- প্রচ্ছদ রচনা স | হ | জ | পা | ঠ
- জুলাই ১৯, ২০২৫
কয়েক কোটি বছর আগেও বয়েছিল বিশালাকায় নদী, অ্যান্টার্কটিকার বরফচাদরের নিচে উন্মোচিত ইতিহাসের সুদূর অধ্যায়। কেমব্রিজে চলছে বিশ্বের প্রাচীনতম বরফ পরীক্ষা
৮ কোটি বছর আগের কথা। পৃথিবীর রূপ তখন অন্যরকম। উত্তর গোলার্ধে ডাইনোসরের দাপট, দক্ষিণে গন্ডোয়ানা নামের এক সুবিশাল মহাদেশে সবুজে মোড়া ভূমি, বয়ে চলেছে নদী, রয়েছে জীবনের অজস্র স্পন্দন। সেই গন্ডোয়ানা আজ আর নেই। ভাগ হয়ে গিয়েছে কয়েকটি মহাদেশে। তার একটি অংশ—অ্যান্টার্কটিকা, আজ বরফে বরফে ঢাকা, জনমানবহীন, অথচ ইতিহাসের পাতা খুললে দেখা যায়, একদিন সেখানে প্রবাহিত হতো বিশালাকার সব নদী।
বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন, পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার বরফচাদরের গভীরে লুকিয়ে রয়েছে সেই প্রাচীন নদীর চিহ্ন। এমনকি নদীর ক্ষয়ে তৈরি হওয়া সমতল ভূমিরূপও এতবছর পরেও টিকে রয়েছে প্রায় অক্ষত অবস্থায়। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানপত্রিকা ‘নেচার জিও-সায়েন্স’-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ওই নদীগুলির অস্তিত্ব ছিল আনুমানিক ৮ কোটি থেকে ৩.৪ কোটি বছর আগে—অর্থাৎ অ্যান্টার্কটিকার বরফজন্মের বহু আগেই। পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার প্রায় ৩,৫০০ কিলোমিটার বিস্তৃত উপকূল বরাবর রাডার চিত্র বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, বরফের নিচে কোথাও বিস্তীর্ণ সমতল প্রান্তর, কোথাও আবার গভীর খাঁজ। এই খাঁজগুলিই জানান দিচ্ছে, একদিন এখানে নদী ছিল, তার প্রবাহ ক্ষয় করেছে মাটি, গড়ে তুলেছে নতুন ভূমিরূপ।
নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিজ্ঞানী নীল রস জানিয়েছেন, ‘এই সমতল ভূমির অস্তিত্ব বহু বছর ধরে আমাদের কৌতূহলের বিষয় ছিল। এতদিন পরে আমরা যখন রাডার-চিত্রে একের পর এক সমতল ভূ-প্রকৃতি দেখতে পেলাম, বুঝতে পারলাম—এগুলি কাকতালীয় নয়, বরং ভূ-তাত্ত্বিক ইতিহাসের স্পষ্ট চিহ্ন।’ গবেষণার সহলেখক ও ডারহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরু ভূগোলবিদ গাই প্যাক্সম্যান জানিয়েছেন, ‘সমতল ভূমিগুলি অন্তত ৩ কোটি বছর ধরে বরফের নিচে থেকেও টিকে রয়েছে, স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে—বরফচাদর সে সময়ের ভূ-প্রকৃতি ধ্বংস করেনি, বরং সংরক্ষণ করেছে।’
যেখানে আজ শুধু বরফ, সেখানে একদিন বইত নদী! এই তথ্য যতটা আশ্চর্যের, ততটাই উদ্বেগের। কারণ, ভূতাত্ত্বিকভাবে এই অঞ্চল বরাবরই স্পর্শকাতর। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, যদি পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার এই বিশাল বরফচাদর সম্পূর্ণরূপে গলে যায়, তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে পারে ১৬০ ফুট পর্যন্ত! এমত অবস্থায় পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার বরফচাদরের নীচে কী ধরনের ভূ-প্রকৃতি রয়েছে, তার বিশদ ধারণা থাকলে বরফ গলনের গতি এবং ভবিষ্যতের পূর্বাভাস আরও নির্ভুল করা সম্ভব। বরফচাদরের নিচে শিলাস্তর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে যদি সেই ভূমির গঠন বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে বোঝা যাবে—বহু বছর আগে জলবায়ু কেমন ছিল, ভূ-প্রকৃতি কীভাবে বদলেছে, আর তা থেকে ভবিষ্যতের পূর্বাভাস কী হতে পারে। গবেষকরা জানিয়েছেন, সমতল অঞ্চলের উপর দিয়ে বরফের গতি অনেক ধীর, কিন্তু খাঁজ বা গিরিখাতে তা দ্রুত প্রবাহিত হয়। এর ফলে বোঝা যাচ্ছে, বরফচাদরের নিচের ভূ-প্রকৃতি সরাসরি প্রভাব ফেলছে বরফের গতিপ্রকৃতিতে। আর বরফের এই গতি—বরফ গলনের অন্যতম পূর্বাভাস।

একদিকে যখন পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার বরফচাদরের নিচে কয়েক কোটি বছর আগের নদীর খোঁজে মগ্ন বিজ্ঞানীরা, ঠিক তখনই আরো এক যুগান্তকারী আবিষ্কারে আলোড়ন পড়েছে বৈজ্ঞানিক মহলে। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে পুরনো বরফের স্তর—প্রায় ১৫ লক্ষ বছরের পুরনো বরফ টুকরো পৌঁছেছে ব্রিটেনের কেমব্রিজ শহরে, ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের গবেষণা কেন্দ্রে। উদ্দেশ্য একটাই—এই বরফ গলিয়ে তুলে আনা হবে সেসব অমূল্য তথ্য, যা জানিয়ে দিতে পারে পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য গতিপথ। জানা গেছে, পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার কনকর্ডিয়া ঘাঁটির কাছে ২.৮ কিলোমিটার গভীর থেকে তোলা হয়েছে ওই বরফ। বরফের কেন্দ্রটি কাঁচের মত স্বচ্ছ, এমনকি হাতে নিলে তার ভেতর দিয়ে দেখা যায় আঙুলের রেখা। কিন্তু এর চেয়েও মূল্যবান বরফের ভেতরে থাকা প্রাচীন ধুলো, আগ্নেয় ছাই, সামুদ্রিক শৈবাল এবং রাসায়নিক মৌলগুলি—যা বহু লক্ষ বছর আগের পৃথিবীর হাওয়া, জলবায়ু, সমুদ্রপৃষ্ঠ আর গ্লেশিয়ার চক্রের ইতিহাস বলে দেবে। গবেষক ও বিজ্ঞানীদের মতে, বরফের মধ্যে থাকা উপাদানগুলি বিশ্লেষণ করে জানা যাবে পৃথিবীর আশ্চর্য জটিল পরিবর্তনের রহস্য, বিজ্ঞানের পরিভাষায় যা ‘মধ্য-প্লেইস্টোসিন রূপান্তর’ নামে পরিচিত। বিজ্ঞানিরা জানান, প্রায় ৮ লক্ষ থেকে ১২ লক্ষ বছর আগে, পৃথিবীর বরফ যুগের চক্র হঠাৎ বদলে গিয়েছিল। আগে যেখানে ৪১ হাজার বছর অন্তর উষ্ণ যুগ থেকে বরফ যুগে ঢুকত পৃথিবী, সেই চক্র আচমকা ১ লক্ষ বছরে রূপান্তরিত হয়। কীভাবে ঘটেছিল এই পরিবর্তন? বিজ্ঞানীদের কাছে এ এক ‘রোমাঞ্চকর অমীমাংসিত প্রশ্ন’। গবেষণার নেতৃত্বে থাকা ডঃ লিজ থমাস বলেন, ‘এই বরফ এমন এক সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে, যা সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই। এ বরফ শুধু বরফ নয়, মহাকালের স্মারকচিহ্ন, এটিকে গলিয়ে আমরা ফিরে যেতে পারি সময়ের অতলান্ত গভীরে।’ বরফ গলিয়ে যে তরল পাওয়া যাবে, সেটি অত্যাধুনিক যন্ত্র- এর সাহায্যে বিশ্লেষণ করা হবে। ২০টিরও বেশি মৌল ও ধাতব উপাদান চিহ্নিত করা যাবে, যার মধ্যে থাকবে দুর্লভ মাটি থেকে আসা মৌল, সামুদ্রিক উপাদান, এমনকি প্রাচীন আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের চিহ্নও। এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, আশ্চর্য এ বরফের মধ্যে হয়তো এমন সময়ের চিহ্ন আছে, যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রাকৃতিকভাবেই কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ছিল আজকের তুলনায় সমান অথবা সামান্য বেশি। পরীক্ষা সফল হলে, চরম বিশ্বায়নের যুগে, পাওয়া যেতে পারে পরিবেশ রক্ষার অজানা রক্ষাকবজ।
❤ Support Us







