- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৫
‘ভাষা আন্দোলনের শহীদদের অবমাননা’, বাংলাদেশের বইমেলায় হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ড. ইউনূসের
সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশের অমর একুশে বইমেলায় তাণ্ডব চলে। একটি প্রকাশনা সংস্থার স্টলে হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত। অন্তর্বর্তী সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পুলিশ ও বাংলা অ্যাকাডেমিকে এই ঘটনার তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। মেলায় নিরাপত্তা আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পুলিশকে।
বাহান্নোর ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রতিবছর বাংলাদেশে আয়োজিত হয় ‘অমর একুশে বইমেলা’। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এ বছর বইমেলা কবে কি না, সে নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট দিনেই পুস্তকমেলা শুরু হয়েছে। কিন্তু নয়া বাংলাদেশে বিতর্ক কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। এবার বইমেলার একটি স্টলে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে মুখ খুলেছে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। সেই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই হামলা বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিকারকে খর্ব করে। এবং এটা দেশের আইনের প্রতি অবজ্ঞার পরিচয় দেয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার সমর্থনে জীবন উৎসর্গকারী ভাষা শহিদদের স্মরণ করে এই অনুষ্ঠান। সেখানে এই ধরনের হামলা বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক উন্মুক্ত মনের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। সরকারি বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, পুলিশ ও বাংলা অ্যাকাডেমিকে এই ঘটনার তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। মেলায় নিরাপত্তা আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পুলিশকে। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যেন কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশে যে কোনও ধরনের গণ সহিংসতার ঘটনা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলিকে।
সোমবার তসলিমা নাসরিনের লেখা বই স্টলে রাখা নিয়ে রীতিমতো অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাঁর বইটির প্রকাশক ‘সব্যসাচী’র স্টলে ভাঙচুর চালায় একদল জনতা। সেই স্টলে রাখা হয়েছিল তসলিমা নাসরিনে বিতর্কিত বই ‘চুম্বন’। অভিযোগ, সেখানেই হামলা চালিয়ে ফতোয়া জারি হয়, ওই বইগুলি সরাতে হবে। স্টলে কর্তব্যরত কর্মী তাতে রাজি না হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। চলে স্লোগান, পাল্টা স্লোগান। শেষে পুলিস গিয়ে বন্ধ করিয়ে দেয় ওই বইমেলার প্রকাশনা সংস্থার স্টল। ভাঙচুরের ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয় বিতর্ক। সেই ভিডিও নিজের এক্স হ্যান্ডলে শেয়ার করে ইউনূস সরকারের তীব্র নিন্দা করেছেন খোদ তসলিমা। কেন তাঁর বই এখনো নিষিদ্ধ সে নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি লেখেন, ‘বাংলাদেশের বইমেলায় প্রকাশক সব্যসাচীর স্টলে জিহাদি ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা আক্রমণ করেছে। সরকার এই উগ্রপন্থীদের সমর্থন করছে এবং জিহাদি কার্যকলাপ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।’
বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম ‘প্রথম আলো’র প্রতিবেদনে লেখা হয়েছ, বইমেলার ওই স্টলে বিভিন্ন বইয়ের মাধ্যমে নাস্তিকতা প্রচার করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয় একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে । এরপর উগ্রবাদীরা স্টলটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানায় । তারই প্রতিক্রিয়ায় বিরাট সংখ্যর লোকজন জড়ো হয়ে যান মেলা প্রাঙ্গনে ওই স্টলের সামনে। প্রথমে স্টলের সামনে স্লোগান তোলা, তারপর প্রকাশককে রীতিমতো হেনস্তা করা হয়।
এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে। অমর একুশে বইমেলার ঘটনার নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি জানিয়েছেন, ‘এ ধরনের বিশৃঙ্খল আচরণ বাংলাদেশে নাগরিকের অধিকার এবং দেশের আইন উভয়ের প্রতিই অবজ্ঞা প্রদর্শন করে। ‘ ইউনূস লেখেন,’একুশে বইমেলা এদেশের লেখক ও পাঠকদের প্রাণের মেলা। এদেশের সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, চিন্তক, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সকল শ্রেণি-পেশা-বয়সের মানুষের মিলনস্থল। বইমেলায় এই ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা বাংলাদেশের উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক চর্চাকে ক্ষুন্ন করে, ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের মর্যাদার প্রতি অবমাননা প্রদর্শন করে। অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ এবং বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষকে ঘটনাটি তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছে। মেলায় নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং এই তাৎপর্যপূর্ণ স্থানে যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে দেশে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।’
বাংলাদেশে এই ঘটনা এই প্রথম নয়। লেখক, শিল্পী, কবিদের উপর হামলা হয়েছে বারবার। নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়েছে উদারচেতা ব্যক্তিদের। আওয়ামি লীগের সরকারের আমালেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে একের পর এক বইপত্র। হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই ধারা অব্যাহত। ১৮ বছর আগে ২০০৪ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা হয়। তাঁকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। বিদেশে উন্নত চিকিৎসা শেষে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর একই বছরের ১২ আগস্ট জার্মানিতে মারা যান হুমায়ুন আজাদ। সে বছরই আজাদের উপন্যাস ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ প্রকাশিত হয়েছিল। ২০১৫ সালে এই একুশের বই মেলা থেকে বের হওয়ার সময় ‘মুক্তমনা ব্লগ’-এর প্রতিষ্ঠাতা, লেখক ও প্রকৌশলী অভিজিৎ রায়কে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। সে সময় অভিজিতের সাথে তাঁর স্ত্রীও ছিলেন। ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন তিনি। অভিজিৎ হত্যার পর আনসারউল্লাহ বাংলা টিম নাকে একটি চরমপন্থি জঙ্গিসংগঠন হত্যার দায় নেয়। তবে ব্লগার হত্যা শুরু আহম্মদ রাজিব হায়দার শোভনকে দিয়ে। ২০১৩ সালের ১৫ ফ্রেব্রুয়ারিতে তাকে মীরপুরের পলাশ নগরে তার বাসার একটু দূরে দুর্বৃত্তরা তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করে। জাগৃতি প্রকাশনীর সত্ত্বাধিকারী দীপনকে ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর কুপিয়ে হত্যা করেন একটি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা। ৪৩ বছর বয়সী দীপন তখন রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের ভেতরে প্রকাশনীর কার্যালয়ে ছিলেন। ওয়াশিকুর রহমান, অনন্তবিজয় দাস, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় সহ একাধিক ব্লগারকে খুন হতে হয়েছে। প্রতিটি হত্যাই মহানগরের বুকে, কোনও আগাম নিরাপত্তায় যা আটকানো অসম্ভব।
বাংলাদেশে কট্টরপন্থী জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে পুলিশ-প্রশাসন যথেষ্ট সক্রিয় নয় বলে আগেও অভিযোগ উঠেছিল বিভিন্ন মহলে। এই মুহূর্তে কত ব্লগার ঘরছাড়া, দেশছাড়া, তার ইয়ত্তা নেই। ভাঙচুর আর আগুনে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ। রাজনৈতিক ডামাডোলের আবহে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে উগ্র মৌলিবাদ। ভেঙে ফেলা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বাসভবন, স্থাপত্য, ভাস্কর্য। ড.ইউনূসের সামনে এই উগ্রতাই সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ এখন, যুদ্ধের ভূমিটিও স্পষ্ট চিহ্নিত। মৌলবাদ বনাম মুক্তচিন্তা অর্থাৎ মু্ক্তিবাদ। কার পক্ষ নেবেন তিনি!
❤ Support Us







