- দে । শ
- অক্টোবর ৯, ২০২৬
কেদারনাথে রেকর্ড ভিড়ের হাতছানি, বাড়ছে হৃদ্রোগে আক্রান্তের সংখ্যা, পরিবেশ বিপন্ন বর্জ্যে
চলতি বছরে ১৬.৮৬ লক্ষেরও বেশি পুণ্যার্থী দর্শন করেছেন কেদারনাথ। জরুরি চিকিৎসার জন্য আকাশপথে সরানো হয়েছে ২০০ জনকে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শুধু কেদারনাথেই মৃত্যু হয়েছে ১২০ জনের। এরই মধ্যে তীর্থপথে নিকাশি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে গাফিলতির অভিযোগে উত্তরাখণ্ড সরকারকে নোটিস পাঠাল জাতীয় পরিবেশ আদালত।
এক দিকে পুণ্যার্থীর ঢল। অন্য দিকে উচ্চতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শারীরিক অসুস্থতার ঝুঁকি। তারই পাশাপাশি প্রশ্ন উঠছে হিমালয়ের ভঙ্গুর পরিবেশের সুরক্ষা নিয়েও। উত্তরাখণ্ডের কেদারনাথ যাত্রা এ বছর নতুন রেকর্ডের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। কিন্তু সেই বিপুল জনসমাগমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চিকিৎসা ও পরিবেশ সংক্রান্ত পরিকাঠামো কতটা প্রস্তুত, তা নিয়েই উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত ১৬.৮৬ লক্ষেরও বেশি পুণ্যার্থী কেদারনাথ মন্দিরে পুজো দিয়েছেন। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই তীর্থক্ষেত্রে ভক্তসমাগমের পরিসংখ্যান নতুন নজির গড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ি পথে পুণ্যার্থীর সংখ্যা যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে উচ্চতাজনিত অসুস্থতা আর জরুরি চিকিৎসার সমস্যা। বাতাসে অক্সিজেনের স্বল্পতা, হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট কিংবা দুর্ঘটনায় গুরুতর আঘাত — যে কোনো পরিস্থিতিই দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে এই দুর্গম অঞ্চলে।
সে কারণেই অসুস্থ পুণ্যার্থীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হেলিকপ্টারে উদ্ধারের ব্যবস্থা। কেদারনাথের মতো দুর্গম এলাকায় সড়কপথে রোগীকে বড়ো হাসপাতালে নিয়ে যেতে সময় লাগে। অথচ হৃদ্রোগ বা গুরুতর শ্বাসকষ্টের ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের বিলম্বও বিপজ্জনক হতে পারে। তাই প্রাথমিক চিকিৎসার পরে রোগীর অবস্থা বুঝে চিকিৎসকেরা আকাশপথে স্থানান্তরের পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, যাত্রাপথের বিভিন্ন চিকিৎসা সহায়তা কেন্দ্রে এবং কেদারনাথের হাসপাতালে প্রথমে রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার পরে পরিস্থিতি অনুযায়ী তাঁদের উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হয়। কেদারনাথ ছাড়াও মদমহেশ্বর এবং জেলার অন্যান্য দুর্গম এলাকা থেকে অসুস্থদের উদ্ধারের জন্য এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তুলনামূলক কম গুরুতর রোগীদের কাছাকাছি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হেলিকপ্টার পরিষেবা ও অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে সমন্বয় রাখা হচ্ছে।
জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯ জনকে সরাসরি হেলিকপ্টারে উদ্ধার করে উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এছাড়া জরুরি চিকিৎসার জন্য আকাশপথে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ২০০ জন পুণ্যার্থীকে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন কম অক্সিজেনের কারণে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগী, হৃদ্রোগী, বুকে ব্যথা নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়া পুণ্যার্থী এবং দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিরা। তবে চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও মৃত্যুর পরিসংখ্যান উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শুধু কেদারনাথেই ১২০ জন পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়েছে। চারধাম যাত্রায় সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ২৬৩। অর্থাৎ, বিপুল জনসমাগমের পাশাপাশি যাত্রাপথে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিও ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে। জেলা বিপর্যয় মোকাবিলা আধিকারিক নন্দন সিংহ রাজওয়ার জানিয়েছেন, রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী গুরুতর অসুস্থদের উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হয়। তাঁর মতে, কেদারনাথ ও মদমহেশ্বরে হেলিকপ্টারে উদ্ধারের ব্যবস্থা রয়েছে। জেলার অন্যত্র অসুস্থদের পরিস্থিতি অনুযায়ী হেলিকপ্টার অথবা অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ বছরের যাত্রায় আকাশপথে রোগী উদ্ধারের অন্যতম প্রধান কারণ হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা।
গত ১১ জুলাই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন উত্তরপ্রদেশের আমরোহার বাসিন্দা ২৫ বছরের পুনীত। তাঁকে কেদারনাথ থেকে হেলিকপ্টারে ঋষিকেশে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৬ জুলাই বিহারের ৬৬ বছরের রাম প্রকাশ যাদবও হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরে আকাশপথে ঋষিকেশে পৌঁছন। শুধু হৃদ্রোগ নয়, ফুসফুসের অসুখ এবং শ্বাসকষ্টও বিপদের কারণ হয়ে উঠছে। গত ২০ জুলাই মহারাষ্ট্রের কোলাপুরের বাসিন্দা ৫৫ বছরের জয়শ্রী থাকর গুরুতর ফুসফুসের সমস্যায় আক্রান্ত হলে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। ১৫ জুন বুকে ব্যথার অভিযোগ জানান ৭০ বছরের মিথিলেশ। তাঁকেও কেদারনাথ থেকে হেলিকপ্টারে ঋষিকেশে নিয়ে যাওয়া হয়। গত ২৬ মে কেরালার ৩৯ বছরের তেজস রাজাগোপালনের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। সোনপ্রয়াগের চিকিৎসা সহায়তা কেন্দ্র থেকে তাঁকে ঋষিকেশে পাঠানো হয়।
৩১ মে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরে মদমহেশ্বর থেকে উদ্ধার করা হয় ২৯ বছরের শিব নামে এক যুবককে। প্রশাসনিক আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরেও আরও দু’জন গুরুতর অসুস্থ পুণ্যার্থীকে কেদারনাথ থেকে হেলিকপ্টারে ঋষিকেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ঘটনাগুলি ফের মনে করিয়ে দিচ্ছে, হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে তীর্থযাত্রা শুধু ধর্মীয় আবেগের বিষয় নয়, শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার সঙ্গেও ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। উচ্চতার কারণে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি, প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম পথ আর বড়ো হাসপাতালের দূরত্ব— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ফলে চিকিৎসা পরিকাঠামোর পাশাপাশি জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থার কার্যকারিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু কেদারনাথকে ঘিরে উদ্বেগের ছবিটি শুধু চিকিৎসার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। পুণ্যার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য। সেই বর্জ্য ও নিকাশি সামলানোর পরিকাঠামো পর্যাপ্ত কি না, তা নিয়ে এবার প্রশ্ন তুলেছে জাতীয় পরিবেশ আদালত। সোনপ্রয়াগ থেকে কেদারনাথ পর্যন্ত তীর্থযাত্রার পথে নিকাশি পরিশোধন, নর্দমা এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একাধিক গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে উত্তরাখণ্ড সরকার-সহ কেন্দ্র ও রাজ্যের একাধিক সংস্থার কাছে জবাব চেয়েছে জাতীয় পরিবেশ আদালত (এনজিটি)। ২২ সেপ্টেম্বর নয়ডার পরিবেশকর্মী তথা তথ্যের অধিকার আইনে আবেদনকারী অমিত গুপ্ত এই বিষয়ে আদালতে আবেদন করেন। মঙ্গলবার সে আবেদনের শুনানিতে কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ, উত্তরাখণ্ড দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ, উত্তরাখণ্ড জল সংস্থান দফতর, রুদ্রপ্রয়াগের জেলাশাসক, রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং ‘ন্যাশনাল মিশন ফর ক্লিন গঙ্গা’-কে নোটিস পাঠায় আদালত।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, আবেদনে পরিবেশ সংক্রান্ত বিধি ও নির্ধারিত মানদণ্ড মেনে চলা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আগামী ১৭ ডিসেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানি হবে। তবে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি আদালত। আবেদনে মূলত কেদারনাথ ও গৌরীকুণ্ডের নিকাশি পরিশোধন কেন্দ্রগুলির ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। যাত্রার ব্যস্ততম সময়ে বিপুল সংখ্যায় পুণ্যার্থী আসেন। তাঁদের থাকার ব্যবস্থা, খাবারের দোকান, হোটেল এবং অন্যান্য পরিষেবা থেকে তৈরি হয় বিপুল পরিমাণ বর্জ্যজল। সেই বর্জ্যজল পরিশোধনের জন্য বর্তমানে যে পরিকাঠামো রয়েছে, তা যথেষ্ট কি না, তা নিয়েই সংশয় প্রকাশ করেছেন আবেদনকারী। আবেদনে দাবি করা হয়েছে, কেদারনাথে প্রতিদিন ৬০০ কিলোলিটার বর্জ্যজল পরিশোধনের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কেন্দ্র রয়েছে। স্থায়ীভাবে বসবাসকারী প্রায় ৫,০০০ মানুষ এবং যাত্রার সময় সাময়িকভাবে আসা সর্বাধিক ২০,০০০ পুণ্যার্থীর কথা মাথায় রেখে এই পরিকাঠামোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু আবেদনকারীর বক্তব্য, যাত্রার ভরা মরসুমে এই ক্ষমতা যথেষ্ট নয়।
আবেদনকারী অমিত গুপ্ত বলেন, ‘যাত্রার ব্যস্ততম দিনগুলিতে উৎপন্ন নিকাশি পরিশোধনের জন্য এই ক্ষমতা যথেষ্ট নয়। কেদারনাথে অন্তত ১,০০০ কিলোলিটার দৈনিক পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্র প্রয়োজন। গৌরীকুণ্ডের ২০০ কিলোলিটার দৈনিক ক্ষমতার পরিশোধন কেন্দ্রটিও বর্তমান চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত।’ আবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, কয়েকটি নর্দমা নিকাশি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত নয়। ফলে অপর্যাপ্ত পরিশোধিত বর্জ্যজল কী ভাবে নিষ্কাশন করা হচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পাশাপাশি কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ, ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও ঘাটতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। অমিত গুপ্তের আরও বক্তব্য, পাহাড়ি তীর্থক্ষেত্রে নিকাশি ও বর্জ্য পরিকাঠামো গড়ে তোলার সময় শুধু স্থায়ী জনসংখ্যার হিসাব করলে চলবে না। যাত্রার মরসুমে প্রতিদিন কত পুণ্যার্থী আসছেন, তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করতে কত হোটেল ও অন্যান্য পরিষেবা চালু হচ্ছে এবং সেই সব ক্ষেত্র থেকে কতটা বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, তা-ও বিবেচনা করা জরুরি। তাঁর দাবি, ‘পরিশোধন কেন্দ্রের প্রকৃত ক্ষমতা কতটা হওয়া উচিত, তা নির্ধারণের সময় প্রতিদিন আসা পুণ্যার্থীদের সংখ্যা এবং স্থানীয় ব্যবসা, থাকার ব্যবস্থা ও অন্যান্য কার্যকলাপ থেকে উৎপন্ন বর্জ্যের পরিমাণও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।’
এ বিষয়ে রুদ্রপ্রয়াগের জেলাশাসক বিশাল মিশ্র জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশটি বিস্তারিত ভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। রাজ্য সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি নিজেদের বক্তব্য জমা দেওয়ার পরে অভিযোগ এবং বর্তমানে চালু পরিকাঠামো সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। কেদারনাথের মতো পরিবেশগত ভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা শুধু পরিচ্ছন্নতার প্রশ্ন নয়। নিকাশি ও অপর্যাপ্ত পরিশোধিত বর্জ্যজল স্থানীয় জলসম্পদ এবং পাহাড়ি পরিবেশের উপর কী প্রভাব ফেলছে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সেই কারণে যাত্রার মরসুমে বাড়তি জনসমাগম সামলানোর পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠছে।
❤ Support Us





