Advertisement
  • এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৫

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার মঞ্চে ‘বাদশা’-রানির জয় আর বিক্রান্তের সরল উচ্ছ্বাস। দাদাসাহেব ফালকের মহার্ঘ স্বীকৃতি মোহনলালকে

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার মঞ্চে ‘বাদশা’-রানির জয় আর বিক্রান্তের সরল উচ্ছ্বাস। দাদাসাহেব ফালকের মহার্ঘ স্বীকৃতি মোহনলালকে

মঙ্গলবারের সন্ধ্যা যেন শুধুই পুরস্কারের জন্য নয়, আবেগ, বন্ধুত্ব আর নির্ভেজাল আনন্দের এক অনন্য প্রদর্শন হয়ে রইল ৭১তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-এর আসর। নয়াদিল্লির বিজ্ঞান ভবনের রাজকীয় মঞ্চে প্রথমবার জাতীয় সম্মান পেলেন শাহরুখ খান, রানি মুখার্জি, বিক্রান্ত মাসে থেকে করণ জোহর কিংবা মালয়ালম কিংবদন্তি মোহনলাল— প্রত্যেকে ছিলেন সে সন্ধ্যার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।

এই প্রথমবার জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে দেখা গেল ‘বলিউড বাদশা’ শাহরুখ খানকে। তিনি ‘জওয়ান’ ছবির জন্য পেয়েছেন সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি। প্রায় ৩ দশকের কর্মজীবনে অসংখ্য বক্স অফিস সাফল্য থাকলেও জাতীয় পুরস্কার কোনোদিন আসেনি তাঁর ঝুলিতে। তাই পদক হাতে পেয়ে কিং খান নিজের আবেগ আর আটকে রাখতে পারেননি। গলায় পদক ঝোলানোর চেষ্টা করতে গিয়ে হেসে বলে উঠলেন, ‘ম্যায় তো ইয়ে পেহেন রহা হুঁ।’ সে এক অদ্ভুত মুহূর্ত— কিং খানের মুখে শিশুসুলভ আনন্দ, যেন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সদ্য মেডেল পাওয়া স্কুলছাত্র। কিন্তু গলায় ফিতে ঠিকমতো পরতে পারছিলেন না শাহরুখ। তখনই এগিয়ে এলেন তাঁর পুরনো বন্ধু, সহঅভিনেত্রী এবং এদিনের আরেক বিজয়িনী রানি মুখার্জি। যিনি ‘মিসেস চ্যাটার্জি ভার্সেস নরওয়ে’ ছবিতে মায়ের প্রতিকৃতি তুলে ধরে পেয়েছেন সেরা অভিনেত্রীর সম্মান। রানি নিজে শাহরুখের গলায় পদকটি পরিয়ে দিলেন। তারপর ক্যামেরা খুলে নিজের পদকের ঝলকও দেখালেন কিং খানকে। এই ছোট্ট মুহূর্তটিই যেন সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিণত হলো বলিউডের বন্ধুত্বের অন্যতম নিদর্শন।

এই আনন্দঘন মুহূর্তে যোগ দেন বিক্রান্ত মাসে, যিনি ১২থ ফেল ছবির জন্য যৌথভাবে সেরা অভিনেতা হয়েছেন শাহরুখের সঙ্গে। মঞ্চ থেকে নেমে এক সাক্ষাৎকারে বিক্রান্ত বলেন, ‘মুহূর্তটা ছিল জাদুর মতো। আমরা যেন স্কুলজীবনে ফিরে গিয়েছিলাম। দু’জনেই খুব খুশি ছিলাম। হাসছিলাম, একে অপরকে বলছিলাম— চলো আমরাও পদক পরে নিই। একে অপরের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিয়েছিলাম।’ সন্ধ্যার শ্রেষ্ঠ সম্মান— দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার উঠল চলচিত্র জগতের এক মহীরুহের হাতে। মালয়ালম চলচ্চিত্রের জীবন্ত কিংবদন্তি মোহনলালকে তাঁর বহুবর্ণ জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ দেওয়া হল অনন্য এই সম্মান, পদক গ্রহণ করে আবেগ সংবরণ করতে পারেননি তিনিও। বললেন, ‘এটি কোনো স্বপ্নপূরণ নয়, বরং তার চেয়েও বেশি। এ এক অলৌকিক মুহূর্ত। এই সম্মান শুধু আমার নয়, মালয়ালম সিনেমার, দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র সংস্কৃতির। আমি কৃতজ্ঞ তাঁদের প্রতি, যাঁরা আমাকে আজকের এই জায়গায় পৌঁছাতে সাহায্য করেছেন।’

বিজ্ঞান ভবনের আরম্বরপূর্ণ সন্ধ্যায় মঞ্চে ওঠেন আরো অনেকে। পরিচালক সুদীপ্ত সেন ‘দ্য কেরালা স্টোরি’-র জন্য পেলেন সেরা পরিচালকের স্বীকৃতি। করণ জোহরের ‘রকি ঔর রানি কি প্রেম কাহানি’ পেল বছরের সবচেয়ে জনপ্রিয় হোলসাম এন্টারটেইনমেন্ট ছবির সম্মান। সামাজিক বার্তা বহনকারী ছবির স্বীকৃতি গেল মেঘনা গুলজার পরিচালিত সাম বাহাদুর-এর ঝুলিতে। শিশু শিল্পী, সম্পাদনা, সিনেমাটোগ্রাফি, সঙ্গীত থেকে শুরু করে আঞ্চলিক ভাষার নানা ছবিও যথোচিত সম্মান পেয়েছে। গানের বিভাগেও ছিল চমক। শিল্পা রাও ‘জওয়ান’ ছবির ‘চালেয়া’ গানের জন্য পেলেন সেরা গায়িকার পুরস্কার। গায়ক হিসাবে সম্মান পেলেন পি. ভি. এন. এস. রোহিত ‘বেবি’ ছবির ‘প্রেমিস্তুন্না’ গানের জন্য। সেরা গীতিকারের পুরস্কার গিয়েছে তেলুগু সিনেমার তরফে কার্সালা শ্যামের হাতে। বৈভবী মার্চেন্ট পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ কোরিওগ্রাফির পুরস্কার, ‘রকি ঔর রানি…’ ছবির ‘ধিনঢিনাধিন’ গানে অনবদ্য নৃত্য পরিকল্পনার জন্য।

আঞ্চলিক ভাষার ছবির মধ্যে নজর কেড়েছে অসমীয়া ছবি ‘রঙ্গতাপু ১৯৮২’, মারাঠি ছবি ‘শামচি আই’, তেলুগু ছবি ‘ভাগবন্ত কেসারি’, গুজরাতি ছবি ‘ভাষ’, পাঞ্জাবি ছবি ‘গোদ্দে গোদ্দে চা’, এবং তামিল ছবি ‘পার্কিং’। প্রতিটি ছবি নিজেদের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে অবলম্বন করে এক গভীর মানবিক বার্তা পরিবেশন করেছে। পুরো অনুষ্ঠান জুড়েই আবেগ আর গর্বের মিশ্র অনুভূতি। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু বললেন, ‘নারীকেন্দ্রিক ছবি আজ সমাজে যতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা শুধু সিনেমার ক্ষেত্রেই নয়, সমাজের মননেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এই পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রগুলি যেন মানুষের ভিতরে আলো জ্বালায়, সচেতনতা ছড়ায়।’ অনুষ্ঠানের শেষ প্রান্তে রাষ্ট্রপতি ভবনের নৈশভোজে দেখা গেল একসঙ্গে বসে হাসতে হাসতে গল্প করছেন শাহরুখ, রানি, করণ জোহর ও বিক্রান্ত। কেউ কেউ বলছেন— সিনেমার বাইরে এটাই সিনেমার আসল চিত্রনাট্য। গৌরী খান পরে ইনস্টাগ্রামে লেখেন, ‘তোমার এই পদক শুধু সম্মান নয়, এটা প্রমাণ করে তুমি সবসময় নিজের কাজে বিশ্বাস রেখেছ।’ ৭১তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের এই সন্ধ্যা আমাদের শিখিয়ে দিল, সাফল্য শুধু পদক বা পুরস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং, কোনো এক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে, পরিশ্রমের ফসল হাতে নিয়ে যখন মানুষ নিজের আবেগকে আলিঙ্গন করে— সেটাই হয় ইতিহাস। শাহরুখের উচ্ছ্বাস, রানির বন্ধুত্ব, বিক্রান্তের সরলতা আর মোহনলালের মাটির গন্ধ মিশে ২০২৫ সালের জাতীয় পুরস্কার হয়ে রইল ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের এক চিরস্মরণীয় অধ্যায়।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!