Advertisement
  • ব | ই | চ | র্যা রোব-e-বর্ণ
  • অক্টোবর ১১, ২০২৬

রোমে সকলেই একটু ‘বহিরাগত’

জিয়া হক
রোমে সকলেই একটু ‘বহিরাগত’

এ বই যতটা রোমের গল্প, তার চেয়ে বেশি রোমান মানুষের গল্প। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, যারা কোথাও পুরোপুরি ‘ঘরের মানুষ’ হয়ে উঠতে পারে না, তাদের গল্প।

নয়টি গল্প। একই শহর। কিন্তু ‘একই’ রোম নয়। কোথাও পর্যটকের রোম। কোথাও অভিবাসীর রোম। কোথাও মধ্যবিত্ত পরিবারের রোম। কোথাও একা মানুষের। কোথাও আবার এমন এক শহর, যেখানে একই সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা মানুষগুলিও পরস্পরের কাছে যেন অচেনা। প্রকাশকের বর্ণনাতেও এই বৈচিত্র্য স্পষ্ট। ‘দ্য বাউন্ডারি’, ‘পি’জ পার্টিজ’ এবং ‘দ্য স্টেপস’— তিনটি গল্পেই ভিন্ন শ্রেণি, জাতিগত পরিচয় ও অভিবাসী জীবনের সংঘাত আন্তরিক বয়ানে উঠে এসেছে। লাহিড়ির বিশেষত্ব, তিনি ‘বিদেশি’ আর ‘স্থানীয়’-কে সরল দুই ভাগে ভাগ করেন না। বরং দেখান, শহরের ভিতরেই কত মানুষ ‘নিজের জায়গা’ হারিয়ে ফেলে। লেখক নিজেও বলেছেন, তাঁর কাছে বইটির সকল চরিত্রই কোনো না কোনো অর্থে ‘আউটসাইডার’। জন্মসূত্রে রোমান হওয়াও কাউকে সম্পূর্ণ ‘ভিতরে’র মানুষ করে তোলে না। এ জায়গাতেই ‘রোমান স্টোরিজ’ ভিন্ন।

লাহিড়ির চরিত্রদের ‘নাম’ নেই। এটি নিছক শৈলীগত কৌশল বলে আমার মনে হয় না। নাম না থাকায় মানুষগুলি একদিকে আরও ‘অস্পষ্ট’। অন্যদিকে আরও সার্বজনীন। তারা নির্দিষ্ট ব্যক্তি থেকেও যেন সামাজিক চরিত্র হয়ে ওঠে। অভিবাসী। শিক্ষক। গৃহকর্মী। মা। বাবা। কিশোরী। বিধবা। প্রতিবেশী। প্রত্যেকেই যেন একটি বৃহত্তর নগর-সমাজের প্রতিনিধি। কিন্তু প্রতিনিধি হয়েও তারা কখনো নিছক ‘প্রতীক’ হয়ে যায় না। এটাই লাহিড়ির সাফল্য।

তিনি বড়ো রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেন না। ছোটো ঘটনাকেই ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠার পরিসর দেন। একটি রেস্তরাঁয় বসা। রাস্তা দিয়ে হাঁটা। প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা। কোনো পার্টিতে যাওয়া। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা। ডাকঘর থেকে পার্সেল নিয়ে ফেরা। এই সামান্য ঘটনাগুলির ভিতরেই ঢুকে পড়ে বর্ণবিদ্বেষ, শ্রেণি, অভিবাসন, একাকিত্ব এবং ক্ষমতার সম্পর্ক।

নাম না থাকায় মানুষগুলি একদিকে আরও ‘অস্পষ্ট’। অন্যদিকে আরও সার্বজনীন। তারা নির্দিষ্ট ব্যক্তি থেকেও যেন সামাজিক চরিত্র হয়ে ওঠে। অভিবাসী। শিক্ষক। গৃহকর্মী। মা। বাবা। কিশোরী। বিধবা। প্রতিবেশী।

‘দ্য স্টেপস’ গল্পটি এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একটি জনসাধারণের সিঁড়ি হয়ে ওঠে গোটা পাড়ার সামাজিক মানচিত্র। সেখানে মানুষ ওঠে। নামে। অপেক্ষা করে। কাজের জন্য ছুটে যায়। কেউ অন্যের সন্তানের দেখাশোনা করে। কেউ নিজের সন্তানকে দূর দেশে রেখে এসেছে। একটি সাধারণ সিঁড়ি তখন আর কেবল ‘স্থাপত্য’ থাকে না। হয়ে ওঠে শ্রেণি ও অভিবাসনের অদৃশ্য অলিন্দ। আমার কাছে বইটির সবচেয়ে তীব্র বিষয় ‘হোম’ নয়, বরং ‘আন-বিলঙ্গিং’। ঘর থাকা আর ঘরের মানুষ হওয়া এক কথা নয়।

কেউ বহু বছর রোমে থেকেও বিদেশি। কারও জন্ম রোমে। তবু সে একা। কেউ অন্যের বাড়িতে কাজ করে। অন্যের সন্তানকে বড়ো করে। অথচ নিজের সন্তান থাকে অন্য দেশে। কারও আবার ভাষা ‘ঠিক’ নয়। কারও চেহারা ‘অন্যরকম’। কারও উচ্চারণ ‘সন্দেহ’ তৈরি করে। অর্থাৎ শহর শুধু মানুষকে আশ্রয় দেয় না। শ্রেণিবিন্যাসও করে।

এই শ্রেণিবিন্যাস কখনো প্রকাশ্য। কখনো খুব সূক্ষ্ম। একটি তাকানো। একটি মন্তব্য। একটি অস্বস্তিকর নীরবতা। কখনো একটি অপমান। কখনো সরাসরি আক্রমণ। ‘দ্য ডেলিভারি’তে এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণীকে রাস্তায় বর্ণবিদ্বেষী আক্রমণের মুখে পড়তে হয়। ‘দ্য রিএন্ট্রি’তে বন্ধুত্বের ভিতর ঢুকে পড়ে বর্ণবিদ্বেষ। ‘ওয়েল লিট-হাউসে’ যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা একটি পরিবার শেষ পর্যন্ত নিজের বাসস্থানও হারায়। এখানে লাহিড়ির সমাজ-দৃষ্টি খুব স্পষ্ট।

বর্ণবিদ্বেষ তাঁর কাছে কেবল কোনো উগ্র ব্যক্তির সমস্যা নয়। এটি দৈনন্দিন সামাজিক আচরণের মধ্যেও নিরন্তর কাজ করে চলে। সভ্য শহরের ‘ভদ্র’ মুখের নীচে জমে থাকে সন্দেহ। ভয়। বিরাগ। শ্রেষ্ঠত্ববোধ। এ কারণেই রোমের সৌন্দর্যও বইটিতে নিখাদ ‘সৌন্দর্য’ নয়।

রোমের প্রাচীন স্থাপত্য আছে। আলো আছে। রাস্তা আছে। উৎসব আছে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের পাশে আবর্জনা। দেওয়ালে ‘নারীবিদ্বেষী’ ও ‘বর্ণবিদ্বেষী’ গ্রাফিতি। ভাঙা কাচ। আক্রমণের আতঙ্ক। অর্থাৎ পোস্টকার্ডের রোম এবং বাসযোগ্য রোম এক নয়। লাহিড়ি এই দুই রোমকে পাশাপাশি রাখেন। এই দ্বৈততা বইটির নান্দনিক ভিত্তি। শহর সুন্দর। শহর নিষ্ঠুরও। মানুষও তাই।

‘পি’জ পার্টি’তে সামাজিক ভদ্রতার ভিতর ঢুকে পড়ে আকাঙ্ক্ষা, ঈর্ষা এবং সীমা-লঙ্ঘন। একটি মধ্যবিত্ত পার্টি তাই নিছক আর সামাজিক সমাবেশ থাকে না। সম্পর্কের অদৃশ্য ক্ষমতার ‘খেলা’ও হয়ে ওঠে। কে কাকে পছন্দ করে। কে কাকে বিচার করে। কে নিজেকে নিরাপদ ভাবে। কে অন্যের উপস্থিতিতে অস্বস্তি বোধ করে। ছোট ছোট সামাজিক আচরণেই মনস্তত্ত্ব প্রকাশ পায়।

মনস্তাত্ত্বিক সূক্ষ্মতাই লাহিড়ির পুরনো শক্তি। তবে ‘রোমান স্টোরিজে’ তা আরও দৃঢ় ও জোরালো হয়ে উঠেছে। ‘ইন্টারপ্রিটার অফ ম্যালাডিজে’র অনেক গল্পে যে সাংস্কৃতিক দূরত্ব ছিল, এখানে তা শহুরে অস্তিত্বের বৃহত্তর সংকটে পরিণত হয়েছে। আর একটি পরিবর্তন খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো ভাষা। গল্পগুলি প্রথমে ইতালীয় ভাষায় লেখা। পরে ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। ছয়টি গল্প নিজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন লাহিড়ি। বাকি তিনটির অনুবাদে কাজ করেছেন টড পোর্টনোভিৎজ। এখানে ভাষা কেবল মাধ্যম নয়। বিষয়ও।

একজন বাংলা-ইংরেজি সাংস্কৃতিক পরিসরের লেখক ইতালীয় ভাষায় রোমের গল্প লিখছেন। তারপর সেই গল্প আবার ইংরেজিতে ফিরছে। ভাষা বদলাচ্ছে। লেখকের অবস্থানও বদলাচ্ছে। যেন ‘আমি কোথাকার?’ প্রশ্নটি লেখার পদ্ধতির মধ্যেই ঢুকে পড়ছে। অগোচরে নয়, প্রকাশ্যে।

এ কারণেই ‘রোমান স্টোরিজ’কে অভিবাসনের বই বললে কম বলা হয়। এটি ‘আত্মপরিচয়ে’র বই। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, পরিচয় কতটা ভঙ্গুর, তার বই। শেষ গল্প ‘দান্তে আলিগিয়েরি’ যেন এই সমগ্র অভিজ্ঞতার উপর দীর্ঘ এক ছায়া ফেলে রেখেছে। দান্তে এখানে কেবল ইতালির মহান কবি নন। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সংযোগ। জীবন, মৃত্যু, প্রেম এবং পথ হারানোরও প্রতীক। বইটির সমাপ্তিতে তাঁর উপস্থিতি যেন প্রশ্ন তোলে — মানুষ কোথায় পৌঁছয়? এবং পৌঁছলেও কি সত্যিই ঘরে ফেরে?

আমার কাছে ‘রোমান স্টোরিজে’র সবচেয়ে বড়ো ‘সাফল্য’ এখানেই। এটি অভিবাসীর গল্প লিখে শুধু অভিবাসীর মধ্যে আটকে থাকে না। বহিরাগতকে আয়নায় দেখিয়ে ভিতরের মানুষটির অস্বস্তিকেও ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেয়। বিদেশিকে দেখিয়ে স্থানীয় মানুষের মনের কোণায় লুকিয়ে থাকা ‘ভয়’কেও দেখায় বারবার। শহরের সৌন্দর্য দেখায় না শুধু, তার চিরাচরিত ক্ষতও দেখায়। ফলে রোম এখানে আর কোনও একটি শহর নয় নেহাত। একটি মানসিক অবস্থা। সেই অবস্থার নাম—থাকা, অথচ পুরোপুরি না-থাকা।

লাহিড়ির চরিত্ররা সেই অসম্পূর্ণতার ভিতরেই বেঁচে থাকে। কেউ মানিয়ে নেয়। কেউ প্রতিরোধ করে। কেউ পালায়। কেউ ফিরে আসে। কেউ থেকে যায়। আর আমরা বুঝতে পারি, আধুনিক মহানগরে ‘ঘর’ আসলে কতটা অনিশ্চিত একটি শব্দ। ‘রোমান স্টোরিজ’ তাই নিছক রোমের গল্পসংকলন নয়। এটি মানুষের সামাজিক বিচ্ছিন্নতার এক সংবেদনশীল মানচিত্র। কোনও বড় স্লোগান নেই। কোনও ঘোষিত মতাদর্শ নেই। আছে মানুষের আচরণ। আর সেই আচরণের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসে সমাজের মুখ। রোমকে লাহিড়ি ভালোবাসেন। কিন্তু ‘অন্ধ’ ভাবে নয়। এই ভালোবাসার ভিতরেই তাঁর অভিযোগ। শহরটি সুন্দর। শহরটি নির্মম। আর সম্ভবত সেই বিরোধেই তার সত্যিকারের মুখ ও মুখচ্ছবি।

 

 

 

 

 

 

রোমান স্টোরিজ । ঝুম্পা লাহিড়ি । পেঙ্গুইন হ্যামিশ হ্যামিল্টন

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!