- এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- জুলাই ১, ২০২৫
স্মৃতির কুয়াশা সরিয়ে রুপালি পর্দায় এবার সিধো-কানহো
‘হুল’ — শব্দটার মধ্যেই ধ্বনিত হয় প্রতিরোধ, প্রতিশোধ, অস্তিত্ব আর স্বাধীনতার চিৎকার। কিন্তু সে ইতিহাস যাঁদের নিয়ে, তাঁদের কণ্ঠ আজও বিস্মৃত, কুয়াশাচ্ছন্দ, স্তব্ধ। সিধো-কানহু, মঙ্গলা মাঝি — নামগুলো পাঠ্যপুস্তকে অবান্তর, সিনেমার পর্দায় প্রায় অনুপস্থিত। অথচ এঁরাই ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে সেই প্রথম পদক্ষেপের নায়ক, যাঁরা কাঁধে তির-ধনুক তুলে মুখোমুখি হয়েছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের।
১৭০ বছর পেরিয়ে এসে, অবশেষে তাঁদের গল্প বলার দায় কাঁধে নিয়েছে বাংলা সিনেমা। ঐতিহাসিক সিনেমা নির্মাণ শুধুই অতীতকে সাজিয়ে তোলার কাজ নয়। এক জাতির স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের সংরক্ষণও। ঠিক সেই কাজটাই করতে চলেছে পরিচালক আবীর রায়ের নতুন বাংলা ছবি ‘হুল’। ছবির প্রথম পোস্টার সামনে এল ‘হুল দিবস’-র দিনেই। সময়টা প্রতীকী — কারণ, এই দিনেই ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল। বাংলার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মঞ্চে যখন ঐতিহাসিক চরিত্রের আকাল, তখন এক ভিন্ন ধারার ছবির জন্ম নিঃসন্দেহে সাহসী পদক্ষেপ। ছবির মুখ্য চরিত্রে কিঞ্জল নন্দ ও দেবাশিস মণ্ডল। সঙ্গে রয়েছেন চন্দন সেন, বিশ্বরূপ বিশ্বাস, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, উমা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্রীতমা দে। প্রযোজনায় অনুপল সাউ। পোস্টারে ধরা পড়েছে সময়ের ছাপ — কাঁধে ধনুক-বাণ, চোখে জ্বলন্ত প্রতিশোধের আগুন। ঝাড়খণ্ড ও ঝাড়গ্রামের বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে শ্যুট হয়েছে ছবিটি— যেখানে আজও বেঁচে আছে সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রেতছায়া।
বাংলা সিনেমা দীর্ঘদিন ধরেই গতানুগতিক থ্রিলার, প্রেম ও অতিপ্রাকৃতের ঘেরাটোপে বন্দি। সেখানে দাঁড়িয়ে ‘হুল’ এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে — কেন এত দিন আমরা মুখ ফিরিয়ে ছিলাম? কেন মূলনিবাসী ইতিহাস আমাদের মূল ধারার আলোচনায় নেই? সিনেমা তো শুধুই বিনোদন নয় — তা স্মৃতি রক্ষারও মাধ্যম। সাঁওতাল হুলের গাথা কেবল অরণ্যের অধিকারের লড়াই নয় — সাংস্কৃতিক দাবিরও লড়াই। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন। সিধো ও কানহো মুর্মুর নেতৃত্বে শুরু হল বিদ্রোহ। ঝাড়খণ্ড, বিহার, পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল সাঁওতালদের প্রতিবাদ। ব্রিটিশদের সহযোগিতায় স্থানীয় জমিদার, মহাজন ও পুলিশ-প্রশাসনের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। জমি কেড়ে নেওয়া, চরম কর আদায়, দাসত্বের জীবন—এসবই ছিল মূলনিবাসী জনজীবনের বাস্তব। আর এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিল ‘হুল’—যার অর্থই ‘বিদ্রোহ’। সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর হাজার হাজার মানুষ ধনুক-তীর হাতে নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন ব্রিটিশ সেনার বিরুদ্ধে। ইতিহাস বলে, মাত্র কয়েক মাসেই এই আন্দোলন ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। ১৫,০০০-এরও বেশি সাঁওতাল প্রাণ হারান সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আর জমিদারদের হাতে।। শুরু হয় নির্মম গণহত্যা। ইতিহাস বলছে, রাজনগরের পুরনো রাজবাড়ির কাছে সেই শতাব্দীপ্রাচীন গাবগাছেই ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল মঙ্গলা মাঝিকে। বলা হয়, কুশকর্ণিকা নদীর জল সেই দিন লাল হয়েছিল সাঁওতাল রক্তে।
অথচ পাঠ্যবইয়ে সে কথা খুব একটা নেই, শিল্প-সাহিত্য, সিনেমাতেও বিরল। জাতীয় স্তরে নেই মর্যাদা। স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও তাঁদের প্রাপ্তি বলতে কয়েকটি মূর্তি, কয়েকটি রাস্তার নাম। সাধারণ মানুষও জানেন না, আদিবাসী বিদ্রোহই ছিল ভারতের প্রথম সংগঠিত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা। পলাশি বা ১৮৫৭ নয়, হুলই ছিল প্রথম জাগরণ, বলছেন বহু ঐতিহাসিক। পরিচালক আবীর রায়ের কথায়, ‘১৭০ বছর কেটে গেল, কিন্তু কেউ তাঁদের কথা বলেন না। আমাদের ছবি সেই নীরবতাকে ভাঙবে।’ তাঁর কথায়, ‘সাঁওতালদের ইতিহাস শুধু বেদনার নয়, গৌরবেরও। তাঁদের অস্তিত্বের লড়াই, নিজেদের সংস্কৃতির দাবিদাওয়া — এ এক অনন্য বিপ্লব। আজকের প্রেক্ষিতে তা আরও প্রাসঙ্গিক।’ ‘হুল’ কেবল এক রোমাঞ্চকর বিপ্লবের সিনেম্যাটিক পুনরুত্থান নয়। বরং আত্মসমালোচনার সুযোগ। বাংলা সিনেমার কাছে এটি মৌলিক পরীক্ষা — শুধু বিষয়ের দিক থেকে নয় নয়, মননের দিক থেকেও। স্মৃতি, সংস্কৃতি আর সংগ্রামের মেলবন্ধনে ‘হুল’ যদি দর্শককে সেই রক্তাক্ত অতীতের মুখোমুখি দাঁড় করাতে সক্ষম হয়, তবে এ ছবি শুধু একটি সিনেমা থাকবে না — হয়ে উঠবে বৃহত্তর এক জাতির আত্মপরিচয়ের আয়না।
❤ Support Us







