- প্রচ্ছদ রচনা বৈষয়িক
- ডিসেম্বর ৫, ২০২৫
রেপো রেট কমাল আরবিআই। ‘গোল্ডিলক্স’ মুহূর্তে ভারতীয় অর্থনীতি
বছরশেষের আগে, উৎসবের মরশুমে সাধারণ মানুষের ঘাড় থেকে সুদের বোঝা নামাতে কোমর বাঁধল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া। টানা দু-দফা নীতি বৈঠকে রেপো রেট অপরিবর্তিত রাখার পর, এ বার বড়দিনের আমেজে গা মিলিয়ে দেশের শীর্ষ ব্যাঙ্ক ফের নামাল নীতি সুদের হার। শুক্রবার, ৩ দিনের মনিটারি পলিসি কমিটির আলোচনার পর গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা ঘোষণা করলেন—‘রেপো রেট আরও ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৫.২৫ শতাংশ করা হয়েছে।’ এ নিয়ে ২০২৫ সালেই মোট ৪ বার রেপো রেট কমল, এবং বছরজুড়ে কমল ১২৫ বেসিস পয়েন্ট। ফেব্রুয়ারি, এপ্রিল ও জুনে যথাক্রমে ২৫, ২৫ ও ৫০ বেসিস পয়েন্ট সুদ কমানোর পরে ডিসেম্বরেও শীর্ষ ব্যাঙ্ক একই পথে হাঁটল। বছরের শুরুতে রেপো রেট ছিল ৬.৫০%, এখন তা নেমে এসেছে ৫.২৫%-এ।
শুক্রবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে আরবিআই গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা বলেন, অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি এই কাটতির জন্য অনুকূল। তিনি জানান, ‘মুদ্রাস্ফীতি ২.২ শতাংশে নামায় এবং প্রবৃদ্ধি টানা ছ-টি ত্রৈমাসিকে গতি ধরে রাখায় অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে এক বিরল ‘গোল্ডিলক্স’ পরিস্থিতি, অর্থাৎ অত্যধিক উতপ্ত নয়, আবার অতিরিক্ত শীতলও নয়, বরং মাঝামাঝি আরামদায়ক অবস্থান।। এ সময়ে সুদের হার হ্রাস অর্থনৈতিক গতি আরও ত্বরান্বিত করবে।’ অক্টোবরের নীতি পর্যালোচনার পর থেকে খুচরা মুদ্রাস্ফীতি স্থিতিশীল। অক্টোবরেই সিপিআই নেমেছিল রেকর্ড-নিম্ন ০.২৫ শতাংশে। সমান্তরাল ভাবে দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশের জিডিপি ছুঁয়েছে ৮.২ শতাংশ—ছয় ত্রৈমাসিকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
গত অক্টোবরেই খুচরা মুদ্রাস্ফীতি নেমে এসেছিল রেকর্ড-নিম্ন ০.২৫ শতাংশে। এই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির জেরে আরবিআই প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও বাড়িয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭.৩ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতির পূর্বাভাস ২ শতাংশ ধরা হয়েছে, যা আগের আনুমানিকতার তুলনায় ০.৬ শতাংশ কম। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম প্রান্তিকে মুদ্রাস্ফীতি ৩.৯ শতাংশে থাকতে পারে বলে অনুমান। ধারাবাহিকভাবে রেপো রেট কমায়, বিশেষ করে বড়ো দিনের আগে আরবিআই-এর রেপো রেট কমানো মানে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলিকে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেওয়ার খরচ কমে যাওয়া। এই খরচ কমলে সাধারণত ব্যাঙ্কগুলি গ্রাহকদের ঋণের হারও কমায়। সে কারণে গৃহঋণ থেকে শুরু করে গাড়ির ঋণ, কেনাকাটা, সব ক্ষেত্রেই মাসিক কিস্তি বা ইএমআই কমার সম্ভাবনা থাকে। যাঁরা চড়া সুদে ঋণ নিয়েছেন তাঁদের জন্য বিশেষ করে এটি বেশ বড়ো স্বস্তির বার্তা। উৎসবের মরসুমে গ্রাহকদের আরো সক্রিয় করার ক্ষেত্রেও এই সুদ কমানোর পদক্ষেপ বাজারে নতুন গতি এনে দিতে পারে। ঋণ বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ডিসেম্বরের সুদ কমানোর সিদ্ধান্ত গৃহঋণের বাজারকে পুনরায় চাঙ্গা করতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সুবিধা হবে।’
রেপো রেট কমানোর পাশাপাশি রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক আর্থিক ব্যবস্থায় ‘লিক্যুইড’ জোগানোর জন্য আরো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ‘স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি’র হার ৫ শতাংশ এবং ‘মার্জিনাল স্ট্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি’র হার ৫.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১ লক্ষ কোটি টাকার সরকারি বন্ড কেনা এবং বৈদেশিক মুদ্রা সোয়াপ পরিষেবা চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলিও বাজারে তাজা পুঁজি জোগাবে এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করবে বলে আরবিআই আশাবাদী। তাদের মতে, গত দু-টি নীতি বৈঠকে রেপো রেট অপরিবর্তিত রাখলেও নভেম্বর-ডিসেম্বরের অর্থনৈতিক তথ্যচিত্র ‘মনিটারি পলিসি’ কমিটিকে অন্য পথে হাঁটার সুযোগ দিয়েছে। দেশের উৎপাদনক্ষেত্রে যে শক্তিশালী উত্থান দেখা যাচ্ছে এবং তার সঙ্গে মূল্যস্ফীতির ধারাবাহিক নিম্নগতি মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এমন এক অর্থনৈতিক পরিবেশ, যেখানে সুদ কমানো ঝুঁকির নয়, বরং যুক্তির পথ। এই মুহূর্তে রুপির মান বেশ চাপে থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে যে, এ মুহূর্তে প্রবৃদ্ধিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
গভর্নর মালহোত্রা এদিন বলেন, গত বছরের বিভিন্ন বৈশ্বিক টানাপড়েন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা এবং বিদেশি মুদ্রাবাজারের ওঠানামা সত্ত্বেও ভারতীয় অর্থনীতি নিজস্ব শক্তি ধরে রেখেছে। ব্যাঙ্কিং পরিকাঠামো মজবুত, ঋণপ্রবাহ বাড়ছে, খুচরো ঋণ বাজারে গতি রয়েছে। আর্থিক স্থিতিশীলতার এ দৃশ্যপটই নতুন বছরে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির আরও সুযোগ এনে দেবে বলে মনে করেন তিনি। তারই অন্যতম প্রতীক হিসেবে এই বছরের শেষ নীতি বৈঠকে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক বছরের সবচেয়ে বড়ো উপহারটা তুলে দিল সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের হাতে। গভর্নর মালহোত্রার জানান, ‘২০২৬-কে স্বাগত জানাতে চাই আমরা নতুন আশা, নতুন শক্তি আর সম্ভাবনা নিয়ে।’
❤ Support Us








