- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ৫, ২০২৬
বইপাড়ায় উচ্ছেদ নয়, ঘোষণা পুরসভার
রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলে দ্রুত বদলাচ্ছে বহুকিছুই। ইউপি-বিহার মডেলে ‘অবৈধ’ নির্মাণে বুলডোজার গর্জে উঠছে দিকে দিকে। প্রথম কোপ পড়েছে রেল স্টেশন, ফ্লাইওভারের নীচের হকারদের উপর। শিয়ালদহ, হাওড়া, দমদম, উল্টোডাঙা-সহ জেলায় জেলায় চলছে উচ্ছেদ অভিযান। সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন হকার, বাম ও নাগরিক সংগঠন থেকে সাধারণ মানুষের একাংশ। অনেকের বক্তব্য, উপযুক্ত ব্যবস্থা না করে গরীব মানুষের রুজিরুটি কেড়ে নেওয়া অপরাধ। ক্ষমতায় আসার আগে, আজকের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও উচ্ছেদের বিরুদ্ধে ছিলেন।
উচ্ছেদ অভিযানের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল বইয়ের গন্ধ, পুরনো কাগজের স্পর্শ, ফুটপাত জুড়ে সাজানো অজস্র বইয়ের সারি আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য— কলেজ স্ট্রিটেও। যে অঞ্চল ঘিরে বাঙালির আবেগের কোনো পরিমাপ নেই। ঐতিহ্যবাহী বইপাড়াকে ঘিরে গত কয়েক দিন ধরে ছড়িয়ে পড়েছিল অস্বস্তিকর গুঞ্জন। সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হচ্ছিল, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে চলা হকার উচ্ছেদ অভিযানের আবহে এ বার নাকি কলেজ স্ট্রিটেও শুরু হতে চলেছে উচ্ছেদ অভিযান। বইয়ের দোকান সরিয়ে দেওয়ার জন্য নোটিস দেওয়া হয়েছে বলেও প্রচার হতে থাকে। জল্পনা, আতঙ্ক আর গুজবের অবসান ঘটাতে বৃহস্পতিবার সরাসরি মুখ খুলেছে কলকাতা পুরসভা।
পুরভবনে আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে কলকাতা পুরসভার কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, কলেজ স্ট্রিটে হকার উচ্ছেদ নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এ সংক্রান্ত কোনো সরকারি নোটিসও জারি করা হয়নি। তাঁর দাবি, ‘অনেক ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এমনকি এআই ব্যবহার করে ভুয়ো নোটিস তৈরি করে প্রচার করা হচ্ছে বলেও আমাদের নজরে এসেছে। কিন্তু কলেজ স্ট্রিটে হকার উচ্ছেদের বিষয়ে পুরসভার তরফে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, কোনো নোটিসও দেওয়া হয়নি।’’
সাংবাদিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার দেবেন্দ্র প্রতাপ সিংহও। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে কলকাতা পুলিশের বিভিন্ন স্তরে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। জোড়াসাঁকো, আমহার্স্ট স্ট্রিট-সহ সংশ্লিষ্ট থানার আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। কোথাও এ ধরনের কোনো সরকারি নির্দেশ বা নোটিসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য, ‘কলকাতা পুলিশের তরফেও কোনো নোটিস জারি করা হয়নি। আমাদের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই। ফলে যে সব নোটিস বা বার্তা ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেগুলি সরকারি নয়।’
পুরসভার এই স্পষ্টীকরণের আগেই কলেজ স্ট্রিট চত্বরে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় হকার উচ্ছেদ, রাস্তা দখলমুক্ত করার অভিযান নিয়ে প্রশাসনের তৎপরতা চোখে পড়েছে। সে আবহেই কলেজ স্ট্রিটের বই বিক্রেতাদের একাংশের মধ্যে খবর ছড়ায় যে, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্ট্রিট এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ফুটপাতের বইয়ের দোকানগুলিকেও সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। সামাজিক মাধ্যমে এ খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বইপাড়ার সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ আশঙ্কা করতে শুরু করেন, কয়েকশো বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যের উপর বুঝি নেমে আসছে অনিশ্চয়তার ছায়া।
বাস্তবে অবশ্য ছবিটা মিশ্র। বইপাড়ার বিভিন্ন দোকানদার ও কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, কোনো লিখিত নোটিস কারও হাতে পৌঁছয়নি। তবে, কয়েক দিন আগে পুরসভার কিছু কর্মী মৌখিকভাবে কয়েক জন ব্যবসায়ীকে সতর্ক করেছিলেন বলে দাবি স্থানীয়দের। সতর্কবার্তার বিষয় ছিল রাস্তার উপর অতিরিক্ত দখলদারি। অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে ফুটপাথ ছাড়িয়ে পিচ রাস্তার উপর পর্যন্ত বই সাজিয়ে রাখা হচ্ছিল। কোথাও কোথাও গলির মুখ দখল করে ব্যবসার পরিধি বাড়ানো হয়েছিল। সেসব ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ব্যবসা চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একাংশের বক্তব্য, ‘দোকান তুলে দেওয়ার কথা কেউ বলেনি। শুধু রাস্তার উপর অতিরিক্ত মালপত্র না রাখতে বলা হয়েছে।’ তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের নির্দেশ মাঝেমধ্যে দেওয়া হয়। কারণ, পথচারীদের চলাচল এবং যানবাহনের গতিবিধি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন নিয়মিত নজরদারি চালায়।
রাজ্যের হকার নীতিতেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, কোনো অবস্থাতেই ব্ল্যাকটপ রাস্তা বা যান চলাচলের মূল অংশ দখল করে ব্যবসা করা যাবে না। ফুটপাতের নির্দিষ্ট অংশ ব্যবহার করা গেলেও রাস্তার উপর স্থায়ী বা অস্থায়ী দোকান বসানো নিয়মবহির্ভূত। ফলে প্রশাসনের সাম্প্রতিক সতর্কতাকে অনেকেই নিয়ম রক্ষার পদক্ষেপ বলেই ব্যাখ্যা করছেন। গুজবের জেরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়েছে। কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল, সিপিএম। সেখানে উপস্থিত হয়ে বাম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, ‘বইপাড়াকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। কলেজ স্ট্রিট শুধু একটি বাজার নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। এখানে বই বিক্রেতাদের পাশাপাশি প্রকাশক, মুদ্রাকর, বাঁধাই শ্রমিক এবং তাঁদের পরিবারের জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে।’ তাঁর দাবি, উচ্ছেদের কোনো চেষ্টা হলে সাধারণ মানুষই তার প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। নাগরিক সমাজের একাংশের বক্তব্য, বইপাড়ার মতো ঐতিহাসিক অঞ্চলে কোনো ধরনের পরিবর্তনের আগে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হওয়া উচিত।
এরপরেও বইপাড়ার উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। কারণ কলেজ স্ট্রিট শুধুমাত্র একটি বাণিজ্যিক এলাকা নয়। এটি বাঙালির বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রায় দু–শো বছরেরও বেশি সময় ধরে এ অঞ্চলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বইয়ের বিশাল বাজার। নতুন বইয়ের পাশাপাশি পুরনো ও দুষ্প্রাপ্য বইয়ের জন্যও দেশজুড়ে পরিচিত এই এলাকা।
গবেষক, শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ পাঠক — সকলেরই এক আবেগের নাম কলেজ স্ট্রিট। কলেজ স্কোয়ারের ধারে ছোট ছোট বইয়ের দোকানগুলির অনেকগুলিই প্রজন্মান্তরে চলে আসছে। কারও বাবা, কারও ঠাকুর্দা এই ব্যবসা শুরু করেছিলেন। দোকানগুলিই বহু পরিবারের একমাত্র জীবিকার উৎস। এক প্রবীণ বই বিক্রেতার কথায়, ‘চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে ব্যবসা করছি। নিয়মিত ভাড়াও দিই। হঠাৎ যদি উঠে যেতে বলা হয়, তা হলে কোথায় যাব?’ যদিও প্রশাসনের বক্তব্য, এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয় নি।
❤ Support Us






