- বি। দে । শ
- অক্টোবর ৯, ২০২৬
নভিকে নোবেল শান্তি
যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার বিচারে আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি পেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয় বংশোদ্ভূত আইনজীবী ও বিচারক নভানেথেম ‘নভি’ পিল্লাই। ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম ঘোষণা করেছে নরওয়ের নোবেল কমিটি। আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বশান্তির প্রসারে দীর্ঘদিনের ভূমিকার জন্য ৮৫ বছর বয়সি এই বিশিষ্ট আইনজ্ঞকে সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিটি।
দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল প্রদেশের ডারবানে এক ভারতীয় তামিল পরিবারে জন্ম পিল্লাইয়ের। বর্ণবিদ্বেষের কঠিন পরিবেশে বেড়ে ওঠা থেকেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পথ বেছে নেন তিনি। আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সরব হন। দেশের বর্ণবিদ্বেষবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা এবং প্রয়াত প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার আইনজীবী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।
পিল্লাইয়ের কর্মজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায় আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা। দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টে বিচারকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রোয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার হাইকমিশনার হিসেবেও কাজ করেছেন। যুদ্ধ, সংঘাত এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার মানুষের অধিকার রক্ষায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক মহলে তাঁকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে।
নারী অধিকার এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে পিল্লাইয়ের। ১৯৯৫ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত রোয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি একটি ঐতিহাসিক রায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই মামলায় যুদ্ধকালীন ধর্ষণ ও যৌনহিংসাকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গণহত্যার অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এই সিদ্ধান্তকে যৌনহিংসার বিচার এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংঘাতের সময় নারীর উপর যৌন নির্যাতনকে নিছক যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে না দেখে, পরিকল্পিতভাবে কোনও জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার অপরাধের অংশ হিসেবে বিচার করার ক্ষেত্রে এই রায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
মায়ানমারের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন সংক্রান্ত মামলার বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন পিল্লাই। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার প্রশ্নে তাঁর ভূমিকা আন্তর্জাতিক স্তরে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
শিক্ষাজীবনেও সাফল্যের নজির গড়েছিলেন পিল্লাই। মহাত্মা গাঁধীর কর্মভূমি হিসেবে পরিচিত নাটাল প্রদেশের নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর ১৯৬৭ সালে তিনি ওই অঞ্চলে প্রথম মহিলা হিসেবে একটি আইন সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন নাটাল প্রদেশের প্রথম মহিলা আইনজীবী। পরবর্তীতে আমেরিকার হার্ভার্ড ল’ স্কুলে পড়াশোনা করেন তিনি। বর্ণবিদ্বেষের বাধা পেরিয়ে আইন পেশায় প্রতিষ্ঠা পাওয়া থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আদালতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন—তাঁর দীর্ঘ যাত্রাপথের প্রতিটি অধ্যায়েই উঠে এসেছে ন্যায়বিচার ও সমানাধিকারের প্রশ্ন।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষবিরোধী আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব—নভি পিল্লাইয়ের কর্মজীবন বিস্তৃত হয়েছে নানা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে। যুদ্ধকালীন যৌনহিংসার বিচারকে নতুন আইনি দৃষ্টিভঙ্গি দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রসারে তাঁর অবদানই ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের স্বীকৃতির কেন্দ্রে রয়েছে।
❤ Support Us








