- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬
‘বাংলা নিয়েছে, আমরা দিল্লি নেব’ : পালাবদলের পর শ্রীরামপুরের প্রথম সভাতেই রণংদেহী মমতা, নিশানায় কমিশন-বিজেপি
বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণা, পালাবদলের পরে প্রথম বার কলকাতার বাইরে জেলা সফর। আদালতের অনুমতি ঘিরে টানাপড়েন, সভায় যাওয়ার পথে দলীয় নেতার গাড়িতে হামলার অভিযোগ, কর্মীদের ধরপাকড় ও পুলিশি বাধার অভিযোগ — সব মিলিয়ে উত্তপ্ত আবহেই শনিবার শ্রীরামপুরের কোর্ট ময়দানে সভা করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঞ্চে উঠেই একের পর এক নিশানা করলেন বিজেপি, রাজ্য প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনকে। বক্তৃতার বড়ো অংশ জুড়ে থাকল ‘এসআইআর’, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, ভোট গণনায় অনিয়মের অভিযোগ। পাশাপাশি হকার উচ্ছেদ, ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’, নন্দীগ্রাম এবং বিরোধী ঐক্যের প্রসঙ্গও তুললেন তৃণমূল নেত্রী।
সভা থেকে মমতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা, ‘আপনারা বাংলা নিয়েছেন, আমরা দিল্লি নেব।’ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল হারেনি, বরং তাঁকে ‘জোর করে হারানো হয়েছে’ —এমনই দাবি করলেন তিনি। ‘এসআইআর’-এর মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানালেন মমতা। শনিবারের সভাটি ছিল একাধিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরে শ্রীরামপুরের কোর্ট ময়দানে সভার অনুমতি মিলেছিল কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে। তার আগে থেকেই সভা ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর চলছিল। শুক্রবার কালীঘাটের বাড়িতে দাঁড়িয়ে মমতা অভিযোগ করেছিলেন, তাঁকে সভায় যেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। পুলিশি নজরদারির অভিযোগও তুলেছিলেন তিনি। শনিবার সভার মঞ্চ থেকেও সেই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করেন তৃণমূল নেত্রী।
সভায় যাওয়ার পথে উত্তরপাড়ায় তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষের গাড়িতে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করেও উত্তেজনা তৈরি হয়। তৃণমূলের দাবি, গাড়ি লক্ষ্য করে ইট-পাথর, লাঠি, রড এবং ডিম ছোড়া হয়েছিল। কুণাল আহত হয়েছেন বলেও দলের তরফে দাবি করা হয়। ঘটনাটির প্রসঙ্গ টেনে মমতা বলেন, ‘আমি আসার আগে শুনছিলাম উত্তরপাড়া জ্যাম করে রেখেছেন, জিটি রোড জ্যাম। কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আমাদের বিধায়ক কুণাল ঘোষের গাড়িতে ভাঙচুর করা হয়েছে।’ এর পরেই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, সভায় মানুষ যাতে না আসেন, সে জন্য আগের রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এমনকি ড্রোনে ছবি তুলে সভায় যাঁদের দেখা যাবে, তাঁদের রাতে গ্রেফতার করা হবে বলেও ভয় দেখানো হয়েছিল বলে দাবি মমতার। পুলিশের উদ্দেশে তাঁর প্রশ্ন, ‘আপনারা আইনের রক্ষক, কেন ভক্ষক হবেন?’
ভোটের ফল নিয়ে আপত্তির প্রসঙ্গেই বক্তৃতার শুরুতে মমতা বলেন, ‘আমরা কিন্তু হারিনি। আমাদের জোর করে হারানো হয়েছে।’ তাঁর দাবি, ‘এসআইআর’-এর নাম করে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯২-৯৩ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল প্রথম থেকেই এ প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছে বলেও দাবি করেন তিনি। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মমতা। সীমা খান্না নামে এক আধিকারিকের ভূমিকা নিয়ে আগেও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, ফর্ম-৬ নিয়ে অনিয়ম হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ফের ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে কটাক্ষ করেন মমতা। তাঁর বক্তব্য, ‘ভ্যানিশ কুমারকে যেমন ধরেছি, তেমন অন্যায়কারীদের ধরব। ভ্যানিশ কুমার মাস্ট গো।’ জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলেও জানিয়ে দেন তিনি।মমতার অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। বহু নাম ফেরানো হয়েছিল বলেও তাঁর দাবি। তাঁর দাবি, ‘মানুষের ভোট কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।’
শুধু ‘এসআইআর’ নয়, ভোট গণনার প্রক্রিয়া নিয়েও এ দিন বিস্তর অভিযোগ করেন মমতা। তাঁর দাবি, গণনার সময় তৃণমূলের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছিল। ইভিএম থেকে গণনা —পুরো প্রক্রিয়াই ‘হাইজ্যাক’ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর। তৃণমূল নেত্রীর বক্তব্য, ‘এসআইআর’ নিয়ে তাঁরা প্রথম থেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং সে সূত্রেই ভোটার তালিকা সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। তাঁর দাবি, প্রয়োজনে এই বিষয় নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত লড়াই চালানো হবে। তবে সভায় করা এই সমস্ত অভিযোগই মমতার রাজনৈতিক বক্তব্য ও দাবি হিসেবে সামনে এসেছে। ভোটার তালিকা বা ভোট গণনা নিয়ে তাঁর উত্থাপিত সব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীন যাচাই করা তথ্য তিনি সভায় পেশ করেননি।
ভোটের ফলকে ঘিরে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার পরেই বিজেপির উদ্দেশে আরও বড়ো রাজনৈতিক বার্তা দেন মমতা। তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘আপনারা আমাদের কী হারাবেন? একটা চেয়ার দখল করেছেন জোর করে। ওই চেয়ার আমরা কেয়ার করি না। আমরা মানুষের চেয়ার কেয়ার করি। আপনারা বাংলা নিয়েছেন, আমরা দিল্লি নেব।’ বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, ‘যদি জিতেই থাকেন মানুষের ভোটে, কেন অন্য দলকে মিটিং করতে দেবেন না?’ এ সূত্রেই গণতান্ত্রিক অধিকার এবং বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মসূচির স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তোলেন মমতা। তাঁর দাবি, ক্ষমতায় আসার পরে বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূল কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁদের সভা করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
নতুন সরকারের আমলে বিভিন্ন এলাকায় হকার উচ্ছেদের প্রসঙ্গও উঠে আসে মমতার বক্তৃতায়। শহর থেকে জেলা — বিভিন্ন জায়গায় হকারদের উচ্ছেদ করে বহু মানুষকে কর্মহীন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। মমতার বক্তব্য, গরিব মানুষের রুজি-রোজগারের অধিকার রয়েছে। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে তাঁদের উচ্ছেদ করা যায় না। শ্রীরামপুরের সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাশে নিয়ে হকারদের হয়ে আদালতে লড়াই করার বার্তাও দেন তিনি। বলেন, ‘আমি হকারদের কেস নিয়ে কোর্টে লড়ব। তাঁদের কাজের সন্ধান দিতে হবে। এদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। বেঁচে থাকা আমাদের অধিকার। উপার্জন করা আমাদের অধিকার। এটা কেড়ে নেওয়া যায় না।’ হকারদের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে মমতা বলেন, ক্ষমতাবানদের সুবিধা করে দিয়ে গরিব মানুষের জীবিকা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এই নীতির বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথাই ফের জানান তিনি।
সরকারি প্রকল্পের প্রসঙ্গেও এ দিন বিজেপিকে আক্রমণ করেন মমতা। ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’-এর নাম করে তাঁর অভিযোগ, ভোটের আগে মহিলাদের একাধিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ফর্ম পূরণ করানো হয়েছিল। কিন্তু ভোট মিটে যাওয়ার পরে সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সঙ্গে তুলনা টেনে মমতা বলেন, তাঁর সরকারের সময়ে মহিলাদের নিয়মিত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হতো। তাঁর অভিযোগ, নতুন সরকারের প্রকল্পে বহু মহিলা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। মমতার দাবি, ‘ভোটের আগে মা-বোনেরা সবাই অন্নপূর্ণা পাবে বলে আশ্বাস দিয়েছিল। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সবাই পেত। যত দিন বাঁচবে, তত দিন আমরা টাকা দিতাম। এখন অন্নপূর্ণা সবাইকে দেবে বলেও সেই কথা রাখল না।’
সভামঞ্চ থেকে ‘এসআইআর’ ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে আন্দোলনে বিরোধী দলগুলিকে একজোট হওয়ার আহ্বান জানান মমতা। তাঁর বক্তব্য, এই ইস্যুতে দলীয় রং দেখা উচিত নয়। যে দলই গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নে পাশে থাকবে, তাদের সঙ্গে আন্দোলনে থাকার বার্তা দেন তিনি। রাহুল গান্ধীর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে বলেও সভায় জানান তৃণমূল নেত্রী। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে বিরোধী জোটের বৈঠকে তিনি যোগ দিতে পারেন বলেও জানান। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির সঙ্গে তাঁর ফোনে কথোপকথনের প্রসঙ্গও টানেন মমতা। ভোটার তালিকা এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধী দলগুলির বৃহত্তর সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।
নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের গ্রেফতারির প্রসঙ্গও এ দিন তোলেন মমতা। ২০০৭ সালের জমি আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তাঁর প্রশ্ন, সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরেও কংগ্রেসের প্রার্থীকে কেন গ্রেফতার করা হলো? মমতার বক্তব্য, ‘ভূমি আন্দোলনের সঙ্গে আমিও যুক্ত ছিলাম। আমার সমর্থন আছে কংগ্রেস প্রার্থীর সঙ্গে।’ নন্দীগ্রামের অতীত আন্দোলনে কারা ছিলেন এবং কারা ছিলেন না, তা নিয়ে পরোক্ষে বিজেপি নেতৃত্বকেও আক্রমণ করেন তিনি। পাশাপাশি, দুর্গাপুজোর পরে নতুন করে বৃহৎ আন্দোলনের কর্মসূচির ইঙ্গিতও দেন তৃণমূল নেত্রী। কর্মীদের ভয় কাটিয়ে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়ে তাঁর বার্তা, পুজোর মরসুম শেষ হওয়ার পরে ফের রাজনৈতিক কর্মসূচি নেওয়া হবে। মমতার হুঁশিয়ারি, ‘পুজো মরশুমের পর্বটা মিটে যাক, তারপর আমরা আর একটা দশমী করব।’ কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ‘ভয় ভাঙুন, তবেই জয় আসবে।’
নিজের বাড়ির সামনে নজরদারি চালানো হচ্ছে বলেও এদিন অভিযোগ করেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, নিরাপত্তা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বাড়ির সামনে বিশেষ শাখার লোকজনকে রেখে নজর রাখা হচ্ছে — কে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসছেন, তা দেখা হচ্ছে। নির্বাচন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে মমতা বলেন, সমস্ত ঘটনা নথিবদ্ধ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। তাঁর দাবি, ‘আজকে ভ্যানিশ কুমারকে যেমন ধরেছি, তেমনি যাঁরা এরকম করছেন প্রত্যেকটা রেকর্ড করে রাখা আছে। কেউ পার পাবেন না।’ বিজেপি সরকারের আমলে খুন, ধর্ষণ এবং তোলাবাজির ঘটনা বেড়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। চার মাসে ৬৫টি খুন এবং ৪৫টি ধর্ষণের দাবি করেন মমতা। এই অভিযোগগুলির ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
বক্তৃতার শেষ পর্বে সভার ভিড় থেকে ভেসে আসে শিশুকণ্ঠে ‘দিদি’ ডাক। সে আওয়াজে থেমে গিয়ে মমতা বলেন, ‘শিশুর কণ্ঠেও আওয়াজ উঠছে। বুঝতে পারছেন। বাংলা জবাব দেবে।’নিজের শারীরিক কষ্টের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। নানা আঘাতের মধ্যেও রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে মমতার বক্তব্য, ‘জীবন্ত লাশের মতো আমার সারা শরীরে চোট। তবু লড়াইটা লড়ে যাচ্ছি।’ সবশেষে ফের তাঁর মুখে শোনা যায় ‘খেলা হবে’ স্লোগানের সুর। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি পুনরায় তুলে মমতা বলেন, ‘আগে ভ্যানিশ কুমারকে বিদায় করতে হবে। ও ফিনিশ হলে বাদবাকি খেলাও হবে।’
❤ Support Us





