- এই মুহূর্তে দে । শ
- এপ্রিল ২, ২০২৬
বিদেশে পরিযায়ী ভারতীয় শ্রমিকের মৃত্যু বাড়ছে । সংসদে ৫ বছরের উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান পেশ কেন্দ্রের
বিদেশে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকদের মৃত্যুর হার, নিরাপত্তা ও কর্মপরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াল কেন্দ্রের সদ্য প্রকাশিত তথ্য। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ২০ জনেরও বেশি ভারতীয় শ্রমিক বিদেশে মৃত্যুবরণ করেছেন বলে সংসদে জানিয়েছে কেন্দ্র। বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং রাজ্যসভায় লিখিত জবাবে এ তথ্য পেশ করেছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৫ বছরে মোট ৩৭,৭৪০ জন ভারতীয় শ্রমিক বিদেশে প্রাণ হারিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসনের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মৃত্যুর সংখ্যা বছরভিত্তিক ওঠানামা করলেও সামগ্রিকভাবে ছবিটা ভয়াবহ। ২০২১ সালে সর্বাধিক ৮,২৩৪ জন ভারতীয় শ্রমিক বিদেশে মারা যান, যা এই ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরবর্তী বছরে অর্থাৎ ২০২২ সালে মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেয়ে ৬,৬১৪-এ নেমে আসে। ২০২৩ সাল থেকে ফের মৃত্যুহার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে, ৭,২৯১ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৭,৭৪৭-এ এবং ২০২৫ সালে সংখ্যাটি আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৭,৮৫৪ জনে পৌঁছায়। এই ধারাবাহিক মৃত্যু আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে ভারতীয় শ্রমিকদের ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
ভারতীয় শ্রমিকদের অকাল মৃত্যুর বেশিরভাগ ঘটনা ঘটেছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে। এইসব অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় শ্রমিক কর্মরত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট মৃত্যুর প্রায় ৮৬ শতাংশই এই উপসাগরীয় দেশে ঘটেছে। দেশভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী সর্বাধিক মৃত্যুর সাক্ষী, যেখানে ৫ বছরে ১২,৩৮০ জন ভারতীয় শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সৌদি আরব, যেখানে মৃত্যুর সংখ্যা ১১,৭৫৭। এরপর কুয়েত ৩,৮৯০, ওমান ২,৮২১, মালয়েশিয়া ১,৯১৫ এবং কাতার ১,৭৬০ জন ভারতীয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এই সময়পর্বে। তবে শুধু মৃত্যুই নয়, বিদেশে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সংখ্যাও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিদেশে অবস্থিত ভারতীয় মিশনগুলো ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মোট ৮০,৯৮৫টি অভিযোগ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে শ্রমিকদের প্রতি নির্যাতন, শোষণ এবং বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রজনিত সমস্যা। দেশভিত্তিক অভিযোগের পরিসংখ্যানে আবারও ইউএই শীর্ষে, যেখানে ১৬,৯৬৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এরপর রয়েছে কুয়েত ১৫,২৩৪, ওমান ১৩,২৯৫ এবং সৌদি আরব ১২,৯৮৮টি অভিযোগ। অভিযোগগুলো মূলত বেতন না পাওয়া, চুক্তিভঙ্গ এবং কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত সমস্যাকে ঘিরে।
২০১২ থেকে ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘কমনওয়েলথ হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ’–এর বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছিল, উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ১০ জন ভারতীয় শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে। সে তথ্য রাইট টু ইনফরমেশন এবং সংসদীয় নথির ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ৬ টি উপসাগরীয় দেশ বাহরিন, ওমান, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী—মিলিয়ে সাড়ে ৬ বছরে অন্তত ২৪,৫৭০ জন ভারতীয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। সদ্য প্রকাশিত সরকারি তথ্য বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোতে (বাহরিনের তথ্য অনুপস্থিত) ৩২,৬০৮ জন ভারতীয় শ্রমিক মারা গেছেন, যা আগের সময়পর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। হিসাব অনুযায়ী উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৮ জন ভারতীয় শ্রমিকের মৃত্যু ঘটছে।
উপসাগরীয় অঞ্চল ছাড়াও অন্যান্য দেশেও শ্রম সংক্রান্ত সমস্যা ও অভিযোগের ফিরিস্তি লম্বা। মালয়েশিয়ায় ৮,৩৩৩টি এবং মালদ্বীপে ২,৯৮১টি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও অভিযোগের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মায়ানমারে গত ৫ বছরে কোনো মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও সেখানে ২,৫৪৮টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার মধ্যে ২০২৫ সালেই ১,৮৬৩টি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে, যা একক বছর হিসেবে অত্যন্ত উচ্চ। কম্বোডিয়ায় ৩১ জনের মৃত্যু হলেও অভিযোগের সংখ্যা ২,৫৩১ এবং লাওসে ১১ জনের মৃত্যু সত্ত্বেও ২,৪১৬টি অভিযোগ রেকর্ড হয়েছে। শ্রম-সংক্রান্ত অভিযোগের সামগ্রিক প্রবণতা ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী। ২০২১ সালে যেখানে অভিযোগের সংখ্যা ছিল ১১,৬৩২, সেখানে ২০২৪ সালে তা বেড়ে ১৬,২৬৩-এ পৌঁছায় এবং ২০২৫ সালে তা লাফিয়ে ২২,৪৭৯-এ দাঁড়ায়।
কেন্দ্র সরকারের মতে, বিদেশে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকদের সবচেয়ে সাধারণ সমস্যাগুলির মধ্যে রয়েছে সময়মতো বেতন বা প্রাপ্য সুবিধা না পাওয়া, চাকরি শেষে পাওনা আটকে রাখা, এবং চুক্তি অনুযায়ী পরিষেবা না দেওয়া। এছাড়াও, পাসপোর্ট অবৈধভাবে আটকে রাখা, দীর্ঘ সময় কাজ করানো হলেও ওভারটাইম না দেওয়া, ছুটি না দেওয়া, এবং কোম্পানি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে চাকরি হারানোর ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, মৌলিক শ্রম অধিকার অস্বীকার করা এবং চুক্তি শেষ হলেও দেশে ফেরার জন্য এক্সিট ভিসা না দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে মন্ত্রক জানিয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্র সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে জানানো হয়েছে, বিদেশে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কোনো ভারতীয় নাগরিক বিপদে পড়েছেন বলে তথ্য পাওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্ট দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শ্রম দফতর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা হয়। পাশাপাশি কনস্যুলার সহায়তা এবং আইনি সহায়তা প্রদান করা হয়। সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শ্রম ও মানবসম্পদ সহযোগিতা সংক্রান্ত বিস্তৃত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, যাতে বিদেশে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকদের স্বার্থ ও অধিকার সুরক্ষিত রাখা যায়।
❤ Support Us







