- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ৩, ২০২৬
‘বহিরাগত দিয়ে বাংলায় অশান্তির ছক, প্রকৃত ভোটারদের আটকাতে পারে কেন্দ্রীয় বাহিনী’ — হরিরামপুরে বিজেপিকে নিশানা করে বিস্ফোরক মমতা
দক্ষিণ দিনাজপুরের হরিরামপুরে নির্বাচনী প্রচারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ফের আক্রমণাত্মক সুরে কেন্দ্র ও বিজেপিকে নিশানা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার হাজারিপাড়া মাঠের জনসভায় তৃণমূল সুপ্রিমো একের পর এক ইস্যু তুলে ধরে যেমন কেন্দ্র ও বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ শানালেন, তেমনই সংগঠন ও সাধারণ ভোটারদের উদ্দেশে দিলেন সতর্কবার্তা, নির্দেশ আর রাজনৈতিক বার্তা।
শুরুতেই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগকে সামনে আনেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, পরিকল্পিত ভাবে বহু মানুষের নাম কেটে দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে বুথ স্তরের সংগঠনকে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বুথ লেভেল এজেন্টদের শুধু ভোটের দিন দায়িত্ব পালন করলেই চলবে না, প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনালে গিয়ে নাম পুনর্নিবন্ধনের আপিলের ক্ষেত্রেও তাঁদের এগিয়ে আসতে হবে এবং সাধারণ মানুষকে সহায়তা করতে হবে। জনতার উদ্দেশে সতর্কবার্তাও শোনান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, বিভিন্ন এলাকায় বিজেপির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচয় দিয়ে কিছু ব্যক্তি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের নম্বর সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে। ‘ভুলেও আপনার ব্যাঙ্কের তথ্য দেবেন না, এটা চক্রান্ত’— মঞ্চ থেকে এমন সতর্কতা শোনান তিনি।
এরপরই তাঁর বক্তব্যে আসে মালদহের সাম্প্রতিক অশান্তির প্রসঙ্গ। কালিয়াচকের ঘটনায় বিচারকদের আটকে রাখার মতো নজিরবিহীন পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, অশান্তির নেপথ্যে যিনি ‘মূলচক্রী’, তাঁকে গ্রেফতার করেছে রাজ্যের সিআইডি। তিনি জানান, ওই ব্যক্তি মুম্বই থেকে এসেছিল, এদিন বাগডোগরা বিমানবন্দর দিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিল। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা পৌঁছনোর আগেই তাঁকে পাকড়াও করা হয়। এ ঘটনাকে সামনে রেখে তিনি ফের অভিযোগ তোলেন, বাইরে থেকে লোক ঢুকিয়ে অশান্তি ছড়ানোর ছক কষা হয়েছিল।
এদিন, বিজেপির বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত অভিযোগ আনেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে উসকে দিয়ে রাজ্যে অশান্ত পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক স্তরে ব্যাপক রদবদলের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘অন্যান্য রাজ্যে যেখানে দশ-এগারো জন অফিসার বদলি হয়, সেখানে বাংলায় চারশোরও বেশি অফিসারকে সরানো হয়েছে।’ তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনকে প্রভাবিত করতেই এই পদক্ষেপ। ভোটের আগে পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিস্থিতিও তুলে ধরেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, বাংলার বহু শ্রমিক যারা অন্য রাজ্যে কাজ করেন, তাঁরা ভোটের আগে ঘরে ফিরতে চাইলে তাঁদের ট্রেনের টিকিট দেওয়া হচ্ছে না। শুধু তাই নয়, উত্তরপ্রদেশ, ওডিশা, দিল্লি-সহ বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্যে বাংলায় কথা বললেই তাঁদের হেনস্থা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ভোটের দিনকে সামনে রেখে বিশেষ সতর্কবার্তা দিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করেন, কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে ভোটারদের ভোট দিতে বাধা দেওয়া হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দলীয় প্রার্থীদের অতি আত্মবিশ্বাসী না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক এলাকায় নজরদারি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে মহিলাদের উদ্দেশে তাঁর আহ্বান, প্রয়োজনে তাঁরা নিজেরাই এলাকায় পাহারা দিন, যাতে কেউ ভোটারদের ভয় দেখাতে বা আটকাতে না পারে। লক্ষ্মীর ভান্ডার কিংবা যুবসাথীর মতো প্রকল্পের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বোঝাতে চান, এসব সুবিধা বজায় রাখতে হলে ভোটাধিকার রক্ষা করাও জরুরি।
ভাষণে আসন পুনর্বিন্যাস নিয়েও বিস্ফোরক অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, বিজেপি পরিকল্পিত ভাবে বাংলার কিছু অংশকে বিহারের সঙ্গে যুক্ত করে আলাদা রাজ্য গঠনের ছক কষছে। যদিও সে পরিকল্পনা সফল হবে না বলেই তাঁর আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য, ‘২০২৬-এই বাংলার মানুষ জবাব দেবে।’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-এর রাজ্যে দীর্ঘ সময় অবস্থানের সম্ভাবনা নিয়েও কটাক্ষ করেন মুখ্যমন্ত্রী। ‘ভয় দেখাতে বলছে ২৫ দিন থাকবে। তুমি ৩৬৫ দিন থাকো— তোমার মুখ যত মানুষ দেখবে, ততই ভোট কমবে’— তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানান তিনি। তাঁর সংযোজন, মানুষের মনে অত্যাচার ও দাঙ্গার স্মৃতিই জেগে ওঠে সেই মুখ দেখলে। বিজেপির প্রার্থী নির্বাচন নিয়েও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি তিনি। বালুরঘাটে বিদায়ী বিধায়ক ও অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিড়িকে টিকিট না দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘ভদ্রলোকদের জায়গা দিচ্ছে না ওরা, ভাল মানুষ চায় না।’
মালদহের কালিয়াচক কাণ্ড প্রসঙ্গে আরও একবার ফিরে এসে তিনি জনতার উদ্দেশে আবেদন জানান, ভোটের সময় যাতে বাইরে থেকে কেউ ঢুকে অশান্তি ছড়াতে না পারে, সে দিকে সবাইকে নজর রাখতে হবে। বেআইনি অর্থ বা অস্ত্র প্রবেশ রুখতেও সতর্ক থাকতে বলেন তিনি। একই সঙ্গে অভিযোগ করেন, বর্তমানে রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতার বড় অংশই নির্বাচন কমিশনের হাতে চলে গিয়েছে এবং কমিশনের পছন্দমতো অফিসারদেরই নিয়োগ করা হয়েছে। তবে এ পরিস্থিতি সাময়িক বলেই তাঁর দাবি, ভোটের পর সবকিছু পুনরুদ্ধার করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
❤ Support Us







