- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ১১, ২০২৬
এসআইআর ট্রাইব্যুনাল নিয়ে কমিশনকে ভর্ৎসনা শীর্ষ আদালতের
পশ্চিমবঙ্গে ‘ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ বা ‘এসআইআর’-এ নাম বাদ পড়া প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষ ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয়েছেন। কিন্তু সে আবেদনের কতগুলি এখনো পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাবই নির্বাচন কমিশনের কাছে নেই। এ পরিস্থিতিতে ট্রাইব্যুনালের কাজের গতি নিয়ে মঙ্গলবার তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, এ ভাবে আবেদন নিষ্পত্তি চলতে থাকলে পরবর্তী নির্বাচন এসে যাবে, অথচ বহু আবেদন তখনো ঝুলেই থাকবে।
কংগ্রেস নেতা, প্রাক্তন সাংসদ অধীররঞ্জন চৌধুরীর করা মামলার শুনানিতে শীর্ষ আদালতে এ দিন ট্রাইব্যুনাল প্রসঙ্গ ওঠে। অধীরের আবেদন, মুর্শিদাবাদ ও মালদহে বিপুল সংখ্যক মানুষের ‘এসআইআর’-এ নাম বাদ পড়েছে। সেখানে অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনাল তৈরি করা হোক। প্রয়োজনে ব্লকভিত্তিক ট্রাইব্যুনাল গড়ে দ্রুত শুনানি, আবেদনের নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি পর্যাপ্ত সংখ্যক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে এই কাজে নিয়োগের আবেদনও করেছিলেন তিনি।
মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। সেখানেই ট্রাইব্যুনালের কাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে শীর্ষ আদালত। বিচারপতি বাগচীর বক্তব্য, ট্রাইব্যুনালে আবেদন জমা পড়েছে— শুধু এই তথ্য দিয়ে পরিস্থিতির বিচার করা যায় না। আসল প্রশ্ন, আবেদনগুলির কত দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে। কমিশনের কাছে শীর্ষ আদালত জানতে চায়, এ পর্যন্ত কতগুলি আবেদন ট্রাইব্যুনালে জমা পড়েছে, তার মধ্যে কতগুলির নিষ্পত্তি হয়েছে আর কতগুলি এখনো বিচারাধীন। আপিলের অগ্রগতির পরিষ্কার ছবিও আদালতের সামনে তুলে ধরতে বলা হয়। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, ‘শুধু ট্রাইব্যুনালে আবেদন করলেই তো হবে না। সে আবেদনগুলির কী হচ্ছে, কতগুলি নিষ্পত্তি হল, সেটাও দেখতে হবে।’ তাঁর মতে, আবেদনের সংখ্যা যদি বেশি হয় এবং নিষ্পত্তির গতি যদি যথেষ্ট না হয়, তা হলে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো বা কাঠামোয় বদল আনার বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হতে পারে।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তও কমিশনের উদ্দেশে স্পষ্ট বার্তা দেন। আদালত জানতে চায়, ট্রাইব্যুনালে বাস্তবে কী কাজ হচ্ছে। শুধু কাজ চলছে বলে জানালেই হবে না, তার পরিসংখ্যানও আদালতের সামনে রাখতে হবে। কারণ, এই ট্রাইব্যুনাল গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টই। আর সে সূত্রেই প্রধান বিচারপতির তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, ‘কাজ যদি দ্রুত না হয়, তা হলে তো পরের ভোট চলে আসবে!’ আদালতের এই মন্তব্যে স্পষ্ট, ভোটার তালিকায় নাম ফেরানোর জন্য যে আইনি প্রক্রিয়া তৈরি করা হয়েছে, তার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে শীর্ষ আদালত উদ্বিগ্ন। অধীরের আইনজীবী ফিরদৌস শামিম এবং রউফ রহিম আদালতে জানান, মুর্শিদাবাদ ও মালদহে এসআইআর-এর ফলে নাম বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে বেশি। ফলে ওই দুই জেলায় অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনাল তৈরি করা হলে আবেদনগুলির দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হবে। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও আদালতে সওয়াল করা হয়।
আদালতে আরও অভিযোগ ওঠে, ‘এসআইআর’-এর তালিকায় নাম না থাকার কারণে বহু মানুষ রেশন-সহ বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা থেকে সমস্যায় পড়ছেন। তাঁদের বক্তব্য, ভোটার তালিকায় নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকারি খাদ্যসুরক্ষা বা পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমের সুবিধা থেকে কাউকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। তবে এ অভিযোগকে ট্রাইব্যুনাল সংক্রান্ত মামলার সঙ্গে একসঙ্গে শুনতে রাজি হয়নি শীর্ষ আদালত। বিচারপতি বাগচী স্পষ্ট করে দেন, কোনো ব্যক্তির এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়ার তথ্য ব্যবহার করে রাজ্য সরকার রেশন বা পিডিএসের সুবিধা বন্ধ করছে কি না, সেটি পৃথক বিষয়। এ অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে কলকাতা হাই কোর্টে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
উল্লেখ্য, ‘এসআইআর’-এ বাদ পড়া নামের আপিলের নিষ্পত্তির জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই রাজ্যে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। প্রথমে মোট ২০টি ট্রাইব্যুনাল তৈরি হয়েছিল। পরে দু–জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। বর্তমানে ২৪টি জেলায় ১৮টি ট্রাইব্যুনালে এসআইআর সংক্রান্ত আবেদনগুলির শুনানি চলছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় রাজ্যে প্রায় ৯১ লক্ষ নাম বাদ পড়েছিল। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন বলে আদালতে জানানো হয়েছে। কমিশনের আইনজীবী দামা শেষাদ্রি নায়ডু জানান, ট্রাইব্যুনালের কাঠামো নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট কোনো নির্দেশ দিলে কমিশন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অনলাইনে তথ্য নিয়মিত আপডেট করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মত দেন বিচারপতিরা। তবে তার আগে আদালতের চাওয়া একটাই, এ পর্যন্ত কতগুলি আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে, তার স্পষ্ট এবং বিস্তারিত হিসাব। দ্রুত সে তথ্য নির্বাচন কমিশনকে আদালতে জমা দিতে হবে।
এদিন সুপ্রিম কোর্টে ‘এসআইআর’ সংক্রান্ত আরও একটি মামলারও শুনানি হয়। পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের ‘এসআইআর কমিটি’-র চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ বসুর করা মামলায় প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্র অনুযায়ী ‘এসআইআর’-এ বাদ পড়া ভোটারদের দাবি এবং আপত্তির তথ্য প্রকাশের আবেদন জানানো হয়েছে। ওই মামলায় নির্বাচন কমিশন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং রাজ্যের নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও জবাব চেয়েছে শীর্ষ আদালত। এর আগে ১৭ জুলাই এসআইআর সংক্রান্ত শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, ভোটার তালিকা নিয়ন্ত্রণ ও সংশোধনের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। কিন্তু নাগরিকত্ব যাচাই বা নির্ধারণ করার সাংবিধানিক ক্ষমতা কমিশনের নেই। সে পর্যবেক্ষণের পরেও ‘এসআইআর’ ঘিরে একাধিক মামলা এখনো শীর্ষ আদালতে বিচারাধীন। অধীররঞ্জন চৌধুরীর মামলার পরবর্তী শুনানি ২৫ আগস্ট। সে দিন ‘এসআইআর’ সংক্রান্ত আরও কয়েকটি মামলার সঙ্গে এ মামলাটিও শুনবে সুপ্রিম কোর্ট।
❤ Support Us





