Advertisement
  • ব | ই | চ | র্যা
  • নভেম্বর ১, ২০২৬

‘উৎসবের আরম্ভ’, ব্যঙ্গ, অনুবাদ, গল্প আর কবিতার এক মননশীল সংকলন

দেবদত্ত চক্রবর্তী
‘উৎসবের আরম্ভ’, ব্যঙ্গ, অনুবাদ, গল্প আর কবিতার এক মননশীল সংকলন

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস আসলে ছোটো কাগজের ইতিহাস । ১৯২৩ সালে ‘কল্লোল’ রবীন্দ্র-পরবর্তী আধুনিকতার দরজা খুলে দিয়েছিল; ১৯৩১-এ ‘পরিচয়’ সাহিত্যের সঙ্গে সমাজচিন্তার সেতু বেঁধেছিল; ১৯৩৫-এ বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ কবিতাকে দিয়েছিল নিজস্ব একটি ঘর; আর ১৯৫৩ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার ও আনন্দ বাগচীর ‘কৃত্তিবাস’ এক নতুন প্রজন্মের কণ্ঠস্বরকে জায়গা করে দিয়েছিল । বাজারের কোলাহল, বিজ্ঞাপনের চাপ আর পাঠকপ্রিয়তার হিসেব থেকে দূরে দাঁড়িয়ে যে লেখাগুলি টিকে থাকে, তাদের অধিকাংশেরই প্রথম ঠিকানা ছিল কোনো না কোনো লিটল ম্যাগাজিন । সেই দীর্ঘ ও দায়বদ্ধ ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বয়ে এনেছে ‘আরম্ভ’-এর উৎসব ১৪৩৩ সংখ্যাটি ।

পত্রিকার নামই এক ঘোষণা — আরম্ভ মানে শেষ কথা নয়, শুরুর সাহস। সংখ্যাটির পাতা ওল্টালে বোঝা যায়, সম্পাদকীয় রুচি এখানে কেবল নামী-অনামী লেখার সমাহার ঘটায়নি; উপমহাদেশের তিন ভাষার সাহিত্য-ঐতিহ্য, রাজনৈতিক প্রতিবাদের সুর, আত্মজৈবনিক নিঃসঙ্গতা আর স্থানিক স্মৃতিকে একটি সুতোয় গাঁথার চেষ্টা স্পষ্ট। সেই সুতোটির নাম সম্ভবত ‘সংকটকালের মানুষ’— ক্ষমতার সামনে, ক্ষুধার সামনে, সময়ের সামনে ।
এই সংকটকালের মানুষের দুঃখ-বেদনা, বহুত্ববাদ এবং আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বিপন্নতার কথা বলতেই ‘আরম্ভ’ তুলে ধরেছে ‘পূর্বপুরুষের লণ্ঠন’। সংখ্যাটি শুরু হয়েছে একটি অসাধারণ প্রবন্ধ দিয়ে, শেষও হয়েছে একটি প্রবন্ধ দিয়ে এবং প্রবন্ধগুলো এই সংকলনের সবচেয়ে বড়ো সম্পদ । তাই আলোচনার শুরুতেই দুটি প্রবন্ধের কথা না বললেই নয় । প্রথমটি শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষের আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চা, যা আমাদের সাম্রাজ্যের ইতিহাসের বাইরে টেনে নিয়ে বুঝিয়ে দেয়, স্থানীয় স্তরের ইতিহাস কীভাবে বৃহত্তর ইতিহাসের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে । প্রবন্ধটির সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক এর তথ্যভিত্তিক গভীর বিশ্লেষণ; গণিতের ‘লিমিট’ এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের রূপকে অংশ ও সমগ্রের যে মেলবন্ধন তিনি দেখিয়েছেন, তা এক কথায় অসাধারণ । দ্বিতীয়টি সৌরীন ভট্টাচার্যের ‘আমাদের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো’, যেখানে স্মৃতিচারণ আর সংবিধানের ঐতিহাসিক দলিলের মিশেলে এক জটিল রাজনৈতিক ও আইনি বিষয় পাঠকের কাছে অত্যন্ত সহজবোধ্য হয়ে উঠেছে। তিনি স্পষ্টই বলেছেন, ভারতবর্ষ তাত্ত্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রীয় হলেও বাস্তবে তার আত্মা শুরু থেকেই কেন্দ্রমুখী ।

এই দুটি প্রবন্ধই এই ভাঙা সময়ে গভীর চিন্তার খোরাক জোগায় । শুদ্ধসত্ত্ব যেখানে ইতিহাসের বিকেন্দ্রীকরণের (আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চার) গুরুত্ব তুলে ধরেন, সৌরীন ভট্টাচার্য সেখানে মনে করিয়ে দেন রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের (যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সংহতির) কথা । সমকালীন প্রেক্ষাপটে স্বাধিকার, বহুত্ববাদ ও ক্ষমতার বণ্টন বোঝার জন্য লেখা দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ।

এ ছাড়া আরও দুটি প্রবন্ধ আমাকে স্পষ্টতই নাড়া দিয়েছে—হিলাল উদ্দিন লস্করের ‘মুক্ত সত্তা নির্মাণের প্রচেষ্টা’ এবং পত্রিকার প্রধান সম্পাদক বাহারউদ্দিনের ‘যুক্তি বনাম বিশ্বাস’। প্রথমটি জন লক, ডুরখেইম ও অমর্ত্য সেনের দর্শনের আলোকে রচিত; বর্তমান সময়ে ভারতীয় গণতন্ত্র ও সমাজের গভীর আত্মজিজ্ঞাসাকে তা তুলে ধরেছে । সংকীর্ণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীন, সচেতন নাগরিক সমাজ গড়ার দিকনির্দেশনা হিসেবে লেখাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী । দ্বিতীয় প্রবন্ধে পাই ধর্মকে কেবল আচার ও বিধিনিষেধের সমষ্টি হিসেবে না দেখে মানুষের বিবেক, যুক্তি ও কল্যাণবোধের আলোকে বোঝার চেষ্টা । মুতাজিলা মতবাদের আলোচনা এখানে নিছক ধর্মীয় বিতর্কের ইতিহাস হয়ে থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে মানুষের স্বাধীন বিচারশক্তি ও নৈতিক দায়িত্বের অনুসন্ধান । আলোচনার কেন্দ্রীয় সুর মুক্তচিন্তা, যার মধ্য দিয়ে লেখক ধর্মবিশ্বাস ও মানবিক বোধের সম্পর্ককে বিচার করেছেন । পাঠশেষে যে প্রশ্নটি মনে থেকে যায়, তা হলো —আমাদের বিশ্বাস কি আমাদের আরও ন্যায়পরায়ণ, সহিষ্ণু ও মানবিক করে তুলছে ? এই আত্মজিজ্ঞাসার সুযোগ তৈরি করাই প্রবন্ধটির প্রধান সাফল্য ।

এরপরের তিনটি প্রবন্ধ যেন লোকচিত্তের তিন জানালা—ভুল পাঠের বিরুদ্ধে পুনঃপাঠ । ‘আরম্ভ’-এর এই প্রবন্ধগুলি পাশাপাশি রাখলে একটি আশ্চর্য সাযুজ্য চোখে পড়ে । একটি রবীন্দ্রনাথের গানের ‘তুমি’ ও তাঁর ধর্মবোধ নিয়ে, একটি পশ্চিমবঙ্গের লোকনাট্য ও তার সংগীত নিয়ে, আর একটি প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র পাপুয়া নিউ গিনির গায়ে সেঁটে থাকা ‘নরখাদক’ তকমা নিয়ে । বিষয়ে এরা পরস্পরের থেকে যতই দূরের হোক, প্রত্যেকটিই এক অর্থে ভুল পাঠের বিরুদ্ধে পুনঃপাঠ । রবীন্দ্রনাথকে আমরা ভুল বুঝি তাঁর শব্দকে নিজেদের অর্থে পড়ে; আলকাপ-গম্ভীরার মতো লোকনাট্যকে ভুল বুঝি ‘গ্রাম্য’ বলে সরিয়ে রেখে; আর একটি গোটা দেশকে ভুল বোঝে সারা বিশ্ব — সিনেমা আর ঔপনিবেশিক গল্পের চশমায়। ষোড়শ শতকে মন্তেন লিখেছিলেন, নিজের অভ্যাসের বাইরের সবকিছুকেই মানুষ ‘বর্বরতা’ বলে ডাকে; এই তিন প্রবন্ধ সেই পুরনো সত্যেরই তিনটি আধুনিক প্রয়োগ ।

‘তোমার মাঝে দেখতে দাও আমার আপনারে’: শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদারের প্রবন্ধ পাঠককে ধরে এক সৎ স্বীকারোক্তিতে: ‘রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের মুশকিলের অন্ত নেই’—কারণ তিনি আমাদের ভাষাতেই কথা বলেন, অথচ আমাদের অর্থে বলেন না । ভাষাটাই আলাদা হলে বরং সুবিধা ছিল, ‘জানি না’ বলে সরে দাঁড়ানো যেত; এখানে শব্দ চেনা, অর্থ অচেনা। প্রবন্ধকারের মূল যুক্তি: বাউল যেমন প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের শব্দাবলিকে শব্দার্থের কারাগার থেকে মুক্ত করে নতুন অর্থ দেন, রবীন্দ্রনাথও তাঁর গানে ‘সাধক’, ‘প্রেমিক’, ‘পাগল’ শব্দগুলিকে ধর্মসাহিত্যের চিরাচরিত অর্থে ব্যবহার করেননি । এখানে সাধক মানে নিবেদিতপ্রাণ, প্রেমিক মানে বিশ্বপ্রেমিক (ইংরেজিতে ‘ফিলানথ্রপিস্ট’), আর পাগল মানে বিদ্রোহী — সকলে যে পথে হাঁটে, তিনি সে পথে হাঁটেন না। এই চাবি হাতে নিলে ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো’ গানটি আর গগনবিহারী ঈশ্বরের আরাধনা থাকে না; হয়ে ওঠে সেই সর্বত্যাগী সমাজকর্মী ও বিপ্লবীদের কথা, যাঁরা আত্মস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে জীবনকে আদর্শের ব্রতে সঁপে দিয়েছেন ।

আবার ১২৬ পৃষ্ঠায় প্রবন্ধ ফিরে যায় রবীন্দ্রসংগীতের চিরকালীন প্রশ্নে: এই ‘তুমি’ কে — ঈশ্বর, প্রেয়সী, স্বদেশ, নাকি আবহমান বাংলা ? প্রবন্ধকার কোনো একটি উত্তরে থামতে চান না । ‘দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা’— এই পারস্পরিক বিনিময়েই ‘তুমি’র ভূমিকা বদলে যায়, আর সেই বদলের ভেতরেই গানের গভীর দ্যোতনা । বিশ্বাসীর কাছে এ ঈশ্বরের প্রতিরূপ, প্রেমিকের কাছে প্রেয়সী, আর সবচেয়ে মর্মস্পর্শী পাঠে — নিজের বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা আমারই প্রতিরূপ, যে কাজের দিনে আড়ালে থাকে আর দিনান্তে অপলক তাকায় ।

কোথাও আন্দোলন উত্তরাধিকার হয়ে ফিরে আসে, কোথাও সে হারিয়ে যাওয়া যৌবনের নাম; কোথাও পতাকা আর গান জীবিত রাখে স্মৃতিকে, আবার কোথাও সেই স্মৃতি বর্তমানের অক্ষমতাকে আরও তীব্র করে। এই দ্বৈত দৃষ্টি জরুরি, কারণ এর মাধ্যমে পত্রিকাটি কোনও একক দলীয় বা মতাদর্শিক ঘোষণাপত্র হয়ে ওঠে না। এটি রাজনৈতিক মানুষের প্রতি সহানুভূতি রাখে, কিন্তু রাজনীতির আত্মকথনকে নির্বিচারে বিশ্বাসও করে না

‘লোকচিত্তের নিহিত সঙ্গীত’, নাজমুল হকের প্রবন্ধ শুরু হয় সৃষ্টির আদি ধ্বনি থেকে, কিন্তু তার আসল ঠিকানা পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ লোকনাট্যের আসর। প্রবন্ধকার বাংলার সামাজিক-ধর্মীয় ইতিহাসের এক দ্রুত পর্যটন সেরে নেন— আর্য সংস্কৃতির স্রোতের মুখেও দ্রাবিড়-অনার্য শিকড়ের প্রতিবাদী রূপ ধরে রাখা, শাক্ত-শৈব বিভাজন, শ্রীচৈতন্যদেবের নেতৃত্বে বৈষ্ণব আন্দোলন, সুফি ও সহজিয়া মতাদর্শ—যাতে বোঝা যায়, বাংলার লোকনাট্য কেন শ্রেণিগত ও সম্প্রদায়গত মানুষকে একই সুরে বাঁধার ক্ষমতা রাখে । তারপর আসে আঞ্চলিক সম্ভারের মানচিত্র: জলপাইগুড়ির ‘চোর-চুন্নি পালা’, মালদহের ‘গম্ভীরা’, বীরভূমের ‘লেটো’, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ‘গাজন’-এর পালা, সুন্দরবনের ‘বনবিবির পালা’, দিনাজপুরের ‘খন’, এবং মুর্শিদাবাদ ও সন্নিহিত অঞ্চলের ‘আলকাপ’ বা ‘বোলান’।

প্রবন্ধের কেন্দ্রে ‘আলকাপ’। লেখক একে পূর্ণাঙ্গ নাটক বলতে চান না; বলেন ‘গ্রাম্য জীবন-চিত্রভিত্তিক নাটকীয় নকশা’, যেখানে নাচ, গান, কথা, ছড়া আর অভিনয় মিলে এক গতিশীল সংমিশ্রণ। মঞ্চ চারদিক খোলা, পরিবেশনা দর্শকের সমতলে; ফলে অভিনেতা ও দর্শকের মাঝখানে কোনো ‘ফোর্থ ওয়াল’ থাকে না। নাট্যকার বাদল সরকার তাঁর ‘থার্ড থিয়েটার’-এর ভিত্তি রচনায় এই গ্রামীণ লোকনাট্য থেকেই প্রচুর রস ও অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন । এই প্রবন্ধ বাংলার লোকনাট্যকে ‘গ্রাম্য’ নয়, প্রতিরোধ ও সম্প্রীতির জীবন্ত আর্কাইভ হিসেবে পড়ার আহ্বান জানায় ।

ফাল্গুনী দের ‘নরখাদকের দেশে’ প্রবন্ধ শুরু হয় প্রায় চলচ্চিত্রের ক্লোজ-আপে: ‘হ্যানিবল লেকটারকে মনে পড়ে ?’ ১৯৯১ সালের ‘দ্য সাইলেন্স অব দ্য ল্যাম্বস’-এর সেই সুসংস্কৃত নরখাদক, কিংবা হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলির খুঁজে পাওয়া রহস্যময় দ্বীপ, যার আপাত-শান্ত মানুষগুলি গোপনে নরখাদক — এই দুই উদাহরণেই পাঠক আমন্ত্রিত হন এক শিহরণের জগতে । তারপর প্রবন্ধ ধীরে ধীরে সেই শিহরণকেই প্রশ্ন করতে শুরু করে । লেখক মনে করিয়ে দেন, ১৯৭২-এর আন্দিজ বিমান দুর্ঘটনায় বেঁচে ফেরা যাত্রীদের কাহিনি (‘অ্যালাইভ’) কল্পনা নয়, বাস্তব; ‘ক্যানিবাল হলোকাস্ট’-এর পরিচালককে আদালতে প্রমাণ করতে হয়েছিল, কেউ সত্যিই নিহত হননি; ‘দ্য গ্রিন ইনফার্নো’, ‘ইয়েলোজ্যাকেটস’, ‘সোসাইটি অব দ্য স্নো’, ‘র‍্যাভেনাস’— চলচ্চিত্র ও সিরিজের একটি গোটা ঘরানা নরখাদকতাকে ব্যবহার করেছে রূপক হিসেবে । সাহিত্যেও ঐতিহ্য দীর্ঘ: ডিফোর ‘রবিনসন ক্রুসো’ (১৭১৯), কনরাডের ‘হার্ট অব ডার্কনেস’ (১৮৯৯), আর আমাদের নিজের ঘরে ‘ঠাকুরমার ঝুলি’-র রাক্ষস-খোক্কস, ব্রহ্মদৈত্য, নিশাচর — শৈশবে যাদের ভয়ে আমরা ঘুমিয়েছি ।

‘ক্যানিবাল’ শব্দের উৎস নিয়ে প্রবন্ধকারের সূত্র — কলম্বাসের বিবরণ ইউরোপে পৌঁছনোর পর ক্যারিব জনগোষ্ঠীর নাম থেকে শব্দটির জন্ম—পাঠককে মনে করিয়ে দেয় শেক্সপিয়রের ‘দ্য টেম্পেস্ট’ (১৬১১)-এর ক্যালিবানকে, যাঁর নামটি ‘ক্যানিবাল’-এর ধ্বনিরূপান্তর বলেই ব্যাপকভাবে গৃহীত। মন্তেনের ‘দেজ ক্যানিবাল’ (১৫৮০)-এর সেই বিখ্যাত পর্যবেক্ষণও এখানে মনে পড়ে — জীবন্ত মানুষকে যন্ত্রণা দিয়ে ছিন্নভিন্ন করা মৃত মানুষকে খাওয়ার চেয়ে বেশি বর্বর; অথচ সেই নিষ্ঠুরতা তখন ‘সভ্য’ ইউরোপেরই ধর্মযুদ্ধের দৈনন্দিনতা । কনরাডের ‘হার্ট অব ডার্কনেস’ প্রসঙ্গে প্রবন্ধকারের পাঠ — ঔপনিবেশিক আফ্রিকায় ইউরোপীয়দের গড়া মিথ সরিয়ে লেখক আসল বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেছেন — আংশিক সত্য; যদিও চিনুয়া আচেবে ১৯৭০-এর দশকের এক বিখ্যাত বক্তৃতায় অভিযোগ করেছিলেন, কনরাড নিজেই আফ্রিকাকে ‘অন্ধকারের’ রূপক বানিয়ে ফেলেছেন । এই বিতর্ক জেনে পড়লে প্রবন্ধটির পাঠ আরও সমৃদ্ধ হয় ।

তিনটি প্রবন্ধই শেষ পর্যন্ত একই প্রশ্নে ফিরে আসে: ‘লোক’ বলতে আমরা কাদের বুঝি, আর তাদের কথা শোনার ধৈর্য কার আছে ? লালন-বাউলের লোকধর্মে ঈশ্বর ভক্তের অধীন; আলকাপের বন্দনায় সরস্বতী আর পীর-সাহেব এক সমতলে; কুরুর দ্বীপে ‘নরখাদক’ তকমার আড়ালে আছে শোক ও শ্রদ্ধার আচার । এ ধারার পূর্বসূরি রবীন্দ্রনাথ নিজেই—‘লোকসাহিত্য’ (১৯০৭)-এ তিনি ছেলেভুলানো ছড়া, গ্রাম্যসাহিত্য ও কবিগানকে সাহিত্যের মর্যাদা দিয়েছিলেন, আর ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ (১৯০৭)-র ভূমিকাও লিখেছিলেন তিনিই। ‘আরম্ভ’-এর প্রবন্ধত্রয় সেই উত্তরাধিকার বহন করে — সময়ের সঙ্গে প্রশ্নগুলি শুধু আরও জরুরি হয়েছে ।

সংকলনের সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সাদত হাসান ম’ন্টোর দুটি নাটকের বাংলা অনুবাদ —‘সাদত হাসান ম’ন্টোর ২ নাটক’, ভাষান্তর ইমরাজ হাসান । মন্টো (জন্ম ১১ মে ১৯১২, পাঞ্জাবের সামরালা; মৃত্যু ১৮ জানুয়ারি ১৯৫৫, লাহোর) বাংলা পাঠকের কাছে প্রধানত দেশভাগের গল্পকার —‘টোবা টেক সিং’, ‘ঠান্ডা গোশত’, ‘খোল দো’-র স্রষ্টা। ছয়টি অশ্লীলতার মামলা — তিনটি ব্রিটিশ ভারতে, তিনটি পাকিস্তানে —তাঁর জীবনকে ক্ষতবিক্ষত করেছিল, অথচ তিনি কলম থামাননি । কিন্তু ১৯৪০-এর দশকের গোড়ায় দিল্লির অল ইন্ডিয়া রেডিওর দিনগুলিতে যিনি বেতার-নাটক লিখেছিলেন, সেই নাট্যকার মন্টোর খোঁজ আমরা কমই রাখি । এই সংযোজন তাই কেবল একটি অনুবাদ নয়, একজন পরিচিত লেখকের অপরিচিত মুখের সঙ্গে পাঠকের নতুন পরিচয় । সংখ্যার প্রধান আকর্ষণ ১৯৫৪ সালে উর্দুতে প্রকাশিত ব্যঙ্গনাটক ‘ন্যায়বিচার’। মৃত্যুর বছরখানেক আগেকার এই রচনায় মন্টোর কলম ক্লান্ত নয়, বরং আরও ক্ষুরধার । নাটকের জগৎ এক রাজতান্ত্রিক দরবার, যেখানে সম্রাটের সামনে ফরিয়াদি তাঁর অভিযোগ পেশ করে, আর প্রধান খানসামা রাতারাতি ‘ভাষা-মন্ত্রী’ এবং পরে ‘অস্থায়ী গণনা-মন্ত্রী’ হয়ে ওঠেন । পদোন্নতির এই পরাবাস্তব ধারাবাহিকতা প্রশাসনিক যোগ্যতা নয়, ক্ষমতার খেয়ালকেই সামনে আনে। ‘ভাষা’ আর ‘গণনা’—এই দুটি শব্দ যে দুটি আধুনিক রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের নাম, আজকের পাঠকের কান তা এড়াতে পারে না: ভাষা-নীতি ও আদমশুমারি, যে দুটি ক্ষেত্রে পরিচয়ের রাজনীতি সবচেয়ে তীক্ষ্ণ । নাটকের কেন্দ্রীয় ঘটনা আরও নির্মম। রাজকন্যাদের বন্দুকের গুলিতে সাধারণ ধোপারা নিহত হয় । রক্তের বদলে রক্ত দাবি করা তো দূর, দরবারের একমাত্র চিন্তা কীভাবে বিষয়টি চাপা দেওয়া যায়। সমাধান: ‘তদন্ত কমিশন’, এবং সেই কমিশনের ওপর আরেকটি কমিশন । এই কৌশল কোনো কল্পনার দেশের নয় । ১৯৫২ সালের কমিশনস অব ইনকোয়ারি অ্যাক্টের পর থেকে ভারতে তদন্ত কমিশন প্রায়ই সত্য-অনুসন্ধানের চেয়ে সময়-ক্ষেপণের উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে । ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তদন্তে গঠিত লিবেরহান কমিশন প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল ২০০৯ সালে, অর্থাৎ প্রায় সতেরো বছর ও বারংবার মেয়াদবৃদ্ধির পর । ঘটনাচক্রে মন্টোর নাটকের ওই ১৯৫৪ সালেই পাকিস্তানে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালের পাঞ্জাব দাঙ্গার তদন্তে বিচারপতি মুহম্মদ মুনির ও এম. আর. কায়ানির প্রতিবেদন, যা রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে এক ঐতিহাসিক দলিল । নাটকটি সরাসরি ওই ঘটনার প্রতিক্রিয়া কি না, তার প্রমাণ আমাদের হাতে নেই; তবু তদন্ত কমিশন তখন উপমহাদেশের রাজনৈতিক শব্দভাণ্ডারের পরিচিত অংশ, আর মন্টো সে শব্দের অন্তঃসারশূন্যতা ধরে ফেলতে ভুল করেননি ।

ব্যঙ্গের এই ধারা বিশ্বসাহিত্যে সুপ্রাচীন । গোগোলের ‘ইন্সপেক্টর জেনারেল’ (১৮৩৬) আমলাতন্ত্রের মুখোশ খুলেছিল; সুইফটের ‘মডেস্ট প্রোপোজাল’ (১৭২৯) নিষ্ঠুর যুক্তির আড়ালে নিষ্ঠুর সমাজকে দেখিয়েছিল । বাংলা সাহিত্যেও এর বংশতালিকা সুদীর্ঘ — পরশুরামের ‘গড্ডলিকা’ (১৯২২), সুকুমার রায়ের ‘হযবরল’-এর উদ্ভট বিচারসভা, রবীন্দ্রনাথের ‘তাসের দেশ’ (১৯৩৩), যেখানে নিয়মের শৃঙ্খলই শেষ পর্যন্ত মানুষকে প্রাণহীন তাসে পরিণত করে। ম’ন্টোর বিশেষত্ব হলো, ব্যঙ্গের এই ঐতিহ্যে তিনি নিয়ে আসেন উর্দু ‘তঞ্জ’-এর তীব্র, প্রায় নির্মোহ ঝাঁঝ —যা তাঁর শেষ জীবনের ‘চাচা সামের নামে চিঠি’ (১৯৫১–৫৪)-র নয়টি পত্রেও সমান জ্বলজ্বল করে । ‘ন্যায়বিচার’ নামটিও তাই এক কঠিন বিদ্রূপ: যে দরবারে বিচারের নামে চাপা দেওয়াই একমাত্র নীতি, সেখানে ‘ন্যায়’ শব্দটিই ক্ষমতার সবচেয়ে সুবিধাজনক মুখোশ ।

পত্রিকার পৃষ্ঠাবিন্যাস, মুদ্রণশৈলী আর সূচিপত্রের গঠন ইঙ্গিত দেয়, এটি দায়িত্বশীল ও নিষ্ঠাবান এক সাহিত্য-প্রয়াস । একদিকে ব্যঙ্গনাট্য, অনুবাদ, অন্যদিকে মৌলিক কবিতায় সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিবাদের স্বর —সংকলনের ভেতর দিয়ে একটি অন্তর্লীন সংলাপ চলতে থাকে: মন্টোর নাটক বহু দশক আগের দেশভাগোত্তর উপমহাদেশের কথা বলে, আর মৌলিক কবিতাগুলি আজকের অনিশ্চিত সময়ের । ফলে অতীত ও বর্তমান এখানে পরস্পরের আয়না হয়ে ওঠে

অনুবাদকের কৃতিত্ব এখানেই যে, উর্দু দরবারি ভাষার আতিশয্য, উপাধি-অলংকারের সেই নাটকীয় ঘটা বাংলায় আনতে গিয়ে তিনি ম’ন্টোর পরিহাস ও অন্তর্দৃষ্টিকে ভোঁতা করেননি । ওয়াল্টার বেঞ্জামিন অনুবাদককে যে ‘কাজ’ দিয়েছিলেন (‘দ্য টাস্ক অব দ্য ট্রান্সলেটর’, ১৯২৩), তা মূল ভাষার অর্থ নয়, তার ‘ধ্বনি-প্রতিধ্বনি’ অন্য ভাষায় বাঁচিয়ে রাখা — এই অনুবাদে সেই প্রয়াসের ছাপ আছে । বাংলা অনুবাদের এ ধারাও পুরোনো; কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৩০ সালে ‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ’ বাংলায় রূপান্তর করে ফারসি কাব্যসম্পদকে বাংলার ঘরে এনেছিলেন । প্রাঞ্জল ও গতিশীল গদ্যে লেখা এই নাট্যানুবাদ সেই ধারায় এক যোগ্য সংযোজন ।

নাটকের কঠিন ব্যঙ্গের পরে সংকলন আমাদের নিয়ে যায় ছোটো-বড়ো কবিতার বিস্তৃত ভুবনে । এই পর্বের শুরু এই সময়ের এক শক্তিমান কবি অমিতাভ গুপ্তের ‘পাখি ও অর্কিড’ দিয়ে, আর শেষ উর্দু কবি নিদা ফাজলির ‘বৃদ্ধ’ ও ‘প্রেম’ কবিতা দুটি দিয়ে (ভাষান্তর: তারিক রাজা) । সংকলনের কবিতাগুলিকে সম্মিলিত গতিমুখ ধরে পড়লে একটি স্পষ্ট রেখা চোখে পড়ে: কবিতাগুলি নির্জন ‘আমি’ থেকে যাত্রা শুরু করে ক্রমশ সাক্ষ্য-দেওয়া ‘আমরা’র দিকে এগোয় — নির্জনতা থেকে সম্বোধন, সম্বোধন থেকে বস্তু ও স্মৃতি, স্মৃতি থেকে জাগরণ । এই যাত্রায় তিনটি লক্ষণীয় বাঁক আছে, আর শেষে একটি প্রস্থান-বিন্দু ।

প্রথম বাঁকটি নির্জনতা থেকে সম্বোধনের দিকে। কবিতাগুলির সূচনার ভঙ্গি প্রায়ই নেতিবাচক—‘কিছুই পেতে চাইছি না’, ‘অক্ষরে যাবে না ছোঁয়া’, ‘হে পরিত্যাগ’—ত্যাগ, না-চাওয়া, ভাষার অক্ষমতার কথা । অথচ শিরোনামগুলিই বলে দেয়, এই নির্জনতা বন্ধ ঘর নয় । কবিতা এখানে চিঠি লেখে (‘নির্জন স্টেশনকে চিঠি’), উৎসর্গ করে (‘উৎসর্গ’), ডাকে (‘হে পরিত্যাগ’), স্মরণ করে (‘কমরেড জেঠু’)। সম্বোধনের এই ব্যাকরণ আসলে শ্রোতা-খোঁজার ব্যাকরণ: যিনি লেখেন, তিনি জানেন কেউ শুনছে না, তবু লেখেন — শূন্যতার দিকে তাকিয়েও কথা বলা এখানে এক ধরনের প্রতিরোধ । এই সংখ্যার রবীন্দ্র-প্রবন্ধের সঙ্গে এ ভঙ্গির এক অন্তর্লীন সংলাপ তৈরি হয়: ‘তুমি’কে কেউ ঈশ্বর, কেউ প্রেয়সী, কেউ নিজের প্রতিরূপ বলে ডাকে; এই কবিতাগুলিও ডাকে স্টেশনকে, নদী ও মাতৃত্বকে, অনুপস্থিত কমরেডকে । ত্যাগ ও না-চাওয়ার ভঙ্গিও তাই শূন্যতার নয়, প্রস্তুতির—ওই প্রবন্ধেরই ভাষায়, রিক্ত হওয়ার জন্য নয়, পূর্ণ হওয়ার জন্য ।

দ্বিতীয় বাঁকটি বিমূর্ত থেকে বস্তুর দিকে । কবিতাগুলি যত এগোয়, দর্শনের ভাষা ছেড়ে ততই হাতের কাছের জিনিস তুলে নেয়: ভাতের থালা, দেশলাই বাক্স, ছাই, নির্জন স্টেশন, বৃষ্টিতে ভেজা ফুটবলের মাঠ । আর এই সাধারণ বস্তুগুলিই বহন করে ইতিহাসের ভার । ‘ভাতের থালার ওপর নিত্যদিন উড়ে এসে পড়ে কোনো না কোনো শীর্ণ কাটা হাত !’— এই একটি চিত্রকল্পে ঘরোয়া ক্ষুধা আর প্রকাশ্য হিংসা একই থালায় এসে বসে; দেশলাই বাক্সের ক্ষুদ্র রসায়নে পারমাণবিক আতঙ্কের প্রতিধ্বনি শোনা যায়; আগ্নেয়গিরির ছাই হয়ে ওঠে সভ্যতার ক্ষয়ের সংক্ষিপ্ত নাম ।

আমরা দেখি, আর্কট ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লুণ্ঠন ফিরে আসে পাখি ও অর্কিডের মতো কোমল জীবের পাশে দাঁড়িয়ে; অন্যদিকে প্রাগৈতিহাসিক জল, লবণ, সমুদ্র, চাঁদ ও পাহাড় মানুষের ইতিহাসকে আরও গভীর ভূগোলীয় সময়ে নামিয়ে দেয় । অর্থাৎ, আজকের শহরের ওপর দিয়ে শুধু আজকের খবর চলে যাচ্ছে না, চলে যাচ্ছে শতাব্দীর শোষণ আর যুগের ভূত । কবিতাগুলি মনে করিয়ে দেয়, উপনিবেশ কেবল পুরোনো পাঠ্যপুস্তকের অধ্যায় নয় —তার অর্থনৈতিক কাঠামো, বৈষম্য ও নিঃশব্দ হিংসা এখনও দৈনন্দিন জীবনের ভেতর কাজ করে । আবার প্রাচীন জলের সামনে দাঁড়ালে মানুষের রাজনৈতিক অহংকারও ক্ষুদ্র হয়ে যায় । এই দুই চরম সময়সীমার মাঝখানে মানুষকে রাখার কারণেই ‘আরম্ভ’-এর বর্তমান এত বিস্তৃত, এত অস্থির ।
তৃতীয় বাঁকটি স্মৃতিকে রাজনীতি হিসেবে পড়ার । ‘শিলচরের ফাউস্ট’-এর প্রশ্ন —‘কোথায় বৃষ্টিতে ভেজা ফুটবলের মাঠ? / কোথায় নীল বড়াইল পাহাড়ে জমা মেঘ ?’—কিংবা ‘কমরেড জেঠু’-র পাহাড়ি সুর আর লাঠিখেলা: এসব কবিতায় স্মৃতি নস্টালজিয়ার আরাম নয়, ক্ষতির হিসাব । শিলচর বলতেই ১৯৬১ সালের ১৯ মে ভাষার দাবিতে এগারো প্রাণের স্মৃতি মনে আসে; কবিতার জিজ্ঞাসাচিহ্ন তাই শোকেরই অন্য নাম । কমরেডের আদর্শ হয়তো পরাজিত, কিন্তু তাঁর মুখ, লাঠিখেলার ভঙ্গি, পাহাড়ের সুর কবিতায় বেঁচে থাকে — স্মৃতিই এখানে শেষ পর্যন্ত আদর্শের উত্তরাধিকার । আর এই স্মৃতির ভূগোলের দিকে তাকান: বরাক উপত্যকা, পাহাড়ি অঞ্চল — কেন্দ্রের বাইরের জায়গা, ঠিক যেমন ম’ন্টোর দরবারে ধোপারা, কিংবা লোকনাট্যের আসরে বাউড়ি-বাগদি-সাঁওতাল পালাকাররা । কবিতাগুলি প্রান্তের ঠিকানা থেকে লেখা ।

এই সংখ্যার রাজনৈতিক কবিতাগুলি সবচেয়ে শক্তিশালী হয়েছে যখন তারা বড়ো শব্দের বদলে ক্ষতের ভৌত অবস্থান ধরেছে । বিক্ষোভকারী তরুণের দেহ, লাঠির আঘাত, গুলি, পাথর, জেল, ভাঙা হাত, ভাত তুলতে গিয়ে আটকে যাওয়া গ্রাস, রাস্তার পুলিশি নিরাপত্তা এবং প্রশাসনের সামনে নিঃশব্দ হয়ে যাওয়া মানুষ — এই উপাদানগুলি রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠানের বাইরে এনে শরীরের ওপর বসিয়ে দেয় । শাসকের সঙ্গে বিরোধ এখানে বিমূর্ত মতপার্থক্য নয়; তার ফল হয় ভাতের অভাব, দুশ্চিন্তা, নির্বাসন, আত্মসমর্পণ কিংবা মৃত্যু । তাই ক্ষুধা এই কবিতা-বিভাগের একটি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক চিত্র । খালি পেটের কাছে দেশ, ধর্ম, পতাকা ও উন্নয়নের বড় বাক্য কতটা অর্থহীন হয়ে ওঠে, তা এই পাতাগুলি বারবার প্রকাশ করে । আবার ক্ষুধার পাশে প্রতিবাদও দাঁড়ায় — মানুষ শুধু ভুক্তভোগী নয়, সে চিৎকার করে, টিকিট ছিঁড়ে, আসন পুড়িয়ে, পথে নেমে ভবিষ্যৎ বদলানোর দাবি তোলে ।

প্রশংসার বিশেষ দিক হলো, এই পত্রিকা প্রতিবাদকে কেবল বীরত্বের আবেগে সীমাবদ্ধ রাখেনি । এখানে রাজনৈতিক আন্দোলনের ভেতরকার ভাঙন, নেতার দূরে সরে যাওয়া, সহযোদ্ধার ব্যর্থতা, পুরোনো ‘কমরেড’-এর নস্টালজিয়া এবং আদর্শ ও দৈনন্দিন জীবনের ব্যবধানও উপস্থিত । কোথাও আন্দোলন উত্তরাধিকার হয়ে ফিরে আসে, কোথাও সে হারিয়ে যাওয়া যৌবনের নাম; কোথাও পতাকা আর গান জীবিত রাখে স্মৃতিকে, আবার কোথাও সেই স্মৃতি বর্তমানের অক্ষমতাকে আরও তীব্র করে। এই দ্বৈত দৃষ্টি জরুরি, কারণ এর মাধ্যমে পত্রিকাটি কোনও একক দলীয় বা মতাদর্শিক ঘোষণাপত্র হয়ে ওঠে না। এটি রাজনৈতিক মানুষের প্রতি সহানুভূতি রাখে, কিন্তু রাজনীতির আত্মকথনকে নির্বিচারে বিশ্বাসও করে না । বর্তমানকে জানার এই সংশয়ী ও সহৃদয় পদ্ধতিই এর সম্পাদকীয় পরিণতির পরিচয় ।

এই তিন বাঁকের শেষে কবিতাগুলি পৌঁছে যায় রাত ও নীরবতার দেশে — এবং সেখানেও দিক ঘোরানোর ইঙ্গিত দেয় । ‘নিরাপত্তার ভয়াবহ নীরবতা’ শিরোনামেই এক বিরোধাভাস: নিরাপত্তা, যার স্বস্তি দেওয়ার কথা, জাগায় ভয়; নীরবতা, যা শান্তির প্রতিশব্দ, সেখানে ‘ভয়াবহ’। আর পাশেই ‘জেগে ওঠে কালো গোলাপ’—কালো গোলাপ শোকেরও প্রতীক, প্রতিরোধেরও; ক্রিয়াপদটি ‘জেগে ওঠে’। অর্থাৎ নীরবতার শেষে নিঃশব্দ হয়ে যাওয়া নয়, জেগে ওঠা । কবিতাগুলির এই শেষ প্রবণতাকে আমি বলব ‘নৈঃশব্দ্য থেকে সাক্ষ্য’: কবি বুঝেছেন, চুপ থাকা আর নিরাপদ নয়, আর কথা বলার ভাষা আসে হাতের কাছের জিনিস, চেনা স্মৃতি আর সম্বোধনের ভেতর থেকেই ।

ভাষার দিক থেকেও গতিমুখটি লক্ষণীয় । অন্তত উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তিগুলিতে প্রশ্ন (‘কোথায়…?’) আর বিস্ময়সূচক উচ্চারণ (‘কাটা হাত!’) প্রধান ভঙ্গি—কবিতা এখানে ঘোষণা করে না, জিজ্ঞাসা করে, আঁতকে ওঠে । অলংকারের আড়ম্বর নেই; চিত্রকল্প আসে সরাসরি, আর সেই সংযমেই তার ধার । এই সংযম সংকলনের অন্য অংশের সঙ্গেও মেলে: ম’ন্টোর ব্যঙ্গনাট্য যেমন ঘোষণা না করে হেসে ওঠে, নিদা ফাজলির কবিতা যেমন নীরবতায় থামে, তেমনই এই কবিতাগুলিও নিচু স্বরে কথা বলেই বেশি শোনা যায় ।

এ ছাড়া এখানে সংকলিত হয়েছে তিনজন কবির ছয়টি অসাধারণ অনুবাদ-কবিতা । সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ের অনুবাদে আসে আলী আল সালাহ-এর ‘মন্ত্র’ ও ‘নিঃসঙ্গতা’; জিয়া হক-এর ভাষান্তরে অবতার সিং পাশের ‘সবচেয়ে ভয়ের’ ও ‘আমার অধিকার এখন’; আর তারিক রাজার অনুবাদে ফাজলির ‘বৃদ্ধ’ ও ‘প্রেম’। কবিতাগুলি পাঠকের সামনে আসে সংক্ষিপ্ত টীকাসহ, যা কবির পরিচয় ও কর্মজীবনের সঙ্গে পাঠকের প্রাথমিক সেতু তৈরি করে ।

অনুবাদগুলির মধ্য দিয়ে আসে ইরাকি স্বদেশবোধ, ভাগ করা যায় না এমন দেশের প্রশ্ন, গ্রেফতারি ও নির্বাসনের অভিজ্ঞতা; পাঞ্জাবি কবিতায় গণতন্ত্রের টিকিট, দর্শকের হুংকার, ক্ষুধা ও নিঃশব্দতার ভয়; উর্দু-হিন্দি কাব্যধারায় বার্ধক্য, মাতৃত্ব ও প্রেমের ক্ষয় — সবকিছুই এই সংখ্যার দেশীয় প্রশ্নগুলির সঙ্গে প্রতিধ্বনিত হয় । এর ফলে সীমান্ত দুই অর্থে কাজ করে: একদিকে দেশ ভাগ করা যায় না বলে দাবি ওঠে, অন্যদিকে মানুষের ক্ষুধা, ভয়, মৃত্যু ও ভালোবাসা ভাষাগত সীমান্ত পেরিয়ে একে অন্যকে চিনে নেয় । অনুবাদ এখানে পরিচয়পত্র নয়, তুলনামূলক দৃষ্টি — বিশ্বের অন্য সমাজের ভেতর দিয়ে নিজের সমাজকে আরও স্পষ্ট দেখার পথ হয়ে ওঠে ।

উপন্যাস ও গল্পের জাদুঘরে প্রবেশের মুখেই আছে হেদায়েতুল্লাহর ‘গাংপারের অষ্টপ্রহর’, কবি অমিতাভ দেব চৌধুরীর উপন্যাস ‘আভে মারিয়া’, অথবা মেঘমালা দে মহন্তের ‘আলো নিভে যাওয়ার পরে’। আছে রনবীর পুরকায়স্থের গল্প ‘সকলি গরল ভেল’, প্রবুদ্ধ মিত্রের ‘কানা গলির শেষ মাথা’, সাধন চট্টোপাধ্যায়ের ‘সময়ের গর্তে অনুশাসন’ এবং তপন রায়ের ‘নকুড় ভটের ঈশ্বরী’।

উপন্যাসগুলির মধ্যে ‘আভে মারিয়া’ স্মৃতি, প্রেম আর হারানোর স্বপ্নিল এক উপন্যাস । অমৃতের জীবনে ফিরে ফিরে আসে অতীত —শিলচরের দিনগুলি, পরিচিত মুখ, প্রিয়জনদের কণ্ঠস্বর আর অসমাপ্ত সম্পর্কের ব্যথা। গল্প এগোয় ঘটনার চেয়ে অনুভূতির স্রোতে; তাই পড়তে পড়তে মনে হয়, কেউ যেন নিজের ভেতরের আলমারি খুলে পুরোনো চিঠি, গান আর ছবি একে একে দেখাচ্ছে । লেখার কবিতাময় ভাষা, সংগীতের ছোঁয়া আর ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে সমাজ ও সম্পর্কের মিশ্রণ উপন্যাসটিকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে । কখনো প্রবাহ কিছুটা ছড়ানো মনে হলেও তার মর্মস্পর্শী আবেদন থেকে যায়। ধীরে পড়ে উপভোগ করার মতো একটি আবেগঘন বই ।

অন্যদিকে পুরোনো একটি থিয়েটারকে কেন্দ্র করে এই সময়ের গল্পকার মেঘমালার ‘আলো নিভে যাওয়ার পরে’ বলে সময়, পরিবর্তন আর শিল্পের টিকে থাকার গল্প। লেখিকা নস্টালজিয়াকে শুধু আবেগের জায়গায় রাখেননি, বরং তার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন বাস্তব জীবনের সংগ্রাম। সরল ভাষা, পরিচিত পরিবেশ আর মার্জিত বেদনা গল্পের শক্তি । শেষে পাঠকের মনে প্রশ্ন রেখে যায় — আলো নিভলেই কি সব শেষ হয়ে যায়, নাকি নতুন আলোর অপেক্ষা থেকে যায় ?

বাকি গল্পগুলিও সমসাময়িক গল্পের দঙ্গল থেকে নিজেদের আলাদা করে চিহ্নিত করেছে; ‘আরম্ভ’-কে দিয়েছে শব্দের মোহনা, আর পাঠককে দিয়েছে অনিঃশেষ পাঠাভিজ্ঞতা ।

তাছাড়া ‘আরম্ভ’-এর দুটি সফরনামা ভ্রমণের দুই ভিন্ন আবেশ তুলে ধরেছে—রিমি দে-র ‘ভ্রমণগন্ধা ফুল’ স্মৃতির নিবিড়, ব্যক্তিগত জগৎ খুলে দেয়; সোমাভা বিশ্বাসের ‘হঠাৎ চে-র সঙ্গে দেখা’ পাঠককে নিয়ে যায় ইতিহাস, রাজনীতি ও সভ্যতার বিস্তারে । সোমাভা বিশ্বাসের লেখা তুলনামূলকভাবে বহুমুখী ও তথ্যঘন । কিউবার পথে চে গেভারার সঙ্গে ‘দেখা’ কেবল একজন বিপ্লবীর সমাধি বা স্মৃতিসৌধ দেখার অভিজ্ঞতা নয়; বিপ্লব, আদর্শ ও সময়ের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়া । দুটি লেখার মূল শক্তি তাদের পার্থক্যেই । একটিতে পথ ফিরে আসে নিজের শৈশবে, অন্যটিতে পথ খুলে দেয় বিশ্বের ইতিহাস ।

বাংলা সাময়িকপত্রে লেখা আর ছবির সহাবস্থানের এক দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে—‘প্রবাসী’-র পাতায় নন্দলাল বসু বা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি থেকে শুরু করে ‘সন্দেশ’-এর রেখাচিত্র পর্যন্ত । ‘আরম্ভ’-এর স্কেচগুলি সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা: নিছক ফাঁকা জায়গা ভরাট করার জন্য নয়, লেখার ভাবানুষঙ্গ গভীর করার জন্য ব্যবহৃত। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী বিজন চৌধুরীর রেখাচিত্র কবিতার দৃশ্যপটকে বহুগুণ শক্তিশালী করেছে; শাহিন সুলতানার মাতৃত্ব ও স্মৃতির ড্রয়িং এবং সজল রায়ের ভাবগম্ভীর আধুনিক স্কেচ প্রতিটি লেখার বক্তব্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠেছে । বিশেষত মাতৃত্ব-বিষয়ক রেখাচিত্রগুলি নিদা ফাজলির ‘বৃদ্ধ’ ও ইন্দিরা দাশের ‘উৎসর্গ’-এর পাশে পড়লে এক অন্তর্লীন সংলাপ তৈরি হয়—কবিতা ও ছবি পরস্পরকে ব্যাখ্যা না করে প্রতিধ্বনিত করে।
পত্রিকার পৃষ্ঠাবিন্যাস, মুদ্রণশৈলী আর সূচিপত্রের গঠন ইঙ্গিত দেয়, এটি দায়িত্বশীল ও নিষ্ঠাবান এক সাহিত্য-প্রয়াস । একদিকে ব্যঙ্গনাট্য, অনুবাদ, অন্যদিকে মৌলিক কবিতায় সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিবাদের স্বর —সংকলনের ভেতর দিয়ে একটি অন্তর্লীন সংলাপ চলতে থাকে: মন্টোর নাটক বহু দশক আগের দেশভাগোত্তর উপমহাদেশের কথা বলে, আর মৌলিক কবিতাগুলি আজকের অনিশ্চিত সময়ের । ফলে অতীত ও বর্তমান এখানে পরস্পরের আয়না হয়ে ওঠে — ম’ন্টোর কল্পিত দরবারের তদন্ত কমিশন আর আজকের সংবাদপত্রের শিরোনাম একই সুরে বাজে ।

এই সংখ্যার পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় আরও একটি কথা বলতেই হয়: সম্পাদকীয় সাহসের আরেক পরিচয় উৎসবের মধ্যেই উৎসবকে প্রশ্ন করা । এখানে প্রতিমা অনুপস্থিত, আনন্দের প্রতীকী শরৎ পুরোনো হিংসা ও বর্তমান অর্থনৈতিক অনটনের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায় । এতে উৎসব অস্বীকার করা হয়নি, বরং উৎসবের সামাজিক বৈপরীত্য প্রকাশ করা হয়েছে । যে সমাজে সবাই সমান আলো পায় না, সেখানে আলোর উৎসব নিজেই প্রশ্নের মুখোমুখি হয় । আবার কোথাও সূর্যোদয়, ফুল, শিশুর হাসি, গান ও আকাশ স্পর্শ করার ইচ্ছে টিকে থাকে । ফলে এই পত্রিকা হতাশার একরঙা উৎসবও নয়; এটি দেখায়, প্রতিবাদের পাশাপাশি জীবনের সামান্য আনন্দ টিকিয়ে রাখাও এক ধরনের রাজনীতি ।

পাঠক একদিকে উৎসবের অপেক্ষায় পত্রিকা হাতে নেন, অন্যদিকে কবিতাগুলি তাঁর সেই অপেক্ষার স্বাচ্ছন্দ্য ভেঙে দেয় । উৎসব, প্রার্থনা ও প্রতিবাদ পাশাপাশি চলতে থাকে সারাটা সংকলন জুড়ে । পত্রিকাটি নিজের প্রকাশনার লক্ষ্যকেই সমালোচনামূলক করে তোলে। যে পত্রিকা নিজের উৎসবী অবস্থান থেকেই বাস্তবের অসাম্য দেখাতে পারে, সে সহজে অন্য পত্রিকার সঙ্গে মিশে যায় না । ‘আরম্ভ’-এর স্বাতন্ত্র্যের একটি বড়ো ভিত্তি এখানেই ।

♦–♦–♦–♦•♦–♦–♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!