- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬
জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ঘিরে বিরোধী ঐক্যের ডাক, বেবিকে ফোন মমতার, দ্রুত ‘ইন্ডিয়া’ বৈঠকের অনুরোধ রাহুলকে
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে যাঁরা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, সেই তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিএমের মধ্যে এবার তৈরি হলো যোগাযোগের নতুন পরিসর। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ নিয়ে মতপার্থক্যের খবর প্রকাশ্যে আসার পর জাতীয় স্তরে বিরোধী দলগুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগে সাড়া দিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন তিনি। একই সঙ্গে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক দ্রুত ডাকার জন্য লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গেও কথা বলেছেন মমতা, বলে সূত্রের খবর।
বেবির সঙ্গে ফোনালাপে নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা, নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর আস্থা অটুট রাখার প্রশ্নে বিরোধী দলগুলির একযোগে এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সূত্রের খবর, মমতা জানিয়েছেন, ‘ইন্ডিয়া’ জোটের দলগুলির দ্রুত বৈঠকে বসা প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি যৌথ কৌশল তৈরি করা দরকার। সম্ভব হলে আগামী সপ্তাহের সোমবার অথবা মঙ্গলবারই সে বৈঠক আয়োজনের জন্য রাহুলকে অনুরোধ করেছেন তৃণমূল নেত্রী।
ঘটনার সূত্রপাত অবশ্য আরও আগে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক বেবি ইন্ডিয়া জোটের শরিক এবং অন্যান্য বিজেপি-বিরোধী দলের নেতাদের চিঠি লিখে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে আলোচনার জন্য বৈঠকে বসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে তিনি নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে ‘এসআইআর’ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে মতপার্থক্যের বিষয়টি উল্লেখ করে পরিস্থিতিকে ‘সত্যিই অসাধারণ’ বলে বর্ণনা করেন। বেবির বক্তব্য ছিল, নির্বাচন কমিশনের কাজকর্মের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী দলগুলি ‘এসআইআর’ নিয়ে যে আপত্তিগুলি জানিয়েছে, কমিশন তা উপেক্ষা করেই প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাঁর দাবি, এর ফলে ১৩ কোটিরও বেশি ভোটারের ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিরোধী দলগুলির একজোট হয়ে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করা প্রয়োজন বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন বেবি। তাঁর বক্তব্য, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নে সাধারণ মানুষের নজর এখন বিরোধীদের দিকে। তাই পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে একটি দিন এবং স্থান নির্ধারণ করে দ্রুত বৈঠকে বসা প্রয়োজন। বেবির সে চিঠির জবাবেই মমতা ইতিবাচক বার্তা দেন বলে সূত্রের খবর। শুধু ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিক নয়, বিজেপি-বিরোধী আরও কয়েকটি দলকে নিয়েও বৃহত্তর পরিসরে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা ওঠে। সূত্রের খবর, বিআরএস, আম আদমি পার্টি, ডিএমকে, তামিলনাড়ুর তামিলাগা ভেট্রি কাজাগম, বিজেডি এবং ককরোচ জনতা পার্টির মতো দলগুলির সঙ্গেও যোগাযোগের উদ্যোগ নিয়েছেন সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক ।
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে ‘এসআইআর’ নিয়ে মতপার্থক্যের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এক তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং বিবেক যোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার এসআইআর-সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের আপত্তির অন্যতম বিষয় ছিল, তাঁদের অজ্ঞাতসারে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা বিভিন্ন ঘাটতি। ২৩ সেপ্টেম্বর ওই প্রতিবেদনের জবাবে নির্বাচন কমিশন কমিশনারদের লিখিত নোট থাকার কথা স্বীকার করলেও সেগুলিকে কমিশনের ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার’ অংশ বলে উল্লেখ করে। তবে ওই আপত্তিগুলির প্রত্যেকটির কী জবাব দেওয়া হয়েছিল, কিংবা সংশ্লিষ্ট উদ্বেগগুলি কী ভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছিল, সে বিষয়ে কমিশনের তরফে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি বলে বিরোধীদের অভিযোগ।
এ ঘটনাকেই সামনে রেখে বিরোধী দলগুলি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবি আরও জোরালো করেছে। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং এসআইআর প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিও জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার সংসদে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে নতুন করে নোটিস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিরোধী দলগুলি। আইনি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়ার পরে লোকসভা এবং রাজ্যসভা — দুই কক্ষেই সেই নোটিস দেওয়া হতে পারে বলে সূত্রের খবর। বিরোধীদের তরফে এটি হবে এমন নোটিস দেওয়ার তৃতীয় প্রচেষ্টা।
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল এবং সিপিএমের রাজনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাতপূর্ণ। রাজ্য রাজনীতিতে একে অপরের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে থাকা দুই দলের মধ্যে জাতীয় স্তরে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের পরিসরেও কার্যত কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ছিল না। সে জায়গায় ‘এসআইআর’ এবং নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে তৈরি পরিস্থিতি দুই দলের মধ্যে কথাবার্তার দরজা খুলে দিল। তবে বেবির সঙ্গে যোগাযোগকে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের স্থায়ী ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে দুই দলের তরফেই সতর্কতা রয়েছে। বেবি জানিয়েছেন, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগটি বিষয়ভিত্তিক এবং বৃহত্তর বিরোধী ঐক্যের উদ্যোগের অংশ। তাঁর বক্তব্য, বাম দলগুলি পরিস্থিতির প্রশ্নে এনডিএ-বিরোধী যত বেশি সংখ্যক দলকে এক জায়গায় আনতে চাইছে।
অন্যদিকে, বিজেপি এই যোগাযোগকে কটাক্ষ করেছে। মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের বক্তব্য, ক্ষমতা হারানোর পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জাতীয় রাজনীতিতে নিজের জন্য নতুন ভূমিকা খুঁজছেন। তাঁর দাবি, আগে সিপিএম নেতারা মমতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তৃণমূল নেত্রী তাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন না। এখন পরিস্থিতি বদলেছে বলেই তিনি মন্তব্য করেন। দিলীপের মতে, ‘আগে যখন তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করতেন, তিনি তাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন না। এখন পরিস্থিতি উল্টো। মনে হচ্ছে, তিনিই তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন অথবা তাঁদের ফোনের অপেক্ষা করছেন।’ তাঁর আরও বক্তব্য, ‘বাংলায় তাঁর আর কোনো ভূমিকা নেই। তাই তিনি অন্য কোথাও ভূমিকা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।’
এদিকে নির্বাচন কমিশন এবং ‘এসআইআর’ নিয়ে বিরোধী দলগুলির মধ্যে সমন্বয়ের প্রক্রিয়া আরও এগিয়েছে। সংবাদ সংস্থা পিটিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠক হতে পারে। কমিশনের অন্দরের মতপার্থক্য, ‘এসআইআর’, ভোটার তালিকা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবি — সবকটি বিষয়ই বৈঠকের আলোচ্য হতে পারে। এর পাশাপাশি বিরোধী দলগুলির মধ্যে বৃহত্তর সমন্বয়ের বিষয়েও আলোচনা হতে পারে বলে সূত্রের খবর। অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ আপাতত সরিয়ে রেখে জাতীয় স্তরের একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নে তৃণমূল ও বামেদের মধ্যে কথাবার্তার সূচনা হয়েছে। সে যোগাযোগ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়, কিংবা তা বৃহত্তর রাজনৈতিক সমন্বয়ের দিকে এগোয় কি না, তা সময়ই বলবে। আপাতত নির্বাচন কমিশন এবং এসআইআরকে ঘিরে বিরোধীদের যৌথ অবস্থান তৈরির প্রক্রিয়াতেই গুরুত্ব দিচ্ছেন দুই পক্ষ।
❤ Support Us







