- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- জুলাই ৩০, ২০২৩
আগে সে মানুষ ছিল
অলঙ্করণ: দেব সরকার
তাতার প্রথমে ডাকাত ছিল না। সে ছিল চোর। তার আগে সে মানুষ ছিল ! কী করে সে এক দুর্ধর্ষ দস্যু হয়ে উঠল, তা শুনলে অবাক হয়ে যেতে হয়।
মারাত্মক রকমের ভীতু হয়ে জন্মেছিল তাতার। ডুবে যাবার ভয়ে সে পুকুরে নামতো না। পড়ে যাবার ভয়ে সে গাছে চড়তো না। গাড়ি চাপা পড়ে মরবে, এই ভয়ে সে পাকারাস্তায় উঠতো না। ঘুমাতে পর্যন্ত পারতো না সে মাকে ছাড়া । তার স্থির বিশ্বাস ছিল একা একা ঘুমিয়ে পড়লে, ছেলেধরা তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় বস্তার মধ্যে ভরে নিয়ে চলে যাবে । তারপর তাকে জাহাজে করে চালান করে দেয়া হবে কাবুলে। সে আর ফিরতে পারবে না !
তার মন চাইতো বাবাকে সে ছেলেধরার কথা বলে দেয়। বাবা তার ছেলেধরার মুন্ডু কেটে গাঙে ভাসিয়ে দেয়। কিন্তু চাইলে কী হবে? বাবাকে তো সে দেখতেই পেতো না চোখে। সে মায়ের কাছে খোঁজ করে জানতে চাইতো , মা, আমার বাবা কই ?
মা বলতো , তোর বাবা শহরে।
তাতার জিজ্ঞেস করতো, কেন, শহরে কী করে বাবা ? বড়ি কেন আসে না বাবা ? বাবাকে আমি আজই চাই , তুমি আসতে বলো ।
এক সন্ধেয় সত্যিই বাড়িতে চলে এলো তাতারের বাবা । বাবাকে দেখে তো ভয়ে সে জড়োসড়ো। ইয়াব্বড়ো তার গোঁফ। মাথায় ভরা ঝাঁকড়া চুল। কালো কুচকুচে গায়ের রঙ। মাথা মোটা। খাম্বাখাম্বা দুই পা। বেটেখাটো চেহারায় তার যমদূতের শক্তি। হাত তো নয় , যেন দুটো মুগুর। তার ছোটো ছোটো দুটো চোখ থেকে যেন সবসময় ঠিকরে বেরোচ্ছে আগুন। বাবাকে ‘ বাবা’ বলে ডাকতে পর্যন্ত ভয় হলো তাতারের।
রাতটুকুও থাকলো না বাবা। রাত গভীর হলে , গাঢ় অন্ধকারে গা ঢাকা দিলো সে । তাতার তখন ঘুমিয়ে ছিল মাকে জড়িয়ে। ঘুমের মধ্যে সে কিছুই জানতে পারেনি। সকালে তাতার বাবার খোঁজ করলে তার মা বললো , তোর বাবা রাতেই চলে গেছে । জরুরি কাজ ছিল তো তাই।
তাতার বললো , বাবা তো আমার সাথে কোনো কথা বললো না , মা !
মা বললো , তুইও তো কোনো কথা বললিনে।
তাতার বলে , কথা বলবো কী ? আমার তো ভীষণ ভয় পেলো বাবাকে ।
মা বলে , ঠিক আছে । এবার বাবা বাড়িতে আসুক। আমি বাবার সাথে তোর কথা বলিয়ে দেবো।
তাতার বলল , তাই দিও।
পরক্ষণেই তার কী মনে হলো , সে জিজ্ঞেস করলো , মা , বাবা কি খুব রাগী ?
মা বললো , হাঁ । তোর বাবা ভীষণ রাগী।
এই কথা শুনে তাতার গেল চিন্তায় পড়ে। কেন বাবা রাগী ? এই প্রশ্নের উত্তর তার খুঁজে বের করতে হবে। শহরে বাবা যেখানে কাজ করে সেখানে বাবাকে কি তারা খেতে দেয় না? বাবাকে কি তারা খুব খাটায়? গালাগালি করে ? চাবুক দিয়ে মারে? আপন মনে হাজার রকমের অলীক কল্পনা করে তাতার । কিন্তু একটি প্রশ্নেরও কোনো উত্তর সে পায় না।
এরপর হঠাৎ একদিন খবর এলো শহরের এক ব্যাঙ্কে দুর্ধর্ষ এক ডাকাতি কেসে নিরাপত্তা রক্ষীর গুলি খেয়ে মারা গেছে তাতারের বাবা। দলের সবাই নিরাপদে পালিয়ে গেলেও , সে আর পালাতে পারেনি। ভোজালিটা সে আর একটু সুযোগ পেলেই রক্ষীর পেটে চালিয়ে দিয়ে চম্পট দিতো। কিন্তু সে সুযোগ সে পেলো না। তার আগেই রক্ষী তাকে গুলি করে দিলো। বডি বাড়ি আনেনি তাতারের মা। থানায় গিয়ে , মর্গে গিয়ে মা কী কী সব বললো। আর তাতেই বডি বেওয়ারিশ হয়ে গেল।
বাবাকে আর ‘বাবা’ বলে ডাকা হয়নি তাতারের।
•২•
একটা কথা তাতার কিছুতেই বুঝতে পারে না। মা বলেছিল শহরে কাজ করে বাবা। কাজ মানে কি ওই ডাকাতি? কেন মা তার কাছে লুকালো বাবার প্রকৃত পরিচয়? সে জানতে চাইলো , মা, তুমি যে আমাকে বলেছিলে বাবা কাজ করে শহরে ! বাবা যে ডাকাতি করে, তা তো তুমি বলোনি ?
মা বললো, আমিও কি জানতাম ওই ছিল তার কাজ? আমাকে তো বলতো কাজ করে।
তাতার জিজ্ঞেস করে, কোথায় কাজ করে , তা জানতে চাইতে না তুমি?
মা বলে, জানতে চাইতাম তো। ওই বলতো , শহরে।
তাতার এরপর জিজ্ঞেস করে, তা বাবার বডি তুমি বাড়িতে আনলে না কেন ?
মা বললো, লজ্জায়। সবাই তো জানতো তোর বাবা কাজ করে শহরে। বডি আনলে সবাই তো জানতে পারতো আসলে সে ছিল ডাকাত ।
এবার তাতার বুঝতে পারলো বডি না আনার কারণ। ডাকাত মানে যে খারাপ লোক তা বোঝার বয়স তখন তার হয়েছে। এতটা খারাপ একটা লোক ছিল তার বাবা ! একথা ভেবে সে নিজেও লজ্জা পেতে থাকে গোপনে মনে মনে। এমন একটা খারাপ লোকের বডি বাড়িতে না এনে মা ঠিক কাজই করেছে । এমন ভাবতে ভাবতে এক সময় বাবার কথা ভুলে গেল তাতার। তখন তার একমাত্র আশ্রয় তার মা ।
কিন্তু সংসার তো চলে না আর। বাবা ডাকাতি করুক , আর যাই করুক , সংসারটা চালাতো । যখন বাবা বাড়িতে আসতো তখন টাকা দিয়ে যেতো। মা সেই টাকায় চাল ডাল কিনতো। বাবা মারা যাবার পর মা নিরুপায় হয়ে গেল। একদিন রাতে খাবার কিছুই রইল না। তাতার জিজ্ঞেস করল , মা , আজ রাতে খাবো না ?
মা বললো , না।
তাতার জিজ্ঞেস করল , না খেয়ে কী করে থাকবো ?
মা বললো , পানি খেয়ে ঘুমিয়ে থাকতে হবে।
তাই করলো তাতার।
কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে সে তার মাকে আর দেখতে পেলো না।
তখন তাতার ফাইভে।
•৩•
সামান্য একটু ভিটেয় দু’চালা কুঁড়েটুকু ছাড়া আর কিছু রইল না তাতারের। না কোনো আত্মীয় , না কোনো সঙ্গতি।
স্কুল ছেড়ে দিল তাতার। ভীরু মনে সাহস সঞ্চয় করলো সে। একলা থাকা , একলা চলা অভ্যেস করে ফেললো সে অল্প ক’দিনের মধ্যে। সারাদিন সে মোকামে কাটায়। মুদির ফরমাশ খাটে। দোকানে দোকানে ঝাঁটাঝাড়ু দেয়। পিপাসার পানি এনে দেয় বোতলে বোতলে। তারা প্রত্যেকেই কিছু কিছু পয়সা তাকে দেয়। সকালে পাগলের চার দোকানে বয়গিরি করে ঘুগনি রুটি আর চা পায়। দুপুরে কাশেমের হোটেলের থালাবাটি মেজে ভাত তরকারি পায়। রাতেও হোটেলে খেটে খেয়েদেয়ে বাড়িতে এসে ঘুমায়। একরাতের জন্যেও বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও সে থাকে না। সে বেশ বুঝতে পারে বাড়িতে না থাকলে বাড়ি তার থাকবে না।
এইভাবে চলতে চলতে বড়ো হয়ে উঠতে থাকে তাতার। মাথায় ডাগর। গতরে তাকত। অন্তরের ক্ষুধা দু’চোখে আগুন হয়ে জ্বলে। তার আপাত নিরীহ ভাব। কিন্তু একটু খোঁচা খেলেই বেরিয়ে পড়বে তার অন্তর্লীন মরিয়া হিংস্র রূপ।
এক রাতে হোটেলে থালাবাটি সব মাজা হলে সে খেতে বসলো। থালায় ভাত পেয়েছে , সবজি চচ্চড়ি পেয়েছে ডালের সঙ্গে। অর্ধেক ভাত সে খেয়ে নিল দ্রুত। বাকি অর্ধেক ভাত থালায় নিয়ে সে নাড়াচাড়া করে , কিন্তু খাওয়া শেষ করে ওঠে না।
লক্ষ করে কাশেম তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, কী রে খাওয়া শেষ হয় না কেন?
নিঃসঙ্কোচে তাতার বললো, গোস্ত নোবো একটু।
রাতের উদ্বৃত্ত মাংস কাশেম পরের দিন নতুন মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে রান্না করে বিক্রি করে। তাতার মাংসের ডেকচিতে নজর দেওয়ায় সে অগ্নিশর্মা হয়ে গেল, বড্ডো তোর লোভ , না ? ডালভাত জোটে না , লবাববেটা আমার গোস্ত খাবে ! যা বের হ , ছোচকা কোথাকার !
মুহূর্তে মাথায় রক্ত উঠে গেল তাতারের অমনি । সে অর্ধসমাপ্ত ভাতের থালা ছুড়ে মারলো কাশেমের মুখে। এতটাই জোরে সে থালাটা ভাত সমেত ছুড়লো যে, তার আঘাতে মাথা ঘুরে গেল কাশেমের। হোটেলের অন্য কর্মচারী কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাতার এক ছুটে নাগালের বাইরে চলে গেল।
সেই রাতের পর তাকে আর এলাকায় দেখা গেল না বেশ কিছুদিন।
•৪•
তাতার এলাকা ছেড়ে চলে গেল সদর শহরে। সেখানে লরির খালাসিগিরি করলো কিছুদিন। কিন্তু ড্রাইভার প্রচন্ড খাটায়। গালিগালাজ করে। গায়ে হাত পর্যন্ত তোলে। আর টাকা দেবার সময় তার হাত থেকে যেন বেরুতেই চায় না টাকা। তাতার খালাসিগিরি ছেড়ে দিয়ে এরপর বাসে হেল্পারি করতে শুরু করলো । হেল্পারি করতে করতে চোখের সামনে ভিড়ের মধ্যে পকেটমারের হস্তশিল্প দেখে তাজ্জব হয়ে যেতে লাগল প্রথম প্রথম। তারপর একদিন নিজেই সে টাকা রোজগারের ওই সহজ পথে নামলো সাহস করে। এতটাই পটু সে হয়ে উঠলো এক সময় পকেটমারিতে যে , জীবনে অন্য কিছু তার আর করা লাগবে না বলেই তার মনে হতে লাগল। কিন্তু অল্প ক’দিনের মধ্যে এই সহজ উপায় তার একঘেয়ে লাগলো। তখন তার রঙ ধরেছে জীবনের পরতে পরতে। তাতার বিয়ে করে ফিরে এলো বাড়িতে।
এবার তার নিজেরই মনে হলো সে ভালো হয়ে উঠবে। সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে। খেটে খাবে। কিন্তু যেকোনো ব্যবসায় সামান্য হলেও পুঁজি লাগে কিছু। সে পুঁজি তার নেই। গতরে খাটতে গেলে কষ্ট হয় । প্যান্টশার্ট পরা তার অভ্যেস হয়ে গেছে। মাঠে ঘাটে খাটতে গেলে লুঙ্গি পরতে হবে। তাছাড়া এলাকায় আর কাজ কোথায় এখন ?
বউ বললো , আয়রোজগারের ধান্দা দেখো। এই কুঁড়েয় আমি থাকবো না কিন্তু।
প্রচ্ছন্ন এই হুঁশিয়ারির মুখে তাতার নতুন ধান্ধায় নেমে গেল। সে স্পষ্ট দেখলো যার টাকা আছে , সে লোক ঠকায়। সে এতটাই কৃপন যে, সামনে কাউকে এক টাকা ছাড়বে না । কিন্তু সে-ই আবার এতটাই ভীতু যে, টাকা দিয়ে চোরডাকাত পুষবে। লাইনটা মন্দ নয়। তাতারের নাকনকশা পুরো তার বাবার মতো । ফলে জুত করে একটু ভাবভড়ং দেখালেই টাকার কুমির গুলো সব ভয়ে কাপড়চোপড়ে করে ফেলবে। হলোও তাই।
পাড়ায় লোকের বাগান থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে সে কলার কাঁদি কেটে আনে। কলার মালিক প্রতিবাদ করলে সে উত্তর দেয়, তোমার আছে অনেক, কিন্তু আমার তো মোটে কিছু নেই। কলাটুকু আমি নিলে তোমার আর কতটা যাবে ? ছোটো খাটো ব্যাপার , ছেড়ে দাও ভাই , ঝামেলা কোরো না।
কথাটা হয়তো সঠিক। কিন্তু লোক তা মানবে কেন সহজে ? কেউ হয়তো তাতারকে চ্যালেঞ্জ করে বলে , আমার কিছুতে হাত বাড়ালে তোর হাত আমি কেটে লোবো।
তাতার শান্তভাবে বলে , তাই ? হাত কেটে নিবি আমার?
রগচটা পড়শি রাগে গরগর করে বলে , হাঁ , কেটে লোবো !
সেই রাতেই ওই পড়শির বাড়িতে চড়াও হয়ে তার সর্বনাশ করে দেয় তাতার মুখে মুখোশ পরে। শুধু সন্দেহের বশে তো তাকে কিছু বলা যাবে না !
এক সময় এমন দিন এলো যে, যার অনেক ধান হয় মাঠে, সে গোপনে চাল দিয়ে যায় তাতারের বউয়ের কাছে। যাদের সবজির চাষ অনেক , তারা নিত্য জোগায় তার সবজি। মাছের ঘেরি থেকে মাসচুক্তির নগদ টাকা ছাড়াও ভালো ভালো মাছ আসে প্রায়ই । মোকামে বাইরের কোনো গ্যাং এসে কোনো অপারেশন করতে পারবে না, এই আশ্বাস দিয়ে তাতার বড়ো বড়ো ব্যবসায়ীর থেকে আদায় করে মোটা অংকের তোলা। গালগল্পের ডালপালা ছড়িয়ে যায় এমন করে যে , ক্রমে ধনাঢ্যদের মনের গোপন কন্দরে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হয় যে , তাতারের গাঁটিতে সবসময় মেশিন রাখা থাকে , তার পকেটে থাকে স্প্রিং ভোজালি। সে বোমা বাঁধে। শহরে ডাকাতি করতে যায় দল নিয়ে। গলার নলি কেটে খুন করে দেওয়া বা গুলিতে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া তার কাছে বা-হাতের খেল।
লোকাল থানা থেকে সে মাসোহারা নেয়। পঞ্চায়েতের প্রধান উপপ্রধান আর মেম্বাররা পর্যন্ত তাতারকে সমীহ করে চলতে শুরু করে । অন্তর থেকে না হলেও , দেখা সাক্ষাতে তারা ভালোবাসা দেখায় তাকে। তাদের হয়ে ইলেকশনে যে ভীষণ কাজ করে দেয় সে ! এলাকার ছিঁচকে চোর ছ্যাঁচোড় আর আধঘোড়ে ডাকুফাকু সব তাতারের ভয়ে সিঁটকে থাকে।
তার ভরা দাপটে ভাটা থেকে ইট পাঠালে , বিল্ডার তার বালি পাথর আর রড সিমেন্ট দিলে তাতার কুঁড়ে ভেঙে ফেলে পাকা বাড়ি করে একতলা। ছেলেও হলো তার একটা। আর তো তার কোনো কিছুরই অভাব থাকার কথা নয়। কিন্তু অভ্যেস যায় না মলে ! সে তার বাবার পরিণতির কথা মনে রাখেনি। সে তার মায়ের উধাও হয়ে যাবার কথাও ভুলে গেল অবলীলায়।
কী যে তার লক্ষ্য , তা সে নিজেও জানে না !
•৫•
শেষে তাতারের খেয়াল হলো এবার ইলেকশনে সে প্রধানকে হটিয়ে দেবে। প্রধানের ট্যারাবাঁকা কথা তার অপছন্দ। প্রধান বলে কিনা , এবার কিন্তু তুই বসে যাবি , তাতার !
বসে যাবে, মানে নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে হবে। প্রচন্ড লাগে তাতারের প্রেস্টিজে । এইভাবে হুমকি দেবার সাহস প্রধান কোথায় পেলো? থানার বড়োবাবু পর্যন্ত কঠিন কথা কিছু বলতে হলে ,তাকে বুঝিয়ে বলেন ! আর প্রধান কিনা হুমকি দেয় ! একদিন তার ইঙ্গিতে সে বোমা ফাটিয়েছে । বুথে মেশিন বের করেছে। ছাপ্পা মেরেছে অসংখ্য। আর আজ কিনা হঠাৎ সে সাধু সেজেছে? থোড়াই কেয়ার করে সে এরকম ফাঁকা আওয়াজকে। প্রধানকে হটিয়ে তবে সে ক্ষান্ত হবে। নিজের মনে তাতার সংকল্প করে , হয় প্রধান থাকবে , নয় আমি থাকবো !
তাতার বিরোধী দলের প্রার্থীর পক্ষে তৈরি হয়ে নমিনেশন দিতে গেল। সে জানে প্রধান এ খবর নিশ্চিয়ই পাবে। তখন সে রেগে আগুন হয়ে যাবে। ঝোঁকের বশে তখন তাকে কিছু বলতে এলেই অমনি সে বসে যেতে বলার জবাবটা দিয়ে দেবে। পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বাধানোর পুরোনো ছক আর কী !
কিন্তু হতাশ হলো তাতার। প্রধান কোনো গুরুত্বই দিলে না তার বিরোধী দলে যোগ দেবার খবরকে।
উপপ্রধান প্রধানকে একান্তে বললো, তাতার এক দুর্ধর্ষ দস্যু। ওকে তাতিয়ে দিয়ে কী ফয়দা হবে ?
প্রধান বললো, ও একটা কাগুজে বাঘ । কিচ্ছু করার কোনো ক্ষমতা ওর নেই। মিথ্যে ভয় দেখায়। ভীরু যারা ,তারা ভয় পায় বলে ওর মস্তানি।
তার প্রতিটি শব্দের উচ্চারণে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। ছ’ফুটে চেহারার হোমরাচোমরা ভাব যেন প্রধানের অভূতপূর্ব এক শক্তিতে টগবগ করে ওঠে।
উপপ্রধান কথা বাড়ায় না আর।
মেম্বার সতর্ক করে প্রধানকে বলে , আমার কাছে যা খবর , তাতে তুমি নিশ্চিত জেনে রাখো কাল আমাদের নোমিনেশন দেবার সময় তাতার বিডিও তে গিয়ে হুজ্জুতি করবে।
প্রধান বলে, ওরে মেরে ফেলে দোবো তাহলে কাল ।
এতটা একরোখা হতে প্রধানকে কোনোদিন দেখা যায়নি । সে যেন তাতারের নামে আগুন হয়ে জ্বলে উঠছে।
মেম্বার বিপদের আশঙ্কা করেও প্রধানের মুখের উপরে কথা বাড়াতে পারলো না।
পরদিন নমিনেশন ফাইল করতে যাবার পথে গাড়িতে বাইকে কোথাও তাতারের টিকিটি দেখা গেল না। কিন্তু বিডিও-তে গিয়ে দেখা গেল সে হাজির। সঙ্গে ক’জন অপরিচিত লোক। তার চোখ জবাফুলের মতো লাল। পা টলছে । বোঝাই যাচ্ছে হদ্দ মাল টেনেছে তাতার মরণ নেশায়।
প্রধান ভ্রূক্ষেপ করলো না প্রথমে। কিন্তু সকলকে বলে দিলো , তাতার কিছুতেই আমাদের দলে থাকবে না !
সবাই সতর্ক হয়ে গেল আগেভাগে।
কিন্তু এই সতর্কবার্তা অসহ্য লাগে তাতারের। সে নেশায় এলানো স্বরে বলে, আম্মিইই ভেতররেএ যাববোইই !
প্রধান সামনে চলে এলো তৎক্ষণাৎ । তেজস্বী কন্ঠে আগুন ঝরিয়ে সে বললো, হট যা, তাতার !
রক্তচক্ষু তাতার অমনি ডান হাত তুলতে গেল উপরে।
প্রধান লুফে নিল তার কালো কুতকতে হাত । তারপর এক হাতের শক্তিতে সে উদ্ধত হাতটা ঘুরিয়ে মুড়িয়ে একটা মোচোড় দিয়ে দিল এমন কষে যে , চোখে গরম পানি এসে গেল তাতারের।
তীব্র চিৎকারে হিংস্র তাতার সুস্থ বা- হাতটা শক্ত করে প্যান্টের পকেটে ঢোকাতে যাবে এমন কায়দায় যে, এক্ষুনি মেশিনটা বের করে মজা দেখাবে সে প্রধানকে।
কিন্তু কোনো নাটক তাকে করতে দিলে না প্রধান। এক ধাক্কায় সে চাতালে তাতারকে ফেলে দিয়ে নিজের ডান-পা তুলে দিলো সে তার গলায়, আর কড়া খিস্তি ঝেড়ে বললো , বাঁচতে চাস , না কি মরবি আজ। আমি তোকে আগেই বারণ করেছিলাম। একটু চেঁচামেচি হলো। ভয়ে আগেই অদৃশ্য হয়ে গেছে তাতারের সাঙাতরা ক’জন। হৈ চৈ শুনে ভিড়ের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে লোকাল থানার পুলিশ, সিভিক। প্রধানের ঈশারায় তারা তুলে নিয়ে যায় তাতারকে।
বিডিও স্যারের চেম্বারের দিকে হাঁটতে হাঁটতে উপপ্রধান জিজ্ঞেস করল, আসলে কী ব্যাপার বলো তো ! কিছুই তো বুঝতে পারছি নে । প্রধান মৃদু হেসে বলে , আসলে এবার দেখতে চাই তাতারফাতার ছাড়া ভোটটা জিততে পারি কি না ।
♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦
❤ Support Us








