- দে । শ
- জুন ৩০, ২০২৬
বর্ষাকালীন অধিবেশনেও অনিশ্চিত ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ সংক্রান্ত রিপোর্ট পেশ। অতিরিক্ত সময় চাইতে পারে যৌথ সংসদীয় কমিটি
দেশজুড়ে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন একসঙ্গে করার প্রস্তাব ঘিরে কেন্দ্রের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা আপাতত আরও কিছুটা সময়ের জন্য অপেক্ষার মুখে পড়তে চলেছে। ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ সংক্রান্ত সাংবিধানিক সংশোধনী বিলগুলি খতিয়ে দেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত যৌথ সংসদীয় কমিটি (জেপিসি) আসন্ন বর্ষাকালীন অধিবেশনেও তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিতে পারবে না বলেই জোরালো ইঙ্গিত মিলেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য, বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে পরামর্শ প্রক্রিয়া এখনো অসম্পূর্ণ। ফলে সুপারিশ চূড়ান্ত করার আগে কমিটি আরও সময় চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
লোকসভা ইতিমধ্যেই ‘জেপিসি’র কার্যকালের মেয়াদ বর্ষাকালীন অধিবেশনের শেষ দিন পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাতেও কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কমিটির সদস্যদের মতে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সরকার, রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ, সাংবিধানিক বিশারদ ও অন্যান্য অংশীজনের মতামত সংগ্রহ না করে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুপারিশ দেওয়া সমীচীন হবে না। সে কারণেই রাজ্যভিত্তিক আলোচনার উপর জোর দিচ্ছে কমিটি। এই বিলম্বের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। আগামী জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা। সে অধিবেশনেই কেন্দ্র সরকার ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ এবং ‘ডিলিমিটেশন’ বা লোকসভা ও বিধানসভা কেন্দ্রগুলির সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংশোধনী বিলগুলি নিয়ে এগোতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। কিন্তু ‘জেপিসি’র রিপোর্ট ছাড়া সে প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া বাস্তবে কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বিজেপি সাংসদ পি. পি. চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত ৩৯ সদস্যের যৌথ সংসদীয় কমিটি বর্তমানে ‘সংবিধান (১২৯ তম সংশোধনী) বিল, ২০২৪’ এবং ‘কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন (সংশোধনী) বিল, ২০২৪’ পরীক্ষা করে দেখছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে লোকসভায় বিলগুলি পেশ হওয়ার পর বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য সেগুলি সংসদের দুই কক্ষের সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই যৌথ কমিটির কাছে পাঠানো হয়। প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য হলো লোকসভা ও সমস্ত রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচন একই সময়ে অনুষ্ঠিত করা। কেন্দ্র সরকারের যুক্তি, বারবার নির্বাচন আয়োজনের ফলে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হয়। পাশাপাশি ঘন ঘন আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর থাকায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নেও বিঘ্ন ঘটে। একযোগে নির্বাচন হলে আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপ অনেকটাই কমবে, সরকার দীর্ঘমেয়াদী নীতি বাস্তবায়নে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।
তবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির আপত্তিও কম নয়। কংগ্রেস-সহ একাধিক বিরোধী দলের অভিযোগ, এ প্রস্তাব কার্যকর হলে দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হতে পারে। রাজ্যগুলির সাংবিধানিক ক্ষমতা ও স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, বিভিন্ন রাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। তাই সব রাজ্যে একই সময়ে নির্বাচন বাধ্যতামূলক করা হলে সাংবিধানিক ভারসাম্যের উপর তার প্রভাব পড়তে পারে। সূত্রের খবর, ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ প্রস্তাবকে রাজনৈতিকভাবে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে কেন্দ্র সরকার ‘ডিলিমিটেশন বিল’-এর সঙ্গেও বিষয়টিকে যুক্ত করার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দুটি বড়ো সাংবিধানিক সংস্কারকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে গেলে সংসদে প্রয়োজনীয় সমর্থন আদায়ের ক্ষেত্রে সরকার কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে।
ডিলিমিটেশন প্রশ্নটি আবার মহিলা সংরক্ষণ আইন কার্যকরের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। বিদ্যমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী, নতুন জনগণনার পর আসন পুনর্বিন্যাস সম্পন্ন হলেই লোকসভা ও বিধানসভায় মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ কার্যকর করা সম্ভব হবে। সে কারণেই ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে এ প্রক্রিয়া শেষ করতে আগ্রহী কেন্দ্র সরকার। তবে সংসদীয় অঙ্ক মোটেই সহজ নয়। সাংবিধানিক সংশোধনী পাশ করাতে হলে লোকসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। ৫৪০ সদস্যের কার্যকর লোকসভায় তার অর্থ অন্তত ৩৬০ জন সদস্যের সমর্থন। ফলে সরকারকে শুধু নিজেদের জোটের সমর্থন ধরে রাখাই নয়, প্রয়োজনে অতিরিক্ত সমর্থনও নিশ্চিত করতে হতে পারে।
অন্যদিকে, ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ সংক্রান্ত সংশোধনী নিয়ে ’জেপিসি’ ইতিমধ্যেই দেশের ১০টি রাজ্যে গিয়ে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে আলোচনা করেছে। বুধবার দিল্লি বিধানসভার সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে কমিটির। কিন্তু এখনো একাধিক রাজ্যে সফর ও মতবিনিময় বাকি। সে কারণেই কমিটির সদস্যদের একাংশ মনে করছেন, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে রিপোর্ট সম্পূর্ণ করা কার্যত সম্ভব হবে না। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছেন কমিটির চেয়ারম্যান পি. পি. চৌধুরী। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সংসদে আইন পাশের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলেও বাস্তবে দেশজুড়ে একযোগে নির্বাচন চালু হতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তাঁর মতে, ২০৩৪ সালের আগে এ ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। ফলে আপাতত স্পষ্ট, ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ নিয়ে কেন্দ্র সরকারের পরিকল্পনা রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকলেও বাস্তবায়নের পথ এখনো দীর্ঘ।
❤ Support Us







