Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুন ১২, ২০২৬

মার্কিন হামলায় ভারতীয়দের মৃত্যু, চুপ কেন প্রধানমন্ত্রী ? প্রশ্ন রাহুলের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
মার্কিন হামলায় ভারতীয়দের মৃত্যু, চুপ কেন প্রধানমন্ত্রী ? প্রশ্ন রাহুলের

ওমান উপকূলের কাছে ধারাবাহিক সামুদ্রিক হামলায় ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যু এবং নিরাপত্তা ঘিরে ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে ভারত-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্ক। গত চার দিনের মধ্যে ভারতীয় নাবিকবাহী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার মুখে পড়েছে। তার মধ্যে একটি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন তিন ভারতীয় নাবিক। ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নীরবতা নিয়ে শুক্রবার সরব হয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। একই দিনে দ্বিতীয় বারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বিদেশ মন্ত্রক।

শুক্রবার সামাজিক মাধ্যমে দীর্ঘ পোস্টে প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি নিশানা করেছেন রাহুল। তাঁর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক জলসীমায় মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে তিনটি পৃথক জাহাজে মার্কিন হামলায় তিন ভারতীয় নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। অথচ প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। রাহুল লিখেছেন, ‘তিন দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক জলসীমায় তিনটি জাহাজে মার্কিন হামলায় তিন ভারতীয় নিহত হয়েছেন। আর আমাদের ‘কম্প্রোমাইজড’ প্রধানমন্ত্রীর মুখে একটি কথাও নেই। কোনো বিদেশি শক্তি যখন ভারতীয় নাগরিককে হত্যা করে, তখন দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব মুখ খোলা। কিন্তু তিনি আমেরিকার বিরুদ্ধে একটি শব্দও বলতে রাজি নন।’ এরপর আরও আক্রমণাত্মক সুরে কংগ্রেস নেতা বলেন, আগামী সপ্তাহে জি-৭ সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে মোদিজি বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে করমর্দন করবেন, হাসিমুখে আলিঙ্গন করবেন, বিভিন্ন চুক্তিতে সই করবেন। কিন্তু যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, সেই ভারতীয় নাবিকের জন্য তাঁর মুখে কোনো সমবেদনা বা প্রতিবাদ থাকবে না। রাহুলের অভিযোগ, ‘একজন আপসকামী প্রধানমন্ত্রী ভারতের সন্তানদের রক্ষা করতে পারেন না, কারণ যাঁরা তাঁদের প্রাণ নিয়েছেন, তাঁদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস বা শক্তি তাঁর নেই।’

এই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে পালাউ-পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ এমটি সেট্টেবেলো। বুধবার ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালীর নিকটবর্তী জলসীমায় জাহাজটি হামলার শিকার হয়। জাহাজে মোট ২৪ জন ভারতীয় নাবিক কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ, মার্কিন নৌবাহিনীর ছোড়া  ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষে আঘাত হানে। বিস্ফোরণের পর মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে জাহাজের একাংশে। উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছলেও প্রথমে ২১ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তিন জন নাবিক নিখোঁজ ছিলেন। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ পরিবহণ ও জলপথ মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল জানান, নিখোঁজ তিন ভারতীয় নাবিকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তাঁদের পরিচয়ও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।

ঘটনার পর বিদেশ মন্ত্রকও বিবৃতি জারি করে। সেখানে বলা হয়, ‘ওমান উপকূলের কাছে বাণিজ্যিক জাহাজ সেট্টেবেলোর উপর হামলার নিন্দা করছে ভারত। জাহাজে থাকা ২৪ জন ভারতীয়ের মধ্যে ২১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, তিন জন নিখোঁজ বলে জানা গিয়েছে।’ বিদেশ মন্ত্রক আরও জানায়, ওই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলির উপর ধারাবাহিক হামলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক, এসবই চলমান মার্কিন-ইরান সংঘাতের প্রত্যক্ষ ফল। তবে সরকারি বিবৃতিতে হামলাকারী শক্তির নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। ফলে, বিষয়টি নিয়েই সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে কেন্দ্র। এমনকি হামলার পর প্রথম সরকারি প্রতিক্রিয়াগুলিতেও ‘মার্কিন হামলা’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়নি।

ঘটনার পর বিদেশ মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব (আমেরিকা বিভাগ) নাগরাজ নাইডু নয়াদিল্লিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জেসন মিকসকে তলব করেন। বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয় এবং ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সে প্রতিবাদের ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এর আগে ৮ জুন এমটি মারিভেক্স নামে একটি জাহাজেও হামলা হয়েছিল। ওই জাহাজেও ছিলেন ২৪ জন ভারতীয় নাবিক। জাহাজটিতে আগুন লাগলেও সমস্ত নাবিক নিরাপদ ছিলেন। ওই ঘটনার পর সরকারের বক্তব্য ছিল, এটি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ নয়, ফলে বিষয়টি আলাদা প্রেক্ষিতে দেখা উচিত। সে সময়ও হামলাকারীর নাম প্রকাশ্যে উল্লেখ করা হয়নি। এর পর ১০ জুন এমটি সেট্টেবেলোতে প্রাণঘাতী হামলা হয়। আর তার পরের দিন, বৃহস্পতিবার, আবার হামলার শিকার হয় এমটি জলভীর। ওই জাহাজে ২০ জন ভারতীয় নাবিক ছিলেন। পরে তাঁদের সকলকেই নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। তবে পরপর তিনটি হামলা ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

শুক্রবার আবারও জেসন মিকসকে তলব করে বিদেশ মন্ত্রক। তিন দিনের মধ্যে এটি দ্বিতীয় সমন। আমেরিকা বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের সঙ্গে বৈঠকে ভারত স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, ওমান উপকূলবর্তী জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলির উপর ধারাবাহিক হামলা মেনে নেওয়া যায় না। ভারতীয় নাগরিকদের জীবন নিয়ে যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে দিল্লি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। এই ঘটনাগুলি এমন সময় ঘটছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, টানা তৃতীয় দিনের মতো তিনি ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সামরিক হামলা স্থগিত করেছেন এবং তেহরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও ইরানের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত এমন কোনো চুক্তির কথা স্বীকার করা হয়নি। বরং পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা আর সংঘাত অব্যাহত রয়েছে বলেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে।

এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব শিপিং নতুন নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। হরমুজ প্রণালী, ওমান উপসাগর ও সংলগ্ন জলসীমায় কর্মরত প্রায় ১৮ হাজার ভারতীয় নাবিককে বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে হরমুজ প্রণালীর পূর্ব ও পশ্চিমে ১৩টি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজে ৬২২ জন ভারতীয় নাবিক কর্মরত। পাশাপাশি শত শত বিদেশি পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে কাজ করছেন প্রায় ১৮ হাজার ভারতীয়। ফলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নাবিক সরবরাহকারী দেশ হিসেবে ভারতের জন্য বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ লক্ষ ২০ হাজার ভারতীয় নাবিক বিভিন্ন জাহাজে কর্মরত।

ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই  ফিনল্যান্ডের কুলতারান্তা টকসে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর পশ্চিমা দেশগুলির সমালোচনার জবাব দেন। রাশিয়ার কাছ থেকে ভারত কেন তেল কিনছে, সে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ভারত তেল কেনে কেবল মূল্য এবং প্রাপ্যতার ভিত্তিতে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউরোপীয় দেশগুলি ব্যাপক হারে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল কিনতে শুরু করে। ফলে ভারতের ঐতিহ্যগত সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হয় এবং পরিস্থিতি ভারতকে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করে। জয়শঙ্কর আরও দাবি করেন, ২০২২ সালে বৈশ্বিক তেলবাজার স্থিতিশীল রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ভারতকে রুশ তেল কেনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছিল। তাঁর দাবি, , ‘সে সময় আমেরিকাই সরাসরি ভারতকে রুশ তেল কেনার পরামর্শ দিয়েছিল।’

একই সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলির নৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিদেশমন্ত্রীর বক্তব্য, বহু বছর ধরে ইউরোপে নির্মিত অস্ত্র ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ কোনো ইউরোপীয় দেশ কখনো ভারতীয় অস্ত্রের আক্রমণের মুখে পড়েনি। তিনি বলেন, ‘ভারত কখনো ইউরোপের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করেনি। কিন্তু ইউরোপে তৈরি অস্ত্র বহু বছর ধরে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে।’ এই মন্তব্যের মাধ্যমে পরোক্ষে পাকিস্তানের অস্ত্রভাণ্ডারের দিকেও ইঙ্গিত করেন জয়শঙ্কর। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে জার্মান প্রযুক্তির রাইফেল ও মেশিনগান, বিমানবাহিনীতে ফরাসি মিরাজ যুদ্ধবিমান এবং সুইডিশ নির্মিত সাব ২০০০ এরিয়ে নজরদারি বিমান, নৌবাহিনীতে ফরাসি আগোস্তা শ্রেণির সাবমেরিন রয়েছে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতীয় নৌবাহিনীর আইএনএস খুকরি ডুবিয়ে দেওয়া ড্যাফনে শ্রেণির সাবমেরিনটিও ছিল ফরাসি নির্মিত।

সব মিলিয়ে ওমান উপকূলের সাম্প্রতিক হামলাগুলি এখন কেবল সামুদ্রিক নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু, মার্কিন সামরিক অভিযানের অভিযোগ, কূটনৈতিক প্রতিবাদ, প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা নিয়ে বিরোধীদের আক্রমণ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারতের অবস্থান— সব মিলিয়ে ঘটনাটি দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিসরে এক গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে পরিণত হয়েছে। নিহত নাবিকদের পরিবারের শোকের আবহের মধ্যেই এখন নজর, ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সামাল দিতে দিল্লি পরবর্তী পদক্ষেপ কী নেয়।


  • Tags:
❤ Support Us
Advertisement
error: Content is protected !!