- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ২, ২০২৬
ভোটার তালিকা বিতর্কে অগ্নিগর্ভ মালদহ। রাতভর ঘেরাওয়ের পরও থামেনি বিক্ষোভ । সকালে ফের অবরোধে স্তব্ধ জাতীয় সড়ক। মুখ্যসচিব, ডিজি, জেলাশাসককে শো কজ সুপ্রিম কোর্টের
ক্ষোভ, অবরোধ, উত্তেজনা। বৈধ নথী থাকা সত্ত্বেও ‘এসআইআর’-এর ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়েছে, এমন অভিযোগ তুলে বুধবার থেকেই জ্বলছে মালদহ। বৃহস্পতিবার সকালেও শান্ত বিক্ষোভ। বরং নতুন করে বিস্ফোরিত হয়েছে জমে থাকা ক্ষোভ। কালিয়াচকের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পুরাতন মালদহ ব্লকের মঙ্গলবাড়ি এলাকায় আবার পথ অবরোধে নামেন বিক্ষোভকারীরা। কয়েক ঘণ্টার জন্য রাতের অন্ধকারে অবরোধ সরলেও ভোরের আলো ফুটতেই ফের থমকে যায় ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক। জ্বলন্ত টায়ার, বাঁশের ব্যারিকেড, স্লোগানে উত্তাল রাস্তা—উত্তরবঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
বিক্ষোভের মূলে একটিই অভিযোগ—বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও বহু মানুষের নাম বাদ পড়েছে ভোটার তালিকা থেকে। স্থানীয়দের দাবি, আগে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে, তার পরেই নির্বাচন। অন্যথায় ভোট প্রক্রিয়া মানা হবে না। এ দাবিকেই সামনে রেখে বুধবার সকাল থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মালদহের মোথাবাড়ি ও সুজাপুর বিধানসভা এলাকার একাধিক অঞ্চল—সুজাপুর, জালালপুর, যদুপুর-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় শুরু হয় পথ অবরোধ। সকাল ১১টা নাগাদ বিক্ষোভকারীদের ভিড় বাড়তে থাকলে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক, থমকে যায় যান চলাচল।
বুধবার দুপুরের দিকে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে কালিয়াচক-২ ব্লক অফিস। ভোটার তালিকা সংক্রান্ত কাজে নিযুক্ত ৭ জন বিচারবিভাগীয় আধিকারিক তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে তিন জন মহিলা। ব্লক অফিসের সামনে ক্রমশ জমতে থাকে বিক্ষুব্ধ জনতার ভিড়। বিকেলের আগেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। বিকেল প্রায় ৪টে নাগাদ থেকে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন ওই আধিকারিকেরা। ব্লক অফিসের গেট ঘিরে ফেলে বিক্ষোভকারীরা। ‘আগে নাম তুলতে হবে, তারপর ভোট’—এই স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে এলাকা।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত গভীর হলেও, অবরুদ্ধ অবস্থাতেই কাটাতে হয় আধিকারিকদের। প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলতে থাকে ঘেরাও। অবশেষে গভীর রাতে পুলিশি হস্তক্ষেপে তাঁদের উদ্ধার করা হয়। পুলিশের গাড়িতে করে কনভয় বানিয়ে ব্লক অফিস থেকে বের করে আনা হয় তাঁদের। উদ্ধার অভিযানের সময় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ। বিক্ষোভকারীরা কনভয়ের গাড়ি আটকানোর চেষ্টা করেন। কোথাও রাস্তার উপর বাঁশ ফেলে দেওয়া হয়, কোথাও গাড়ির উপর হামলার চেষ্টা চলে। একটি গাড়ির কাচ ভেঙে যাওয়ার ঘটনাও সামনে আসে। এই উত্তেজনার মধ্যেই আহত হন এক বিক্ষোভকারী—আলম শেখ (৩৭)। আন্দোলনকারীদের দাবি, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের বহনকারী কনভয়ের একটি গাড়ির ধাক্কায় জখম হন তিনি। বর্তমানে মালদহ মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন। যদিও এই অভিযোগ মানতে নারাজ পুলিশ। উল্টে বিক্ষোভকারীদের লাঠিচার্জের অভিযোগও খারিজ করেছে প্রশাসন।
রাত গভীর হলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। প্রশাসনের তরফে বিক্ষোভকারীদের আশ্বাস দেওয়া হয় যে, ৪ দিনের মধ্যে বৈধ ভোটারদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই প্রতিশ্রুতির পরই সাময়িকভাবে অবরোধ তুলে নেন আন্দোলনকারীরা। প্রায় ১৮ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর রাত ২ টো নাগাদ স্বাভাবিক হয় ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের যান চলাচল। মালদহের অন্যান্য অবরুদ্ধ এলাকাতেও রাতেই সরে যান বিক্ষোভকারীরা। তবে সে স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। বৃহস্পতিবার সকাল হতেই ফের নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায়। কালিয়াচকের পরিবর্তে এ দিন বিক্ষোভের কেন্দ্র পুরাতন মালদহের মঙ্গলবাড়ি। আবারও জাতীয় সড়কে অবরোধ, টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ, বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড। ফলে নতুন করে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা। পাশাপাশি মালদহ-মোথাবাড়ি রাজ্য সড়কের বিভিন্ন জায়গাতেও বসানো হয় পুলিশ পিকেট। জেলার একাধিক স্পর্শকাতর এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
বর্তমানে ঘটনাস্থলে মোতায়েন রয়েছে বিশাল পুলিশ বাহিনী ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। সকাল থেকেই এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। সূত্রের খবর, গোয়েন্দা শাখাকেও সজাগ থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুধবার রাতে সুজাপুর ও মোথাবাড়ি বিধানসভা এলাকায় যে তাণ্ডব চলেছিল, তার রেশ এখনও কাটেনি বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা। যদিও অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইছেন না। এই অস্থিরতার মধ্যেই বৈষ্ণবনগরে জনসভা করার কথা মমতা ব্যনার্জির। ফলে প্রশাসনের সামনে চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। এদিকে গোটা ঘটনার উপর কড়া নজর রেখে চলেছে নির্বাচন কমিশন। সূত্রের খবর, রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্তর কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করা হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টকে।
উত্তপ্ত মালদহের ঘটনাপ্রবাহ পৌঁছে গিয়েছে দেশের শীর্ষ আদালতেও। কালিয়াচকে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের ঘেরাও এবং প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে সরব হয়েছেন প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি। বৃহস্পতিবার শুনানির শুরুতেই বিচারপতি বাগচি নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে বলেন, কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করে সর্বোচ্চ স্তরের আধিকারিককে দায়িত্ব দিতে হবে। তাঁর মন্তব্য, এ ধরনের ঘটনায় সর্বস্তরের প্রতিবাদ প্রয়োজন। পাশাপাশি কমিশনকে প্রয়োজনীয় বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশও দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত গোটা বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের উপরই ছেড়ে দেয় আদালত, জানিয়ে দেয়—কমিশনের উপরই আস্থা রয়েছে। তবে আদালতে কেন্দ্রের তরফে উপস্থিত সলিসিটার জেনারেল তুষার মেহতা মন্তব্য করেন, এই ঘটনায় কড়া বার্তা যাওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও জানান, নিরাপত্তার প্রশ্নে শুধুমাত্র রাজ্য প্রশাসনের উপর নির্ভর করা বুদ্ধিমানের কাজ নাও হতে পারে।
প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি জানান, রাত ১১টা পর্যন্ত জেলাশাসক ঘটনাস্থলে পৌঁছোননি। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাতেই মৌখিকভাবে কঠোর নির্দেশ দিতে হয়েছে। এমনকি ৫ বছরের শিশুকেও দীর্ঘ সময় খাবার ও জল দেওয়া হয়নি—এই তথ্য আদালতে উল্লেখ করেন তিনি। আরও জানা যায়, কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সেই চিঠিতে জানানো হয়েছে, মালদহের কালিয়াচকে তিন জন মহিলা-সহ মোট সাত জন বিচারবিভাগীয় আধিকারিক বিকেল সাড়ে ৩টে থেকে দুষ্কৃতীদের ঘেরাওয়ের মধ্যে ছিলেন। উদ্বেগের বিষয়, সেই সময়ে জেলাশাসক কিংবা পুলিশ সুপার—কেউই ঘটনাস্থলে যাননি। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাধ্য হয়ে হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকেই রাজ্যের ডিজি ও স্বরাষ্ট্র সচিবকে সরাসরি ফোন করতে হয়। এ প্রেক্ষিতেই কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে শীর্ষ আদালত। মালদহের ঘটনায় মুখ্যসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং সংশ্লিষ্ট জেলাশাসককে শো-কজ নোটিস জারি করেছে শীর্ষ আদালত। আগামী সোমবার ভার্চুয়াল শুনানিতে তাঁদের হাজির থাকার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
❤ Support Us





