- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ
- নভেম্বর ১, ২০২৬
অন্য ভাগলপুর, অন্য ‘শ্রীকান্ত’
শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম কবে পড়েছি, মনে করতে পারছি না । বোধহয় যখন সবে পড়তে শিখেছি তখনই । বইয়ের মলাট কেমন ছিল, তাও মনে নেই । তবে মনে আছে, সে বই আমাদের সকলের সম্পত্তি । এখানে ওখানে পড়ে থাকত আমাদের পরম আদরের, পরম অনাদরেরও বইটি । যে হাতে পেত,
সে-ই পড়ত কয়েক পাতা; আর অন্যেরা তার হাত থেকেও টানাটানি করে কেড়ে নিত । পড়তে পড়তে বইটির কী দশা করেছিলাম, সে কথা ভাবলে এখন শরৎচন্দ্রের কাছে ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে করে ।
মনে হয় শরৎচন্দ্র বুঝি আমাদের একেবারে কাছেই বসে, সবকিছু চোখের সামনে দেখে দেখে লিখে গেছেন । আমাদের বাহিরবাড়ি, ভিতরবাড়ি, দেউড়ি, পোর্টিকো, সন্ধ্যার লন্ঠন, গম্ভীর দাদা, তস্য বয়োজ্যেষ্ঠ-বান্ধব চক্রবর্তীদাদা, আর শরৎচন্দ্রের একনিষ্ঠ নীরব পাঠক মানিক মামা — সবাই যেন তাঁর অতি পরিচিত। আমাদের বাড়ির ‘সর্ব বিঘ্ন বিনাশায় সর্বকল্যাণ হেতবে’ মানিক মামার দায়িত্ব ছিল একেবারে জুতাসেলাই থেকে ঠাকুর দেওয়া পর্যন্ত ।
শুধু বাড়ির লোকজনই নয়, বইতে যেমন ছিল, তেমনি পুকুরের ওপারে কয়েক ঘর দেশোয়ালি এবং আশপাশের বিচিত্র প্রতিবেশীরাও যেন লেখকের চেনা-জানা । মনে হয় এ বইয়ের মানুষগুলো কি তবে আমাদেরই চারপাশে একসময় ঘুরে বেড়াচ্ছিল ? শরৎচন্দ্র কি সত্যিই আমাদের গ্রামে এসে, আমাদেরই সংসারের আড়ালে-আবডালে বসে, একে একে সবাইকে দেখে গিয়েছিলেন ?
বাহিরবাড়িতে সন্ধ্যাবেলা দুই সমবয়সী ভাগিনাসহ আমরা তিন স্কুল পড়ুয়া ফর্সো ঘরে লন্ঠনের আলোয় গোল হয়ে পড়তে বসতাম । দেউড়িতে থাকত বাড়ির চাষের কর্মী, মহিষ রাখালরা । এরা সুর করে তুলসীদাসী রামায়ণ না পড়লেও বাবাহরের গান, মঙ্গল আরতির কীর্তন, শ্রাবণ মাসে পদ্মাপুরাণ গানের মহড়া এখানেই করে নিত ।
খুড়তুতো দাদা তাঁর বন্ধু রসিক পুরোহিত চক্রবর্তীমশাইয়ের সঙ্গে পোর্টিকোতে আরাম কেদারায় বসে সান্ধ্যকালীন তন্দ্রা উপভোগ করতেন, একেবারে শ্রীকান্তের পিসেমশাইয়ের মতোই ।
কোন আশ্চর্য জাদুবলে শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’-এর প্রথম পর্বের দৃশ্যপট যেন বইয়ের পাতা থেকে গ্রাম কাছাড়ের পুরনো এ জমিদার বাড়িতে নেমে এল ভাবতে আশ্চর্য লাগে ! বলা চলে পশ্চিমের ভাগলপুরে পিসেমশাইয়ের বাড়িটিই একটু এদিক সেদিক হয়ে যেন উড়ে এসে বসেছে এ গ্রামে । এখানে পিসতুতো ভাই আর ছোড়দা যতীনদাও আছেন অন্য নামে অন্য পরিচয়ে। পিসির বাড়ির মেজদার অনুরূপ চরিত্রও আছেন, যিনি ছোটোদের উপর বেশ ছড়ি ঘুরিয়ে রাজত্ব করছেন । এই প্রেক্ষাপটে আমাদের ছিল ‘প্র্যাকটিক্যাল শ্রীকান্ত পাঠ’।
‘সেদিনটির কথা আমার খুব মনে পড়ে’ – শ্রাবণের সন্ধ্যা, সারা আকাশ মেঘে ঢাকা। বাইরের ঘরে রেড়ির তেলের প্রদীপের জায়গায় কেবল জ্বলছে কেরোসিনের বাতি । চৌকির উপর একজন ফেল-করা না হলেও কনসিডারেশনে পাশ অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে তিন-চারটি বালক গভীর মনোযোগে বিদ্যাদেবীর আরাধনা করছে — যদিও এদের মনোযোগের পরিমাণ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে । পরদিন স্কুলে এদের এমনতর অধ্যয়নের যথোচিত পুরস্কার লাভের কথা তো আছেই । মনে হতো শরৎচন্দ্র এ সবই দেখে গেছেন ।
এরকম সময় পশ্চিমা বহুরূপী বা সঙদের জমিদারবাড়িতে আসা মোটেই অস্বাভাবিক কিছু ছিল না । অবশ্য ভালুকের বেশে এসে যে নাটকীয় বিপত্তি ঘটিয়েছিল শ্রীনাথ, বাংলা সাহিত্যে তার তুলনা মেলা ভার। আমাদের প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট কিন্তু এরকমই ছিল — বুঝতেই পারছেন । সেই দেউড়ি, চৌকিদার, সন্ধ্যায় আমেজ করে ধূমপানরত পণ্ডিতমশাই, এমনকি ঠাকুরদালানের লাগোয়া ডালিমগাছটিও । ‘শ্রীকান্ত’-র এ পর্বটি পড়তে পড়তে আমাদের মুখস্থ ।
শ্রাবণের বুকের ভেতর সত্যিই আগুন লুকিয়ে থাকত । রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর মশারির ভিতর ঢোকা ছিল প্রায় অসম্ভব । তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া করে শরীর ঠান্ডা করার বৃথা চেষ্টা করতে করতে মাঝরাত পার হয়ে যেত । আমাদের প্রশ্রয়দাত্রী পরম স্নেহময়ী কাকিমার ঘরের কাছে ছিল বাঁশঝাড় আর একটা জামগাছ । সেদিক থেকে মাঝে মাঝে একটু ঠান্ডা বাতাস আসত । সে আশাতেই আমরা মণ্ডপের লাগোয়া ফর্সো ঘর, বা তার পাশের শোয়ার ঘর ছেড়ে গুটি গুটি পায়ে কাকিমার ঘরে গিয়ে জমায়েত হতাম । মাটিতে পাটি বিছিয়ে শুয়ে থাকতাম — যদি একটু ঠাণ্ডা হাওয়া কিংবা বৃষ্টির বার্তা নিয়ে মেঘের ডাক আসে !
আমরা এখানেও সেরকম কোনো মজাদার ঘটনা ঘটবে, এ আশায় ঘুমিয়ে পড়তাম । তবে কখনো কখনো দু-একজন আগন্তুক এসে আমাদের বিনোদন জুগিয়েও যেতেন । কোনো মনসার গান গাওয়া না-পুরুষ না-স্ত্রী গুর্মী শিল্পী, অথবা কোনো ভাবের পাগল, উচ্চরবে ‘দেহি পদপল্লবমুদারম্’ বলে এসে বাবার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতেন । লন্ঠনের আলোয় পড়তে পড়তে দূর থেকে গানের সুর ভেসে এলে মনে হতো, এই বুঝি শ্রীকান্ত- গল্পের আর-একটি চরিত্র এসে পড়ল ।
তখন শ্রাবণের বুকের ভেতর সত্যিই আগুন লুকিয়ে থাকত । রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর মশারির ভিতর ঢোকা ছিল প্রায় অসম্ভব । তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া করে শরীর ঠান্ডা করার বৃথা চেষ্টা করতে করতে মাঝরাত পার হয়ে যেত । আমাদের প্রশ্রয়দাত্রী পরম স্নেহময়ী কাকিমার ঘরের কাছে ছিল বাঁশঝাড় আর একটা জামগাছ । সেদিক থেকে মাঝে মাঝে একটু ঠান্ডা বাতাস আসত । সে আশাতেই আমরা মণ্ডপের লাগোয়া ফর্সো ঘর, বা তার পাশের শোয়ার ঘর ছেড়ে গুটি গুটি পায়ে কাকিমার ঘরে গিয়ে জমায়েত হতাম । মাটিতে পাটি বিছিয়ে শুয়ে থাকতাম — যদি একটু ঠাণ্ডা হাওয়া কিংবা বৃষ্টির বার্তা নিয়ে মেঘের ডাক আসে ! আর কাকিমাকে গল্প বলার জন্য ধরতাম ।
গল্প বলার আসল ক্ষমতা অবশ্য ছিল মায়ের । কিন্তু মা এমন গরমেও লন্ঠন জ্বালিয়ে বই পড়তেন । এ ছিল তাঁর বিশেষ শৌখিনতা । আমাদের কাছে ঘেঁষতেই দিতেন না । ফলে কাকিমাই ছিলেন আমাদের শেষ ভরসা । তাঁর ঘরে হাঁসফাঁস করতে করতে কখন ঘুম এসে যেত, টের পেতাম না। কাকিমা তখন আমাদের টেনে-টুনে বিছানায় ফেলে, মশারি গুঁজে দিতেন ।
এরকমই উৎকট গরমের দিনে উঁকি দিত পশ্চিমবাড়ির কানুদা । শিস দিয়ে রামপ্রসাদী সুর টেনে, লবঙ্গ ঠাকুরাণের বাড়ি পেরিয়ে গোঁসাইবাগানের মতো পরিত্যক্ত খালিবাড়ির জঙ্গলে, ভীষণাকৃতি শ্যাওড়া গাছের নিচ দিয়ে, গায়ে বিচিত্র সব আগাছা সম্বলিত, অতি উঁচু এক একটা আদ্যিকালের গাছের আম কুড়িয়ে যে পথ দিয়ে কানুদা আসত সে পথে সচরাচর পড়ে থাকত দু-মুখো শঙ্খিনী — অনেকেই তা দেখেছেন । আমরা বলতাম পাটোয়া সাপ । এসব শুনেও, কিংবা গেছো আলদ, দাঁড়াশ বা অন্য কোনো বিষধর সাপের উপস্থিতির সম্ভাবনা জেনেও, কানুদার বিশেষ ভাবান্তর হতো না। আমাদের তো তাঁকেই মনে হতো, ইন্দ্রনাথের আর-একটি সংস্করণ ।
কানুদা কদাপিও শরৎচন্দ্র পড়েনি । তবে পক্ষান্তরে, শরৎচন্দ্র যদি তাঁকে চিনতেন, ‘শ্রীকান্ত’-র আরেকটি অধ্যায় লিখে ফেলতেন । কানুদা অবশ্য সাহিত্যিক প্রবরের কাহিনির আরও অনেক উপাদান হয়ে উঠতেন, যদি তাঁর নাট্যপ্রীতির দু-একটি নমুনা কোনো অলৌকিক ক্ষমতাবলে এসে চুপি চুপি দেখে ফেলতেন । সঙ্গী-সাথী জুটিয়ে এরা নৌকা ঠেলে, পায়ে হেঁটে দূর গ্রাম, চা-বাগানের নাচঘর, রেলস্টেশনের লাগোয়া রঙ্গমঞ্চে যাত্রাগান শুধু দেখতে নয়, ছোটখাটো কমিক রোলে পার্টও করতে যেতেন
সে বিষধর সাপের গর্তের পাশে বসে বঁড়শি ফেলত । পুকুরের ঢালের মুখে জলের ধারার সামনে বসিয়ে রাখা ডরির ভিতর মাছখেকো আলদ সাপকে নির্বিষ ঢোড়া ভেবে হাত দিয়ে ধরে ছুড়ে ফেলে দিত । অসমবয়স্ক এ সঙ্গী একবার দুর্গাপূজার অষ্টমীর শেষ রাতে ফুলের সন্ধানে আমাদের নিয়ে ঢুকে পড়েছিল হরিণছড়া চা-বাগানের এক পরিত্যক্ত, ভূতুড়ে বাংলোয় । সেখানে বাঘের গায়ের গন্ধ পেয়ে আমাদের দাঁত কপাটি লাগার জোগাড়। নির্বিকার ভাবে সে বলল, ‘বাঘের গন্ধ’। আমরা প্রশ্ন করলাম, ‘বাঘ কোথায়?’ কানুদার নির্লিপ্ত উত্তর, ‘এই ধারে কাছে কোথাও হবে। আমি কি দেখতে পাচ্ছি’ – ঠিক যেমন বুনো শুয়োরের উপস্থিতি সম্বন্ধে ইন্দ্রনাথ বলেছিল । ষাট বছর আগের কথা। তবে মোটামুটি এরকমই ছিল সে নাটকের দৃশ্যপট ।
আমি হলফ করে বলতে পারি, এ কানুদা কদাপিও শরৎচন্দ্র পড়েনি । তবে পক্ষান্তরে, শরৎচন্দ্র যদি তাঁকে চিনতেন, ‘শ্রীকান্ত’-র আরেকটি অধ্যায় লিখে ফেলতেন । কানুদা অবশ্য সাহিত্যিক প্রবরের কাহিনির আরও অনেক উপাদান হয়ে উঠতেন, যদি তাঁর নাট্যপ্রীতির দু-একটি নমুনা কোনো অলৌকিক ক্ষমতাবলে এসে চুপি চুপি দেখে ফেলতেন । সঙ্গী-সাথী জুটিয়ে এরা নৌকা ঠেলে, পায়ে হেঁটে দূর গ্রাম, চা-বাগানের নাচঘর, রেলস্টেশনের লাগোয়া রঙ্গমঞ্চে যাত্রাগান শুধু দেখতে নয়, ছোটখাটো কমিক রোলে পার্টও করতে যেতেন । তবে ‘ঠুনঠুন পেয়ালা’ গাওয়া সংগীত সাধক নূতনদার মতো কিছুই নয় ।
আমাদের এদিকে সিদ্ধির পাতা তখন দুর্লভ। ওসব আবদারি মাল ‘রেডি টু ইউজ’ হিসেবেই আসত পাহাড়লাইন দিয়ে । ছোটো ছিলিমে ঢুকিয়ে জলন্ত টিকে বসিয়ে বিশেষ কায়দায় প্রাণপণে টেনে টেনে ধোঁয়া বের করার দৃশ্যও দেখেছি । কানুদাও অবশ্য পকেটে খয়েরি রঙের কাগজে মোড়া অপেক্ষাকৃত দুর্বল নেশাদ্রব্য, সঙ্গে অগ্নিসংযোজনের শলাকা রাখত। তবে ইন্দ্রনাথের মতো এ চিজ আমাদের অফার করে একটা টান মেরে দেখতে বলত না কখনো ।
যে কথাটি এবার বলতেই হয় তা হলো, ভাগলপুরের মতো আমাদের এদিকেও ফুটবল ম্যাচ হতো । ঘোষিতভাবে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে যদিও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো না, তবু দল বিভাজন কিছুটা ওই রকমই ছিল । মানে এতে ধর্ম নিরপেক্ষতা মোটেই বজায় রাখা হতো না । তৎসত্বেও দুই সম্প্রদায়কে আলাদা বলে আলাদা করে চিহ্নিত করার কোনো ব্যাপারও ছিল না । মুসলমানই হোক আর হিন্দুই হোক, সবাই যে বাঙালি সে বোধটি ছিল টনটনে । অপরদিকে, সম্ভবত ভাগলপুরের হিন্দিভাষী সবাইই ধর্মে মুসলমান ছিল তা বোঝা যায় ।
তবুও বলব এখানে কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের কলম থেকে একটি অসাবধানী বাক্যটি বেরিয়েই গেল – ‘ইস্কুলের মাঠে বাঙালি ও মুসলমান ছাত্রদের ফুটবল ম্যাচ ।’ এটাও সম্ভব — ভাগলপুর বা পশ্চিমে যাদের সংস্পর্শে শ্রীকান্তর পিসির বাড়ির লোকেরা এসেছেন, তাঁদের কাছে মুসলমানরা সবাইই ছিলেন হিন্দিভাষী । অবশ্য এ ভুলের খেসারত শরৎবাবুকে আজও দিতে হচ্ছে । সমালোচকরা এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়বেন না-ই বা কেন ?
তবে মূল কথা হল শরৎচন্দ্র যেভাবে ছোটোবেলার সেই ভীতি, ফাঁকি আর কৌতূহল মেশানো রোমাঞ্চকর পরিবেশটা এঁকেছেন, তা আমাদের মতো সাধারণ বাঙালি বালকের শৈশব কৈশোরের অভিজ্ঞতার সঙ্গেই যে হুবহু মিলে যায় । এজন্যই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে তিনি বুঝি পাশে বসেই সবটা দেখছেন ! এই যে পাশের পড়ার বিঘ্ন না ঘটিয়ে ঘড়ি ধরে সাড়ে সাতটা থেকে ন-টা পর্যন্ত মনোযোগ সহকারে পড়ার ব্যাপার, তা আমাদেরও ছিল বিলক্ষণ। আমাদের ‘নাক ঝাড়া’, ‘তেষ্টা পাওয়া’র মতো বাহানা না থাকলেও পাঠ্যবইয়ের নিচে শুকতারা, স্বপনকুমার রেখে গুনগুন করে পাঠাভ্যাস করে যাওয়ার ব্যাপার ছিল। পড়ার শব্দেই আমাদের স্বঘোষিত বা ঘোষিত অভিভাবকরা সন্তুষ্ট । আর পড়তে বসে হঠাৎ কোনো জম্পেশ গল্প উঠে গেলে তো হয়ে গেল । তখন একজন উঠে ‘ইন্সপেকশন’ করে কেউ কাছে আছেন বা আসার সম্ভাবনা আছে এসব দেখে এসে আসর শুরু করার ব্যাপারও ছিল ।
এ অবশ্য শরৎবাবুর দেখা হয়নি। আমরা যে ফর্সোঘরে ঠাকুরদাদার আমলের দেওয়াল ঘড়িটির কাঁটা এগিয়ে ন-টা বাজিয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই রান্নাঘরে পিঁড়ি পেতে বসে যেতাম ! মা ভাবতেন, তিনিই দেরি করেছেন। তাড়াতাড়ি ডাল নামিয়ে ভাজা দিয়ে আমাদের নৈশভোজ শুরু করাতেন । ভাবতেন, এত পড়াশোনা করে যদি সময়মতো দুটো ভাত পেটে না যায় বাছাদের, এরা দুর্বল হয়ে যাবে।

চিত্রকর্ম : সঞ্জীব দেব লস্কর
কিন্তু সব দিন তো আর সমান যায় না। একদিন নির্দিষ্ট সময়ের আগে ভোজনশালা থেকে হাসি-ঠাট্টার আভাস পেয়ে খুড়তুত দাদা আচমকা এসে স্তম্ভিত—‘জ্যেঠিমা, আটটা বাজছে মাত্র, আর তুমি এখনই ভাত দিয়ে দিলে !’
‘কিন্তু এরা যে বলল ন-টা বাজে !’
দাদা রেগেমেগে গিয়ে দেখেন, সত্যিই বাইরের ঘরের দেওয়াল ঘড়িতে ন-টাই বাজে। ঘরে গিয়ে নিজের ঘড়ি দেখে যা বোঝার, তা বুঝলেন। এরপর দিন থেকে রাতের খাবার দেওয়ার আগে মা-ও সময় পরখ করে নেওয়া শুরু করলেন।
শরৎচন্দ্র যে কল্পনার জগতে বসে কোনো কৃত্রিম চরিত্র তৈরি করেননি, আমাদের গ্রামীণ সমাজ আর প্রকৃতির আড়াল থেকে তুলে আনা মানুষকেই সাহিত্যে অমর করে গেছেন তা বেশ বোঝা যায়। কানুদার যে-আদল আমরা দেখতে পাই তা-ই এর সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ। কানুদা হয়তো জীবনে কোনোদিন শরৎচন্দ্র পড়েননি, কিন্তু যেভাবে জীবন যাপন করেছেন তাতেই তিনি শ্রীকান্তের পাতা থেকে হেঁটে বেরিয়ে আসা এক নায়ক হয়ে উঠেছেন।
তবে কানুদা ছাড়াও জাটিঙ্গা তীরে আমাদের আরও কয়েকজন ইন্দ্রনাথের ক্ষুদে ভার্সনও ছিলেন। তাঁদের নেতৃত্বে আমাদের বিপজ্জনক অভিযানের একটি কাহিনি বলে আমাদের এ পর্ব শেষ করি। তখন এদিকে বন্যার জলে নদীর একূল-ওকূল, দুকূল ভরাট হয়ে ওপারের পুরো বনাঞ্চল ডুবিয়ে একটা বিরাট চেহারা ধারণ করত আমাদের ছোট নদীটি। তখন আমরা উঠতি ইন্দ্রনাথদের নেতৃত্বে চুরি করে কারও ডিঙি নিয়ে ওই বনের ভিতর ঢুকে বুনো ফল খুঁজতে যেতাম। এ অভিযানে বনের ভিতর বিপন্ন বিষধর সাপের মুখোমুখি হয়েছি অনেক বার।
একবার এমন একটি বৃহৎ আলদ সাপ, যার পোশাকি নাম বোধহয় গোখরো, সে-ই আমাদের সঙ্গে সঙ্গে ফাড়ি ছেড়ে মূল গাঙ পর্যন্ত এসেছে ফনা তুলে — আমরা লক্ষ্য করেছি অনেক দেরিতে। লিডারের সিদ্ধান্ত, এটাকে খতম না করলে পিছন পিছন আসবে। আমরা সাপের এ ব্যাপারটি জানতাম, এও জানতাম, ছুঁয়ে এলে সাপ রাত্রিতে মশারির ভিতর এসেও দংশন করে যেতে পারে, যেমন ‘পদ্মপুরাণ’-এ লক্ষীন্দরকে করেছিল।
বাঁশের কঞ্চি নিয়ে সাপের মাথায় আঘাত করার চেষ্টা করতে করতেই অন্ধকার ঘনিয়ে এল নদীর বুকে। সাপের ল্যাজের ডগার দেখাও পাওয়া গেল না।
এক দাদা বললেন, ‘সাপ এ ডিঙিতেই ঝুলে আছে।’
‘চারিদিকে জল দেখছিস না, বসবে কোথায় ?’
সর্পদংশনের আশঙ্কা নিয়েই আমরা নৌকা নিয়ে কোনো মতে নিঃশব্দে ঘাটে পৌঁছোলাম। ধপাধপ লাফ দিয়ে পাড়ে উঠেই বুঝলাম, না! সাপ কামড়ায়নি।
কিন্তু এখন সমস্যা হলো, সাপের যে পিছু নেওয়ার অভ্যাস! বিষয়টি কাউকে জানাতেও পারছি না। এ সব তো আমাদের গোপন অভিযান। জানাজানি হলে মহা কেলেঙ্কারি হবে।
সব কথা খুলে বলা হল আমাদের পরম নির্ভর মানিক মামাকে। রাতে খাওয়ার পর আমাদের হাতে একটুকরো করে রসুন দিয়ে বলল, ‘বিছানায় ফেলে রাখো। সাপ আসবে না।’ আর যা বলল, তাতে আমরা আশ্বস্ত না হয়ে পারলাম না। বালিশের নিচে সবাই যেন একটা করে মোটা বই রাখি। বিষয়টি সবিশেষ ভাঙিয়ে মামা বলল, মনসা আর তাঁর কনিষ্ঠা ভগ্নী সরস্বতীর মধ্যে একটা বোঝাপড়া আছে। মনসার কোনো অনুচরকে যদি কোনো কারণে সরস্বতীর কোনো সাধককে দংশন করতে হয়, সে চুক্তি যেন ভঙ্গ না হয়। চুক্তি মতে, যার শিয়রে বই থাকে, সাপ সে বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত না পড়ে তাকে দংশন করতে পারবে না !
আমরা শিয়রে সমগ্র ব্যাকরণ-কৌমুদী, ভূগোল-বিকাশ আর এ টি দেবের ডিকশনারি নিয়ে ঘুমিয়ে সে যাত্রা নিজেদের প্রাণ রক্ষা করলাম। যদিও সাপ এসে থাকে তবু ইয়া মোটা গ্রন্থ পাঠ করা তার বাপেরও অসাধ্যি।
হায় হায় ! শরৎচন্দ্রের এ সব ব্যাপার দেখার সুযোগ হল না। তাই তাঁর উদ্দেশেই নিবেদিত হলো এ সংযোজন। তবে শেষ করার আগে বলি — আমাদের প্রাণপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে আমরা নিজেদের জীবনে এমনি ভাবে আরও অর্ধ শতাব্দী কেন অনেক অনেক দিনই খুঁজে পাব, এ আমাদের স্থির বিশ্বাস।
♦–♦•♦–♦ ♦–♦•♦–♦
❤ Support Us







