Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • অক্টোবর ১১, ২০২৬

আমজনতার জয় হোক

হিলাল উদ্দিন লস্কর
আমজনতার জয় হোক

নানা কারণে ব্যক্তিগত জীবনের স্মৃতিপট থেকে কিছু ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়ে নিবন্ধটি শুরু করার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তখন আমি উত্তর-পূর্ব পার্বত্য বিশ্ববিদ্যালয়-এর স্নাতকোত্তর শ্রেণীর ছাত্র। আমার প্রিয় শিক্ষক ক্যাসিয়ান আর. আগেরা একদিন আমাকে তাঁর কক্ষে ডেকে পাঠান। গিয়ে দেখি, তিনি গভীরভাবে একটি ইংরেজি ম্যাগাজিন পড়ছেন, যার একটি প্যারাগ্রাফ লাল কালি দিয়ে আন্ডারলাইন করা। আমাকে লাইনগুলো পড়তে বললেন; আমি আংশিক বুঝলেও সম্পূর্ণ বিষয়টি বুঝতে পারিনি। তখন তিনি বুঝিয়ে বললেন, নিবন্ধটি ইতালীয় সমাজবিজ্ঞানী ভিলফ্রেদো পারেতোর ‘সার্কুলেশন অব এলিটস্’ বা অভিজাত শ্রেণীর আবর্তন তত্ত্ব নিয়ে লেখা। সে তত্ত্বে বলা হয়েছে, ইতিহাসের কালপরিক্রমায় সাধারণ মানুষ সাধারণ অবস্থাতেই থেকে যাবে। ফলে সাম্য ও গণতন্ত্র নিয়ে আমাদের চিরায়ত বিশ্বাসের ধারণা সম্পূর্ণ বদলে যায়। সুদীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষিতে এই নির্মম সত্য তুলে ধরে লেখক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী দিনগুলোতেও পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হবে না। তিনি বললেন, এই কথাগুলো আমাকে ভীষণভাবে আঘাত করেছিল বলেই বিষয়টি তোমার সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করলাম; কারণ আমি দেখেছি তুমি প্রায়ই সামাজিক সুবিচার নিয়ে কথা বলে থাক।

১৯ শতকের শেষ ভাগে এবং ২০ শতকের শুরুতে ইতালি ও সুইজারল্যান্ডে সক্রিয় ভিলফ্রেদো পারেতো (১৮৪৮–১৯২৩) প্রথমে প্রকৌশলী ও অর্থনীতিবিদ হলেও পরবর্তী সময়ে আধুনিক রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি ইতালীয় ‘এলিটিস্ট স্কুল’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। পারেতোর মতে, মানব সমাজ স্বভাবগতভাবেই অসমান এবং সমাজ মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত — ক্ষুদ্র ‘অভিজাত শ্রেণী’ এবং বিশাল ‘সাধারণ মানুষ’। তিনি মনে করতেন, সমাজের নিচের তরের সাধারণ মানুষেরা পরিবর্তনের কথা বললেও বা কিছু ব্যক্তি ওপরে উঠে এলেও কাঠামোগতভাবে নিচের শূন্য স্থানটি সবসময় অন্য মানুষদের দ্বারাই পূর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ, সমাজের একটি বিরাট অংশ সবসময় নিচেই থেকে যায়। নিচ থেকে কিছু সক্ষম মানুষ ওপরে এসে পুরোনো অভিজাতদের হটালেও সাধারণ মানুষের সামগ্রিক অবস্থার কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয় না; এক দল শাসক যায়, অন্য দল আসে—এই চক্র চলতেই থাকে। পারেতোর মতে, গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র যাই হোক না কেন, সমাজ পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ সব সময় একটি ক্ষুদ্র শক্তির হাতেই থাকে এবং সাধারণ মানুষ কখনোই ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে না।

স্যারের কথাগুলো যখন আমাকেও পীড়িত করছিল, তখন মনে পড়ে গেল স্নাতক স্তরে যখন ইংরেজি ক্লাসে অধ্যাপক শিশির কুমার ভট্টাচার্য উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ঐতিহাসিক নাটক ‘জুলিয়াস সিজার’ পড়াচ্ছিলেন, তখন তিনি এই বিখ্যাত নাটকে সাধারণ মানুষের যে ছবিটি তুলে ধরেছিলেন। জুলিয়াস সিজার নাটকটি আনুমানিক ১৫৯৯ সালে লেখা হয়েছিল এবং ১৬২৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। এই নাটকে সাধারণ বা আম মানুষ — যাঁদের রোমের নাগরিক হিসেবে বারবার উপস্থাপন করা হয়েছে — তাঁদের চরিত্র এবং ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব ও আচরণ নিয়ে শেক্সপিয়র যা বোঝাতে চেয়েছেন, তাতে তিনি সাধারণ মানুষকে অত্যন্ত আবেগতাড়িত ও চঞ্চলমতি হিসেবে দেখিয়েছেন। তাঁদের কোনো স্থির রাজনৈতিক দর্শন বা নিজস্ব বিচারবুদ্ধি থাকে না; তাঁরা ক্ষণিকের আবেগে পরিচালিত হন। নাটকের তৃতীয় অঙ্কে সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে, যেখানে প্রথমে ব্রুটাসের যুক্তিনির্ভর ও দেশপ্রেমের ভাষণে জনতা উদ্বুদ্ধ হয়ে সিজার বধকে সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত বলে মেনে নেয় এবং ব্রুটাসের জয়ধ্বনি দেয়। এর ঠিক পরেই মার্ক অ্যান্টনির আবেগপূর্ণ, মার্জিত ও প্রোপাগান্ডামূলক ভাষণ শুনে সেই একই জনতা সম্পূর্ণ উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। তাঁরা ব্রুটাস ও ক্যাসিয়াসকে দেশদ্রোহী ও শত্রু বলে ঘোষণা করে এবং তাঁদের ঘরবাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। শেক্সপিয়র এখানে বোঝাতে চেয়েছেন যে সাধারণ মানুষ যুক্তি বোঝে না, তারা বোঝে আবেগ আর বাগ্মিতা। নাটকে শেক্সপিয়রের বার্তাটি হচ্ছে, সাধারণ রোমান নাগরিকরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার রদবদল বা গণতন্ত্রের সূক্ষ্ম রাজনীতি বোঝার মতো রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিল না। তাঁরা ছিল কেবল ক্ষমতার খেলায় একেকটি নীরব দর্শক বা ব্যবহারের হাতিয়ার। কে শাসন করছে বা শাসনপদ্ধতি কেমন — তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে বড়ো হয়ে দাঁড়ায় নেতার জৌলুস বা সাময়িক জনতুষ্টি।


সমাজের নিচের তরের সাধারণ মানুষেরা পরিবর্তনের কথা বললেও বা কিছু ব্যক্তি ওপরে উঠে এলেও কাঠামোগতভাবে নিচের শূন্য স্থানটি সবসময় অন্য মানুষদের দ্বারাই পূর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ, সমাজের একটি বিরাট অংশ সবসময় নিচেই থেকে যায়। নিচ থেকে কিছু সক্ষম মানুষ ওপরে এসে পুরোনো অভিজাতদের হটালেও সাধারণ মানুষের সামগ্রিক অবস্থার কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয় না


নাটকের একটি বিখ্যাত দৃশ্য হলো যখন জনতা কবি সিন্নাককে ধরে ফেলে। কবি বারবার পরিচয় দেন যে তিনি ষড়যন্ত্রী সিন্নাক নন, বরং কবি সিন্নাক; কিন্তু উন্মত্ত জনতা যুক্তি শোনার ধারেকাছেও যায় না এবং বলে, ‘তাঁর নাম সিন্নাক — তাঁর নামটাই ছিঁড়ে ফেল!’, ‘তাকে টুকরো করে ফেলো, সে একজন ষড়যন্ত্রকারী’। শেক্সপিয়র এই দৃশ্যের মাধ্যমে খুব স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, সংঘবদ্ধ জনতা বা ‘মব’ যখন যুক্তি হারিয়ে হিংস্র হয়ে ওঠে, তখন তা বিচারবুদ্ধিহীন দানবে রূপ নেয়, যেখানে নির্দোষ মানুষেরও রক্ষা থাকে না। নাটকে সাধারণ মানুষকে বারবার উচ্চাভিলাষী নেতাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হতে দেখা যায়। অ্যান্টনি খুব ভালো করেই জানতেন কীভাবে জনতার সেন্টিমেন্টকে ব্যবহার করতে হয় (সিজারের উইল পাঠ করে এবং সিজারের ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত দেহ দেখিয়ে)। শেক্সপিয়র এর মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন যে সাধারণ মানুষ সবসময়ই চতুর রাজনীতিকদের আবেগসর্বস্ব প্রোপাগান্ডার সহজ শিকারে পরিণত হয়। অর্থাৎ শেক্সপিয়র ‘জুলিয়াস সিজার’ নাটকে আম জনতাকে কোনো আদর্শিক বা পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে দেখাননি। বরং তিনি তাঁদের চিত্রিত করেছেন এমন এক পরিবর্তনশীল শক্তি হিসেবে, যাদের নিজস্ব কোনো স্থায়ী মতাদর্শ নেই — যারা সুযোগসন্ধানী বাগ্মী ও রাজনৈতিক খেলোয়াড়দের হাতের পুতুল মাত্র। রাজনীতিতে অন্ধ জনসমর্থন বা আবেগতাড়িত ভিড়ের বিপদ সম্পর্কে শেক্সপিয়র এখানে এক চিরন্তন সতর্কবার্তা দিয়েছেন। নাটকে বা রাজনৈতিক দর্শনে সাধারণ মানুষের (বা ‘মব’ ও জনতার) আবেগপ্রবণতা, রাজনৈতিক অজ্ঞতা এবং পরিবর্তনশীল চরিত্র নিয়ে শেক্সপিয়রের বহু আগে থেকেই এবং তাঁর পরেও অনেক প্রখ্যাত দার্শনিক, ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যিক গভীর আলোচনা করেছেন।

ঠিক তখন, অর্থাৎ স্নাতক স্তরে আমার অনার্স কোর্স ছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। সেখানে ‘পলিটিক্যাল থট’ বা রাজনৈতিক চিন্তা নামক বিষয়টি পড়াতেন অধ্যাপক ড. অসিত রঞ্জন ভট্টাচার্য। সেখানে শাসনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি আমাদের জানিয়েছিলেন যে, গ্রিক দার্শনিক প্লেটো (খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক) তাঁর বিখ্যাত ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থে গণতন্ত্র এবং সাধারণ মানুষের শাসনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। প্লেটো সাধারণ মানুষকে নাবিকহীন এক জাহাজের চালক কিংবা চিকিৎসাবিদ্যার জ্ঞানহীন জনতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, বেশিরভাগ সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, প্রজ্ঞা বা দূরদর্শিতা থাকে না। অশিক্ষিত ও আবেগতাড়িত জনতা সবসময় সঠিক সিদ্ধান্তের চেয়ে চাটুকার ও সুযোগসন্ধানী নেতাদের কথায় সহজেই বিভ্রান্ত হয়। তাঁর মতে, গণতন্ত্র বা জনতার শাসন শেষ পর্যন্ত ‘অরাজকতা’ বা স্বেচ্ছাচারিতায় রূপ নেয়। বিষয়টি কিছুটা অন্যভাবে ব্যাখ্যা করে প্লেটোর শিষ্য অ্যারিস্টটল (খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক) তাঁর ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থে মানুষের রাজনৈতিক আচরণ বিশ্লেষণ করেছেন। অ্যারিস্টটল মনে করতেন যে সাধারণ মানুষ স্বতন্ত্রভাবে বিচার করলে হয়তো কিছুটা ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু যখন তারা একটি বিশাল ‘জনতা’ বা ‘ভিড়’ হিসেবে একত্রিত হয়, তখন তাদের সম্মিলিত বুদ্ধি মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। সংঘবদ্ধ জনতা অনেক সময় কোনো দীর্ঘমেয়াদি নীতি বা যুক্তির চেয়ে তাৎক্ষণিক আবেগ দ্বারা বেশি পরিচালিত হয়।

নানা সময়ে এসব বিষয় আমাকে ভাবিয়েছে। পরবর্তীতে যখন ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিদ গুস্তাভ ল্য বঁ (১৯শ-২০শ শতক)-র ভিড়ের মনোবিজ্ঞান নিয়ে যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘দ্য ক্রাউড: আ স্টাডি অব দ্য পপুলার মাইন্ড’ (১৮৯৫) আমার হাতে আসে, তখন শেক্সপিয়রের নাটকের ধারণার প্রায় নিখুঁত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সেখানেও খুঁজে পাই। ল্য বঁ জোরালোভাবে বলেছেন যে মানুষ যখন কোনো বড়ো ভিড় বা জনতার অংশ হয়ে ওঠে, তখন তার ব্যক্তিগত ব্যক্তিত্ব, যুক্তিবাদী মন এবং নৈতিকতাবোধ সম্পূর্ণ লোপ পায়। ভিড়ের মধ্যে থাকা ব্যক্তিরা আদিম প্রবৃত্তি, আবেগ এবং অন্ধ অনুকরণ দ্বারা চালিত হয়। শেক্সপিয়রের নাটকে অ্যান্টনির ভাষণে জনতা যেমন নিমেষে বদলে গিয়েছিল, ল্য বঁ-এর মতে, জনতা কোনো যুক্তির ভাষা বোঝে না — তারা বোঝে কেবল ছবি, রূপক, স্লোগান এবং অতি-নাটকীয় আবেগ। মনস্তত্ত্বের জনক সিগমন্ড ফ্রয়েড (২০শ শতক) তাঁর ‘গ্রুপ সাইকোলজি অ্যান্ড দ্য অ্যানালিসিস অব দ্য ইগো’ (১৯২১) গ্রন্থে জনতার মানসিকতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গুস্তাভ ল্য বঁ-এর তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই নিজের মতামত দিয়েছেন। ফ্রয়েড বলেছেন, জনতা বা ভিড়ের মধ্যে মানুষের অবচেতন মনের অবদমিত প্রবৃত্তিগুলো মুক্তি পায়। একক মানুষ যা একা করার সাহস পায় না, ভিড়ের ছত্রচ্ছায়ায় বা কোনো শক্তিশালী নেতার সম্মোহনী শক্তিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে সে সেই ধ্বংসাত্মক কাজই অবলীলায় করে ফেলে। শেক্সপিয়রের নাটকে কবি সিন্নাককে হত্যা করার পেছনে জনতার এই উন্মত্ত অবচেতন হিংস্রতাই কাজ করেছিল।


শেক্সপিয়র ‘জুলিয়াস সিজার’ নাটকে আম জনতাকে কোনো আদর্শিক বা পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে দেখাননি। বরং তিনি তাঁদের চিত্রিত করেছেন এমন এক পরিবর্তনশীল শক্তি হিসেবে, যাদের নিজস্ব কোনো স্থায়ী মতাদর্শ নেই—যারা সুযোগসন্ধানী বাগ্মী ও রাজনৈতিক খেলোয়াড়দের হাতের পুতুল মাত্র


এই আলোচনার প্রেক্ষিতে সমসাময়িক ভারতের গণতান্ত্রিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক আচরণে অপপ্রচারের শিকার হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। ইতিহাস, সাহিত্য ও সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্বের মতোই আজকের ভারতীয় সমাজেও জনমানসের সেই সীমাবদ্ধতার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। যুক্তি ও তথ্যের আলোকে বিষয়টি বিচার করলে দেখা যায়, আজকের ডিজিটাল যুগে অতিরিক্ত তথ্য বা ‘ইনফরমেশন ওভারলোড’ মানুষের গভীর চিন্তার ক্ষমতাকে ভোঁতা করে দিচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী গুস্তাভ ল্য বঁ-এর তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ যখন ডিজিটাল ভিড়ের অংশ হয়, তখন ব্যক্তিগত যুক্তি কাজ করে না। এই সুযোগে স্বার্থান্বেষী মহল সুনির্দিষ্ট অ্যালগরিদম ব্যবহার করে মানুষের মনে ভয় বা ক্ষোভের সৃষ্টি করে; ফলে বস্তুনিষ্ঠ সত্যের চেয়ে সেনসেশনাল মিথ্যা প্রচার দ্রুত মানুষের মন জয় করে নেয়। ভারতীয় সমাজে ধর্মের গভীর শেকড় রয়েছে। যখন কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের অপব্যাখ্যা করে মেরুকরণের রাজনীতি শুরু করে, তখন মানুষের ধর্মীয় আবেগ সরাসরি উসকে ওঠে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’ বা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি বলা হয়। একবার মানুষের পরিচয়কে সংকটে ফেলা গেলে অর্থনৈতিক বা বাস্তব সমস্যাগুলো আড়ালে চলে যায় এবং মানুষ যুক্তির বদলে অন্ধ বিশ্বাসের আবেগে চালিত হয়। তাছাড়া, মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী, মানুষ সাধারণত এমন তথ্য বা প্রচার বিশ্বাস করতে পছন্দ করে, যা তার পূর্বনির্ধারিত ধারণাকে সমর্থন করে। অপপ্রচারকারীরা এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে এমন সব মিথ্যা গল্প বা ন্যারেটিভ তৈরি করে, যা সমাজের পুরনো ভয়কে নিশ্চিত করে। একবার এই মানসিক বৃত্ত তৈরি হলে নিরপেক্ষ সত্য সামনে এলেও তা সহজে গৃহীত হয় না।

সুস্থ গণতন্ত্রের ভিত্তি সচেতন নাগরিক সমাজ হলেও, ভারতের বিশাল জনসংখ্যার বড়ো অংশ এখনো কাঠামোগত শিক্ষাগত ঘাটতির মধ্যে রয়েছে। তাদের ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ বা তথ্য যাচাইয়ের মানসিকতা গড়ে তোলার সুযোগ সীমিত। এই বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে গুজব ও মিথ্যা প্রচার সহজেই সাধারণ মানুষের মননকে নিয়ন্ত্রণ করে। শেক্সপিয়রের নাটকে বা প্রাচীন দর্শনশাস্ত্রে যে জনতার আবেগপ্রবণতা ও সহজ-প্রবঞ্চনার কথা বলা হয়েছিল, আধুনিক ভারতের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তার রূপ বদলালেও মূল স্বভাব একই রয়েছে। কাঠামোগত শিক্ষাগত সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ধর্মের নামে আবেগ চালনা করার আধুনিক প্রোপাগান্ডা কৌশলগুলোর যৌথ প্রভাবেই আজকের সাধারণ মানুষ তাৎক্ষণিক ভালো-মন্দের বিচার করতে প্রায়ই ব্যর্থ হয়।

তারপরও যে কথাটি বলতেই হয়, তা হলো — এখনো এই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। তাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা ও তথ্য যাচাইয়ের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। যতদিন পর্যন্ত এই মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতাগুলো থেকে যাচ্ছে, ততদিন এগুলোকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লোটার প্রবণতা সমাজে থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে। এখন প্রশ্ন হলো, এই বাস্তবতায় আম জনতাকে কীভাবে দেশের সমান ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা যায়? এর উত্তর নিহিত রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার ও যুক্তিবাদী মনন তৈরির মধ্যে। তবেই সাধারণ মানুষ প্রোপাগান্ডার ফাঁদ, ধর্মীয় আবেগ ও গুজবের রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে। গণতন্ত্র হলো নিরন্তর চর্চা, যেখানে সাধারণ মানুষ নিজের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে অন্ধ আবেগের বদলে যুক্তির আলোয় ভাবতে শিখবে। হয়তো তখনই প্রকৃত অর্থেই একটি শক্তিশালী ও অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!