Advertisement
  • বি। দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬

ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেই রাশিয়ার প্রথম ডুমা নির্বাচন, ফলাফলে পুতিনেরই জয়জয়কার, পিছিয়ে বিরোধীরা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেই রাশিয়ার প্রথম ডুমা নির্বাচন, ফলাফলে পুতিনেরই জয়জয়কার, পিছিয়ে বিরোধীরা

ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরুর পর প্রথম বার সংসদীয় নির্বাচন হলো রাশিয়ায়। আর সে নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে ফের স্পষ্ট হলো রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের রাজনৈতিক প্রভাব। প্রাথমিক গণনা পর্যন্ত ভোটের সিংহভাগেই এগিয়ে রয়েছে পুতিন-সমর্থিত ইউনাইটেড রাশিয়া। রুশ সংবাদমাধ্যম ‘তাস’ এবং রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৭১.১৭ শতাংশ ব্যালট গণনা হওয়ার পর ইউনাইটেড রাশিয়ার ঝুলিতে রয়েছে ৫৭.৫৩ শতাংশ ভোট। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি অব দ্য রাশিয়ান ফেডারেশন — প্রাপ্ত ভোট প্রায় ১৪ শতাংশ। লিবারাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব রাশিয়ার ভোট ৮.৭৩ শতাংশের কাছাকাছি।

১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর, তিন দিন ধরে রাশিয়ায় ভোটগ্রহণ হয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরুর পর এটাই ছিল রাশিয়ার প্রথম স্টেট ডুমা নির্বাচন। ফলে এই ভোটের ফলাফলের দিকে শুধু রাশিয়াই নয়, আন্তর্জাতিক মহলেরও নজর ছিল। ৪৫০ আসনের রুশ আইনসভার নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমায় এ বারও ইউনাইটেড রাশিয়ার আধিপত্য বজায় থাকারই ইঙ্গিত মিলছে। রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, এ বার ভোট পড়েছে ৫৬.৬৬ শতাংশ। প্রায় ১১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ ভোট দিয়েছেন। রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত ব্যালটের পাশাপাশি একাধিক অঞ্চলে ইলেকট্রনিক ভোট দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল। মস্কো-সহ কয়েকটি এলাকায় সেই অনলাইন ভোটিং ব্যবস্থাকে ঘিরে সাইবার হামলার অভিযোগও উঠেছে। রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলা সত্ত্বেও ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্য ভাবে ব্যাহত হয়নি।

রাশিয়ার নির্বাচনী ব্যবস্থায় ৪৫০টি ডুমা আসনের অর্ধেক অর্থাৎ ২২৫টি আসন দলীয় তালিকার ভিত্তিতে বণ্টিত হয়। বাকি ২২৫টি আসনে একক প্রার্থী সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। প্রাথমিক ফলাফলে দুই ধরনের আসনেই ইউনাইটেড রাশিয়ার প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। ২০২১ সালের নির্বাচনে ইউনাইটেড রাশিয়া ৪৫০টির মধ্যে ৩২৪টি আসন পেয়েছিল। এ বারের প্রাথমিক প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ডুমায় দলটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ বারের নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল — প্রকৃতপক্ষে কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ছিল এই ভোট? নির্বাচনের আগে যুদ্ধবিরোধী একাধিক প্রার্থী নির্বাচনী ময়দান থেকে ছিটকে যান। বিশেষ করে উদারপন্থী ইয়াবলোকো দলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

আগস্টে রাশিয়ার সুপ্রিম কোর্ট দলটির জাতীয় পার্টি-লিস্ট বাতিল করে দেয়। ইয়াবলোকো অবশ্য অভিযোগিত অনিয়মের ব্যাখ্যা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। দলের কিছু প্রার্থী একক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পেলেও জাতীয় স্তরে দলটির লড়াই সীমিত হয়ে যায়। যুদ্ধের সমালোচনা করে প্রকাশ্যে সরব হওয়া একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও ভোটে অংশ নিতে পারেননি। তাঁদের কেউ জেলে, কেউ দেশছাড়া। যুদ্ধ নিয়ে রুশ সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করলে দীর্ঘ কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে — যা বিরোধী রাজনৈতিক পরিসরকে আরও সংকুচিত করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে কমিউনিস্ট পার্টি, এলডিপিআর, নিউ পিপল এবং এ জাস্ট রাশিয়ার মতো দলগুলি নির্বাচনে লড়েছে। তবে রাশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এই দলগুলির অধিকাংশই ক্রেমলিনের গুরুত্বপূর্ণ নীতির সঙ্গে বহু ক্ষেত্রে একমত হয়েছে। ফলে ভোটের ফলাফলে বিরোধীদের উপস্থিতি থাকলেও, পুতিন-বিরোধী রাজনৈতিক বিকল্পের পরিসর কতটা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে, নির্বাচনের শেষ দিন, রবিবার, ইউক্রেনের তরফে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বড়সড় ড্রোন হামলার খবর আসে। মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিনের দাবি, মস্কো অভিমুখী ৪৫০টি-সহ ১,৬০০-র বেশি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। মস্কো অঞ্চলে হামলায় তিন জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। একটি তেল শোধনাগর এবং আবাসিক ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রুশ প্রশাসনের অভিযোগ, নির্বাচনী প্রক্রিয়া বানচাল করতেই এই হামলা চালানো হয়েছিল। ইউক্রেনের পক্ষ থেকে অবশ্য রাশিয়ার এই দাবির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলেনি। একই সময়ে রাশিয়ার ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থা এবং যোগাযোগ পরিকাঠামোয় সাইবার হামলার খবরও সামনে আসে। রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেগুলিও প্রতিহত করা হয়েছে।  ফলে এক দিকে ভোটকেন্দ্রে ব্যালট, অন্য দিকে আকাশে ড্রোন — যুদ্ধের আবহেই শেষ হল রাশিয়ার এই সংসদীয় নির্বাচন।

নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিতর্কের আরও একটি কারণ হল ইউক্রেনের যে অঞ্চলগুলি রাশিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে বলে দাবি করে, সেখানেও ভোটগ্রহণ। দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, জ়াপোরিঝিয়া ও খেরসনের রুশ-নিয়ন্ত্রিত অংশে ভোট নেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সালে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা ক্রিমিয়াতেও ভোটগ্রহণ হয়েছে। ইউক্রেন এই ভোটকে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও ইউক্রেনের অধিকৃত এলাকায় রাশিয়ার ভোট আয়োজনকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। নির্বাচনের আগে পুতিন নিজেই এই ভোটকে তাঁর দেশের ঐক্য এবং যুদ্ধের প্রতি সমর্থনের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। ভোটের আগে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, রুশ নাগরিকদের ভোট তাঁদের দেশের সেনাদের পাশে থাকার বার্তা দেবে।

প্রাথমিক ফলাফল সেই রাজনৈতিক বার্তাকে ব্যবহার করার সুযোগ পুতিন সরকারকে দিতে পারে। তবে নির্বাচনের ফলকে সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধের পক্ষে গোটা রুশ জনগোষ্ঠীর জনমত হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ, যুদ্ধবিরোধী বহু প্রার্থী ভোটে দাঁড়ানোর সুযোগ পাননি এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রটিও সীমিত ছিল। অর্থাৎ, সংখ্যার বিচারে ইউনাইটেড রাশিয়া ফের বড়ো ব্যবধানে এগিয়ে। কিন্তু এই ফল একই সঙ্গে রাশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো, বিরোধীদের সীমিত পরিসর এবং যুদ্ধকালীন নির্বাচনের চরিত্র নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সব মিলিয়ে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম ডুমা নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে আপাতত একটাই ছবি স্পষ্ট—রাশিয়ার সংসদে পুতিন-সমর্থিত ইউনাইটেড রাশিয়ার দাপট অটুট থাকার ইঙ্গিত মিলছে। চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর সেই ব্যবধান কতটা দাঁড়ায়, এখন নজর সে দিকেই।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!