‘আঁকিয়ে’, ‘বুঝি-য়ে’ ‘দেখি-য়ে’ – ছবির বিশ্বকে এই তিন দলে ভাগ করলে আমি ‘দেখি-য়ে’ দলে। অতএব অন্য দুই দলের ভাব ভাবনার সঙ্গে আমার আর
আমাদের আরো অনেক দেখি-য়ে দের ভাব–ভাবনার মিল না হওয়াই স্বাভাবিক। তবে আঁকিয়ের রেখা রঙ যেমন অমূলসম্ভব নয়, লিখিয়ের অক্ষরও যেমন নয় অমূলসম্ভব — আলতামিরা থেকে মহাভারত হয়ে শাহনামা; সকলই যেমন স্থান ও কালের এবং সেই স্থান-কালের উৎপাদন-বন্টনের দ্বারা নির্ধারিত সামাজিক অবস্থান, যা শ্রেনী অবস্থানও বটে, তারই দ্বারা নির্ধারিত — প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষভাবে, তেমনি দেখি-য়ে’র দেখা-চোখ, দেখা-কোণও নির্ধারিত তার শ্রেণী অবস্থানের দ্বারা। কিন্তু বাজারে যেমন রাষ্ট্র হয়ে থাকে, শ্রেণী দৃষ্টি শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি, নয় তেমন কোনো মার্কামারা বস্তু। যেমন আমার মতো অনেকের মধ্যবিত্ত শ্রেণির দেখি-য়ে’র চোখে পিকাসোর কিউবিস্ট পর্ব ভালো লাগে, আবার অনেকেরই লাগেনা। ঠিক যেমন বহু মধ্যবিত্ত উত্তর পঞ্চাশেও সুনীল সন্দীপন পড়ে যায়, আবার অনেকেই সতেরো আঠারোর ঘোরের সঙ্গে সঙ্গেই ওই সকল ঘোরও কাটিয়ে আসে। দুই-ই স্বাভাবিক। দুই বিপরীতই স্বাভাবিক। বিপরীতেই প্রমাণিত হয় শ্রেণী অবস্থানের সত্য, কেননা সকল সত্যই দ্বান্দ্বিক সত্য। আমার কিউবিস্ট পিকাসো থেকে ব্লু পিকাসো বেশী ভালো লাগা, যামিনী রায়ের জ্যামিতিক পর্ব, যা ৩০–এর দশক থেকে ৭০–এর দশক, তার চেয়ে ২০–এর দশকের ছবিগুলি বা তার আগের পর্বেরও অনেক ছবি বেশি ভালো লাগা তেমনই এক দ্বান্দ্বিক সত্য।
বুঝি-য়ে’দের মতে সদ্য প্রয়াত যোগেন চৌধুরীর ছবি-যাপনেরও পাঁচটি পর্যায় :
প্রাথমিক অ্যাকাডেমিক ও সামাজিক বাস্তবতাবাদী পর্যায় (১৯৫০-এর দশক – ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি)। এ সময়ের কাজগুলি বাংলা ভাগ, বাস্তুহারা মানুষদের কষ্ট এবং কলকাতার নগরজীবনের সংকট দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। পর্বের কাজগুলোতে মানুষের অনিশ্চয়তা ও শারীরিক কাঠামোর ওপর জোর দেওয়া হয়। মাধ্যম ও শৈলী মূলত ক্যানভাসে তেলরং, জলরং ও স্কেচ। অতঃপর ফরাসি সরকারি বৃত্তি পেয়ে প্যারিসে থাকা কালে প্রথাগত ইউরোপীয় তেলরং ছেড়ে তিনি রেখা, অবয়ব এবং শূন্য স্থানের ওপর বেশি মনোযোগী। কালির রেখার সাথে শুষ্ক প্যাস্টেলের ক্রস-হ্যাচিং এর উদ্ভাবনও য়খনকার। বুঝি-য়ে’রা বলেন এটি যোগেনের দ্বিতীয় পর্যায়, যার বিস্তার, ১৯৬৫–১৯৬৮। তৃতীয় পর্যায়ে চেন্নাইতে টেক্সটাইল ডিজাইনার হিসেবে কাজ (১৯৬৮–১৯৭২)। চেন্নাইতে থাকাকালীন তিনি ছবির পিছনের অংশকে গাঢ় ঘন কালো রঙে ঢেকে দেওয়ার পদ্ধতি শুরু করেন। এই পর্বে তাঁর বিষয়বস্তু হয়ে উঠলো মধ্যবিত্তের ব্যঙ্গচিত্র। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সমাজের ভণ্ডামি, নৈতিক অবক্ষয়। মেদবহুল, বিকৃত শরীরের চিত্রায়ন। ফুল, মাছ, সাপ আর যুগলদের অবয়ব (ম্যান অ্যান্ড ওম্যান সিরিজ)।
পরের পর্বের আরম্ভ ১৯৮৭ সালে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রকলার অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করার সময়ে। এই পর্বে তিনি তাঁর একবর্ণ কাজের পাশাপাশি উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার শুরু করেন। বিষয়বস্তুও যায় বদলে। রাজনৈতিক দুর্নীতি, সামাজিক অবিচার এবং মানুষের যন্ত্রণা। চতুর্থ পর্যায়, ১৯৮০-এর দশক– ১৯৯০-এর দশক। বুঝি-য়ে’দের মতে শান্তিনিকেতন ও রাজনৈতিক প্রকাশের পর্যায়। ১৯৮৭ সালে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রকলার অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। এ পর্বে তিনি তাঁর একবর্ণ কাজের পাশাপাশি উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার শুরু করেন। বিষয়বস্তুও যায় বদলে। রাজনৈতিক দুর্নীতি, সামাজিক অবিচার এবং মানুষের যন্ত্রণা। অতঃপর প্রবীণ পর্যায় (২০০০-এর দশক – বর্তমান)। এই পর্বে চারকোল, কালি, ড্রাই প্যাস্টেল এবং অ্যাক্রিলিক ব্যবহার করে বিশাল আকারের ক্যানভাস, দেয়ালচিত্র এবং মিশ্র-মাধ্যমের কাজ যেখানে ন্যূনতম কিন্তু শক্তিশালী রেখার ব্যবহারে ছবির আকার সহজ-সরল।
জীবিকা ও স্থানের বদলের ছায়াপাত ঘটেছে তাঁর শিল্পে। এই ছায়াপাত স্বাভাবিক, সাবলীল। এই শিল্পের, শিল্পীর গতি। অন্তর্গতি। কিন্তু অন্তর ও তো আদতে বস্তুই। অতএব স্থান কালের প্রেক্ষিত,পারিপার্শ্বের প্রেক্ষিত তাতে মূর্ত হতে বাধ্য, যদি না ‘আর্ট ফর আর্টস সেক’ হেন ধারণা, যা শিল্প ও শিল্পী মাটি-যোগহীন, অমূলসম্ভব কিছু – ইত্যাদি ধারনায় কেউ না যায় ভেসে, বিকিয়ে। যোগেন যাননি। তাই যোগেন জীবিত। জীবন্ত
তবে, এ সবই বুঝি-য়ে’দের কাছ থেকে ধার করে বলা। আমার দেখি-য়ে চোখ পিছনে তাকালে কৈশোরক বিস্ময়ে যে ছবিগুলি দেখে, সেগুলি
মূলত দেশ… না কি আনন্দবাজার? পূজা বার্ষিকীতে ছাপা। সেগুলি দিয়েই যোগেন চৌধুরীর ছবির সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয়। পরে, অনেক পরে বুঝি-য়ে’দের লেখা ইত্যাদি পাঠে টের পাই, যে, ওইগুলি যোগেন চৌধুরীর তথাকথিত তৃতীয় পর্যায়ভুক্ত যে পর্বে তাঁর বিষয়বস্তু ছিল মধ্যবিত্তের, উচ্চবিত্তের ব্যঙ্গচিত্র, মেদবহুল, বিকৃত শরীরের চিত্রায়ন। ওই ছবিগুলি অবশ্যই রেখাপাত করেছিল মর্মে। বাল্যদশা থেকে বয়ঃসন্ধি; ওই ছবিগুলির অন্দরের ভয় ভয়, বিকৃতি আর অবশ্যই যৌনতা মর্মে যে বিপন্ন বিস্ময়ের দাগ কেটেছিল সেগুলি ধরেই, পরে, দেখি-য়ে হিসাবে যোগেন চৌধুরীর ছবির অনুসরণ । ছবি দেখা, দেখতে থাকা আমার রোগ। ওই এলোমেলো দেখার সূত্রেই সাক্ষাত ঘটল ষাটের দশকের যোগেন চৌধুরীর ছবির সঙ্গে। চোখ আটকে গেল। চোখ আটকে গেল যে ছবিগুলিতে, পরে সন্ধান করে জেনেছি তাদের পরিচয়। তারা ‘Reclining Woman, Ink and pastel on paper, 46.5 x 67.5 cm’, ‘Face of a Refugee Girl, Dry pastel on paper, 43 x 30 cm’ – দুই-ই আঁকা ১৯৬০ সালে। প্রকৃত মুগ্ধ হলাম, প্রথম, উনিশ-কুড়ি বচ্ছরের যোগেন চৌধুরীর শিয়ালদা ইস্টিশানে উদ্বাস্তু ভিড়ের রেখায়, রেখার ঘনত্বের হেরফেরে উদ্বাস্তু মানুষদের তথা উদ্বাস্তু সময়ের সর্বস্বকে স্পর্শ করা দেখে, টের পেয়ে ওই স্পর্শ করবার অন্তর্গত মমতাকে, বিদ্রোহকে। উদ্বাস্তু মানুষ আর উদ্বাস্তু সময় ঘিরে অসংখ্য ছবি যোগেন চৌধুরীর। এমনই একটি স্কেচের নিচে লিখে রেখেছেন আঁকিয়ে –‘Thousands of … Refugees come even after ten years of partition from East part of Bengal (East Pakistan) and they arrive at Sealdah Station. They are poor people. They have no place to stay in West Bengal. They continue to stay in the Station with whatever belongings they have.’ — এই ছবি ১৯৫৮ সালের। … আমি আটকে রইলাম, বাঁধা পড়ে গেলাম ঐ যোগেনে। তারপর থেকে মধ্যপর্বের যোগেন চৌধুরী আমাকে তেমন টানেননি আর। অথচ বুঝি-য়ে আঁকিয়ে’দের কাছে যা শুনেছি তাতে টের পেয়েছি ওই পর্বে তাঁর টেকনিক, তাঁর সমগ্র শিল্প নিচ্ছে নতুন বাঁক।কৈশোরের ভয় ভয় নিয়ে দেখা, দেখতে থাকা ছবিগুলি আবার দেখেছি। টের পেয়েছি মধ্যবিত্ত ভণ্ডামি– সর্ববিধ ভণ্ডামীরই – যে ভণ্ডামীও আদতে শ্রেণী চরিত্রেরই অঙ্গ তাকে সর্বৈব নগ্ন করবার প্রয়াস নিয়েছেন শিল্পী – ফর্মে, কন্টেন্টে। দেখিয়ে দিয়ে চেয়েছেন এই পুঁজি সভ্যতায় প্রতিজন সভ্য আদতে বাস করে অন্দরে নরক নিয়ে। টের পেয়েছি – কিছুটা দেখে, কিছুটা বুঝি-য়ে দের লেখালেখিতে। কিন্তু ওই নরকে পাইনি সেই দাহ যাতে পুড়ে যাওয়া যায়। অন্তর আমি পুড়ে যাইনি। পক্ষান্তরে সেই ষাটের যোগেনে ফিরে গেলে যা পাই তা এক আগুন। কন্টেন্টে, ফর্মে আগুন। ঠিক যেমন অন্তিম পর্বের যোগেনের সহজতা আমাকে মুগ্ধ করে, শান্ত করে।
স্থান ও জীবিকার অথবা জীবিকার কারনে স্থানের পরিবর্তন বার বার ঘটেছে যোগেনের। লক্ষ্যনীয় এই, যে, জীবিকা ও স্থানের বদলের ছায়াপাত ঘটেছে তাঁর শিল্পে। এই ছায়াপাত স্বাভাবিক, সাবলীল। এই শিল্পের, শিল্পীর গতি। অন্তর্গতি। কিন্তু অন্তর ও তো আদতে বস্তুই। অতএব স্থান কালের প্রেক্ষিত,
পারিপার্শ্বের প্রেক্ষিত তাতে মূর্ত হতে বাধ্য, যদি না ‘আর্ট ফর আর্টস সেক’ হেন ধারণা, যা শিল্প ও শিল্পী মাটি-যোগহীন, অমূলসম্ভব কিছু – ইত্যাদি ধারনায় কেউ না যায় ভেসে, বিকিয়ে। যোগেন যাননি। তাই যোগেন জীবিত। জীবন্ত। ‘এনআরসি’, ‘সিএএ’ হয়ে ‘এসআইআর’- এর বিধ্বস্ত আবহে ষাটের দশকের যোগেন আমার মর্মে ফিরে আসেন নতুন ব্যঞ্জনায়।
♦–♦•♦–♦ ♦–♦•♦–♦