- এই মুহূর্তে দে । শ
- মে ২৭, ২০২৬
কলকাতা পুরসভার গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে ইস্তফা সুশান্ত ঘোষ ও অরূপ চক্রবর্তীর
দলের হাইপ্রোফাইল নেতানেত্রীদের ও মন্ত্রীদের নামে কঠোর সমালোচনা করে কলকাতা পুরসভার ১২ নম্বর বরো কমিটির চেয়ারম্যান পদে ইস্তফা দিলেন ১০৮ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর সুশান্ত ঘোষ। একই ভাবে ৯৮ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর কলকাতা পুরসভার একাউন্টস কমিটি থেকে ইস্তফা দিলেন। তাদের ক্ষোভের লক্ষ্য সেই সব তৃণমূল নেতামন্ত্রীদের দিকে যাঁরা সারাদিন নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থেকে এলাকায় ঘুরেছেন। তিন-চারটে জেলার দায়িত্বে ছিলেন। দলের এই বিপর্যয়ের সময় সেই নিরাপত্তা বলয়ে থাকা সেই কেষ্ট-বিষ্টুরা কোথায় ? সুশান্ত ও অরূপের অভিযোগের লক্ষ্য যে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস সেটা এই দুই তৃণমূল কাউন্সিলরের কথার ইঙ্গিতে স্পষ্ট। তাই বলা যায় নবান্নের ভাঙনের পর কলকাতা পুরসভায় তৃণমূলের ভাঙন চলছেই।
দেবলীনা বিশ্বাস প্রথমে ৯ নম্বর বরো কমিটির চেয়ারপারসন পদ থেকে ইস্তফা দেন। বুধবার কলকাতা পুরসভার ১২ নম্বর বরো কমিটির চেয়ারম্যান পদে ইস্তফা দিলেন সুশান্ত ঘোষ। এছাড়াও কলকাতা পুরসভার একাউন্টস কমিটির সদস্য পদ থেকে ইস্তফা দিলেন কলকাতা পুরসভার ৯৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অরূপ চক্রবর্তী। অরূপ তৃণমূলের অন্যতম মুখপাত্র। সুশান্ত ঘোষ ১০৮ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর। তবে এই দুজনই কাউন্সিলর পদে থাকছেন বলে জানিয়েছেন। কেন তাঁরা পদত্যাগ করছেন নিজেদের পদ থেকে সেই বিষয়ে সুশান্ত ঘোষ ও অরূপ চক্রবর্তী জানান, দুজনের কেউই আর পুরসভার স্বাক্ষর প্রদানকারী হিসেবে থাকতে চান না বলেই ১২ নম্বর বরো কমিটির চেয়ারম্যান পদে ইস্তফা দিলেন সুশান্ত ঘোষ এবং পুরসভার একাউন্টস কমিটির সদস্য পদ থেকে ইস্তফা দিলেন কলকাতা পুরসভার ৯৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অরূপ চক্রবর্তী। জনগণের ভোটে যেহেতু তাঁরা নির্বাচিত তাই তাঁরা কাউন্সিলর পদ ছাড়ছেন না, মানুষের সেবা করার কাজ করবেন বলে। পুরসভার একাউন্টস কমিটির প্রধান হলেন সিপিআই-র কাউন্সিলর মধুছন্দা দেব। তিনি এই মুহূর্তে মুম্বইতে রয়েছেন। তাঁকে হোয়াটস্যাপ-এ ইস্তফাপত্র পাঠিয়ে দেন অরূপ চক্রবর্তী।
সুশান্ত ঘোষ বলেন, “মানুষ চাইলে আমি কাউন্সিলর পদে থাকব। কেন ছাড়ছি সেটা পরে বলব। এই ফল কাম্য ছিল না। এতদিন যাঁরা, যে মন্ত্রী জেড প্লাস ক্যাটাগরি নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন তাঁদের রাস্তায় পাওয়া যাচ্ছে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তাঁরা আমাদের ঘেঁষতে দিতেন না। তাঁর ওপর ৩ থেকে ৪টি জেলার দায়িত্ব ছিল। সে কোথায়? আমি ধন্যবাদ জনাব বিজেপি নেতাদের। তাঁরা আমাদের কর্মীদের ঘরে ফিরতে সহায়তা করেছেন।”
অরূপ চক্রবর্তী বলেন, “হারটাকে মানতে হবে। এটা মানুষের রায়। মানুষ যখন রায় দিয়েছেন তখন সেই রায় মানতেই হবে। এই রায় না মানলে ২০১১, ২০১৬, ২০২১, ২০১৯, ২০২৪-এর জয়টাকেও মানা যাবে না। চিরদিন ক্ষমতা থাকে না। কোথায় সেই কেষ্টবিষ্টু নেতৃত্বরা? কোথায় সেই শিল্পীরা? যাঁরা সারাদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে থাকতেন। আমাদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ঘেঁষতে দিতেন না। মানুষের রায়কে না মানলে মানুষ আমাদের ক্ষমা করবে না। চারুচন্দ্র কলেজের ছাত্র রাজনীতি থেকে সুশান্ত ঘোষের সঙ্গে আমার পরিচয়। আজ এক সঙ্গেই এসেছি ইস্তফা দিতে।”
পরাজয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানেননি, তার পর আপনি বলছেন পরাজয়কে মেনে নিতে হয়, সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের উত্তরে অরূপ চক্রবর্তী বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করার ধৃষ্টতা আমার নেই।”
সুশান্ত ঘোষ বলেন, “মানুষের রায় মেনে গঠনমূলক বিরোধিতা আমাদের করা উচিত। গত ১৫ বছর ধরে আমাকে দলের সঙ্গে লড়তে হয়েছে। ২০২০ সালে আমার ওপর আক্রমণ হয়। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আমার ওপর আক্রমণ হয়। পুলিশ বলেছিল দুষ্কৃতী দুবাইয়ে পালিয়েছে। তারপর তারা ধরা পরে। বিচার হয়। প্রধান অভিযুক্তের জামিন হয়ে যায়। বাকি দুষ্কৃতীরা এখনও জেলে কারণ আমি নিজে উকিল দিয়ে মামলা চালাচ্ছি। আমি নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে বলবো তদন্ত যেন সঠিক ভাবে হয়। প্রকৃত তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের যেন খুঁজে বার করা হয়, এটা আমার জানা দরকার। ঘটনাটা মশারির ভেতর না বাইরে হয়েছে।” সুশান্ত ঘোষ বলেন, “আমি হতাশ তৃণমূল। দক্ষিণ কলকাতায় তৃণমূলের যে ফল তাতে আমি হতাশ। গত ১০ বছর ধরে যে বাহিনী দক্ষিণ কলকাতায় তৃণমূলের নাম করে দাপিয়ে বেরিয়েছিল তাঁদের জন্যই দক্ষিণ কলকাতায় এই অবস্থা। আমার রুবি-র মোড়ে তৃণমূলের যে অফিস ভেঙে গেছে তার সঙ্গে বিজেপির আক্রমণের সম্পর্ক নেই।”
অরূপ চক্রবর্তী বলেন, “আমার ওয়ার্ডের মন্ত্রী আমার এলাকায় আসেননি। নিরাপত্তা নিয়ে নেতা হওয়া যায় না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই সিকিউরিটি নিয়ে ঘোড়া মন্ত্রী রাস্তায় নেই। কোনও কথা বলতে গেলে আমাদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি। সিপিএম-এর শূন্য অবস্থায় রাস্তায় দেখা গেছে, বোর্ডে গণশক্তি লাগাতে দেখা গেছে। জাগো বাংলা লাগাবার লোক নেই। এখনও দলে আছি। দল যদি বলে দল ছেড়ে দেব। দুপুর ১২টার পর ৪ মে যারা তৃণমূল হয়েছেন তারাই ভাঙচুর করেছে তৃণমূল অফিস। এই বিষয়ে আমি শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে একমত। ২০১১ সালে আমাদের দলের কোনও নেতা এই ভাবে কথা বলেননি। দলের নেতা বিপর্যয়ের সময়ে পালিয়ে গেলে কর্মীরা দলে থাকবে কি?”
বুধবার তৃণমূলের এই দু’জন কাউন্সিলর যখন কলকাতা পুরসভায় আসেন পদত্যাগ পত্র জমা দিতে তখন দফতরে মেয়র ফিরহাদ হাকিম এবং চেয়ারপারসন মালা রায় ছিলেন না। নতুন পুর-কমিশনার স্মিতা পাণ্ডের কাছে তাঁরা পদত্যাগপত্র জমা দেন। মধুছন্দা দেবের অফিসেও অরূপ চক্রবর্তী ইস্তফাপত্রের প্রতিলিপি জমা দেন। কলকাতা পুরসভার ১৬টি বরো কমিটি আছে। এর মধ্যে ৯ ও ১২ নম্বর বরো কমিটির পদ থেকে ইস্তফা দিলেন কলকাতা তৃণমূলের দু’জন হেভিওয়েট নেতা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বাড়িতে ডাকা কলকাতা পুরসভা সহ ৫টি পুরসভার কাউন্সিলরদের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকে নির্দেশ দিয়েছিলেন কেউ যেন দল না ছাড়েন। একবার না হলে বারবার কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করে সমন্বয় রেখে চলার বার্তা দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে তার পরেও সুশান্ত ও অরূপ-এর এই সিদ্ধান্ত তৃণমূলের কাছে সঙ্কট হয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে তৃণমূলনেত্রীর নির্দেশ কি দলের নেতা-নেত্রীরা মানছেন না?
কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলরদের নিয়ে বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মেয়র ফিরহাদ হাকিমের কাছে ডোরিনা ক্রসিংয়ে ধর্ণার আয়োজন করতে বলেন। তবে তাতে কোনও কাজ হয়নি। মমতার বাড়িতে কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলরদের বৈঠকে তৃণমূল নেত্রীর ডাকে দ্বারা দেননি কাউন্সিলর বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্ত, সুদর্শনা চক্রবর্তী, তারক সিং সহ বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর। তাই ওই ধর্ণা কর্মসূচি বানচাল হয়ে যায়।
এর আগে দেবলীনা বিশ্বাস ৯ নম্বর বরো কমিটির চেয়ারপারসন পদে ইস্তফা দিয়ে জানান, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর আত্মীয়দের বাড়িতে পুরসভা থেকে নোটিস দেওয়ার পর তাঁর ওপর চাপ আসছিল, তাই তিনি ইস্তফা দেন। এদিকে সুশান্ত ঘোষের বরো চেয়ারম্যান পদে থার সময় দলের গোষ্ঠী কোন্দলের শিকার হন। তাঁর ওপর প্রাণঘাতী আক্রমণ হয়, গুলি চালানো হয় সুশান্ত ঘোষের ওপর। দল তখন কোনও ব্যবস্থা নেয়নি বলে সেই সময় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন সুশান্ত ঘোষ।
❤ Support Us



