বসানোর কাজ অনেকটা এগিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পৃথকভাবে আবেদন বিবেচনা করা হতে পারে। কেন্দ্রের যুক্তি, ভারতের সৌর মডিউল উৎপাদন ক্ষমতা এখন বছরে প্রায় ২০০ গিগাওয়াট। কিন্তু সৌর সেল উৎপাদন ক্ষমতা এখনও মাত্র ৩০ গিগাওয়াটের আশপাশে। ফলে দেশে তৈরি বহু মডিউলই আসলে চিন থেকে আমদানি করা সেলের উপর নির্ভরশীল। সরকারের মতে, এ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই দেশীয় সেল উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ দেশীয় উৎপাদন শৃঙ্খল গড়ে তুলতেই এই নীতিগত পরিবর্তন।
কেন্দ্রের নতুন নিয়মের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ গ্রাহকদের উপর। শিল্পমহলের হিসাব অনুযায়ী, দেশীয়ভাবে উৎপাদিত সেলের দাম আমদানিকৃত সেলের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ছাদভিত্তিক সৌর প্রকল্পের খরচ প্রতি কিলোওয়াটে প্রায় ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, একটি সাধারণ ৫ কিলোওয়াটের সৌর প্রকল্প স্থাপনে অতিরিক্ত প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। যদি দেশীয় সেলের সরবরাহ চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, তবে এ খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও সরকারের দাবি, ‘পিএম সূর্য ঘর’ প্রকল্পের আওতায় ভর্তুকি চালু থাকবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের কারণে সৌরশক্তি এখনো লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবেই থাকবে।
যদিও ওয়াকিবহাল মহলের মতে, নয়া নীতিতে সমস্যার মূল কারণ চাহিদা ও উৎপাদনের ফারাক। বর্তমানে দেশে সৌর সেলের উৎপাদন ক্ষমতা ২৫-৩০ গিগাওয়াটের মধ্যে, অথচ বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫০ গিগাওয়াট। এত দিন দেশের প্রয়োজনের ৯০ শতাংশেরও বেশি সেল আমদানি করে মেটানো হতো। নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার ফলে সে পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছোটো ও মাঝারি মডিউল নির্মাতারা। কারণ তাঁদের অধিকাংশেরই নিজস্ব সেল উৎপাদনের ব্যবস্থা নেই। ফলে এখন তাঁদের সেল কিনতে হবে সেসব বডড়ো সংস্থাগুলির কাছ থেকে, যারা নিজেরাও মডিউল বাজারে প্রতিযোগী। শিল্পমহলের অভিযোগ, এতে বাজারে অসম প্রতিযোগিতার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সীমিত সরবরাহের সুযোগে বৃহৎ সংস্থাগুলি মূল্য নির্ধারণে বাড়তি সুবিধা পাবে। রাজস্থান সোলার অ্যাসোসিয়েশনের সিইও নীতিন আগরওয়ালের দাবি, ‘চার-পাঁচটি বড়ো সংস্থা বাদ দিলে ১২৫টিরও বেশি মডিউল নির্মাতা এবং ৫০০-রও বেশি সহযোগী শিল্প এ নীতির চাপে পড়তে পারে।’
শিল্পমহলের একাংশ মনে করছে, নতুন নীতির ফলে বাজারে এক ধরনের পুনর্বিন্যাস ঘটতে পারে। যে সব সংস্থা সেল এবং মডিউল; দুটিই তৈরি করে, তারা বাড়তি সুবিধা পাবে। অন্যদিকে, শুধুমাত্র মডিউল উৎপাদনকারী সংস্থাগুলির পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ইতিমধ্যেই মার্কিন শুল্কনীতি এবং বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার ফলে বহু ভারতীয় নির্মাতা সমস্যায় রয়েছেন। তবে সব শিল্পপতি যে নয়া নীতির বিরোধিতা করছেন, তাও নয়। দেশের কয়েকটি বড়ো সৌর উৎপাদনকারী সংস্থার মতে, এ উদ্বেগ অনেকটাই অতিরঞ্জিত। তাঁদের যুক্তি, ৩১ অগস্ট ২০২৫-এর আগে নিলাম হওয়া বৃহৎ সৌর প্রকল্পগুলিকে দেশীয় সেল ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। ফলে দেশীয় সেলের উপর হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে না। তাঁদের দাবি, আগামী এক বছরের মধ্যেই দেশে নতুন সেল উৎপাদন ইউনিট চালু হবে এবং উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। শিল্পকর্তারা বলছেন, যদি দেশীয় উৎপাদনকে রক্ষা করতেই হয়, তবে কোনো না কোনো সময় সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। দীর্ঘমেয়াদে কেন্দ্রের এ নীতি ভারতের সৌর শিল্পকে শক্তিশালী করবে।
এদিকে, কেন্দ্র জানিয়েছে, ‘পিএম সূর্য ঘর: মুফ্ত বিজলি যোজনা’-র আওতায় ইতিমধ্যেই ৪০ লক্ষেরও বেশি পরিবার সুবিধা পেয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ২২,৪৪৬ কোটি টাকার ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি প্রকল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনও আনা হয়েছে। আগে ভর্তুকি আবেদনকারীর নামে নির্ধারিত হতো। এখন থেকে তা বিদ্যুৎ সংযোগ নম্বরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ফলে কোনো পরিবারের একাধিক বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলে প্রতিটি সংযোগের জন্য পৃথক ভর্তুকি পাওয়া যাবে। সরকারের লক্ষ্য, ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে দেশের এক কোটি পরিবারকে সৌরশক্তির আওতায় আনা। ইতিমধ্যেই ৬৮ লক্ষের বেশি আবেদন জমা পড়েছে এবং ৪০ লক্ষেরও বেশি পরিবার এই প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছে। কেন্দ্রের দাবি, সৌরশক্তির প্রসার শুধু বিদ্যুৎ বিল কমাবে না, বরং কর্মসংস্থান, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। তবে নতুন সৌর সেল নীতির বাস্তব প্রভাব কতটা ইতিবাচক হয় এবং শিল্পমহলের আশঙ্কা কতটা সত্যি প্রমাণিত হয়, এখন সে দিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।
❤ Support Us








