- এই মুহূর্তে দে । শ
- মে ২০, ২০২৫
সংশোধিত ওয়াকফ আইন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি পেশ।৩ডি ধারায় স্থগিতাদেশ চাইলেন আবেদনকারীরা, বুধে ফের মামলার শুনানি
মঙ্গলবার, সংশোধিত ওয়াকফ আইন- ২০২৫ সংক্রান্ত শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টে জোরালো আইনি লড়াই চলেছে। গত বৃহস্পতিবার, শুনানি হওয়ার কথা ছিল, কেন্দ্রের আবেদনে তা পিছিয়ে দেওয়া হয়। গত শুনানিতে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, সংশোধিত ওয়াকফ আইনের বিরুদ্ধে যেসব আবেদন জমা পড়েছে, তা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ শুনানি হবে মঙ্গলবার। সেইমতোই আজ, প্রধান বিচারপতি বিআর গবই এবং বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মাসিহ-র বেঞ্চে সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ শুরু হয় মামলার শুনানি। কিছুটা বিরতির পর ফের শুরু হয় শুনানি পর্ব, প্রায় বিকেল চারটে পর্যন্ত চলে। চার ঘণ্টার এই শুনানিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত বিষয় তুলে ধরেন মামলাকারী পক্ষের আইনজীবীরা। মূলত নতুন আইনের ৩ডি ধারা ঘিরেই আদালতে ওঠে বিস্তর প্রশ্ন। সেই ধারা বাতিলের পাশাপাশি তার উপরে স্থগিতাদেশ চাওয়া হয় আবেদনকারীদের তরফে।
সিব্বল বলেন, এই দুটি ধারা আদৌ বিলের মূল অংশ ছিল না এবং তা সংসদের যৌথ কমিটিতেও আলোচনার মধ্যে আসেনি। বরং সংসদে ভোটাভুটির ঠিক আগে চুপিসারে ওই ধারাগুলি সংযোজন করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর। তিনি আরো দাবি করেন, ‘এই আইনের মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চাইছে সরকার। যা একেবারেই অসাংবিধানিক। ওয়াকফ সম্পত্তি একবার দান হয়ে গেলে তা কারও হস্তগত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এই আইন উলটো পথে যাচ্ছে।’ সিব্বলের অভিযোগের সঙ্গে সুর মেলান আর এক আইনজীবী হাফেজা আহমেদি। তাঁর আশঙ্কা, ‘৩ডি ধারার মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। বহু পুরনো মসজিদ বা ধর্মীয় স্থাপনার উপর এর প্রভাব পড়া অসম্ভব নয়।’ ফলে ওই ধারার উপর অবিলম্বে স্থগিতাদেশ দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি। যদিও মঙ্গলবারের শুনানিতে আদালত স্থগিতাদেশের কোনো নির্দেশ দেয়নি। জানানো হয়েছে, বুধবার ফের এ মামলার শুনানি হবে। সিব্বলের বক্তব্যের জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘খাজুরাহো মন্দির সংরক্ষিত সৌধ হলেও সেখানে প্রার্থনা হয়। তাহলে এই আইন কি প্রার্থনার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে?’ এই প্রশ্নের উত্তরে সিব্বল জানান, ‘সংরক্ষিত সৌধ হলেও যদি ওয়াকফের তালিকায় থাকে, তাহলে নতুন আইন অনুযায়ী সেটি আর ওয়াকফ বলে বিবেচিত হবে না। এটা বড়ো রকমের পরিবর্তন।’
ওয়াকফ আইনের ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, এখন ওয়াকফ কাউন্সিলে ১০ জন মুসলিম সদস্যের পাশাপাশি ১২ জন অমুসলিম সদস্য থাকার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়েও আদালতে আপত্তি তোলেন সিব্বল। বলেন, ‘আগে এই কাউন্সিলের সব সদস্য মুসলিম ছিলেন। এখন তার গঠন পুরো বদলে যাচ্ছে। এতে সংখ্যালঘুদের ওপর হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।’ তা ছাড়াও, নতুন আইন মোতাবেক কেউ যদি ওয়াকফে সম্পত্তি দান করতে চান, তবে তাঁকে প্রমাণ করতে হবে তিনি কমপক্ষে ৫ বছর ধরে মুসলিম ধর্ম পালন করছেন। এই শর্তকেই চ্যালেঞ্জ করেন সিব্বল। তাঁর প্রশ্ন, ‘যদি কেউ মৃত্যুশয্যায় শায়িত থাকেন আর নিজের সম্পত্তি ওয়াকফে দিতে চান, তাহলে কীভাবে প্রমাণ করবেন তিনি কত বছর ধরে ধর্ম পালন করছেন ? এমন নিয়ম সংবিধানের পরিপন্থী।’ এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন হাফেজা আহমেদিও। তাঁর বক্তব্য, ‘ধর্ম পালন কত বছর ধরে হচ্ছে, তা যাচাই করার কোনও নির্দিষ্ট মাপকাঠি বা পদ্ধতির উল্লেখ নেই আইনে। তাহলে এই শর্ত কীভাবে কার্যকর হবে?’ ওয়াকফ কাউন্সিলে অ-মুসলিম নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর আদালত বুদ্ধগয়ার প্রসঙ্গ তোলে। প্রধান বিচারপতির প্রশ্ন, ‘বুদ্ধগয়াতে তো মূলত হিন্দুরাই থাকেন। তাহলে?’ সিব্বলের জবাব, ‘ওটি হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয়ের সম্প্রদায়েরই উপাসনাস্থল। সেই অনুযায়ী বুদ্ধগয়া আইনে এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে।’
সম্প্রতি কেন্দ্র দাবি করেছে, দেশে ওয়াকফ সম্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে। সে দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি। তিনি বলেন, ‘২০১৩ সাল থেকে ওয়াকফগুলি অনলাইন পোর্টালে রেজিস্ট্রেশন করতে শুরু করেছে। সেই রেজিস্ট্রেশনের তথ্যকে ‘সম্পত্তির বৃদ্ধি’ বলে ব্যাখ্যা করছে কেন্দ্র।’ তিনি জানান, ‘২৮টি রাজ্যের মধ্যে মাত্র ৫টি রাজ্যে এ সংক্রান্ত সমীক্ষা হয়েছে। অর্থাৎ জাতীয় স্তরে ওয়াকফ সম্পত্তির প্রকৃত পরিমাণ বোঝার মতো কোনও পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষাই হয়নি। যা তথ্য রয়েছে, তা মোটের উপর মাত্র ৯.৩ শতাংশ।’ আইনজীবি রাজীব ধাওয়ান বলেন, ‘ধর্মীয় সম্পত্তি নিয়ে এর আগে এমন ব্যাখ্যা কোনও সরকার দেয়নি। এমনকি ব্রিটিশ আমলেও ওয়াকফের ধারণাকে বদলে দেওয়া হয়নি। তাহলে এখন এই পরিবর্তনের যুক্তিটা কী?’ শুনানির এক পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনারা যদি যথাযথ ভাবে মামলা মজবুত না করেন, তাহলে আদালত এতে মাথা গলাবে না।’ তবে তিনি জানান, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং তা নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করছে বেঞ্চ।
প্রধান বিচারপতি গবইয়ের বেঞ্চ মঙ্গলবারের শুনানির শেষে জানায়, আপাতত আগের নির্দেশই বহাল থাকবে। পরবর্তী শুনানি হবে বুধবার। মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে, আরও বিস্তারিত শুনানি হবে বলেই ইঙ্গিত সুপ্রিম কোর্টের। আদালত জানিয়েছে, সমস্ত আবেদনকারীর বক্তব্য শোনার পরেই তাঁরা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছবেন। এই মামলার রায় শুধু সংশোধিত ওয়াকফ আইন নয়, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র, সংখ্যালঘু অধিকার এবং ধর্মীয় সম্পত্তির সংজ্ঞা ইত্যাদি বহু স্পর্শকাতর বিষয় জড়িয়ে আছে। সব দিক চিন্তা করেই সাবধানে পা ফেলতে চাইছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
❤ Support Us







