- ব | ই | চ | র্যা
- নভেম্বর ১, ২০২৬
‘ইতিবাচক ২৫’: শিক্ষার দর্পণে বহুস্তরী সমাজ ও সময়
শিক্ষা কি কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করা, নম্বরের নিরিখে মেধার বিচার কিংবা নির্দিষ্ট কিছু দক্ষতা অর্জনের নাম ? না কি শিক্ষা মানুষের মনন গঠন, সমাজকে বোঝা, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার এক নিরন্তর প্রক্রিয়া ? ‘ইতিবাচক ২৫: An Introspective Mosaic’ সংকলনের সূচিপত্রের দিকে তাকালে এসব প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে। ভাষা, ইতিহাস, শ্রেণিকক্ষ, প্রযুক্তি, মূল্যায়ন, শিশুমন, শিক্ষক-অভিভাবকের সম্পর্ক, সাংবাদিকতা এবং চলচ্চিত্রের মতো বিচিত্র বিষয়কে এক মলাটে নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে সংকলনটি শিক্ষার প্রচলিত ধারণাকে বৃহত্তর সামাজিক ও মানবিক পরিসরে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে।
এই সংকলনের বিশেষত্ব এর বিষয়বৈচিত্র্যে। এখানে শিক্ষাকে কোনো বিচ্ছিন্ন ‘প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া’ হিসেবে দেখা হয়নি। বরং ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে শুরু করে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ, ঔপনিবেশিক ইতিহাস থেকে সমকালীন শ্রেণিকক্ষ — বিভিন্ন বিষয়কে পাশাপাশি রেখে শিক্ষার বহুমাত্রিক চরিত্র অনুধাবনের চেষ্টা রয়েছে। বিষয় নির্বাচন থেকেই সংকলনটির চিন্তার পরিসর আর সম্ভাব্য অভিমুখ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্ন দিয়ে শুরু হওয়া এ যাত্রা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘ভাষার জন্ম ও জন্মান্তর’ প্রবন্ধে ঋত্বিক মল্লিক যেমন ভাষার বিবর্তনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, তেমনই ‘চমস্কির ভাষাতত্ত্ব: দর্শন ও শ্রেণিকক্ষে প্রভাব’ শীর্ষক লেখায় স্বর্ণালী শ্যাম রায় ভাষা, উপলব্ধি এবং শিক্ষার সম্পর্ক নিয়ে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছেন। ভাষা নিছক যোগাযোগের মাধ্যম নয়; মানুষের অভিজ্ঞতা, সামাজিক অবস্থান ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও বাহক। শ্রেণিকক্ষে ভাষার ব্যবহার তাই শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ ও আত্মবিশ্বাসকে প্রভাবিত করতে পারে। একইভাবে, জলপাইগুড়ির বাংলা ভাষার স্বকীয় বিবর্তন নিয়ে সুজয় কুমার বর্মণের প্রবন্ধ আঞ্চলিক ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রমিত ভাষার আধিপত্যের বাইরে স্থানীয় ভাষার নিজস্ব ইতিহাস ও প্রকাশভঙ্গিকে স্বীকৃতি দেওয়া শিক্ষার ‘গণতান্ত্রিক’ চরিত্রের জন্য জরুরি।
ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্কও সংকলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ‘উচ্চারণে উচ্চ-আসন: ইংরেজি-চর্চা, না, কলোনিয়াল-হ্যাংওভার?’ শীর্ষক প্রবন্ধে রাতুল গুহ ও ড. পূর্ণেন্দু চ্যাটার্জী যে প্রশ্নটি তুলেছেন, তা সমকালীন ভারতীয় সমাজে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ইংরেজি ভাষা শিক্ষা ও পেশাগত সুযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু ইংরেজি জানাকে ‘সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বে’র মাপকাঠি হিসেবে দেখার প্রবণতা ভাষাগত বৈষম্যকে আরও গভীর করতে পারে। ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটলেও ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ‘ক্ষমতা’ ও ‘মর্যাদা’র কাঠামো কতটা বদলেছে, সেই আত্মসমীক্ষা প্রয়োজন। মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার এবং অন্যান্য ভাষা শেখার সুযোগ — এই দুইয়ের মধ্যে বিরোধ তৈরি না করে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত শিক্ষানীতির লক্ষ্য।
সংকলনের বিষয়বৈচিত্র্য এর সবচেয়ে বড়ো সম্পদ। ভাষা, ইতিহাস, প্রযুক্তি, মূল্যায়ন ও মানবিক সম্পর্কের মধ্যে সংযোগ খোঁজার সুযোগ এখানে রয়েছে। তবে এমন সংকলনের প্রকৃত সার্থকতা কেবল বিচিত্র বিষয়ের সমাবেশে নয়; প্রবন্ধগুলির পারস্পরিক সংলাপ কতটা গভীর, যুক্তি কতটা সুসংহত এবং প্রস্তাবগুলি বাস্তব শিক্ষাজগতের সমস্যার সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত, তার উপরও নির্ভর করে। কতটা ‘নগদ’ বাস্তবায়িত হচ্ছে ভাবনাগুলি, তাও লক্ষ্য করার
ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ ঊনবিংশ শতাব্দীর কলেরার বিস্তার নিয়ে তিস্তা ঘোষের ইংরেজি প্রবন্ধ ‘Spread of Cholera in the 19th Century: What it taught’-তে। মহামারির ইতিহাস কেবল অতীতের রোগব্যাধির বিবরণ নয়। জনস্বাস্থ্য, নগরজীবন, পরিচ্ছন্নতা, সামাজিক বৈষম্য এবং প্রশাসনিক দায়িত্বের মতো বিষয়ও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। অতীতের অভিজ্ঞতা কীভাবে বর্তমানের স্বাস্থ্যশিক্ষা ও নাগরিক সচেতনতাকে সমৃদ্ধ করতে পারে, এ বিষয়টি তাই বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে। ইতিহাসকে মুখস্থ করার বিষয় না বানিয়ে বর্তমানকে ‘বোঝা’র উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনা এখানেই।
সংকলনের কেন্দ্রীয় আকর্ষণ অবশ্যই শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা সমস্যা নিয়ে লেখা প্রবন্ধগুলি। ‘মেয়েদের আঁক কষা: সহজ সমীকরণ জটিল সমাধান’ শীর্ষক লেখায় অরুন্ধতী দাশের আলোচনার বিষয় হিসেবে বিজ্ঞান-শিক্ষায় মেয়েদের অভিজ্ঞতা ও বাধার প্রশ্নটি উঠে এসেছে সংক্ষিপ্তাকারে। বিজ্ঞানের মতো বিষয়কে ঘিরে ‘ভয়’, আত্মবিশ্বাসের অভাব কিংবা লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক ধারণা কীভাবে শিক্ষার্থীর শেখার অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে আলোচনা জরুরি। একইভাবে শিক্ষার মানোন্নয়নে অভিভাবকের অংশগ্রহণ নিয়ে রতন রায়চৌধুরীর প্রবন্ধ শিক্ষক, পরিবার ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা মনে করিয়ে দেয়।
‘নোট বই বনাম রেফারেন্স বই: উল্লম্ব উত্তরণ বনাম অনুভূমিক অভিযোজন’ শীর্ষক লেখায় দেবাশিস পাঠকের আলোচ্য বিষয়ও সমকালীন শিক্ষাব্যবস্থার একটি পরিচিত সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে। পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনায় নোটনির্ভরতা অনেক সময় দ্রুত প্রস্তুতির সুযোগ দিলেও স্বাধীন চিন্তা ও গভীর অনুধাবনের বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে, তথ্যের উৎস যাচাই, বিভিন্ন মতের তুলনা এবং যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে রেফারেন্স বইয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বইয়ের ধরন নয়, শিক্ষার্থী ‘কীভাবে’ পড়ছে এবং সেই পাঠকে চিন্তার ‘কাজে’ লাগাচ্ছে কি না, সেটিও সমান জরুরি।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনাও সংকলনটিকে সমকালীনতা-গুণে ‘গুণবতী’ করেছে। ‘প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং ২০৩০ সালের শ্রেণিকক্ষ: সম্ভাবনা ও সংশয়’ এবং সঞ্জয় পালের ‘The AI Revolution in Education: Promise, Peril, and the Path Forward’—এই দুই প্রবন্ধের বিষয় নির্বাচন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে পারে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক অনুশীলনে সাহায্য করতে পারে এবং তথ্যের নাগাল সহজ করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং ডিজিটাল বৈষম্যের মতো প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষককে সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন করবে, এমন সরল সিদ্ধান্তের পরিবর্তে প্রযুক্তিকে কীভাবে মানবিক শিক্ষার সহায়ক করা যায়, সে প্রশ্নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার মানবিক দিকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে শিশুর দৃষ্টিকোণ থেকে শেখা, সৃজনশীলতা, মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থার মতো বিষয়গুলিতে। ‘যদি এমন হতো: একটি শিশুর দৃষ্টিকোণ থেকে শেখার নতুন দিগন্ত’, ‘উদ্যোগে সৃজনশীলতা’ এবং ‘মূল্যায়নের আনন্দ, আনন্দের মূল্যায়ন’—এই শিরোনামগুলি ‘শেখার আনন্দ’কে শিক্ষার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তাকেই মনে করিয়ে দেয়। পরীক্ষা ও নম্বরের চাপে শিক্ষার্থীর কৌতূহল, কল্পনাশক্তি এবং নিজের মতো করে ভাবার ক্ষমতা যাতে হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা দরকার। কৃশানু গুহর ‘The Inner Scorecard: Aligning Student’s Mind and Outcome’ শিরোনামটিও শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ ও শিক্ষাগত ফলাফলের সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। শিক্ষার সাফল্য কেবল বাইরের স্বীকৃতিতে নয়, আত্মবিশ্বাস, আত্মমূল্যায়ন ও মানসিক পরিণতিতেও নিহিত কি না তা নিয়ে পুনরায় ভাবার সময় এখনো আসেনি কি?
এ ছাড়া সাংবাদিকতা, চলচ্চিত্র, শিক্ষকজীবন এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের শিক্ষা নিয়ে প্রবন্ধগুলি সংকলনের সামাজিক পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ইতিহাসবোধের প্রয়োজনীয়তা এবং চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সমাজ, শিক্ষা ও জীবনদর্শন অনুধাবনের সম্ভাবনা শিক্ষাকে শ্রেণিকক্ষের বাইরের জগতের সঙ্গে যুক্ত করে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের শিক্ষা নিয়ে আলোচনাও মনে করিয়ে দেয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা কেবল নীতিগত ঘোষণা নয়; তার জন্য প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, উপযুক্ত পরিকাঠামো এবং বাস্তব সহযোগিতা।
বলা দরকার, ‘ইতিবাচক ২৫: An Introspective Mosaic’ নামটিই আত্মসমীক্ষার এক বহুস্বরিক পরিসরের ইঙ্গিত দেয়। সংকলনের বিষয়বৈচিত্র্য এর সবচেয়ে বড়ো সম্পদ। ভাষা, ইতিহাস, প্রযুক্তি, মূল্যায়ন ও মানবিক সম্পর্কের মধ্যে সংযোগ খোঁজার সুযোগ এখানে রয়েছে। তবে এমন সংকলনের প্রকৃত সার্থকতা কেবল বিচিত্র বিষয়ের সমাবেশে নয়; প্রবন্ধগুলির পারস্পরিক সংলাপ কতটা গভীর, যুক্তি কতটা সুসংহত এবং প্রস্তাবগুলি বাস্তব শিক্ষাজগতের সমস্যার সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত, তার উপরও নির্ভর করে। কতটা ‘নগদ’ বাস্তবায়িত হচ্ছে ভাবনাগুলি, তাও লক্ষ্য করার। শিক্ষাকে নম্বর, চাকরি কিংবা পাঠ্যক্রমের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে বের করে মানুষ ও সমাজকে বোঝার বৃহত্তর প্রয়াস হিসেবে দেখতে চাইলে সংকলনটি সেই ভাবনার আকর্ষণীয় সূচনাবিন্দু হতে পারে।
সম্পাদনা: রাতুল গুহ, পূর্ণেন্দু চ্যাটার্জী
সম্পাদনা সহায়তা: তন্ময় কুমার ঘোষ
প্রকাশক: রূপালী মূল্য: ২৫০ টাকা
♦–♦•♦–♦ ♦–♦•♦–♦
❤ Support Us








