- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ১৩, ২০২৬
‘জেলে ঢোকাও, গুলি করে মারো, তবু আমাদের ভোট কমবে না’— একদিনে চার জায়গায় নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ মমতার
চারটি পৃথক জনসভা ও কর্মসূচিকে ঘিরে সোমবার ফের নির্বাচনী প্রচারের ময়দানে পুরনো, ঝাঁঝালো ব্যক্তিত্বে দেখা গেল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সিউড়ি, কাঁকসা, বাঁকুড়া ও দুর্গাপুর— একদিনে একাধিক জায়গায় সভা, পদযাত্রা ও প্রচার কর্মসূচি থেকে বিজেপি ও কেন্দ্র সরকারকে একের পর এক নিশানা করলেন তৃণমূল নেত্রী। কর্মসংস্থান, কেন্দ্রীয় প্রকল্প, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা থেকে শুরু করে ভোট প্রক্রিয়া, সব ইস্যুতেই সরব হলেন তিনি। একই সঙ্গে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সাফল্য তুলে ধরে ভোটারদের তৃণমূলের পক্ষে সমর্থন জানানোর আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী।
দিনের শুরু হয় সিউড়ির সভা দিয়ে। সেখানে উত্তরপ্রদেশের ‘বুলডোজার রাজনীতি’র প্রসঙ্গ টেনে সরাসরি বিজেপিকে নিশানা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, রাজ্যে এমন ধ্বংসাত্মক নীতিতে তিনি বিশ্বাস করেন না, বরং তাঁর সরকার ভালোবাসা ও জনকল্যাণের রাজনীতিতে আস্থা রাখে। একই সঙ্গে ভোটারদের উদ্দেশে সতর্কবার্তাও দেন তিনি, যাতে কেউ কোনোভাবে কেন্দ্রীয় সংস্থার ভয়ে বা প্রলোভনে না পড়েন, বিশেষত বিজেপির কাছ থেকে অর্থ বা সুবিধা গ্রহণের বিষয়ে তিনি স্পষ্টভাবে সাবধান করেন, কারণ তাঁর দাবি অনুযায়ী পরে সে অর্থ নিয়েই হয়রানির মুখে পড়তে হতে পারে। সিউড়ি কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়ের সমর্থনে প্রার্থীকে ছাপিয়ে নিজের উপস্থিতিকে কেন্দ্রীয় করে তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘উজ্জ্বল নয়, আমাকেই প্রার্থী ভাবুন। ২৯৪ আসনেই আমাকে প্রার্থী ভেবে ভোট দিন’। এ মন্তব্যে সমগ্র রাজ্যজুড়ে নির্বাচনী লড়াইকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আবহ দেওয়ার চেষ্টা করেন তৃণমূল নেত্রী।
এরপর কাঁকসা ও আউশগ্রাম অঞ্চলে পৌঁছে শ্যামাপ্রসন্ন লোহার ও অলোককুমার মাঝির সমর্থনে প্রচার করেন তিনি। সেখানে জনসংযোগমূলক বক্তব্যে সংগঠনকে শক্তিশালী করার বার্তা দেন, পাশাপাশি স্থানীয় প্রার্থীদের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালান। সেখান থেকে বাঁকুড়ার দিকে অগ্রসর হয়ে তামলিবাঁধ স্টেডিয়াম থেকে হিন্দু হাই স্কুল পর্যন্ত পদযাত্রায় অংশ নেন তিনি, যেখানে জনস্রোতের সামনে দাঁড়িয়ে দলের প্রার্থী অনুপ মণ্ডলের সমর্থনে প্রচার চালান। দুপুরের পর দুর্গাপুরে গিয়ে চতুরঙ্গ ময়দানে আয়োজিত সভায় যোগ দেন মুখ্যমন্ত্রী, যেখানে দুর্গাপুর পূর্ব ও পশ্চিম কেন্দ্রের প্রার্থী প্রদীপকুমার মজুমদার ও কবি দত্তের সমর্থনে জনসভা করেন তিনি। এখানেই তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণ দেখাঁ যায়। কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মসংস্থান নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, দুর্গাপুরের একাধিক কেন্দ্রীয় কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাজ্যে শিল্প ও চাকরির সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। কেন্দ্রের ঘোষিত দুই কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি কোথায় গেল— এই প্রশ্ন তুলে তিনি দাবি করেন, রাজ্য সরকার নিজেদের উদ্যোগে বেকারত্ব ৪০ শতাংশ কমিয়েছে।
দুর্গাপুরের সভা থেকেই সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত মন্তব্যটি আসে। তিনি প্রকাশ্যে বলেন, ‘আমাকে জেলে ঢুকিয়ে দিন, আরও বেশি ভোট পাব। না হলে গুলি করে মেরে দিন।’ তাঁর এ বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। প্রতিরোধ ও চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেওয়ার পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরেন তিনি। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী এবং দুয়ারে সরকার প্রকল্পকে তিনি বিশ্বমানের উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন, এ ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দেশের অন্য কোনো রাজ্য সরকার করতে পারেনি। আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প নিয়েও তিনি কটাক্ষ করে বলেন, এতে সাধারণ মানুষ প্রকৃত সুবিধা পান না।মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে এদিন ফের উঠে আসে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার কথা। ১০০ দিনের কাজের টাকা কেন্দ্র সরকার আটকে রেখেছে বলে অভিযোগ করে তিনি জানান, এই পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকার নিজস্ব উদ্যোগে ‘মহাত্মাশ্রী’ প্রকল্প চালু করে উন্নয়নমূলক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ভোট গণনা ঘিরেও দলের কর্মীদের উদ্দেশে সতর্ক বার্তা দেন তিনি। ইভিএম মেশিনের উপর কড়া নজর রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ভোটের দিন কোনো গাফিলতি বা অনিয়ম হলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ জানাতে হবে, যাতে ভোট ‘লুট’ না হয়। সোমবার, প্রায় প্রতিটি সভাতেই কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপিকে আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল মমতার। এনআরসি, ডিলিমিটেশন এবং এসআইআর-সহ একাধিক ইস্যু তুলে অভিযোগ করেন, বাংলাকে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনার ষড়যন্ত্র চলছে এবং রাজ্যের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, তাঁরা ইঞ্চি ইঞ্চি লড়াই করে বাংলাকে রক্ষা করবেন। শেষপর্বে অমিত শাহকে উদ্দেশ করে তিনি কটাক্ষ করেন, কতদিন বাংলায় থাকবেন—বেশিদিন থাকলে মানুষ তাঁদের ভুলে যাবে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে, দাঙ্গার রাজনীতি করে কেউ মানুষের সমর্থন অর্জন করতে পারে না।
❤ Support Us





