Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • আগস্ট ২৪, ২০২৫

ঝাম্বিল হাজি

রাশিদুল বিশ্বাস
ঝাম্বিল হাজি

 
সন্ধ্যার আকাশ কালি মাখতে শুরু করেছে । কানামাঝির বিল ছুঁয়ে শুয়ে থাকা বাঁকা মাঠ , মাঠের সাথে তাল মিলিয়ে হামাগুড়ি টানা লম্বা গ্রাম নিজেকে আড়াল করে নিচ্ছে ক্রমশ । এইসব আঁধারের সমুদ্র পেরিয়ে আলোর বাতি জ্বালিয়ে রাখে মোসাদ্দেক মিয়াঁ । অনেক দূর থেকে ফাঁকা মাঠের পেট চিঁরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদ- মিনারের পায়ের কাছে তাঁর চায়ের দোকান । বর্তনাবাদের মতো বিরাট গ্রামজুড়ে তার বেশ পরিচিতি । তাকে চেনে না এমন কেউ নেই। সেই ছোট্ট বয়স থেকে মিয়াঁপাড়ার ঘুপচি মোড়ে তার রুটিরুজির কারবার । প্রথম দিকে মদন কটকটি, সস্তা নারকেল বিস্কুট, বুলবুলি এইসব নিয়ে হাটে হাটে চট পেটে বসত । তারপর হাতে দু’পয়সা আসতেই একদিন চায়ের দোকান খুলে বসে । পুবে ফরাজি পাড়া, পশ্চিমে সরকার পাড়া, আর উত্তরে মুটে পাড়ার প্রায় মানুষ তার দোকানেই আসে । ফজর থেকে এসা, গ্রামের চা খেকো লোক, পথচলতি ছেলেবুড়ো,হাটুরে লোকজন কে না আসে তার কাছে !
 
গ্রামের হাভাতে লোকের অভ্যাস; বিহান বেলায় উঠে বাসিমুখে মাঠে যায় । কেউ ভূই নিড়ানি দেয়, কেউ পানি দেয় , কেউ সবজির বাগানে আগাছা তুলে বিষ্পানি ছড়ায়, কেউ সবজি তুলে হাটে চালান দেয় । কাজে বিভর থাকতে থাকতে হঠাৎ তাদের পেটে টান পড়লে ছুটে আসে চায়ের দোকানে; মোসাদ্দেক ভাই একটা বড়ো দেখ্যা লম্বু দ্যাওধিনি , আর মিষ্টি করে দুধ চা কর ! মোসাদ্দেকের হাতের লম্বু বিস্কুট খেয়ে জগ হাতে তুলে নিয়ে ঢকঢক করে পানি ঢালে গলায় , বুক পর্যন্ত পানি গিলে আল্লা বলে হাফ ছেড়ে বাঁচ্লা। তারপর লম্বা সরু কাচের গ্লাসে ঠোঁট ডুবিয়ে সুড়ুত করে চুমুক মারে চায়ে । চলে আড্ডা, পাড়ার গল্প আর মাঠঘাটের কথা । একসময় দুপুর গড়িয়ে এলে ঢেকুর তুলতে তুলতে বাড়ির পথে পা বাড়ায় ।
 
সপ্তাহে মঙ্গল আর শনি দুই দিন হাট বসে । খানিক দূরেই বিশাল ফাঁকা মাঠ তার শরীর জুড়ে হাটুরে মানুষের দাপাদাপি চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত । মাগরিবের আজান কানে আসলে হাটের ভিড় আলগা হতে শুরু করে । সকাল থেকেই থোপ থোপ তাঁবু খাটিয়ে তিনভাজে ইট বসিয়ে উনুন করা হয় । অস্থায়ীভাবে দোকান করে ভাজতে বসে, জিলিপি, ঝালবাড়া, ফুলুরি, পাঁপড় । অনেক দোকানি খুরমা, মতিচুরের নাড়ু, পাকোয়ান, তিলের খাজা, গজা আরও কত কী সারারাত ধরে বানিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে আসে, তারপর কাঠের টেবিলে সাজিয়ে নিয়ে বসে । শীতের দুপুরের হাট থাকে আরও চমকপ্রদ, চিতায় পিঠে, ভাজা পিঠে, সাতখোলা, পাটিসাপটা, রসের আঁধসা, খেজুরের পাটালি গুড় নানান খাবারে ভরে ওঠে প্রাঙ্গণ । চাষিরা হাটের দিন যে যা পারে ছেলেপুলের জন্য কিনে নিয়ে বাড়ি ফেরে । কেউ কেউ ঠোঙ্গা ভর্তি খাবার নিয়ে এসে মোসাদ্দেকের দোকানে বসে । নিজের মুখে খাবারের টুকরো চালান করে ঠোঙ্গাসমেত হাত বাড়িয়ে দেয় দোকানির দিকে, এখান খাও ভাই ।
 
— তুমিই খাও । আমি পরে খাবহিনি । ভাঙ্গা হাটে ওরা আমাকে ম্যালা করে দিয়ে যায় । তাই বুল্যা মাঙনা খাইন্যা, ওরা যেমুন হাট চলাকালিন আমারঠিন চা পানি, বিস্কুট, কলা-পাউরুটি খায় তেমনি আমিও কিছু কিছু খাবারদাবার কিনি বুঝল্যা ! ওরা আমার খদ্দের আমি অধের । কথা চালাচালির মধ্যেই চলে ব্যবসার আদানপ্রদান; বুল ভাই, কী চা খাবা ?
 
— ক্যানে দুধ চা ! তুমার কাছে আবা লাল চা খানু কব্যে ?
 
— এই তো দুধের পিঠ্যা খাচ্ছ, আবা দুধ চা খাবা ক্যানে গো ?
 
— কি জানি ভাই , তুমার দুকানে আস্যা দুধ চা না খাল্যে সারাডা দিন কিছুই খাইনি মুনে হয় । বলেই হো হো করে হেসে ওঠে । কথার কেনাবেনা চলতে থাকে, দোকানে হাটুরে মানুষের আরও ভিড় জমে ওঠে ।
 
কিছু কিছু গৃহস্থ আজকাল মাঠে মুনিষপাঠ লাগালে বাড়ি থেকে আর খাবার আনে না । তা অবশ্য খানিক নিজের আলসেমি ,খানিক মুনিষপাঠের আবদার । এক সময় কাঠালের মালিশ আর খোলা ভরা বড়ো বড়ো ব্যালা রুটিতে মুনিষের পেট ভরত । কোন কোন বাড়ি থেকে পাঠান হত ধ্যাপড়া ধ্যাপড়া হাতের রুটি আর কাঁচা মরিচ বাঁটা । কিন্ত এই গ্রামে সেইসব রেওয়াজ শেষের পথে । এখন মুনিষরাই আবদার করে, মুড়োল, মোসাদ্দেক ভাইয়ের দোকান থেকে কলা পাউরুটি আর কড়া কর‍্যা মিঠ্যা দুধ চা আনেন না, খাই ! দুফরের আগে আপনার ভুইয়ের সব ঘাস ফাসসা করে দিবহিনি । তোদেহের কথা ! শুধু মুড়লের পাছা মারার ধান্দা না ! বলেই মোড়ল হাসতে হাসতে মিয়াঁ পাড়ার চায়ের দোকানের দিকে হাঁটা দেয় ।
 

চায়ের দোকানে নাকি খুব লাভ । খরচের চারগুন পয়সা অসুল হয় । গ্রামের মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ে এইসব কথা, তা নাহলে মোসাদ্দেক মিয়াঁ তিন মেয়ের ভালো বাড়িতে বিহ্যা দিল কী কর‍্যা ! ব্যাটাকে ইস্কুলে পড়াছে কী কর‍্যা ! পড়িয়ে ডাক্তার করব্যা না ব্যালেস্টার করব্যা আল্লা মালিক জানে ।

 
পাড়ায় শত্রু বেড়ে যাচ্ছে দিনকে দিন । কেউ প্রতিবেশির ভালো দেখতে পারে না । মুনজুর কানা বলে বেড়ায়, চায়ের দোকান ক্যাবল পানি ব্যাচা পয়সা গো । দশটাকা খরচ আর পঞ্চাশ টাকা লাভ । তাই নাকি ! যে শোনে সেই হিসেব করতে লেগে যায়, এক কাপ চা বানাতে কত খরচ হয় ! আর বেচে কত দামে । কয়েক মাসে মধ্যেই কয়েকশো মিটার পরপর গ্রামে বেশ কয়েকটা চায়ের দোকান গজিয়ে ওঠে । যারা একসময় বলত, মোসাদ্দেক ভাইয়ের হাতের চা না খাল্যে ভাত হজম হয় ন্যা, তারাই এখন অন্যের দোকানে ঘুরঘুর করে। লুঙ্গিতে কাছা বেঁধে বাঁশবাতার বেঞ্চের ওপর ঘাপ্টি মেরে বসে, চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সুড়ুত সুড়ুত করে চুমুক মারে আর বলে, মুসাদ্দেকের চাহাতে চা ভালো হয়েছে রে ।
 
মোসাদ্দেক জানে, চায়ের দোকানে কত হ্যাপা । সেই ভোরে দোকান খুলে বসতে হয় । খল্পার ঝাপ সরিয়ে ,চারপাশে পানি ছিটিয়ে ভালো করে ঝাঁট দিয়ে ধুপ জ্বালায় । আগের রাতের বাসি ছায় বাউলি দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে বের করে উনুন পরিস্কার করে, তারপর নতুন দিনের টাটকা আগুন জ্বালতে বসে। উনুনে গুল ঢালার পরে ঘুঁটোয় আগুন জ্বেলে খুব সাবধানে উনুনের তলার শিকের জালিতে ধরে থাকতে হয় , গলগল করে বেরিয়ে আসে সাদা সাদা ধোঁয়া । ইট সিমেন্টের বড়ো উনুন যেন বিড়ি খায়, ঘুরতে ঘুরতে সাদা ধোঁয়া সোজা আকাশে উঠে যেতে থাকে । আঁচ উঠতে উঠতে সাইকেল নিয়ে ছুটে গিয়ে সমিতি থেকে ডেকচি ভরে দুধ আনতে হয় , সময়ের মধ্যে না গেলে দুধ চালান হয়ে যায়। ছেলে ছোট তাই তাকেই দুধ আনতে ছুটতে হয় রোজ। দুধে এক ফোটা পানি দেওয়া যায় না , তাহলে চায়ের স্বাদ নষ্ট হয়ে যাবে যে। সেই দুধ ফুটিয়ে ফুটিয়ে লাল করে তুলতে না পারলে স্বর পড়ে না, তা নাহলে প্রথম চুমুকে জিভের ডগায় স্বর থোকা হয়ে বিঁধে না গেলে চায়ের স্বাদ কীসের ! তারপর কতদিন দুধ কেটে যায়, আর দিন দিন দুধের দাম তো আকাশছোঁয়া হয়ে উঠছে , দামি চা পাত, চিনি ! সেসব না দিলে মানুষ খাবে কেন ! এতো কিছুর পরে আসলে কী লাভ থাকে, তা তো মোসাদ্দেক ভালো করেই জানে ।
 
পাড়ায় এতো রেশারেশি, চায়ের দোকান চালান একরকম মুশকিল হয়ে পড়ে । খরিদ্দার কমে আসে , আগের মতো মানুষ আর আসে না ওর কাছে । অন্যদিকে তিন মেয়েকে বিয়ে দিতে গিয়ে সুদে যে পরিমাণ টাকা ধার নেওয়া আছে তা সুদেমূলে দিনদিন দ্বিগুণ হতে থাকে। কিন্তু কারও সঙ্গে সেসব কথা ভাগ করে নেবে মোসাদ্দেক । তাই সে ভিতর ভিতর গুমরে গুমরে মরতে লাগল।
 
একদিন সকালে মোসাদ্দেকের চায়ের দোকানে উপচে পড়া ভিড় । উনুনের দুহাত দূরে একটা টুলের ওপর রাখা হয়েছে একটা ঢাউস কালার টিভি । তাতে গমগম করে চলছে বাংলা সিনেমার লারে লাপ্পা গান ,” ঢুকল পায়ে কাঁটারে / লাগল মনে ব্যথারে / একা একা ভালো লাগে না । “বর্তনাবাদ গ্রামের চারপাঁচটা পাড়ার বুড়ো থেকে ছুড়ার দল গায়ে গা লাগিয়ে দেখছে সেই গান , অল্প বয়সি নায়িকার শরীরের ভাঁজ । ছেলেছুকড়ার দল সিটি মারছে , মোসাদ্দেক পুরো সিনেমা হল যেন দোকানে তুলে এনেছে । আর ঘন ঘন ডিম, সিগারেট, চা বিস্কুটের বাইনা আসে, খদ্দেরদের চাহিদা মিটাতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে দোকানি । বাধ্য হয়ে কয়েকদিনের মধ্যেই পাড়াতুতো ভাইয়ের এক ছেলেকে কাজে লাগায় সে ।
 
শীতের মরসুম শুরু হয়েছে । সান্ধ্য হাওয়ার সাথে জড়াজড়ি করে কুয়াশা গড়িয়ে গড়িয়ে নামতে থাকে । খরিদ্দার হিলহিল করে কাঁপে, দুইহাত বুকে বেঁধে দেখতে থাকে টিভির পর্দায় ভেসে ওঠা রঙিন যুবতিদের আব্রু ফাঁসা শরীর। সপ্তা খানেকের মধ্যেই পাশের ফাঁকা জায়গার ওপর মাথা তুলে দাঁড়ায় ত্রিপলের ছাউনি । তার এক প্রান্তে বাঁশবাখারির মাচান, অন্যদিকে কাতারে কাতারে পাতা বেঞ্চ আর শেষপ্রান্তে উঁচু টেবিলে রাখা হয়েছে টিভি । বিক্রিবাটা বেড়ে উঠছে দিনকে দিন । রমরমিয়ে চলছে চায়ের কারবার , সেদ্ধ ডিম, ডিম টোষ্ট , সিগারেট, বিড়ি, পানমশলা, তিরঙ্গা, আরও কত কী !
 
তবে সে কারবার বেশিদিন গড়াল না । সমাজের ঠিকাদারদের রক্তচোখে পড়ল সে। এভাবে রাস্তার ওপর রাতদিন সিনেমা চালিয়ে, ন্যাংটা মেয়ে মানুষের ভিডিও চালিয়ে পাড়ার ছেলে ছুকড়াদের নষ্ট করছে মোসাদ্দেক মিয়াঁ । উ নাকি মুখে দাঢ়ি রাখ্যাছে , জুব্বা পর‍্যা মাথায় টুপি দিয়ে নামাজ পড়ে , হারামখোর কুন্ঠেকার । ধর্মের সাথে ছিনালি শুরু করেছ ? জুব্বা পরে ঝাম্বিল হাজি সাজ্যাছ ? দাঁত খিচিয়ে হুংকার দেয় খালেক হাজি ! তার দোকানের জন্য পাড়ার বয়স্ক মুসল্লিরা পর্যন্ত সময় মতো মসজিদে যাচ্ছে না, ওইভাবে মেয়ে মানুষের শরীরে ডুব্যা থাকলে কুন মানুষটা ইমান রাখতে পারবে শুনি ! মুসল্লির দল , হৈ হৈ করে উঠে, বয়স্ক মানুষ নাহালে কিলিয়ে ভূত ছুটিয়ে দিতুক এখুনি, চিতকার করে উঠল তালিবুল আলিম হাপি সেখ ।
 
— শুন মুসাদ্দেক, দিনে দুফরে ওইসব ভিডিও দেখা বন্ধ করহিনি । নাহালে তোকে একঘোরে করব । নমাজ পড়, জামাতে যা, মসজিদ ঝাড় দে, মুছামুছি কর । মসজিদের পাঁচতলা মিনার এব্যার দশতালা করব, টাকা কালেকশন কর , তাতে নেকি হবে , লোকে ইমান্দার বুলবে।
 
— মলবিসাব, আমার বিটিধের বিহ্যা দিতে যায়ে ম্যালা ধারদেনা হয়ে গেলছে গো ! তাছাড়া আগে টিভি চালাতুক নাকি ! আপনারা কি জানেন ন্যা ? পাড়ায় এতো শ্ত্রু আমার দুকান বন্ধ করে দিওয়ার ষড়যন্ত্র করল তাই বাধ্য হয়েই তো…
 
— চুপ কর ইবলিশ ! আল্লা রুজদার, আল্লা ঠিক করে কার ভাগে কতটুকুন রুজি লিখা আছে । তুই ধর্মের নিয়ম ভাঙতে পারিস ন্যা !
 
— ভাই, দুকানডা আর কিছুদিন চালাতে দেন , নাহালে আমার বাড়িটুক বেচে ধার শোধ করতে হবে ।
 
— ওসব কিছু বুঝি ন্যা , তুমার দুকানের লাগ্যে বাড়ির বিটি বউরা একচিন বারহাতে পারছে ন্যা । তাছাড়া পাশেই মসজিদ তুমার টিভির গানের শব্দে নমাজে ব্যাঘাত হচ্ছে। তুমি টিভি বাদ দিয়ে দুকান চালাও । আর পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ শুরু কর‍্যাছিল্যা সব বন্ধ তাই ন্যা ! আবা শুরু কর, নমাজের দাওয়াত থাকল । ফজর থাক্যে মসজিদে যাবি । মোসাদ্দেক, আর কিছু বলতে পারে না; গ্রামের সব নামিদামি মানুষ, ধর্মের রক্ষা কর্তা । ওদের অবাধ্য হলে বিপদ । গত বছর নেকবর আলি মরল, ওরা জানাজা বন্ধ করে দিয়েছিল । সে নাকি মদ খেত, পাড়ার মেয়ে বউদের কুনজরে দেখত, খারাপ কাজ করত । শেষে নেকবর বাড়ির লোক, হাত পা ধরতেই জানাজা হল, তবে মিটিং হল এরপর থেকে গ্রামের কেউ এমন বেধর্মী কাজ করলে তাঁর আর জানাজা পড়া হবে না, গরু-ছাগলের মুতন চাপা মাটি দেওয়া হবে । এসব কথা মনে পড়তেই মোসাদ্দেকের বুক কেঁপে ওঠে । তার মরার পর গ্রামের মানুষ যদি এমন করে, তার ছেলে-মেয়ে বউ কী করবে ! তাকে শিয়াল কুকুরে ছিড়ে ছিড়ে খাবে !
 

একদিকে টাকার দেনা মাথায় পাহাড় হয়ে জমে আছে, অন্যদিকে ধর্মীয় চাপ । কী করবে সে বুঝে উঠতে পারে না । সে ভালো করেই জানে; টিভি বন্ধ করল্যা আর খরিদ্দার আসবে না । পাড়ায় অতো চায়ের দোকান থাকতে কিসের নেশায় খদ্দের তার কাছে ছুটে আসবে ! তাকে কি শেষে ঘাস মরা বিষ খেয়ে মরতে হবে, ভাবতে ভাবতে তার খেয়াল হয়; দোকান ফাঁকা , এক জনপোকাও নেই ।

 
সন্ধ্যায় ইমাম, মোয়াজ্জিনদের হুংকার শুনেই সেই যে টিভি বন্ধ করেছিল তখনই খরিদ্দার কেটে পড়ে আর কেউ দোকানমুখী হয়নি । খেয়াল না করায় ততক্ষণে কয়লার উনুনে আঁচ পড়ে গিয়েছে । পাশে জল ভর্তি কেটলি উপুড় করে উনুনে ঢেলে দিয়ে দোকানের ঝাপ লাগায় । কী ভাবতে ভাবতে ডেকচি থেকে দুধটুকু কেটলিতে ঢেলে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেয় ।
 
খুব তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরতে দেখে বউ অবাক হয়ে জানতে চায়, কী গো শরীর খারাপ করল নাকি ! এতো আগে কুনুদিন বাড়ি আসো না যে ! আর কেটলিতে করে দুধও আনেছ ! খুব প্রয়োজন ছাড়া ঘরে দুধ আনতে পারে না সে, বিশেষত দোকানে টিভি আনার পরে দুধ কম পড়ে যায় প্রতিদিন । কোন উত্তর না পেয়ে আবার জানতে চায়ল ; কী গো কুনু কথা বুলছ না ক্যানে !
 
— ভাবছি দুকানডা বন্ধ করে দিব ! আগেই পিছনে শ্ত্রু লাগ্যাছিল, এখুন গ্রামের হাজিগাজিরাও লাগ্যাছে । আমাকে ওরা ভালোভাবে বাঁচতে দিব্যা ন্যা গো ! বলেই হু হু করে কেঁদে উঠে মোসাদ্দেক। তার দম আঁটকে আসে । বউ ঘর থেকে পানি আনে, হাটে ঢেলে দেয় , দুঢোক খেতে বলে । ঝিম ধরে বসে থাকে কতক্ষণ । ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে, আসেপাশের বাড়িতেও কেউ জেগে নাই নিশ্চয় । পাড়াগাঁয়ের লোক, বিহ্যানে উঠে কাজে যায়, তাই বেশি রাত জাগতে পারে না । বউ নিরবতা ভাঙ্গে । অ্যা আবা কী বুলছ ! মায়ের প্যাট থাক্যে পড়ে হুনে তুমার দুকান চালান্যা কাজ । অ্যা ছাড়া তুমি আব্বা কী করব্যা ! এখুন দুকান বন্ধ কর‍্যা দিলে ব্যাটা, জামাই ঝি , কী করে সংসার চলব্যা বুলোধিনি ! ওইসব ভাবনা বাদ দ্যাওধিনি । কে কী বুল্যাছে আমাকে বুল ।
 
— পাড়ায় এতো দুকান হয়ে গেলছে , চলব্যা কী কর‍্যা বুল ! বাধ্য হয়ে দুকানে টিভি কিন্নু তাথেই অধের ফাটছে । সব মলবি হাজিগাজি মসজিদের নামে লাখ লাখ টাকা তুলে হাপিস কর‍্যা দিছ্যে, খেড়ু হাজি হজ করে এসে মরা ভাইয়ের সব জমি দখল কর‍্যা লিল অনাথ ভাইঝিধের এক ছটাক ঠ্যাকাল ন্যা, কলেম মিয়া মাদ্রাসার টাকায় বাড়ি ফান্দাল তাতে কুনু কিছু হয় ন্যা ! আমার বেলায় যতসব ধর্মের কলকাঠি ।
 
— তাহালে এখুন কী করবা ভাবছ ?
 
— দেখি , বাহেরে কাজে যাব ! নাহালে ইট ভাটায় মুনিষ খাটব !
 
— তুমার ছেল্যা মানুষি কথা ছাড়হিনি ! এই বুয়াসে ওই ভারি কাজ তুমি পারব্যা ! দোকান চালাও ! এবের ওরা আসলে আমাকে ডাকবাহিনি ! মোসাদ্দেক মিয়াঁ চুপ করে থাকে । রাতে আর কিছুই খায় না । ঝিম ধরে বসে থাকতে থাকতে বিছানায় আছড়ে পড়ে । রাতে কত কী ভাবে, সেই ছোট্ট বয়স ছেকে চায়ের দোকানে চা বেচে বড়ো হয়ে উঠেছে, বিয়ে করা, ছেলে মেয়েদের মানুষ করা । আর আজ সেই দোকান বন্ধ করতে হলে সে কী করবে ! রাতের আঁধারে ফসফস করে কেঁদে উঠল আবার। কথায় কথায় আজ তার কান্না পাচ্ছে ! এই কী করছ তুমি, ও হাববুরের আব্বা ? কাঁনছো ক্যানে ? মোসাদ্দেক কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করে , পারে না । স্ত্রী বুকের কাছে টেনে নেয় স্বামীর মাথা । আমি অন্য কিছু করতে পারব ন্যা গো ! বউ আরও জাপটে ধরে স্বামীকে । মোসাদ্দেকও যেন বুকের খাঁজে গুটিয়ে যেতে চায় ।
 
— চুপ করো, পাশের ঘরে হাববুর ঘমাছে, উঠে যাবে । আমরা অন্যগ্রামে উঠে যাবহিনি , সেখ্যানে যায়্যে চায়ের দুকান দিব । সব ঠিক হয়ে যাবে দেখবা, সব ঠিক হয়ে যাবে । মরল্যা দুজনা একসাথে মরব, বাঁচলে একসাথেই বাঁচব ! দু’জন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চাপা কান্নায় ডুবে যায় । সে কান্না আর দেওয়াল ভেদ করে বেরতে পারে না ।
 
খুব সকালে আবার গমগম করে বেজে ওঠে মোসাদ্দেকের চায়ের দোকান । টিভিতে জেগে উঠেছে ছবির নায়ক- নায়িকারা আবার; কাউকে ভয় করে না মোসা । একঘরে করে তো করুক, আগে প্রাণে বাঁচবে , ওর সারাজীবনের কাজ সে ছাড়তে পারবে না । টিভির গান আরও ভলিওম বাড়িয়ে দেয় “বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না আমায় কথা দিয়েছে/আসি আসি বলে জ্যোৎস্না ফাকি দিয়েছে ।“
 

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!