Advertisement
  • এই মুহূর্তে স | হ | জ | পা | ঠ
  • নভেম্বর ২১, ২০২৫

ইচ্ছাকৃতভাবে ভূমিকম্প ঘটাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা ! কেন এমন দুঃসাহসী পরীক্ষা ?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ইচ্ছাকৃতভাবে ভূমিকম্প ঘটাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা ! কেন এমন দুঃসাহসী পরীক্ষা ?

শুক্রবার সকালেই প্রবল ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিস্তৃত অঞ্চল। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭ জন। জখম হয়েছেন ৫০-এর বেশি মানুষ। বাড়িঘর ভেঙে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহু জায়গায়। এমন বিপর্যয় ঘটলেই আমাদের হুঁশ ফেরে প্রকৃতির কাছে আমরা কত অসহায়, তা সত্ত্বেও লাগাতার যুগের পর যুগ ধরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রকৃতির উপর মানুষ অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। সীমাহীন আক্রমণ সহ্য করতে করতে মাঝেমধ্যে গা ঝারা গিয়ে ওঠে আমাদের চারপাশ, রুদ্র সে রূপ দেখে জলে-স্থলে-গগণে ছড়িয়ে পরে আতঙ্ক। কিন্তু যদি মানুষই এমন ভূমিকম্প ঘটায়, বিপর্যয়ের পিছনে থাকে দুঃসাহসীক কোনো রহস্যময় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা?

বিগত কয়েকমাস ধরে আল্পস পর্বতমালার বুকের গহিনে একের পর রক ক্ষুদ্র কম্পন তৈরি হচ্ছে। এ কম্পন কিন্তু প্রকৃতির খেয়াল নয়; বরং বিজ্ঞানীদের পরিকল্পিত উদ্যোগ। মাত্রা শূন্যের অস্পষ্ট কাঁপন, যা মানুষ অনুভব করার ক্ষমতাই রাখে না, সেগুলিকেই তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটাচ্ছেন। কারণ ভূমিকম্পের সবচেয়ে দুর্বোধ্য দিকটি লুকিয়ে থাকে তার জন্মমুহূর্তে। সেই ক্ষণিক সূচনাকে ধরতেই বিজ্ঞানীরা নেমেছেন কৃত্রিম কম্পনের পরীক্ষায়। সুইজ়ারল্যান্ডের ই-টি-এইচ জুরিখের ভূকম্পবিদ এবং ভূ-গতিবিদদের নেতৃত্বে শুরু হয়েছে বিশাল গবেষণা উদ্যোগ, ফাটল সক্রিয়করণ ও ভূকম্পন বিচ্ছেদ প্রকল্প। বছরের পর বছর ধরে ভূমিকম্প নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে, তবু ভূমিকম্প শুরু হওয়ার আগে প্রকৃতি যে ইঙ্গিত দেয়, সে সূক্ষ্ম সংকেত প্রায় ধরা পড়ে না। অধ্যাপক ডোমেনিকো জিয়ারদিনির বলেন, সংকেতগুলি চোখে পড়ে ভূমিকম্প হওয়ার পরে। ওই সংকেতগুলিকে আগে ধরার উপায় খুঁজতেই তাঁরা রওনা দিয়েছেন আল্পসের অন্তঃস্থলের দিকে।

পর্বতের গভীরে থাকা একটি পুরনো সুড়ঙ্গকে পরীক্ষাগার বানানো হয়েছে। বহু বছর আগে রেল নির্মাণের জন্য খনন করা হয়েছিল পথটি। কোটি কোটি বছরের টেকটোনিক স্খলনের ফলে আল্পসের নিচে তৈরি হয়েছে জটিল, বাঁকানো, কুঁচকে যাওয়া ফাটলের জাল। ফাটলগুলির কোনোটিতে শিলার ঘর্ষণ সামান্য কমা-বাড়ার ফলে ছোটো ছোটো কম্পন হয়। এবার বিজ্ঞানীরা ওই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকেই নিয়ন্ত্রণে এনে ফল্ট লাইনে উচ্চচাপে জল প্রবেশ করিয়ে কৃত্রিম কম্পন সৃষ্টি করছেন। জলের চাপে পাথরের ঘর্ষণ কমলে সামান্য স্খলন ঘটে, সেখান থেকেই জন্মএকটি শূন্য মাত্রার ভূমিকম্প। পুরো অঞ্চলে সাজানো হয়েছে অসংখ্য সংবেদনশীল যন্ত্র, কম্পন-লিপিকার, ত্বরণ-নির্ণায়ক ও নড়াচড়া মাপার বিশেষ সরঞ্জাম দিয়ে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কম্পনও এই যন্ত্রগুলির চোখ এড়ায় না। ফাটলের ভেতরের প্রতিটি নাড়চড়া, হঠাৎ চাপবদল বা ঘর্ষণ কমার সব মুহূর্ত ধরে ফেলা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা লক্ষাধিক শূন্য মাত্রার কম্পন ঘটিয়েছেন। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, কম্পনের মাত্রা শূন্য নয়, শূন্যের নিচেও নামতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, আগামী মার্চ মাসে আরো বড়ো পরীক্ষা করবার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। এবার তাঁরা মাত্রা একের কম্পন ঘটাতে চান, যা মানুষের জন্য নিরাপদ হলেও গবেষণার জন্য অনেক বেশি কার্যকর। এর পরবর্তী ধাপ আরও সাহসী, ফাটলে গরম জল প্রবেশ করানো হবে, যাতে বোঝা যায় তাপমাত্রা পরিবর্তন ভূমিকম্পের জন্ম, বিস্তার এবং শক্তির বহির্প্রবাহে কী ধরনের প্রভাব ফেলে। গবেষকেরা মনে করেন, এসব তথ্য ভবিষ্যতে ভূমিকম্প পূর্বাভাস ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। কোন ফাটল কতটা অস্থির, কোন অঞ্চলে বড়ো বিপর্যয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, একটি ক্ষুদ্র স্খলন ঠিক কোন পরিস্থিতিতে ভয়াবহ ভূমিকম্পে রূপ নিতে পারে—সেসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে এমন পরীক্ষার মাধ্যমেই। তাঁদের দাবি, এই ক্ষুদ্র কম্পনগুলি প্রকৃতিতেও ঘটতই, তাঁরা শুধু সেটিকে নিজেদের ইচ্ছামতো সময়ে ডেকে এনে প্রকৃতির অন্দরমহল বুঝে নেওয়ার সুযোগ নিচ্ছেন। ভূমিকম্পের ভয়াবহতা কমাতে হলে তার জন্মের মুহূর্তকে জানা জরুরি—এই বিশ্বাস থেকেই আল্পসের গহ্বরজুড়ে চলছে এই অভূতপূর্ব উদ্যোগ। বিজ্ঞানীদের আশা, একদিন এই গবেষণাই হয়তো রক্ষা করবে ভবিষ্যতের হাজার হাজার প্রাণ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!