Advertisement
  • বি। দে । শ
  • ডিসেম্বর ১৬, ২০২৫

কারারুদ্ধ পড়শির প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, আজীবন দায়মুক্ত সেনাপ্রধান ! পাক গণতন্ত্র নিয়ে জাতিসংঘে প্র‌শ্ন ভারতের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
কারারুদ্ধ পড়শির প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, আজীবন দায়মুক্ত সেনাপ্রধান ! পাক গণতন্ত্র নিয়ে জাতিসংঘে প্র‌শ্ন ভারতের

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মঞ্চে ফের মুখোমুখি ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সঙ্কট, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ এবং জম্মু–কাশ্মীর প্রসঙ্গে ইসলামাবাদের দাবিকে একসুতোয় বেঁধে কড়া ভাষায় আক্রমণ করল ভারত। মঙ্গলবার ‘শান্তির জন্য নেতৃত্ব’ শীর্ষক নিরাপত্তা পরিষদের উন্মুক্ত বিতর্কে নয়াদিল্লির বার্তা ছিল স্পষ্ট, নিজের দেশে গণতন্ত্রকে বন্দি করে রাখা কোনো রাষ্ট্র শান্তি, স্থিতি কিংবা নৈতিকতার পাঠ দিতে পারে না।

জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত হরিশ পারভাথানেনি  শুরু থেকেই পাকিস্তানের বক্তব্যকে ‘অযাচিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে চিহ্নিত করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও অখণ্ড অংশ। এই অঞ্চলগুলি অতীতেও ভারতের ছিল, বর্তমানেও রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও ভারতেরই অংশ হয়ে থাকবে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, আন্তর্জাতিক মঞ্চে কাশ্মীর প্রশ্ন তুলে পাকিস্তান আসলে ভারতের সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কার্যত ‘সাংবিধানিক বিপর্যয়’ বলে আখ্যা দেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কারাবাস, তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) নিষিদ্ধ করা এবং ২৭তম সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান জনগণের রায়কে সম্মান করার এক অভিনব পথ বেছে নিয়েছে, একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে জেলে পাঠিয়ে, শাসক দলকে নিষিদ্ধ করে এবং সেনাবাহিনীকে সাংবিধানিক অভ্যুত্থানের সুযোগ দিয়ে।’

পারভাথানেনির বক্তব্যে উঠে আসে, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে দুর্নীতির একটি মামলায় কারাবন্দি ইমরান খান। পাশাপাশি ৯ মে-র বিক্ষোভ ঘিরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চলছে। ভারতের রাষ্ট্রদূত স্মরণ করিয়ে দেন, আদিয়ালা জেলে ইমরান খানের সঙ্গে অমানবিক আচরণ নিয়ে জাতিসংঘের নির্যাতন বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদনকারী অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডস উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘যেখানে রাজনৈতিক বিরোধীদের জেলে পুরে রাখা হয়, সেখানে গণতন্ত্রের পাঠ দেওয়া নেহাতই ভণ্ডামি।’ তাঁর মতে, ২৭তম সংশোধনীর মাধ্যমে পাকিস্তানের চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস আসিম মুনিরকে আজীবন দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল পড়শি দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করেনি, বিচারব্যবস্থার উপরেও সেনাবাহিনীর প্রভাব পাকাপোক্ত করেছে। ‘এমন রাষ্ট্র শান্তি ও ন্যায়বিচারের কথা বললে তা হাস্যকর শোনায়।’ মন্তব্য পারভাথানেনির।

জম্মু–কাশ্মীর প্রসঙ্গে পাকিস্তানের বক্তব্যকে ‘অযাচিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উড়িয়ে দেন দিল্লির প্রতিনিধি। রাষ্ট্রদূত স্পষ্ট করে বলেন, ‘জম্মু–কাশ্মীর এবং লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও অখণ্ড অংশ। ছিল, আছে এবং থাকবে।’ তাঁর অভিযোগ, প্রতিটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে কাশ্মীর প্রসঙ্গ টেনে এনে পাকিস্তান আসলে ভারতের ক্ষতি করার প্রতি নিজের ‘অবসেসিভ মনোভাব’ই প্রকাশ করছে। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘যে দেশ প্রতিটি বৈঠকে বিভাজনমূলক উদ্দেশ্য নিয়ে আসে, সে কি সত্যিই নিরাপত্তা পরিষদের দায়িত্বশীল সদস্য হতে পারে?’ পাকিস্তানকে সরাসরি ‘সন্ত্রাসবাদের বৈশ্বিক কেন্দ্র’ আখ্যা দিয়ে ভারত সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের যুক্তি তুলে ধরে। পারভাথানেনির বক্তব্য, ৬৫ বছর আগে সদিচ্ছা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে চুক্তি হলেও, এই সময়ে পাকিস্তান তিনটি যুদ্ধ ও হাজার হাজার জঙ্গি হামলার মাধ্যমে সে বিশ্বাস ভেঙেছে। তিনি ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে জম্মু–কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ২৬ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। তিনি জানান, ‘এ প্রেক্ষিতেই ভারত জানিয়েছে, পাকিস্তান বিশ্বাসযোগ্য ও স্থায়ীভাবে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে মদত বন্ধ না করা পর্যন্ত সিন্ধু জলচুক্তি কার্যত স্থগিত থাকবে।’

পাকিস্তান প্রসঙ্গের বাইরে গিয়েও ভারত এদিন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত সংস্কারের জোরালো দাবি তোলে। রাষ্ট্রদূত পারভাথানেনি বলেন, আট দশক পুরনো এই কাঠামো আজকের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে বেমানান। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘যদি ব্যবস্থাই থাকে প্রাচীন যুগের, আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য ভবিষ্যৎ কীভাবে গড়ব!’ ভারতের দাবি, নিরাপত্তা পরিষদে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, স্বচ্ছ ও কার্যকর কাঠামো গড়ে তুলতে সময়সীমাবদ্ধ ও লিখিত আলোচনার পথে হাঁটতে হবে। ভারতের বক্তব্যের শেষ পর্বে ছিল স্পষ্ট হুঁশিয়ারি। হরিশ পারভাথানেনি দৃঢ় ভাষায় বলেন, পাকিস্তান-সমর্থিত সন্ত্রাসবাদের কোনো রূপ বা প্রকাশকে ভারত আর বরদাস্ত করবে না। দেশের নিরাপত্তা ও নাগরিকদের সুরক্ষার প্রশ্নে ভারত তার সমস্ত শক্তি নিয়োগ করে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

ভারতের একাধিক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন আর অভিযোগের জবাবে পাকিস্তানের প্রতিনিধি আসিম ইফতিখার আহমেদ বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায় পাকিস্তান, তবে শান্তি একতরফা হতে পারে না। কাশ্মীরকে ‘অমীমাংসিত বিরোধ’ বলে উল্লেখ করেন এবং সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে আখ্যা দেন। পাকিস্তানের দাবি ছিল, কাশ্মীর সমস্যার ন্যায্য সমাধান ভারত দীর্ঘদিন ধরেই অস্বীকার করে আসছে। তবে ভারতের তরফে এই সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে খারিজ করে দেওয়া হয়। দিল্লির কড়া বার্তা, সন্ত্রাসবাদে মদত বন্ধ না হলে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানের বক্তব্যের জবাব একই ভাষাতেই দেওয়া হবে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!