- দে । শ
- আগস্ট ১১, ২০২৬
পেটে ব্যথা, জ্বর-বমি, শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে পার্ক ইনস্টিটিউশনের ৩০ ছাত্রী ! অসুস্থতার কারণ এখনো অজানা
একসঙ্গে এত জন ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ায় উত্তর কলকাতার পার্ক ইনস্টিটিউশন ফর গার্লসের হস্টেল ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। সোমবার দুপুর থেকে শুরু হওয়া ধারাবাহিক অসুস্থতার ঘটনায় মঙ্গলবার নতুন করে আরও ৬ জন ছাত্রীকে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। সব মিলিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩০। তাঁদের অধিকাংশেরই জ্বর, পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব ও বমির উপসর্গ রয়েছে। কয়েক জনের শ্বাসকষ্টের অভিযোগও পাওয়া গিয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এত জন পড়ুয়া একই সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
জানা যাচ্ছে, সোমবার দুপুরের পর হস্টেলে থাকা ছাত্রীদের একাংশ হঠাৎ অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেন। একের পর এক ছাত্রী পেটে ব্যথা, বমি এবং জ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় হস্টেল কর্তৃপক্ষের তরফে দ্রুত তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। দুপুর থেকে রাতের মধ্যে মোট ২৪ জনকে আরজি কর হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। মঙ্গলবার আরও ৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে খবর, আপাতত সকলের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। জরুরি বিভাগে নিয়ে আসার পর চিকিৎসকেরা প্রত্যেকের শারীরিক পরীক্ষা করেন। উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করা হয়েছে। আপাতত সকলকেই চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
ঘটনার খবর পেয়ে মঙ্গলবার সকালে স্কুলের হস্টেলে যায় স্বাস্থ্য দফতরের একটি দল। সঙ্গে ছিলেন ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ ইন ব্যাক্টেরিয়াল ইনফেকশন’-এর প্রতিনিধিরাও। হস্টেলের পানীয় জল, রান্নাঘরের খাবার ও অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। অসুস্থতার কারণ খুঁজে বার করতে বিশেষ দলও গঠন করা হয়েছে বলে স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর। একসঙ্গে এতজন পড়ুয়ার অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে খাবার ও পানীয় জল নিয়ে। হস্টেলের খাবার বা স্কুলের মিড-ডে মিল থেকে খাদ্যে বিষক্রিয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি কোনো ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের সংক্রমণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। তবে এখনও পর্যন্ত স্বাস্থ্য দফতর বা হাসপাতালের তরফে অসুস্থতার নির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি। নমুনাগুলি পরীক্ষার পরেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পার্ক ইনস্টিটিউশনের মিড-ডে মিল যে কমিউনিটি কিচেন থেকে আসে, সেখান থেকেও খাবারের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ওই রান্নাঘরের কর্মীদের বক্তব্য, তাঁদের রান্না করা খাবার থেকেই যদি বিষক্রিয়া হয়ে থাকে, তা হলে সে খাবার খাওয়া অন্য স্কুলের পড়ুয়ারাও অসুস্থ হওয়ার কথা। তাঁদের দাবি, ওই রান্নাঘর থেকে ৫৩টি প্রাথমিক স্কুলে মিড-ডে মিল সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়াও ১৫টি উচ্চ প্রাথমিক স্কুলে খাবার পাঠানো হয়। এখনও পর্যন্ত অন্য স্কুলের পড়ুয়াদের মধ্যে একই ধরনের অসুস্থতার খবর নেই। অন্যদিকে, স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, হস্টেলের আবাসিকদের সকালের জলখাবার এবং রাতের খাবার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে দেওয়া হয়। সেই খাবারের নমুনাও স্বাস্থ্য দফতর সংগ্রহ করেছে। ফলে কোন খাবার বা পানীয় জল থেকে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়নি।
ঘটনার পর স্কুলের সামনে অভিভাবকদের ভিড় দেখা যায়। অনেকেই মেয়েদের হস্টেল থেকে বাড়ি নিয়ে যেতে চাইছেন। তাঁদের অভিযোগ, স্কুলের খাবারের মান নিয়ে আগেও একাধিক বার প্রশ্ন উঠেছে। কয়েক জন অভিভাবকের দাবি, ডাল-চালে পোকা দেখা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পানীয় জল নিয়েও তাঁদের অভিযোগ রয়েছে। এক অভিভাবকের অভিযোগ, ‘মেয়েরা আগে থেকেই খাবার ও জল নিয়ে অভিযোগ করত। এর আগেও হস্টেলের কয়েক জন পড়ুয়া ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু সে অভিযোগের পরেও পরিস্থিতির বিশেষ পরিবর্তন হয়নি।’ অভিভাবকদের একাংশের অভিযোগ, সোমবারের ঘটনার পরে বিষয়টি আরও গুরুতর বলে মনে হচ্ছে। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মেয়েদের হস্টেলে রাখা নিয়েও তাঁরা উদ্বিগ্ন।
হস্টেলের আবাসিকদের বড়ো অংশই দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দা। মেয়েদের অসুস্থতার খবর পেয়ে রাতারাতি কলকাতায় ছুটে এসেছেন তাঁদের বাবা-মায়েরা। হাসপাতালে মেয়েদের দেখে অনেকেরই আতঙ্ক কিছুটা কমলেও হস্টেলে তাঁদের রেখে যেতে রাজি নন তাঁরা। নতুন করে অসুস্থতার সংখ্যা বাড়ায় হস্টেলের অন্য আবাসিকদের মধ্যেও আতঙ্ক বেড়েছে। তাঁদের অনেকেই বাড়িতে ফোন করে পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন।
পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে মঙ্গলবার হস্টেলের পড়ুয়াদের আলাদা করে পানীয় জলের বোতল দেওয়া হয়েছে। তবে হস্টেলের সব আবাসিককে ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠানো হবে কি না, তা নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি স্কুল কর্তৃপক্ষ। তাদের বক্তব্য, সমগ্র শিক্ষা মিশনের তরফে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজন মনে করলে হস্টেলের বাকি আবাসিকদেরও ছুটি দেওয়া হতে পারে। তবে মঙ্গলবার পর্যন্ত সে রকম কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এদিকে, খবর পেয়ে সোমবার রাতেই আরজি কর হাসপাতালে যান রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাঃ শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। চিকিৎসাধীন ছাত্রীদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকদের সঙ্গেও কথা বলেন তিনি। অভিভাবকদের সঙ্গেও কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, ছাত্রীদের হাসপাতালে আনার পর দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ইন্ট্রাভেনাস ওষুধও দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, তৎপরতার সঙ্গে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং বর্তমানে ছাত্রীদের শারীরিক অবস্থা আগের তুলনায় ভালো।
❤ Support Us





