- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬
পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা ফেরাতে প্রস্তাব পাশ জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভায়, বিক্ষোভ-ওয়াকআউট বিজেপির
জম্মু-কাশ্মীরের পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি উঠল বিধানসভায়। সোমবার বিজেপি বিধায়কদের তুমুল বিক্ষোভ এবং ওয়াকআউটের মধ্যেই কেন্দ্রের কাছে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা অবিলম্বে পুনরুদ্ধারের আর্জি জানিয়ে প্রস্তাব পাশ করল জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভা। ধ্বনিভোটে প্রস্তাবটি পাশ হয়। ভোটাভুটির সময় বিজেপি বিধায়কেরা অধিবেশন কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ায় প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কোনো ভোট পড়েনি।
মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ্র আনা প্রস্তাবটি নিয়ে এ দিন শুরু থেকেই উত্তপ্ত ছিল জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভার পরিবেশ। অধিবেশনের শুরুতে বিজেপি বিধায়কেরা স্পিকার আবদুল রহিম রাথারের বিরুদ্ধে সরব হন। স্লোগান দিতে দিতে বিধানসভার ওয়েলে নেমে পড়েন তাঁরা। স্পিকারের পদত্যাগের দাবিও তোলেন বিজেপি বিধায়কেরা। বিজেপির দাবি, ২৩ জন বিধায়ক স্পিকারের বিরুদ্ধে প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেছেন। অন্য কোনো কাজ শুরু করার আগে সে প্রস্তাব গ্রহণ করে ভোটাভুটি করতে হবে। তবে রাথার জানান, তিনি এমন কোনো প্রস্তাব এখনো দেখেননি। বিধানসভার কার্যপ্রণালীর নিয়ম উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্পিকারের বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাবের লিখিত নোটিস জমা পড়লেও সেটিকে কার্যতালিকায় তোলার আগে অন্তত ১৪ দিন সময় দিতে হয়।
এর পরেই মূল প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এ প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০০০ সালের ২৬ জুন এবং ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বর জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভায় পাশ হওয়া আগের দুটি প্রস্তাবের পাশাপাশি এ বার কেন্দ্রীয় সরকারকে জম্মু-কাশ্মীরের পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা ‘অবিলম্বে এবং জরুরি ভিত্তিতে’ পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রস্তাবটি ভারত সরকারের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার বিধানসভায় প্রস্তাবটি পেশ করেছিলেন ওমর আবদুল্লাহ্। তার পরেই তা নিয়ে শুরু হয় রাজনৈতিক চাপানউতোর। বিধায়কদের একাংশ প্রস্তাবে ৩৭০ এবং ৩৫এ অনুচ্ছেদের উল্লেখ রাখার দাবিতে সংশোধনী আনেন। মোট ১০টি সংশোধনী আনা হয়েছিল। তার মধ্যে আটটিতে ২০১৯ সালের আগস্টের আগে জম্মু-কাশ্মীরের যে বিশেষ মর্যাদা ছিল, তা পুনরুদ্ধারের প্রসঙ্গ যুক্ত করার দাবি জানানো হয়। পরে স্পিকারের আবেদনে সেই সংশোধনীগুলি প্রত্যাহার করে নেন সংশ্লিষ্ট বিধায়কেরা।
বিতর্কে অংশ নিয়ে ওমর বলেন, বিজেপি প্রথম থেকেই এই প্রস্তাবকে ৩৭০, ৩৫এ এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবির সঙ্গে জুড়ে দেখানোর চেষ্টা করছে। তাঁর কথায়, ‘শুক্রবার থেকেই বলা হচ্ছে, আমরা স্বায়ত্তশাসন এবং ৩৭০ অনুচ্ছেদের দাবি করছি। সবাই প্রস্তাবটি পড়েছেন। কোথায় আমরা স্বায়ত্তশাসন, ৩৭০, ৩৫এ বা বিশেষ মর্যাদার জন্য ভোট চেয়েছি? আমরা রাজ্যের মর্যাদা ফেরানোর জন্য ভোট চাইছি।’ ওমরের বক্তব্য, প্রস্তাবে ওই বিষয়গুলি যুক্ত হলে বিজেপি তার বিরোধিতা করার ‘অজুহাত’ পেয়ে যাবে। তিনি বলেন, ‘আমার কয়েক জন বন্ধু তাঁদের ফাঁদে পড়ে সংশোধনী এনেছিলেন। আমরা যদি এই সংশোধনীগুলি প্রস্তাবে যুক্ত করি, তা হলে বিজেপিকে এর বিরোধিতা করার সুযোগ করে দেওয়া হবে।’
জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা নিয়ে এর আগে বিধানসভায় দুবার প্রস্তাব পাশ হয়েছে বলেও মনে করিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। ২০০০ সালে স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত এবং ২০২৪ সালের নভেম্বরে বিশেষ মর্যাদা সংক্রান্ত প্রস্তাব পাশের কথা উল্লেখ করে ওমর বলেন, এ বারের প্রস্তাবের বিষয় একেবারেই আলাদা — রাজ্যের মর্যাদা পুনরুদ্ধার। কেন এখন এ প্রস্তাব? সেই প্রশ্নেরও জবাব দেন ওমর। তাঁর বক্তব্য, বিধানসভা নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরেও প্রায় দু-বছর কেটে গিয়েছে। অথচ জম্মু-কাশ্মীরকে কবে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে, তা নিয়ে কেন্দ্রের তরফে কোনও স্পষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রসঙ্গ তুলে ওমর বলেন, বিধানসভা নির্বাচন শেষ হওয়ার পরে ‘যত দ্রুত সম্ভব’ জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তাঁর প্রশ্ন, ‘ইংরেজিতে ‘যত দ্রুত সম্ভব’ বলতে কি দু’বছর বোঝায়? দু-বছর পেরিয়ে গেলেও রাজ্যের মর্যাদা ফেরানোর বিষয়ে কোনো স্পষ্টতা নেই।’
এখানেই থামেননি মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ্। রাজ্যের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের সঙ্গে জঙ্গিবাদের পরিস্থিতিকে কেন্দ্রীয় সরকার কোনও ভাবে যুক্ত করছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, ‘আপনারা কি এটিকে জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত করতে চাইছেন? আপনারা কি বলছেন, যত দিন বন্দুকের আওয়াজ থামছে না এবং জঙ্গিবাদ শেষ হচ্ছে না, তত দিন রাজ্যের মর্যাদা ফিরবে না?’ এ প্রসঙ্গেই পাকিস্তানের দিকে ইঙ্গিত করে ওমর বলেন, এমন হলে রাজ্যের মর্যাদা ফেরানোর সিদ্ধান্ত দিল্লির হাতে না থেকে কার্যত ইসলামাবাদের হাতে চলে যাবে। তাঁর বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন জঙ্গি হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে এসেছে। সে ক্ষেত্রে রাজ্যের মর্যাদা ফেরানোর সিদ্ধান্ত যদি জঙ্গিবাদের পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে, তা হলে সেই সিদ্ধান্তের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণও অন্য দেশের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
ওমরের আরও বক্তব্য, ‘এটি আমাদের সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্ত আমাদের সরকারই নেবে। এই সিদ্ধান্ত কি আমাদের প্রধানমন্ত্রী নেবেন না ? না কি অন্য কোনো দেশে এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে? যদি তা-ই হয়, তা হলে বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।’ জম্মু-কাশ্মীর বর্তমানে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ায় প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কী ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে, তার উদাহরণও বিধানসভায় তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, তাঁর সরকার একটি প্রস্তাব এনেছে, অথচ আইন দফতর সেই প্রস্তাব নিয়ে স্পিকারকে আলোচনা না করার পরামর্শ দিয়েছে। এমনকি মুখ্যসচিবও স্পিকারকে চিঠি দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। ওমর বলেন, ‘আমি আইনমন্ত্রীও। অথচ আমি জানি না, আমার আইনসচিব আপনাকে মতামত দিচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে আমি জানি না, মুখ্যসচিব আমার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে স্পিকারকে চিঠি লিখছেন। আমি জানি না, কার হয়ে এই কাজ করা হচ্ছে।’
কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসনিক কাঠামোর দিকে ইঙ্গিত করে ওমর প্রশ্ন তোলেন, ‘কোনো রাজ্যে এমনটা হতে পারে? এমনটা শুধু কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলেই হয় — যেখানে মুখ্যমন্ত্রী একটি প্রস্তাব আনছেন এবং আইনসচিব সেই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে মতামত দিচ্ছেন।’ জম্মু-কাশ্মীরে দীর্ঘদিন ধরে অ্যাডভোকেট জেনারেল না থাকার বিষয়টিও এ দিন বিধানসভায় তোলেন ওমর। তাঁর দাবি, গত দু-বছর ধরে সেখানে কোনো অ্যাডভোকেট জেনারেল নেই। সরকারের তরফে নাম প্রস্তাব করা হলেও তা এখনও অনুমোদিত হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। শেষে বিজেপিকে কটাক্ষ করে শেষ ওমরের তীর্যক মন্তব্য, ‘আমরা ভেবেছিলাম, জম্মু-কাশ্মীরের মানুষের স্বার্থে গোটা কক্ষ এই প্রস্তাবকে সমর্থন করবে। কিন্তু ওরা উপর থেকে বোধহয় অন্য থেকে নির্দেশ পেয়েছে।’
এদিকে, প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা চলাকালীন বিজেপি বিধায়কদের আপত্তির মূল জায়গা ছিল ২০১৯ সালের ৫ আগস্টের আগে জম্মু-কাশ্মীরের সাংবিধানিক অবস্থার উল্লেখ। বিজেপি বিধায়কেরা সে প্রসঙ্গের বিরোধিতা করেন। শাসক ও বিরোধী বেঞ্চের মধ্যে উত্তপ্ত বাদানুবাদের জেরেই এক সময় বিজেপি বিধায়কেরা ওয়াকআউট করেন। এর পর স্পিকার প্রস্তাবটি ভোটে তোলেন। ধ্বনিভোটে প্রস্তাব পাশ হয়। বিজেপি বিধায়কেরা কক্ষের বাইরে থাকায় প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কোনও ভোট পড়েনি। এ দিনের অধিবেশনে শুধু রাজ্যের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের প্রস্তাবই নয়, একাধিক বিলও পেশ করেন ওমর। মন্ত্রী ও বিধায়কদের বেতন এবং ভাতা সংক্রান্ত আইন সংশোধনের পাশাপাশি জম্মু-কাশ্মীরে ব্যবসা পরিচালনা সহজ করার লক্ষ্যে একাধিক আইনি পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এদিন, মোট পাঁচটি বিল বিধানসভায় পেশ করেন মুখ্যমন্ত্রী ওমর। তার মধ্যে তিনটি বিল যথাক্রমে জম্মু-কাশ্মীরের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের বেতন আইন, ১৯৫৬; জম্মু-কাশ্মীর রাজ্য আইনসভার সদস্যদের বেতন ও ভাতা আইন, ১৯৬০ এবং রাজ্য আইনসভার সদস্যদের পেনশন আইন, ১৯৮৪ সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ছাড়াও বিদ্যমান আইনগুলিকে একত্রিত ও সংশোধন করে অনুমতিনির্ভর ব্যবস্থার বদলে নিয়মভিত্তিক প্রশাসন চালুর লক্ষ্যে একটি বিল আনা হয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের জন্য প্রশাসনিক নিশ্চয়তা বাড়ানো, ব্যবসা পরিচালনা সহজ করা, বিনিয়োগ টানা, কর্মসংস্থান তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি জম্মু-কাশ্মীর গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স (জিএসটি) আইন, ২০১৭ সংশোধনের জন্যও একটি বিল পেশ করা হয়েছে। তবে দিনের অধিবেশনের রাজনৈতিক তাৎপর্যের কেন্দ্রে রইল একটি দাবিই — ২০১৯ সালের পরে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হওয়া জম্মু-কাশ্মীরকে আবার পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া। সে দাবির পক্ষেই এ দিন বিধানসভায় প্রস্তাব পাশ হলো। বিজেপির বিক্ষোভ এবং ওয়াকআউট সে প্রস্তাবকে ঘিরে বিধানসভার রাজনৈতিক বিভাজনটিও আরও স্পষ্ট করে দিল।
❤ Support Us





