- প্রচ্ছদ রচনা বৈষয়িক
- ডিসেম্বর ২, ২০২৫
৫৮ হাজার কোটি টাকার গহ্বরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক, পলাতক জালিয়াতদের দেশে ফেরাতে ব্যর্থতা, ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণ ঘিরে প্রশ্নের মুখে কেন্দ্র
পলাতক অর্থ-জালিয়াতদের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির ক্ষতি ৫৮ হাজার কোটি টাকা, সোমবার, সংসদে তথ্য পেশ অর্থ মন্ত্রকের। বিজয় মাল্য, নীরব মোদি, সন্দেসারা পরিবার-সহ মোটা দাগের পলাতক অর্থজালিয়াতরা বিদেশে বিলাসে জীবন কাটালেও, তাঁদের ঋণের দায় আজও বইছে ভারতীয় ব্যাঙ্কগুলি। বিপুল ক্ষতির ভার এখনো সামলে উঠতে পারেনি রাষ্ট্রয়ত ব্যাঙ্কগুলি। কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক সোমবার সংসদে জানিয়েছে, এই পলাতক অর্থ-জালিয়াতদের কাছে ভারতের পাবলিক সেক্টর ব্যাঙ্কগুলির মোট ৫৮,০৮২ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে (৩১ অক্টোবর, ২০২৫ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী)। এর মধ্যে ২৬,৬৪৫ কোটি টাকা আসল ঋণ, আর ৩১,৪৩৭ কোটি টাকা বকেয়া সুদ। এ পর্যন্ত ব্যাঙ্কগুলি মোট ১৯,১৮৭ কোটি টাকা উদ্ধার করতে পেরেছে। তবে বাকি ৩৮,৮৯৫ কোটি টাকা আদায় হয়নি। অর্থ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, বিজয় মাল্য, নীরব মোদি, সন্দেসারা পরিবার-সহ মোট ১৫ জনকে ‘পলাতক আর্থিক অপরাধী’হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, ফিউজিটিভ ইকোনমিক অফেন্ডার্স অ্যাক্ট, ২০১৮ অনুযায়ী।
দেশের ব্যাঙ্ক প্রতারণায় শীর্ষে রয়েছেন বিজয় মাল্য। কিংফিশার এয়ারলাইন্সের নামে তিনি বিভিন্ন ব্যাঙ্ক থেকে বিপুল ঋণ নিয়েছিলেন। শুধু স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার কাছেই তাঁর নেওয়া ঋণ ৬,৮৪৮ কোটি টাকা, যা সুদ-সহ দাঁড়িয়েছে ১১,৯৬০ কোটি টাকায়। মাল্যর কিছু সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ব্যাঙ্কগুলি টাকা তুলতে পারলেও অধিকাংশই এখনও বকেয়া। ভারত থেকে পালিয়েও লন্ডনে তাঁর বিলাসবহুল জীবনের ছবি প্রায়ই প্রকাশ্যে আসে। নীরব মোদি-ও পিছিয়ে নেই। তাঁর মোট বকেয়া ঋণ প্রায় ৭,৮০০ কোটি টাকা, যার বড় অংশ—৬,৭৯৯ কোটি টাকা—নেওয়া হয়েছিল পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক থেকে। সুদ যোগ হলে এই অঙ্ক আরও অনেকটাই বাড়বে। এই পলাতক প্রতারকদের কারণে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির আর্থিক ক্ষতির বোঝা ক্রমেই বাড়ছে। অথচ সামান্য চাকরিজীবী ভারতীয়রা ১০, ১৫, ২০ বছরের মেয়াদে ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি বা ফ্লাট কিনে ঋণের মেয়াদ শেষের ২/৩ বছর আগে ঋণ খেলাপি হলে ব্যাঙ্ক সেই বাড়ি ক্রোক করে নিচ্ছে, এই ছবি হামেশাই আমাদের নজরে আসছে। তাই প্রশ্ন বড় ঋণ খেলাপিদের প্রতি ব্যাঙ্ক ও ভারত সরকারের নরম মনোভাবের কারণ কি? কেন এই বড়ো মাপের ঋণ খেলাপিদের দেশে ফিরিয়ে আন্তে ভারত সরকার পারছে না?
প্রশ্ন উঠছে কেন সরকার জালিয়াতদের দেশে ফেরাতে পারছে না? শুধু কি আইনি জটিলতা, নাকি এই জটিলতার আড়ালে আছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি? সরকার বলছে, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দীর্ঘ, আন্তর্জাতিক আইনের জটপাকানো জাল ভেদ করা সহজ নয়। কিন্তু সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রের ইচ্ছেই সবকিছুর চালিকাশক্তি; যেখানে সেই শক্তিই দুর্বল, সেখানে পলাতকেরা আরও নিশ্চিন্ত হয়ে ওঠেন। প্রশ্ন উঠছে রাষ্ট্রয়ত ব্যাঙ্কের বেসরকারিকরণের সম্ভাবনা নিয়ে। দিল্লির স্কুল অফ ইকনমিকসের মঞ্চে এই বিতর্কের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বেলেছিলেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। অর্থনীতির ছাত্রছাত্রী, গবেষক, অধ্যাপকদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, জাতীয়করণের সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গ। তাঁর গলায় ছিল দৃঢ়তা, আর যুক্তিতে শান দেওয়া যুক্তিবাদ। তিনি বললেন, পাঁচ দশক আগে ব্যাংক জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত দেশকে কিছু অর্জন দিয়েছিল ঠিকই, গ্রামে মফস্বলে শাখা বিস্তার, অগ্রাধিকারভিত্তিক ঋণদান, সরকারি প্রকল্পে অংশগ্রহণ— কিন্তু এর মোদ্দা ফল খুব আশানুরূপ হয়নি। বরং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের জালে পড়ে ব্যাঙ্কগুলির পেশাদারিত্ব খসে পড়েছে। রাজনৈতিক ইচ্ছাই অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ করেছে ব্যাঙ্কের সিদ্ধান্ত। তাঁর বক্তব্যে ফিরে এসেছিল ২০১২–১৩ সালের ভয়াবহ টুইন ব্যালান্স শিট সংকট। সে সময় ব্যাঙ্কের সম্পদগুণমান তলানিতে, অ-পারফর্মিং অ্যাসেটের বোঝা ধারালো ছুরির মতো চেপে বসেছিল ব্যাঙ্কিং কাঠামোর ওপর। নির্মলার দাবি, মোদী সরকারের পরপর ছয় বছরের শৃঙ্খলা আর সংস্কার মিলিয়েই আজ ব্যাঙ্কগুলির আর্থিক ভিত্তি শক্ত, সুস্থ ও স্থিতিশীল। তাঁর মতে, সরকারী মালিকানার চেয়ে পেশাদার পরিচালনার গুরুত্বই বেশি।
কিন্তু অর্থমন্ত্রীর যুক্তির তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে ব্যাঙ্ক ইউনিয়নগুলির তাদের প্রশ্ন, যদি জাতীয়করণ এত অকার্যকর হয়ে থাকে, তবে গ্রামবাংলার ফসল কাটার মাঠে ব্যাঙ্ক কীভাবে পৌঁছল? দরিদ্রতম মানুষ কীভাবে প্রথম ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলল? দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সিঁড়ি বেয়ে সাধারণ মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করেছে একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কর্মীরাই। জনধন যোজনার সাফল্যের পিছনে যে লঘু-নম্র ব্যাঙ্ককর্মীর ঘাম লেগে রয়েছে, সেই সত্যকে তারা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বহু পিএসইউ ব্যঙ্ক একত্রিভূত হয়েছে, বেসরকারী স্টেক আরো বেড়েছে। ইউনিয়নগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণের যে কোনও ভাবনা সংসদে বিস্তৃত আলোচনা, জনপরামর্শ এবং স্বচ্ছ নীতি পর্যালোচনা ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়। বরং প্রয়োজন প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ, পর্যাপ্ত মূলধন এবং পরিষ্কার শাসনব্যবস্থা— মালিকানা বেচে দেওয়া নয়। এই দুই পক্ষের অবস্থান আজ ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুই বিপরীত মেরু। একদিকে সরকারের সংস্কারপন্থী ঝোঁক, অন্যদিকে ইউনিয়নের সামাজিক দায়বোধ। দুই মতের সংঘর্ষ ভারতীয় আর্থিক নীতিকে এক নতুন মোড়ে নিয়ে এসেছে। পলাতক কর্পোরেট ঋণখেলাপি থেকে ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণ— সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক জটিল, বিস্ফোরক পরিবেশ। ভবিষ্যতের পথে ভারতের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা কোন দিকে এগোবে, তা নির্ভর করবে সরকারের নীতি, ইউনিয়নের আন্দোলন এবং দেশের আর্থ-সামাজিক চাহিদার ওপর। এ বিতর্ক আর শুধু সংখ্যার অঙ্কে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ভারতের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, সামাজিক ন্যায় এবং মানুষের আস্থার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। দেশের জনমানস এখন জানতে চায়, কতদিন আর কর্পোরেট জালিয়াতদের বিলাসে ব্যাঙ্কের রক্ত-ঘাম খরচ হবে? আর কতদিন সাধারণ মানুষের স্বপ্নের বাড়ি নিলামে যাবে, অথচ হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপিরা বিদেশের বাতাসে চুল উড়িয়ে ঘুরে বেড়াবে?
❤ Support Us








