Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • জানুয়ারি ২৫, ২০২৬

কালো পাখি

নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো
কালো পাখি

চিত্রকর্ম : উইলিয়াম কেন্ড্রিজ

তরজমা ইমরাজ হাসান

কেউই তাকে ভালো করে চেনে না। এমনকি তার হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের মানুষ ওয়ামাইথাও। সেও কখনো তাকে বুঝতে পারেনি। একা থাকত সে। কে-ই বা ওর সাথে থাকবে ! এখনো চোখ বুজলে, আমার মনে পড়ে ওর কথা। লম্বা গড়ন, শক্তপোক্ত ইস্পাত-কঠিন শরীর। দেখলেই মনে হতো, যে কাউকে, যে কোনো সময় সে অনায়াসে মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারে। পশুর মতো বড়ো বড়ো চোখ, কালো আর উজ্জ্বল। সে চোখই মাঝেমাঝে শীতল দিঘির জলের মতো সজল, আর্ত। কিছুকিছু মুহূর্তে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি শিশুর চোখের মতো অনুনয় আর অসহায়তায় ভরা। এবার তুমি হয় তার প্রতি মমত্ব অনুভব করবে, নয়তো গা শিরশিরে ভয় পাবে। মাঝে মাঝে সে দেয়ালের দিকে একটানা চেয়ে থাকত, যেন চোখ দিয়েই প্রতিটি খুঁটিনাটি শুষে নিচ্ছে। জানি না, কোনো মায়াজগৎ, কোনো ভ্রম তাকে জড়িয়ে রাখত কি না, কিন্তু তাকে প্রায়ই আছন্নতা কাটিয়ে চারপাশে তাকাতে দেখেছি। যেমন অদ্ভুত কোনো স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন থেকে হঠাৎ জেগে ওঠে কেউ।

স্কুলেই প্রথম দেখা। লিমুরু-তে একমাত্র স্কুল ছিল মাঙ্গুও। দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছেলেমেয়েরা সেখানে পড়তে আসত। সে এসেছিল, বেশ কয়েক মাইল দূরের জনপদ গাথিগি-ইনি রিজ থেকে। পাহাড়, উপত্যকা আর সমতল ডিঙিয়ে স্কুলে আসত। আমরা ওকে ডাকতাম ‘কামড়’ বলে। মজার ব্যাপার হলো, এখন আর কিছুতেই মনে করতে পারি না, কেন ওকে এমন অদ্ভুত নামে ডাকতাম। ওর নাম তো ছিল মাঙ্গারা। লম্বা, চৌকো চেহারার যুবক। সুদর্শনই বলা চলে। মেয়েদের পছন্দের। সে কিন্তু বরাবর মেয়েদের এড়িয়েই চলত, ভুল বলা হলো, আসলে সবার সঙ্গই এড়িয়ে চলত। খেলাধুলায় দারুণ, দৌড়, লাফ, বক্সিং-এ তার জুড়ি মেলা ভার। বিশেষ করে কুস্তি। স্কুলের উঁচু ক্লাসের দামরা দামরা ছেলেদের চ্যালেঞ্জ করত। হারত, আবার চেষ্টা করত। বিশবার হারলেও কখনো রাগ দেখাত না, ভেঙে পড়ত না। আর ফুটবলে গোটা অঞ্চলে সে ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

গুজব ছিলজায়গাটা ভুতুড়ে। শোনা যায়স্বামীর অত্যাচার থেকে বাঁচতে এক মহিলা পালিয়ে গিয়ে ওই ঝোপের মধ্যে ঢুকেছিল। পরে তার ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। মাঝেমাঝেই সেই অতৃপ্ত আত্মার আনাগোনা চলে সেখানে।

আমি ওকে একেবারেই পছন্দ করতাম না, হয়তো ঈর্ষা থেকেই। খেলাধুলায় ভালো ছিলাম না, পড়াশোনাতেও তেমন উজ্জ্বল নই। জনপ্রিয়তা, মেয়েদের ও শিক্ষকদের প্রিয় কেউ, আমার মতো দুর্ভাগা কারো ঈর্ষার কারণ হতে পারে বৈকি। মনে মনে আমি তাকে ঘৃণা করতাম। সব বিষয়ে ওর নির্লিপ্ততাকে মনে হতো অহংকার, সবাইকে এড়িয়ে চলা তীব্র অবজ্ঞা। তারপর একদিন, আমি বুঝতে পারলাম ও কতটা নিঃসঙ্গ।

কীভাবে খেয়াল করলাম জানি না। হয়তো চোখ? হয়তো বা… একবার স্কুলের সমাবেশে আমি পেছনে তাকিয়ে দেখি, খুব মন দিয়ে সে চারপাশের সবকিছু দেখছে। পাকড়াও করলাম। কিছুক্ষণ আমার দিকে বেবাক তাকিয়ে, চোখ নামিয়ে নিল সে। তারপর অন্য আরেকদিন, স্কুল যাওয়ার পথে, কবরখানার কাছে গিয়ে দেখি, মাঙ্গারা সেখানে বসে আছে— একলা, গভীর চিন্তায় মগ্ন। সেদিনও আমি তাকে কিছু বলিনি। আমাদের চেনাজানা হবার তখনো যে অনেক বাকি।

স্কুলের পাশে ছিল ঘন নিবিড় জঙ্গল। ভুলেও কেউ ওখানে যেত না। গুজব ছিল, জায়গাটা ভুতুড়ে। শোনা যায়, স্বামীর অত্যাচার থেকে বাঁচতে এক মহিলা পালিয়ে গিয়ে ওই ঝোপের মধ্যে ঢুকেছিল। পরে তার ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। মাঝেমাঝেই সেই অতৃপ্ত আত্মার আনাগোনা চলে সেখানে। আমাকে কী সেদিন ওই প্রেতাত্মাই ওখানে টেনে নিয়ে গেছিল ? হয়তো বা। যাইহোক, দুপুরের খাবারের বিরতিতে যখন সবাই বাড়ি গেছে, আমি ঘন গাছের ভেতর দিয়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম জঙ্গলের মাঝখানে বড়ো খোলা জায়গাটায়। সেখানে, একা বসেছিল মাঙ্গারা। প্রথমে আমার অনধিকার প্রবেশে সে বিস্মিত হলো, তারপর বিরক্ত হলো। কটমট করে চাইল আমার দিকে। আমিও স্থির চোখে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। কতক্ষণ এভাবে কেটে গেল জানি না। একসময় তাকে জিজ্ঞেস করলাম,

‘তুমি এখানে কী করছ?’

উত্তর দিল না। আমার দিকে তাকাল, সামান্য ভ্রু কুঁচকাল, যেন প্রশ্নটা মাপছে। আমি অধৈর্য হয়ে আবার প্রশ্নটা করব কি না ভাবছি, তখনই সে মুখ খুলল—

‘কালো পাখিটাকে খুঁজছি।’

‘কালো পাখি?’

‘হ্যাঁ,’ ফিসফিসিয়ে বলল সে। লক্ষ্য করলাম, ও তখনো আমার পেছনে কিছু একটার দিকে ঠায় তাকিয়ে আছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, কই কিছুই তো নেই! ক্রমশ অপার নিঃস্তব্ধতায় ঘোর লেগে গেল আমার। মাঙ্গারাকে এ জগতের বাসিন্দা বলে মনে হলো না। মনে পড়ল, প্রায় এক মাস আগে কবরখানায় তাকে এরকম মগ্নমৈনাক হয়ে বসে থাকতে দেখেছিলাম।

‘তোমাকে আমি কবর খানায় কাছে দেখেছিলাম।’

‘ওহ! দেখেছ!’

‘হ্যাঁ।’

‘কালো পাখি।’

আমি হেসে ফেললাম। সেও হাসল। তারপর আবার গম্ভীর হয়ে গেল। আমি ভেবেছিলাম, এটা হয়তো ওর উদ্ভট খামখেয়াল, আকাশকুসুম কল্পনা। জিজ্ঞেস করলাম

‘পেয়েছ?’

‘না!’

সেদিন আর কথা এগোয়নি। কিন্তু ওইদিনের পর থেকে ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে কেমন করে জানি বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। সময় এগোল হু হু করে। স্কুল জীবন শেষ হলো। এর মধ্যে সে আর কখনো কালো পাখির কথা বলেনি। মেধাবি মাত্র, পড়াশোনায় তেমন মনযোগ না দিলেও পরীক্ষায় ভালো ফল করল, ভর্তি হলো কলেজে। আমাদের পথ আলাদা হলো, আমি লিমুরুতে টি. অ্যান্ড এইচ. ট্রেডিং কোম্পানিতে চাকরি পেলাম। শুনেছিলাম, মেডিক্যাল কলেজে গিয়েও দারুণ ফল করেছে সে। সবাই, এমনকি প্রফেসররাও ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সবার আশা, ও নিশ্চয় জীবনে বড়ো কিছু করবেই।

একদিন নাইরোবির কফি হাউসে বসে আছি। এক সহপাঠী হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘মাঙ্গারার সমস্যাটা কী?’

‘কেন বলো তো?’ অবাক হয়ে তাকাই।

‘ও সবসময় যেন কোনো কিছুর মধ্যে ডুবে থাকে। ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত… নিজের মধ্যে এভাবে গুটিয়ে থাকতে আমি কাউকে দেখিনি। আর চারপাশের দিকে যেভাবে তাকায়… মনে হয় যেন…’

জানতাম, কলেজে পড়ার সময়ই গিকোরোরো গ্রামের স্কুলশিক্ষক, ওয়ামাইথার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে মাঙ্গারার। মেয়েটিকে সে ভালোবাসে। আমার সঙ্গে দেখা হলেই, তার কথা বলত। ও যে ওয়ামাইথাকে বিয়ে করতে চায়, তা ওর সলজ্জ চোখ দেখেই বোঝা যেত। ওই বছরগুলোয় মাঙ্গারার একাকিত্বের রোগ জাদুবলে উধাও হয়ে গেল। তাকে দেখে মনে হতো এতদিনে সুখ ছুঁয়েছে তার ইস্পাত শরীর। মেয়েটির সঙ্গে মিলনের আশায় ওর চোখে ফুটে উঠত শিশুর মতো উচ্ছ্বাস আর করুণ নরম আভা। ওদেরকে দু-একবার একসঙ্গে দেখেছি। ওয়ামাইথা লম্বা, ছিপছিপে, চকচকে কালো চুল, সবসময় পরিপাটি। ধর্মপ্রাণ মহিলাদের মতো আচার-আচরণ। হাঁটাচলা পর্যন্ত পবিত্রতায় ভরা। তার সৌন্দর্য যে আসলে বাহ্যিক নয়, ভেতর থেকে আলো বেরিয়ে এসে তাকে আরো উজ্জ্বল করে দেয়, তা আমার চোখ এড়াতো না।

উপজাতীয় দেবতাদের অন্ধকারের রাজপুত্র’ নামে ডাকা শুরু হলো। দাদু মনে করতেনতিনি খ্রিস্টের সৈনিকহারিয়ে যাওয়া জাতিকে রক্ষা করবেন। তাই ফেলে আসা ধর্মের পবিত্র স্থান নোংরা করতেনদেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা মাংস নর্দমায় ফেলে দিতেন। বলতেন, এটাই শয়তানের সঙ্গে শেষ যুদ্ধ!’ 

কলেজ শেষের দিকে। ছুটি চলছে। হঠাৎ মাঙ্গারা এসে হাজির। চোখে আবার সেই পুরনো ভুতুড়ে দৃষ্টি। মুখে অব্যক্ত ক্লান্তি আর বয়সের ছাপ। সুখের স্বপ্নিল রং উধাও। অজানা, ভয়াল কোনো কালো ছায়া যেন গ্রাস করেছে তার সমস্ত সত্তা। শরীর ছাপিয়ে বেড়িয়ে আসতে চাইছে সেই লোমশ-পাশবিক জন্তু। তখন সেসব পাত্তা দিইনি। ভেবেছিলাম, হয়তো ওয়ামাইথার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, তাই এ করুণ অবস্থা। তবে মুখে কিছু বললাম না, সেও নিশ্চুপ হয়ে রইল।

বাড়িতে আমার সবচেয়ে পছন্দ ছোট্ট ঘরটা। আমাদের খাওয়া-দাওয়া, বই পড়া, আড্ডা দেওয়ার যায়গা। এক সন্ধ্যায়, খাওয়ার পর টেবিল ঘিরে বসেছিলাম। একটানা বাতাসের শব্দ। লণ্ঠনটা পাগলপারা কাঁপছে। আমরা দু-জনেই চুপচাপ। আমার হাতে একটা বই, নাম মনে নেই, পড়ায় মনও ছিল না। মাঙ্গারা আরো গুটিয়ে, জুবুথুবু হয়ে বসেছে। আমার মনে হলো, কোনোকিছুতে প্রবল ভয় পাচ্ছে সে, তীব্র ঘৃণা কুণ্ডলী পাকিয়ে শ্বাস ফেলছে তার বুকের ভিতর।

হঠাৎ, সে বলে উঠল, ‘তুমি কালো পাখির কথা কখনো শোনোনি না? ’

চমকে উঠলাম। স্কুলদিনের কথা মনে পড়ে গেল। ‘ভুতুড়ে’ জঙ্গলে আমাদের দেখা হওয়ার ঘটনা। মনে হলো, অশুভ কিছু যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল সারা গায়ে, আঁচড়ে আঁচড়ে কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে আমার সত্তা, জীবনশক্তিকে। নিজেকে কোনোরকমে সামলে নিয়ে প্রশ্ন করলাম,

‘যে পাখিটাকে তুমি স্কুলে পড়বার সময় খুঁজতে?’

‘হ্যাঁ।’

‘ধুর ! সেটা সিরিয়াস কিছু নাকি ?’ গুমোট ভাবটা কাটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করি।

‘জীবনে এর চেয়ে বেশি সিরিয়াস আর কখনো হইনি।’ থমথমে গলায় বলে উঠল মাঙ্গারা ।

হেসে উঠতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ওর কণ্ঠে এমন একটা কিছু ছিল, আমি কথা বলতে পারলাম না।

‘সারা জীবন আমি তাড়া খেয়ে বেড়াচ্ছি।’ একটুক্ষণ চুপ থেকে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাতরকণ্ঠে আবার সে বলল, ‘তুমি কুসংস্কারাচ্ছন্ন নও আমি জানি। আমিও নই। তুমি হয়তো ভাববে, একজন ডাক্তারি ছাত্র কীভাবে এসব বিশ্বাস করে! বিশ্বাস করো, এটা কুসংস্কার নয়। এটা হলো…’ আচমকা থেমে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি কখনো তোমার অতীত নিয়ে ভাবো?’

‘হ্যাঁ, কখনো কখনো পুরনো দিনের কথা ভাবি… তবে তেমন একটা নয়।’

‘তুমি কি বিশ্বাস করো, তোমার অতীতের কালো অন্ধকার, ছাইচাপা পাপ তোমাকে তাড়া করতে পারে, প্রতিশোধ নিতে পারে, মেরে ফেলতে পারে ?’

আমার গলা শুকিয়ে আসছিল, কালো নেকড়ের মতো ভয়টা আবার লাফ দেবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ধীরে ধীরে বললাম,

‘মানে?’

‘ধরো তোমার পূর্বপুরুষকে যদি কেউ অভিশাপ দেয়, আর সে অভিশাপ যদি তোমার ওপর বজ্রকুঠারের মতো নেমে আসে?’

‘পাপের ফল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভোগ করে… তাই বলতে চাইছ তো?’

‘ঠিক তাই।’

‘না ভাই! এটা অসম্ভব!’

মাঙ্গারা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, ‘তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। ওয়ামাইথাও হয়তো বুঝবে না।’

ওর কথায় সেদিন এমন কিছু ছিল, এমন করুণা আর ঘৃণার মিশ্রণ, ওরকম আমি সারাজীবনে, কোনোদিন কারো কাছ থেকে, কোথাও শুনিনি।

আমার হতভম্ব ভাবটা বুঝে, মৃদু হেসে মাঙ্গারা শোনাতে বসল তার গল্প,

‘আমি তখন খুব ছোটো। রবিবারের সন্ধ্যা। দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফিরছিলাম। । চাঁদের শুভ্র আলো চোখে ধাঁধাঁ লাগিয়ে দিচ্ছে, মায়া বুনছে তেপান্তরে। আলোয় ধোয়া পথ, এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে, খানিক দেরি হয়ে গেল। বাড়ি পৌঁছে দেখি, মা চুপচাপ বসে আছেন, আমার দুই ভাই চুলোর পাশে খেলছে। বাবা ঘরে নেই। মনটা কু ডেকে উঠল। এমনটা তো হবার কথা নয়। বাবা এত রাতে তো কখনো বাইরে থাকেন না ! এমনকি চার্চে গেলেও, আঁধার নামার আগেই ফিরে আসেন তিনি। সময় যত গড়াতে লাগল, পাল্লা দিয়ে আমাদের চিন্তাও বাড়তে লাগল। প্রবল দুশ্চিন্তার মধ্যে সবে রাতের খাবার শেষ করে উঠেছি, হঠাৎ দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা। এক মুহূর্তে দরজায় দেখলাম কালো, ভূতুড়ে অবয়ব। বাবা। তার চুল এলোমেলো, চোখ লাল। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন, যেন সবকিছু খুঁটিয়ে দেখে নিচ্ছেন। তারপর ধপাস করে ধুলোমাটিতে লুটিয়ে পড়ল। আমরা চিৎকার করে উঠলাম। আমার মনে হয়েছিল, বাবা মারা গেছেন।

না, তিনি বেঁচে ছিলেন। মা তাঁর অচেতন শরীরটায় ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিতে লাগলেন। ধীরে ধীরে চোখ খুলল। ফ্যাকাসে সাদা চোখ। ফ্যালফ্যাল করে বহুক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। মৃদু মৃদু কেঁপে উঠছে পুরুষ্টু ঠোঁট। আর থেকে থেকেই, অজানা ভয়াল আশঙ্কায়, তীব্র-তীক্ষ্ণ ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছিল শরীরটা। ফিসফিস করে কিছু একটা বললেন। শুধু ‘কালো পাখি’ শব্দটাই আমি শুনতে পেয়েছিলাম। তারপর বাবা ঘুমিয়ে পড়লেন।

জীবনে সেই প্রথম আমি কালো পাখির কথা শুনেছিলাম।

মাসখানেকের মধ্যে মারা গেলেন বাবা। ধর্মপ্রাণ, সৎ মানুষটার মৃত্যুতে প্রচুর আলোচনা হলো, শোক ছড়াল গ্রামের বাতাসে। এরপর নিউমোনিয়ায় মারা গেল আমার ছোটো দুই ভাই। বাকি রইলাম আমি আর মা। সেখানে আর থাকা হলো না, গ্রামের সবকিছু বিক্রি করে কিয়াম্বু ছেড়ে গাথিগি-ইনিতে চলে এলাম আমরা। একদিন আমার জোড়াজুড়িতে মা অবিশ্বাস্য ঘটনাটা বলল— ‘কালো পাখির গল্প।’

একটানা কথা বলে হাঁপিয়ে গেছিল মাঙ্গারা। জল খেয়ে খানিক ধাতস্থ হয়ে আবার শুরু করল—

‘আমাদের আদি বাড়ি ছিল মুরাঙ্গা। প্রচুর জমিজমা ছিল। দাদু সেইসব লোকদের মধ্যে অন্যতম, যারা শ্বেতাঙ্গ মিশনারিদের আমদানি করা খ্রিস্টধর্ম প্রথম দিকেই গ্রহণ করেছিলেন। নব্য খ্রিস্টানরা মনে করত, তাদের পূর্ব জাতিসত্তার সব কিছুই মন্দ, সব আচার-পদ্ধতি পাপ, সমস্ত বিশ্বাস কুসংস্কার, শয়তানের কাজ। উপজাতীয় দেবতাদের ‘অন্ধকারের রাজপুত্র’ নামে ডাকা শুরু হলো। দাদু মনে করতেন, তিনি খ্রিস্টের সৈনিক, হারিয়ে যাওয়া জাতিকে রক্ষা করবেন। তাই ফেলে আসা ধর্মের পবিত্র স্থান নোংরা করতেন, দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা মাংস নর্দমায় ফেলে দিতেন। বলতেন, ‘এটাই শয়তানের সঙ্গে শেষ যুদ্ধ!’

নরকের আগুনের মতো গনগনে লাল চোখ বর্ণনা করা যায় নাএমন অমানবিক ক্রোধঘৃণালালসা সে দৃষ্টিতে। কিচ্ছু করতে পারিনি আমি, প্রতিশোধের কথা মনেও আসেনি ভয়াবহ আতঙ্কেমন্ত্রমুগদ্ধের মতো শুধু চেয়ে রইলাম সে দিকে। কয়েক মুহূর্ত পরে চোখদুটো অদৃশ্য হয়ে গেল।

সে সময় আমদের গ্রামে একমাত্র বটবৃদ্ধ লোক ছিলেন মুন্ডু মুগো। সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করত। রোগির চিকিৎসা, ভবিষ্যৎ দেখা, কালো-সাদার সাবধানবাণী দেওয়া ছিল তাঁর মূল কাজ। একদিন আমার দাদু, ওঁর সব জিনিসপত্রে আগুন ধরিয়ে দিলেন, জোর করে তাকে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করলেন। এমন কিছু যে ঘটতে পারে, বৃদ্ধ প্রথমে সে কথা যেন বিশ্বাসই করে উঠতে পারিনি। যখন হতবাক ভাব কাটল, বজ্রকঠিন আওয়াজে সে বলল— ‘এর শাস্তি তুমি পাবে।’ দাদু সে হুঁশিয়ারি ধর্তব্যেই আনলেন না। ওই ঘটনার পর আর মুন্ডু মুগোকে গ্রামে দেখা যায় নি। প্রাচীন বৃদ্ধ প্রাচীনেই হারিয়ে গেলেন।

কয়েক বছর পর সে আবার ফিরে এলো, মানুষ নয়, কালো পাখি হয়ে। দাদু মারা গেলেন, তার স্ত্রী ও সন্তানরা মারা গেল, শুধু আমার বাবা ছাড়া। সবাই মৃত্যুর আগে বলেছিল, তারা কালো পাখিকে দেখেছে। বাবা মুরাঙ্গা ছেড়ে কিয়াম্বুতে এলেন। কিন্তু সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত তাঁর পিছু ছাড়েনি। মা-ও পাখিটাকে দেখেছিল, সেও মারা গেল। শোকে আছন্ন আমার মনে হয়েছিল, যারা কোনো পাপ করেনি, তাঁরা মরবে কেন ? আমি শপথ নিলাম, পাখিটাকে খুঁজে বের করব, প্রতিশোধ নেব। এরপর তন্ন তন্ন করে কত খুঁজেছি তাকে, কিন্তু পাইনি। স্কুলজীবনে, কলেজজীবনে, সবসময়েই ওকে খুঁজেছি, আজও খুঁজে চলেছি। আবার নীরবতা চেপে বসল ছোট্ট ঘরটায়।

চারদিকে তাকিয়ে কী যেন হাতড়ে, শেষে না পেয়ে, ক্লান্ত-বিষণ্ন গলায় মাঙ্গারা বলল, ‘ওয়ামাইথার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সব ভুলে গিয়েছিলাম। পড়াশোনায় মন দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, সফল হলে জীবনে শান্তি আসবে। বিয়ে করব। কিন্তু গত সপ্তাহে যা হলো…’

কী হলো?

‘ওয়ামাইথা আর আমি পাহাড়ের কিনারে বসে ছিলাম। কী একটা করতে ওয়ামাইথা কিছুক্ষণের জন্য দূরে গেছে, আমি ঘাসের উপর শুয়ে ছিলাম, হঠাৎ দেখি, পাখিটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। নরকের আগুনের মতো গনগনে লাল চোখ। বর্ণনা করা যায় না, এমন অমানবিক ক্রোধ, ঘৃণা, লালসা সে দৃষ্টিতে। কিচ্ছু করতে পারিনি আমি, প্রতিশোধের কথা মনেও আসেনি। ভয়াবহ আতঙ্কে, মন্ত্রমুগদ্ধের মতো শুধু চেয়ে রইলাম সে দিকে। কয়েক মুহূর্ত পরে চোখদুটো অদৃশ্য হয়ে গেল।’

বাতাসটা কিশোরী মেয়ের অভিমানের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছে। লণ্ঠন নীভু নীভু। জানালা-দরজা বন্ধ করে দিলাম। জিজ্ঞেস করলাম ‘ওয়ামাইথাকে বলেছ?’

‘না। ও বিশ্বাস করবে না। আমার দাদুকে পবিত্র গাছের তলায় ক্ষমা চাইতে যাওয়া উচিত ছিল। মা মৃত্যুর আগে তাই বলেছিল।’

এরপরও কয়েকদিন মাঙ্গারা আমাদের বাড়িতে ছিল। প্রতিদিন মনে হতো, সে আরো অস্থির আরো পাগলপারা হয়ে উঠছে। তাকে কোনোকিছু বুঝিয়ে লাভ হতো না। একদিন কলেজে ফিরে গেল। খানিক স্বস্তি যে হলো না, তা নয়। তবে মনের গহীন কোণের, রহস্যময় এক অঞ্চলে বিপদের মেঘ যে ঘনিয়ে আসছে তার সংকেত পেতাম। কয়েকদিন পর খবর এল, মাঙ্গারা পরীক্ষায় ফেল করেছে। কলেজ থেকে অন্য কোথাও চলে গেছে। আরও সপ্তাহখানেক পরে খবরটা এল, মুরাঙ্গা গ্রামের পবিত্র গাছের নিচে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে মাঙ্গারাকে। তাঁর বিস্ফারিত, মৃত, স্থির দুটো চোখ ছুড়ে দিচ্ছে ভয়, ঘৃণা আর করুণা।

♦•–•♦♦•–•♦–•♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!